লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৮:৪৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অপ্রতিমের জন্য রাষ্ট্রের কাছে কোনো কবিতা নেই

অপ্রতিমের বয়স তেরো। এই সংখ্যাকে আজ আমি শহরের সব সরকারি ভবনের কপালে কালি দিয়ে লিখে দিতে চাই, কারণ তেরো বছর বয়সে একটি ছেলের পৃথিবী হওয়ার কথা ছিল স্কুলের মাঠ, বন্ধুর মুখ, মায়ের রান্নাঘর, পরীক্ষার খাতা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে অসংখ্য নির্বোধ স্বপ্ন; অথচ এই দেশ তাকে তার ভবিষ্যৎসহ গিলে ফেলেছে এবং আমরা এখন সভ্য মানুষের মতো বসে তার মৃত্যুর কারণ খুঁজছি।

অপ্রতিম, তোমার জন্য কোনো স্মৃতিসৌধ চাই না, কোনো ফুলের মালা চাই না, কোনো মন্ত্রী এসে তোমার মা বাবার কাঁধে হাত রাখুক সেটাও চাই না। কারণ রাষ্ট্রের ক্যামেরার সামনে উচ্চারিত সহানুভূতি মৃত শিশুকে ফিরিয়ে আনে না; আমি চাই সেই প্রশ্নটি বেঁচে থাকুক, যে প্রশ্নটি তোমার নিথর শরীর আমাদের দিকে ছুড়ে দিয়েছে—একটি শিশু যখন নিখোঁজ হয়, তখন তাকে খুঁজে ফিরিয়ে আনার জন্য রাষ্ট্রের সমস্ত যন্ত্র কেন একই মুহূর্তে জেগে ওঠে না?

মন্ত্রীরা মাধবীদের নিয়ে কবিতা লিখতে ব্যস্ত। কেউ কেউ রবীন্দ্রনাথের সমগ্র সাহিত্যজীবন খুঁজে বেড়ান আটপৌরে শাড়ি পরা বউদিদের কাছে। অথচ অপ্রতিমের জন্য একটি কবিতা কেন, একটি সরকারি নোটিশও লিখতে পারেন না! তোমরা বলবে—তদন্ত চলছে, আইন তার নিজস্ব গতিতে এগোচ্ছে, অপরাধী শনাক্ত হবে; কিন্তু মায়ের কাছে আইন কোনো বিমূর্ত শব্দ নয়, তার কাছে আইন মানে তার দরজায় ফিরে আসা সন্তানের পায়ের শব্দ, আর অপ্রতিমের ঘরে সেই শব্দ আর ফিরবে না—সুতরাং আমাদের সমস্ত আইন, সমস্ত প্রশাসন, সমস্ত ক্ষমতা আজ একটি তেরো বছরের শিশুর খালি বিছানার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

আমি কাউকে অপরাধী ঘোষণা করছি না; তদন্ত তার কাজ করুক, আদালত তার কাজ করুক—কিন্তু আমি নীরবতাকে অভিযুক্ত করছি, সেই সামাজিক নীরবতাকে, সেই রাজনৈতিক সুবিধাবাদকে, সেই অভ্যাসকে যেখানে একটি শিশুর মৃত্যু কয়েক ঘণ্টার শিরোনাম হয়ে থাকে এবং পরদিন আমরা আবার নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে যাই, যেন অপ্রতিম কোনো মানুষ ছিল না, ছিল ক্ষণস্থায়ী খবর।

অপ্রতিম কোনো দলের ছিল না, কোনো পতাকার ছিল না, কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের ছিল না—ছিল একটি শিশুর সবচেয়ে সাধারণ এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিচয়ে, সে ছিল মানুষ; তাই তার মৃত্যু নিয়ে যে-ই রাজনীতি করুক, যে-ই নিজের পতাকা গেড়ে দিতে চায়, তাকে আমি বলব—পিছিয়ে যাও, মৃত শিশুর পাশে দাঁড়িয়ে নিজের পতাকা উড়িও না, তার পাশে দাঁড়াও একজন মানুষ হয়ে। মায়ের কান্নাকে পাশ কাটিয়ে কোনো রাষ্ট্র নিজেকে নিরাপদ রাষ্ট্র বলে ঘোষণা করতে পারবে না।

আজ রাতে অপ্রতিমের স্কুলব্যাগটি নীরব হয়ে ঘরের এক কোণে, তার বইয়ের পাতাগুলো বন্ধ, তার কলমটি কোনো বাক্যের মাঝখানে থেমে আছে। আমি সেই অসমাপ্ত বাক্যের পাশে গিয়ে বসতে চাই। সেখানে কবিতার শব্দ লিখতে চাই না, লিখতে চাই একটি দীর্ঘ প্রশ্ন: আমরা কি এমন একটি দেশ বানিয়েছি যেখানে তেরো বছরের শিশুরাও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া ঘর থেকে বের হয়?

জনপ্রিয় সংবাদ

মুন্সীগঞ্জে বাস-প্রাইভেটকার সংঘর্ষে ৪ জনের প্রাণহানি

অপ্রতিমের জন্য রাষ্ট্রের কাছে কোনো কবিতা নেই

প্রকাশিত হয়েছে: ০১:০০:৩৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অপ্রতিমের বয়স তেরো। এই সংখ্যাকে আজ আমি শহরের সব সরকারি ভবনের কপালে কালি দিয়ে লিখে দিতে চাই, কারণ তেরো বছর বয়সে একটি ছেলের পৃথিবী হওয়ার কথা ছিল স্কুলের মাঠ, বন্ধুর মুখ, মায়ের রান্নাঘর, পরীক্ষার খাতা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে অসংখ্য নির্বোধ স্বপ্ন; অথচ এই দেশ তাকে তার ভবিষ্যৎসহ গিলে ফেলেছে এবং আমরা এখন সভ্য মানুষের মতো বসে তার মৃত্যুর কারণ খুঁজছি।

অপ্রতিম, তোমার জন্য কোনো স্মৃতিসৌধ চাই না, কোনো ফুলের মালা চাই না, কোনো মন্ত্রী এসে তোমার মা বাবার কাঁধে হাত রাখুক সেটাও চাই না। কারণ রাষ্ট্রের ক্যামেরার সামনে উচ্চারিত সহানুভূতি মৃত শিশুকে ফিরিয়ে আনে না; আমি চাই সেই প্রশ্নটি বেঁচে থাকুক, যে প্রশ্নটি তোমার নিথর শরীর আমাদের দিকে ছুড়ে দিয়েছে—একটি শিশু যখন নিখোঁজ হয়, তখন তাকে খুঁজে ফিরিয়ে আনার জন্য রাষ্ট্রের সমস্ত যন্ত্র কেন একই মুহূর্তে জেগে ওঠে না?

মন্ত্রীরা মাধবীদের নিয়ে কবিতা লিখতে ব্যস্ত। কেউ কেউ রবীন্দ্রনাথের সমগ্র সাহিত্যজীবন খুঁজে বেড়ান আটপৌরে শাড়ি পরা বউদিদের কাছে। অথচ অপ্রতিমের জন্য একটি কবিতা কেন, একটি সরকারি নোটিশও লিখতে পারেন না! তোমরা বলবে—তদন্ত চলছে, আইন তার নিজস্ব গতিতে এগোচ্ছে, অপরাধী শনাক্ত হবে; কিন্তু মায়ের কাছে আইন কোনো বিমূর্ত শব্দ নয়, তার কাছে আইন মানে তার দরজায় ফিরে আসা সন্তানের পায়ের শব্দ, আর অপ্রতিমের ঘরে সেই শব্দ আর ফিরবে না—সুতরাং আমাদের সমস্ত আইন, সমস্ত প্রশাসন, সমস্ত ক্ষমতা আজ একটি তেরো বছরের শিশুর খালি বিছানার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

আমি কাউকে অপরাধী ঘোষণা করছি না; তদন্ত তার কাজ করুক, আদালত তার কাজ করুক—কিন্তু আমি নীরবতাকে অভিযুক্ত করছি, সেই সামাজিক নীরবতাকে, সেই রাজনৈতিক সুবিধাবাদকে, সেই অভ্যাসকে যেখানে একটি শিশুর মৃত্যু কয়েক ঘণ্টার শিরোনাম হয়ে থাকে এবং পরদিন আমরা আবার নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে যাই, যেন অপ্রতিম কোনো মানুষ ছিল না, ছিল ক্ষণস্থায়ী খবর।

অপ্রতিম কোনো দলের ছিল না, কোনো পতাকার ছিল না, কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের ছিল না—ছিল একটি শিশুর সবচেয়ে সাধারণ এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিচয়ে, সে ছিল মানুষ; তাই তার মৃত্যু নিয়ে যে-ই রাজনীতি করুক, যে-ই নিজের পতাকা গেড়ে দিতে চায়, তাকে আমি বলব—পিছিয়ে যাও, মৃত শিশুর পাশে দাঁড়িয়ে নিজের পতাকা উড়িও না, তার পাশে দাঁড়াও একজন মানুষ হয়ে। মায়ের কান্নাকে পাশ কাটিয়ে কোনো রাষ্ট্র নিজেকে নিরাপদ রাষ্ট্র বলে ঘোষণা করতে পারবে না।

আজ রাতে অপ্রতিমের স্কুলব্যাগটি নীরব হয়ে ঘরের এক কোণে, তার বইয়ের পাতাগুলো বন্ধ, তার কলমটি কোনো বাক্যের মাঝখানে থেমে আছে। আমি সেই অসমাপ্ত বাক্যের পাশে গিয়ে বসতে চাই। সেখানে কবিতার শব্দ লিখতে চাই না, লিখতে চাই একটি দীর্ঘ প্রশ্ন: আমরা কি এমন একটি দেশ বানিয়েছি যেখানে তেরো বছরের শিশুরাও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া ঘর থেকে বের হয়?