লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৭:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প: বিশ্ববাজারে সম্ভাবনা ও উত্তরণের রূপরেখা

পর্যটন এখন আর কেবল বিনোদন বা অবকাশ যাপনের মাধ্যম নয়, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গতিশীল শিল্প। বিমান পরিবহন, হোটেল-রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, স্থানীয় ব্যবসা, হস্তশিল্প এবং কৃষি থেকে শুরু করে তথ্যপ্রযুক্তি পর্যন্ত পর্যটনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত। একজন পর্যটকের ভ্রমণ ব্যয় সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ে, যা একটি অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনীতিকে সচল রাখে। অথচ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে এখনো তার কাঙ্ক্ষিত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি।

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো তাদের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যকে সফলভাবে পর্যটনপণ্যে রূপান্তর করেছে। নেপাল হিমালয় ও পাহাড়কেন্দ্রিক অ্যাডভেঞ্চার পর্যটন, মালদ্বীপ সমুদ্রকেন্দ্রিক বিলাসবহুল ব্র্যান্ডিং এবং মালয়েশিয়া পরিকল্পিত পর্যটন নগরী গড়ে তোলার মাধ্যমে বিশ্ববাজারে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। বাংলাদেশের বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি কিংবা সিলেটের পাহাড় ও প্রকৃতিতেও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো তৈরি করে একই ধরনের সাফল্য পাওয়া সম্ভব। তবে এই উন্নয়নের ক্ষেত্রে পাহাড় কাটা, বন ধ্বংস বা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদের মতো কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে হবে এবং পরিবেশ ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর বৈচিত্র্য। কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতকে কেন্দ্র করে সার্ফিং, কায়াকিং, স্কুবা ডাইভিং ও সামুদ্রিক জাদুঘরের মতো আধুনিক সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এটি থাইল্যান্ড বা মালদ্বীপের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারবে। এছাড়া কুয়াকাটার সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, পার্বত্য চট্টগ্রামের অ্যাডভেঞ্চার পর্যটন এবং সিলেটের হাওর ও চা-বাগানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পর্যটন সার্কিট গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ঢাকার লালবাগ কেল্লা, ষাটগম্বুজ মসজিদ, মহাস্থানগড়সহ বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে পর্যটন মানচিত্রে গুরুত্ব দিতে হবে।

পর্যটন খাতের প্রকৃত অবদান জানতে নিয়মিত 'ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট' প্রস্তুত করা এবং দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আলাদা পরিসংখ্যান প্রকাশ করা জরুরি। পর্যটন মেলা বা সেমিনার কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও সুপারিশ বাস্তবায়নে সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে। এছাড়া হোটেলকর্মী, গাইড, চালক ও ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের আচরণগত ও ভাষাগত প্রশিক্ষণ প্রদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি পর্যটকদের জন্য বিমানবন্দরে 'ফরেন ট্যুরিস্ট হেল্প জোন' স্থাপন এবং ভিসা প্রক্রিয়া সহজতর করার পাশাপাশি পর্যটন পুলিশকে আরও প্রযুক্তি-নির্ভর ও বহুভাষিক করে তুলতে হবে।

আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের মূল সংকট সম্পদের অভাব নয়, বরং পরিকল্পনা, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও প্রচারণার অভাব। পর্যটনকে কেবল সাধারণ অবকাশযাপনের বিষয় হিসেবে না দেখে জাতীয় অর্থনীতির কৌশলগত শিল্প হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। পরিকল্পিত বিনিয়োগ, উন্নত বিমান যোগাযোগ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

দুর্গাপূজায় সরকারি ছুটি বাড়ল একদিন, টানা পাঁচ দিন ছুটি

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প: বিশ্ববাজারে সম্ভাবনা ও উত্তরণের রূপরেখা

প্রকাশিত হয়েছে: ১২:০০:৪৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পর্যটন এখন আর কেবল বিনোদন বা অবকাশ যাপনের মাধ্যম নয়, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গতিশীল শিল্প। বিমান পরিবহন, হোটেল-রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, স্থানীয় ব্যবসা, হস্তশিল্প এবং কৃষি থেকে শুরু করে তথ্যপ্রযুক্তি পর্যন্ত পর্যটনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত। একজন পর্যটকের ভ্রমণ ব্যয় সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ে, যা একটি অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনীতিকে সচল রাখে। অথচ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে এখনো তার কাঙ্ক্ষিত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি।

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো তাদের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যকে সফলভাবে পর্যটনপণ্যে রূপান্তর করেছে। নেপাল হিমালয় ও পাহাড়কেন্দ্রিক অ্যাডভেঞ্চার পর্যটন, মালদ্বীপ সমুদ্রকেন্দ্রিক বিলাসবহুল ব্র্যান্ডিং এবং মালয়েশিয়া পরিকল্পিত পর্যটন নগরী গড়ে তোলার মাধ্যমে বিশ্ববাজারে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। বাংলাদেশের বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি কিংবা সিলেটের পাহাড় ও প্রকৃতিতেও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো তৈরি করে একই ধরনের সাফল্য পাওয়া সম্ভব। তবে এই উন্নয়নের ক্ষেত্রে পাহাড় কাটা, বন ধ্বংস বা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদের মতো কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে হবে এবং পরিবেশ ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর বৈচিত্র্য। কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতকে কেন্দ্র করে সার্ফিং, কায়াকিং, স্কুবা ডাইভিং ও সামুদ্রিক জাদুঘরের মতো আধুনিক সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এটি থাইল্যান্ড বা মালদ্বীপের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারবে। এছাড়া কুয়াকাটার সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, পার্বত্য চট্টগ্রামের অ্যাডভেঞ্চার পর্যটন এবং সিলেটের হাওর ও চা-বাগানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পর্যটন সার্কিট গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ঢাকার লালবাগ কেল্লা, ষাটগম্বুজ মসজিদ, মহাস্থানগড়সহ বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে পর্যটন মানচিত্রে গুরুত্ব দিতে হবে।

পর্যটন খাতের প্রকৃত অবদান জানতে নিয়মিত 'ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট' প্রস্তুত করা এবং দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আলাদা পরিসংখ্যান প্রকাশ করা জরুরি। পর্যটন মেলা বা সেমিনার কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও সুপারিশ বাস্তবায়নে সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে। এছাড়া হোটেলকর্মী, গাইড, চালক ও ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের আচরণগত ও ভাষাগত প্রশিক্ষণ প্রদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি পর্যটকদের জন্য বিমানবন্দরে 'ফরেন ট্যুরিস্ট হেল্প জোন' স্থাপন এবং ভিসা প্রক্রিয়া সহজতর করার পাশাপাশি পর্যটন পুলিশকে আরও প্রযুক্তি-নির্ভর ও বহুভাষিক করে তুলতে হবে।

আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের মূল সংকট সম্পদের অভাব নয়, বরং পরিকল্পনা, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও প্রচারণার অভাব। পর্যটনকে কেবল সাধারণ অবকাশযাপনের বিষয় হিসেবে না দেখে জাতীয় অর্থনীতির কৌশলগত শিল্প হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। পরিকল্পিত বিনিয়োগ, উন্নত বিমান যোগাযোগ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠবে।