লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৪:৩৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬, ১৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বলেশ্বর নদে গুমের গোপন ব্যাকরণ: লাশ গুমের লোমহর্ষক চিত্র ও বিচারের দাবি

বরগুনার পাথরঘাটা থানার প্রত্যন্ত চরদুয়ানী খালের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে প্রমত্ত বলেশ্বর নদ। এই নদের মোহনার কাছাকাছি একটি জনমানবহীন চর রয়েছে, যা স্থানীয়দের কাছে ‘মাঝের চর’ বা ‘গুমচর’ নামে পরিচিত। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, গত প্রায় এক দশক ধরে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ধরে আনা অসংখ্য মানুষকে এই চরের গভীর স্রোতে ‘সমাধি’ দেওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগীদের চোখ ও হাত বেঁধে, নৌকার পাটাতনে শুইয়ে গুলি করে বা ছুরি দিয়ে পেট চিরে, শরীরের সঙ্গে সিমেন্টের ব্লক অথবা বস্তা বেঁধে বলেশ্বরের পানিতে ফেলে দেওয়া হতো। নাম-পরিচয়হীন এই গুম হওয়া মানুষদের ঘাতকেরা ডাকত ‘প্যাকেট’ নামে। বছরের পর বছর ধরে চলা এই গোপন অপারেশন পুরো জনপদকে এক নীরব আতঙ্কের মধ্যে রেখেছিল।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্যমতে, গুমের অপারেশনের দিনগুলোতে সাদাপোশাকের কিছু লোক এসে চরদুয়ানী বাজারের বরফকল ও অন্যান্য দোকানপাট রাত ৯টার মধ্যে বন্ধ করে আলো নিভিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিত। বিশ্বস্ত সোর্সদের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে খাবার, দড়ি, লাশ বাঁধার চাটাইসহ প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহ করা হতো। অন্ধকার নেমে এলে ঘাটে গাড়ি এসে থামত এবং চোখ-হাত বাঁধা ‘প্যাকেট’গুলোকে একে একে ট্রলারে তোলা হতো। আশপাশের মানুষ ভয়ে উঁকি দেওয়ারও সাহস পেত না, কারণ অতীতে দুই-একজন মুখ খুলতে গিয়ে চিরতরে হারিয়ে গিয়েছিলেন। এই ‘প্যাকেট’ নামকরণ কেবল নিষ্ঠুরতা নয়, বরং অপরাধের এমন এক কাঠামো তৈরি করার কৌশল যেখানে ভিকটিমের কোনো পরিচয় থাকে না এবং অপরাধীদেরও কোনো স্বাক্ষর বা হদিস মেলে না। গুমবিষয়ক তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে যে, কীভাবে অপহরণ, নির্যাতন, বন্দিত্ব ও হত্যার মতো ভিন্ন ভিন্ন কাজ আলাদা আলাদা দলের মাধ্যমে করানো হতো, যার ফলে এক দল অন্য দলের কাজ সম্পর্কে জানতে পারত না। এই কাঠামোগত ফাঁকফোকরের কারণে গুমের তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়ে।

গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে কেবল কোনো নির্দিষ্ট বাহিনী বা শাসনামলের ‘ব্যক্তিগত পাপ’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মূলত একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্যবহার করার প্রবণতা। যখনই কোনো বাহিনীকে জবাবদিহিহীনভাবে ব্যবহার করা হয়, তখনই তারা বেআইনি পথ বেছে নেয় এবং প্রমাণ লোপাটের জন্য নদী বা স্রোতকে ব্যবহার করে। বলেশ্বর ছাড়াও বাংলাদেশের বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা বা মেঘনার মতো নদীতেও এমন চর্চা হয়েছে, যা প্রত্যক্ষদর্শীরা আদালতে জানিয়েছেন। বৈশ্বিক ইতিহাসেও এর একাধিক উদাহরণ রয়েছে।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর অপরাধের প্রমাণ লোপাটে নদীর ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক দলিল না থাকলেও বলেশ্বরপাড়ের প্রবীণ বাসিন্দারা ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে রক্ষীবাহিনীর কিছু অভিযানের কথা স্মরণ করেন। সে সময় একইভাবে নদীতে মানুষ হারিয়ে যাওয়ার গল্প প্রচলিত ছিল, যাদের মধ্যে একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন বলেও দাবি করা হয়। এর তিন দশক পর অপরাধ দমনের লক্ষ্যে র‍্যাব গঠিত হলেও তাদের বিরুদ্ধেও গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতনের অসংখ্য অভিযোগ ওঠে। গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনও র‍্যাবের সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করেছে এবং বলেশ্বরের ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে র‍্যাব সদস্যদের সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ এসেছে। ১৯৭২ সালের রক্ষীবাহিনী এবং ২০১০ সালের পরবর্তী র‍্যাবের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও, উভয় সময়েই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। জবাবদিহিহীন নিরাপত্তা কাঠামোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হলে কীভাবে একই ধরনের অপরাধপদ্ধতি বারবার ফিরে আসে, এই দুই সময়ের অভিজ্ঞতা তারই প্রমাণ।

বিশ্বের অন্যান্য দেশেও প্রমাণ লোপাটের এই ব্যাকরণ দেখা গেছে। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের পাঞ্জাবে বিদ্রোহ দমনের নামে অসংখ্য শিখ তরুণকে গুম ও হত্যা করে শতদ্রু ও বিপাশা নদীসহ বিভিন্ন খালে ফেলে দেওয়া হয়। ভাসমান লাশের সংখ্যা এতটাই বেড়েছিল যে, ১৯৯২ সালে রাজস্থান সরকার পাঞ্জাব সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানায়। সে সময় মানবাধিকারকর্মী যশবন্ত সিং খালরা পৌরসভার শ্মশানের বেওয়ারিশ খাতা ঘেঁটে নিখোঁজদের হিসাব করা শুরু করলে, ১৯৯৫ সালে তাঁকেও অপহরণ করা হয়। পরে তাঁকে হত্যা করে হরিকে খালে ফেলে দেওয়া হয়, যেখানে শতদ্রু ও বিপাশা নদী মিশেছে।

লাতিন আমেরিকাতেও এই কৌশল বড় পরিসরে ব্যবহৃত হয়েছিল। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত আর্জেন্টিনার সামরিক জান্তা ‘ভুয়েলোস দে লা মুয়ের্তে’ বা ‘ডেথ ফ্লাইট’ পরিচালনা করত, যেখানে অচেতন বন্দীদের বিমান থেকে লা প্লাতা নদী ও আটলান্টিক মহাসাগরে ফেলে দেওয়া হতো। চিলিতে পিনোশের বাহিনী একই কাজ করেছিল মাপোচো নদী ও প্রশান্ত মহাসাগরে। আর্জেন্টিনার সাহসী নারী আসুসেনা ভিয়াফ্লোর নিজের নিখোঁজ ছেলেকে খুঁজতে গিয়ে গড়ে তুলেছিলেন ‘মাদারস অব প্লাজা দে মায়ো’ নামের সংগঠন। ১৯৭৭ সালে তাঁকেও অপহরণ করে ডেথ ফ্লাইট থেকে লা প্লাতায় ফেলে দেওয়া হয় এবং পরে তাঁর মরদেহ উপকূলে ভেসে ওঠে।

তবে নদী সবসময় প্রমাণ গোপন রাখে না, কখনো কখনো তা প্রকাশও করে দেয়। ২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে সাত খুনের মরদেহ ফেলে দেওয়া হলেও তা ভেসে ওঠে এবং পরবর্তীতে সাবেক র‍্যাব কর্মকর্তাসহ ২৬ জনের মৃত্যুদণ্ড হয়। একইভাবে, ২০১০ সালে অপহরণের পর বলেশ্বর নদে ডুবিয়ে দেওয়া হলেও পিলখানা হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী ও সাবেক বিডিআর সদস্য নজরুলের লাশ ভেসে উঠেছিল, যার পরিচয় পরে ডিএনএ পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়। কিন্তু যারা কোনোদিন ভেসে ওঠেনি বা ফিরে আসেনি, তাদের পরিবারের অপেক্ষা ও আইনি সুরক্ষার পথটি অত্যন্ত কঠিন।

গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলেশ্বর ও চরদুয়ানীকে লাশ ফেলার স্থান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এছাড়া মুন্সিগঞ্জে হাত বাঁধা ও মাথায় গুলির ক্ষতসহ বেওয়ারিশ লাশের একটি কবরস্থানের সন্ধান মিলেছে। এসব ঘটনায় বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা সংস্থা, বিশেষ করে র‍্যাবের সংশ্লিষ্টতার কথা এসেছে। দীর্ঘদিনের অভিযোগ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য ও ভুক্তভোগী পরিবারের আশঙ্কার সঙ্গে এখন একটি প্রাতিষ্ঠানিক অনুসন্ধানের ফল যুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন মামলায় চলমান তদন্তেও অনেক নতুন তথ্য উন্মোচিত হচ্ছে।

বর্তমানে গুম প্রতিরোধে একটি নতুন খসড়া আইন চূড়ান্ত পর্যায়ে বিবেচনাধীন রয়েছে। গত ৩ আগস্ট মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার খসড়া আইন, ২০২৬’ নিয়ে মানবাধিকারকর্মী ও বিশেষজ্ঞরা গোলটেবিল বৈঠকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন, যার মধ্যে তদন্তের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া অন্যতম। অন্তর্বর্তী সময়ে জারি হওয়া ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫’ (যা বর্তমানে কার্যকর নয়)-এর কিছু বিধান নতুন আইনে কতটা বজায় রাখা হয়, তার ওপর এর কার্যকারিতা অনেকখানি নির্ভর করবে। বলেশ্বরের মতো ঘটনা যেসব ফাঁকফোকর দিয়ে ঘটেছে, চূড়ান্ত আইনে সেগুলো বন্ধ করাই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। নদীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো না গেলেও যারা প্রমাণ লোপাটের জন্য নদীকে ব্যবহার করেছে, তাদের বিচার করা সম্ভব। বাংলাদেশে বলেশ্বর বা অন্য কোনো নদীকে যেন আর কোনোদিন নিখোঁজ মানুষের ভার বইতে না হয়, তা নিশ্চিত করাই এখন প্রধান কাজ।

আর্জেন্টিনায় ১৯৭৬-৮৩ সময়কালে সামরিক জান্তা পরিচালনা করত ‘ভুয়েলোস দে লা মুয়ের্তে’ (মরণ-উড়াল বা ডেথ ফ্লাইট)।

জনপ্রিয় সংবাদ

নেপালে ভয়াবহ বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭৩৪

বলেশ্বর নদে গুমের গোপন ব্যাকরণ: লাশ গুমের লোমহর্ষক চিত্র ও বিচারের দাবি

প্রকাশিত হয়েছে: ০৯:৩৫:৫৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬

বরগুনার পাথরঘাটা থানার প্রত্যন্ত চরদুয়ানী খালের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে প্রমত্ত বলেশ্বর নদ। এই নদের মোহনার কাছাকাছি একটি জনমানবহীন চর রয়েছে, যা স্থানীয়দের কাছে ‘মাঝের চর’ বা ‘গুমচর’ নামে পরিচিত। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, গত প্রায় এক দশক ধরে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ধরে আনা অসংখ্য মানুষকে এই চরের গভীর স্রোতে ‘সমাধি’ দেওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগীদের চোখ ও হাত বেঁধে, নৌকার পাটাতনে শুইয়ে গুলি করে বা ছুরি দিয়ে পেট চিরে, শরীরের সঙ্গে সিমেন্টের ব্লক অথবা বস্তা বেঁধে বলেশ্বরের পানিতে ফেলে দেওয়া হতো। নাম-পরিচয়হীন এই গুম হওয়া মানুষদের ঘাতকেরা ডাকত ‘প্যাকেট’ নামে। বছরের পর বছর ধরে চলা এই গোপন অপারেশন পুরো জনপদকে এক নীরব আতঙ্কের মধ্যে রেখেছিল।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্যমতে, গুমের অপারেশনের দিনগুলোতে সাদাপোশাকের কিছু লোক এসে চরদুয়ানী বাজারের বরফকল ও অন্যান্য দোকানপাট রাত ৯টার মধ্যে বন্ধ করে আলো নিভিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিত। বিশ্বস্ত সোর্সদের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে খাবার, দড়ি, লাশ বাঁধার চাটাইসহ প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহ করা হতো। অন্ধকার নেমে এলে ঘাটে গাড়ি এসে থামত এবং চোখ-হাত বাঁধা ‘প্যাকেট’গুলোকে একে একে ট্রলারে তোলা হতো। আশপাশের মানুষ ভয়ে উঁকি দেওয়ারও সাহস পেত না, কারণ অতীতে দুই-একজন মুখ খুলতে গিয়ে চিরতরে হারিয়ে গিয়েছিলেন। এই ‘প্যাকেট’ নামকরণ কেবল নিষ্ঠুরতা নয়, বরং অপরাধের এমন এক কাঠামো তৈরি করার কৌশল যেখানে ভিকটিমের কোনো পরিচয় থাকে না এবং অপরাধীদেরও কোনো স্বাক্ষর বা হদিস মেলে না। গুমবিষয়ক তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে যে, কীভাবে অপহরণ, নির্যাতন, বন্দিত্ব ও হত্যার মতো ভিন্ন ভিন্ন কাজ আলাদা আলাদা দলের মাধ্যমে করানো হতো, যার ফলে এক দল অন্য দলের কাজ সম্পর্কে জানতে পারত না। এই কাঠামোগত ফাঁকফোকরের কারণে গুমের তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়ে।

গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে কেবল কোনো নির্দিষ্ট বাহিনী বা শাসনামলের ‘ব্যক্তিগত পাপ’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মূলত একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্যবহার করার প্রবণতা। যখনই কোনো বাহিনীকে জবাবদিহিহীনভাবে ব্যবহার করা হয়, তখনই তারা বেআইনি পথ বেছে নেয় এবং প্রমাণ লোপাটের জন্য নদী বা স্রোতকে ব্যবহার করে। বলেশ্বর ছাড়াও বাংলাদেশের বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা বা মেঘনার মতো নদীতেও এমন চর্চা হয়েছে, যা প্রত্যক্ষদর্শীরা আদালতে জানিয়েছেন। বৈশ্বিক ইতিহাসেও এর একাধিক উদাহরণ রয়েছে।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর অপরাধের প্রমাণ লোপাটে নদীর ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক দলিল না থাকলেও বলেশ্বরপাড়ের প্রবীণ বাসিন্দারা ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে রক্ষীবাহিনীর কিছু অভিযানের কথা স্মরণ করেন। সে সময় একইভাবে নদীতে মানুষ হারিয়ে যাওয়ার গল্প প্রচলিত ছিল, যাদের মধ্যে একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন বলেও দাবি করা হয়। এর তিন দশক পর অপরাধ দমনের লক্ষ্যে র‍্যাব গঠিত হলেও তাদের বিরুদ্ধেও গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতনের অসংখ্য অভিযোগ ওঠে। গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনও র‍্যাবের সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করেছে এবং বলেশ্বরের ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে র‍্যাব সদস্যদের সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ এসেছে। ১৯৭২ সালের রক্ষীবাহিনী এবং ২০১০ সালের পরবর্তী র‍্যাবের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও, উভয় সময়েই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। জবাবদিহিহীন নিরাপত্তা কাঠামোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হলে কীভাবে একই ধরনের অপরাধপদ্ধতি বারবার ফিরে আসে, এই দুই সময়ের অভিজ্ঞতা তারই প্রমাণ।

বিশ্বের অন্যান্য দেশেও প্রমাণ লোপাটের এই ব্যাকরণ দেখা গেছে। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের পাঞ্জাবে বিদ্রোহ দমনের নামে অসংখ্য শিখ তরুণকে গুম ও হত্যা করে শতদ্রু ও বিপাশা নদীসহ বিভিন্ন খালে ফেলে দেওয়া হয়। ভাসমান লাশের সংখ্যা এতটাই বেড়েছিল যে, ১৯৯২ সালে রাজস্থান সরকার পাঞ্জাব সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানায়। সে সময় মানবাধিকারকর্মী যশবন্ত সিং খালরা পৌরসভার শ্মশানের বেওয়ারিশ খাতা ঘেঁটে নিখোঁজদের হিসাব করা শুরু করলে, ১৯৯৫ সালে তাঁকেও অপহরণ করা হয়। পরে তাঁকে হত্যা করে হরিকে খালে ফেলে দেওয়া হয়, যেখানে শতদ্রু ও বিপাশা নদী মিশেছে।

লাতিন আমেরিকাতেও এই কৌশল বড় পরিসরে ব্যবহৃত হয়েছিল। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত আর্জেন্টিনার সামরিক জান্তা ‘ভুয়েলোস দে লা মুয়ের্তে’ বা ‘ডেথ ফ্লাইট’ পরিচালনা করত, যেখানে অচেতন বন্দীদের বিমান থেকে লা প্লাতা নদী ও আটলান্টিক মহাসাগরে ফেলে দেওয়া হতো। চিলিতে পিনোশের বাহিনী একই কাজ করেছিল মাপোচো নদী ও প্রশান্ত মহাসাগরে। আর্জেন্টিনার সাহসী নারী আসুসেনা ভিয়াফ্লোর নিজের নিখোঁজ ছেলেকে খুঁজতে গিয়ে গড়ে তুলেছিলেন ‘মাদারস অব প্লাজা দে মায়ো’ নামের সংগঠন। ১৯৭৭ সালে তাঁকেও অপহরণ করে ডেথ ফ্লাইট থেকে লা প্লাতায় ফেলে দেওয়া হয় এবং পরে তাঁর মরদেহ উপকূলে ভেসে ওঠে।

তবে নদী সবসময় প্রমাণ গোপন রাখে না, কখনো কখনো তা প্রকাশও করে দেয়। ২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে সাত খুনের মরদেহ ফেলে দেওয়া হলেও তা ভেসে ওঠে এবং পরবর্তীতে সাবেক র‍্যাব কর্মকর্তাসহ ২৬ জনের মৃত্যুদণ্ড হয়। একইভাবে, ২০১০ সালে অপহরণের পর বলেশ্বর নদে ডুবিয়ে দেওয়া হলেও পিলখানা হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী ও সাবেক বিডিআর সদস্য নজরুলের লাশ ভেসে উঠেছিল, যার পরিচয় পরে ডিএনএ পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়। কিন্তু যারা কোনোদিন ভেসে ওঠেনি বা ফিরে আসেনি, তাদের পরিবারের অপেক্ষা ও আইনি সুরক্ষার পথটি অত্যন্ত কঠিন।

গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলেশ্বর ও চরদুয়ানীকে লাশ ফেলার স্থান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এছাড়া মুন্সিগঞ্জে হাত বাঁধা ও মাথায় গুলির ক্ষতসহ বেওয়ারিশ লাশের একটি কবরস্থানের সন্ধান মিলেছে। এসব ঘটনায় বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা সংস্থা, বিশেষ করে র‍্যাবের সংশ্লিষ্টতার কথা এসেছে। দীর্ঘদিনের অভিযোগ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য ও ভুক্তভোগী পরিবারের আশঙ্কার সঙ্গে এখন একটি প্রাতিষ্ঠানিক অনুসন্ধানের ফল যুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন মামলায় চলমান তদন্তেও অনেক নতুন তথ্য উন্মোচিত হচ্ছে।

বর্তমানে গুম প্রতিরোধে একটি নতুন খসড়া আইন চূড়ান্ত পর্যায়ে বিবেচনাধীন রয়েছে। গত ৩ আগস্ট মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার খসড়া আইন, ২০২৬’ নিয়ে মানবাধিকারকর্মী ও বিশেষজ্ঞরা গোলটেবিল বৈঠকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন, যার মধ্যে তদন্তের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া অন্যতম। অন্তর্বর্তী সময়ে জারি হওয়া ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫’ (যা বর্তমানে কার্যকর নয়)-এর কিছু বিধান নতুন আইনে কতটা বজায় রাখা হয়, তার ওপর এর কার্যকারিতা অনেকখানি নির্ভর করবে। বলেশ্বরের মতো ঘটনা যেসব ফাঁকফোকর দিয়ে ঘটেছে, চূড়ান্ত আইনে সেগুলো বন্ধ করাই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। নদীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো না গেলেও যারা প্রমাণ লোপাটের জন্য নদীকে ব্যবহার করেছে, তাদের বিচার করা সম্ভব। বাংলাদেশে বলেশ্বর বা অন্য কোনো নদীকে যেন আর কোনোদিন নিখোঁজ মানুষের ভার বইতে না হয়, তা নিশ্চিত করাই এখন প্রধান কাজ।

আর্জেন্টিনায় ১৯৭৬-৮৩ সময়কালে সামরিক জান্তা পরিচালনা করত ‘ভুয়েলোস দে লা মুয়ের্তে’ (মরণ-উড়াল বা ডেথ ফ্লাইট)।