লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১০:৩১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কড়া নজরদারির গুলশানেও বাড়ছে চাঞ্চল্যকর অপরাধ, আতঙ্কে বাসিন্দারা

কড়া নিরাপত্তা বলয়, সিসি ক্যামেরা, পুলিশের নিয়মিত টহল আর চেকপোস্টের নজরদারি পেরিয়েও রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানে একের পর এক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটে চলেছে। বিদেশি embassy, করপোরেট কার্যালয় ও ভিআইপিদের এই এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অপহরণ, ডাকাতির চেষ্টা এমনকি নিষিদ্ধ সংগঠনের মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণের মতো ঘটনা বাসিন্দাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ১ হাজার ২৮০ জন তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজের একটি বড় অংশ গুলশান এলাকায় সক্রিয়। গুলশান-১ ও ২ নম্বর এলাকাকে কেন্দ্র করে সক্রিয় কয়েকটি অপরাধী চক্র স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ফুটপাথের দোকান, কাঁচাবাজার এবং ইন্টারনেট-ক্যাবল ব্যবসা থেকে নিয়মিত চাঁদা তুলছে। বিশেষ করে গভীর রাত ও ভোরের দিকে নির্জন সড়কগুলোতে পথচারী, মোটরসাইকেল আরোহী এবং নগদ অর্থ বহনকারীদের টার্গেট করা হচ্ছে। দিনদুপুরেও গাড়ি থামিয়ে অস্ত্রের মুখে মানুষকে তুলে নিয়ে সর্বস্ব লুটের ঘটনা ঘটছে।

গুলশান-২ এর ৯৬ নম্বর রোডের এক বাসিন্দা জানান, সম্প্রতি তার বাসার এক কর্মী ৯৯ নম্বর রোড দিয়ে হেঁটে আসার সময় একটি মাইক্রোবাসে করে ৩/৪ জন সশস্ত্র যুবক তাকে জোরপূর্বক তুলে নেয়। গাড়ির ভেতরেই তার হাত-মুখ বেঁধে মোবাইল ও মানিব্যাগ কেড়ে নেওয়া হয় এবং এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলে দেওয়ার জন্য মারধর করা হয়। পরে তাকে বনানী লেকের পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। এর আগে গুলশান-১ এর নাভানা টাওয়ারের সামনে থেকে এক ব্যক্তিকে অপহরণ করে পরিত্যক্ত কক্ষে আটকে রাখার ঘটনা ঘটে। পরে তাকে আসাদগেট এলাকায় ছেড়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় বোরহান উদ্দিন পাপ্পু নামের একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এছাড়া গুলশান-২ এর ডিএনসিসি মার্কেটের সামনে এক ব্যবসায়ী ও তার স্বজনকে ছুরিকাঘাত করে প্রায় এক কোটি টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে।

ডাকাতির বড় ধরনের একটি প্রচেষ্টা চলে গুলশান-২ এর ১০৩ নম্বর রোডের একটি ভবনে। সেখানে প্রায় ৫০ জন ব্যক্তি মোটরসাইকেল ও গাড়িতে এসে নিরাপত্তাকর্মীদের হাত বেঁধে ও মুখে স্কচটেপ লাগিয়ে ডাকাতির চেষ্টা করে। গত ৩রা সেপ্টেম্বর বনানীতে ডাকাতির প্রস্তুতির সময় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ, যাদের কাছ থেকে বিদেশি পিস্তল, ওয়াকিটকি ও পুলিশের মনোগ্রামযুক্ত হ্যান্ডকাফ উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতদের একজন র‌্যাবের সদস্য ছিলেন।

এলাকায় আধিপত্য ও ময়লা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বারিধারা জে ব্লকের একটি ডিপোতে তৌহিদ নামে এক শ্রমিককে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালানো হয়। এতে তৌহিদের পায়ে গুলি লাগলে তাকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতাল এবং পরে ঢাকা মেডিকেল ও পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় তৌহিদের ভাই শহীদ মিয়া বাদী হয়ে বরকতুল্লাহ শুভ, হেলাল, লাবু ও মোশারফসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করলে বান্দরবানের একটি রিসোর্ট থেকে ৩ জনকে আটক করা হয়। অন্যদিকে দাবিকৃত চাঁদা না দেওয়ায় গুলশান লেকপাড় এলাকায় শরিফুল ইসলাম করিম নামের এক নার্সারি ব্যবসায়ীকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। এছাড়া গুলশান এভিনিউয়ের ২৯ নম্বর রোডে যৌথ বাহিনীর পোশাক পরে এক ব্যবসায়ীর বাসায় ঢুকে ৪৬ লাখ টাকা ও ৬০ ভরি স্বর্ণালংকার লুট করা হয়।

সম্প্রতি গুলশানের ৩ নম্বর রোডে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আওয়ামী লীগের সংঘবদ্ধ মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে, যা বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। স্থানীয় বাসিন্দা নাঈমুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একটি নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মীরা যেভাবে গুলশানের মতো সুরক্ষিত এলাকায় মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটাতে পেরেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগের। এছাড়া পাকিস্তান ও চীনসহ কয়েকটি দূতাবাসে চাঁদা চেয়ে বোমা হামলার হুমকির ঘটনাও ঘটেছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে গুলশানের বিভিন্ন নাগরিক যোগাযোগ গ্রুপে রাতে চলাচলের সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের জন্য জরুরি বার্তা পোস্ট করা হচ্ছে।

নিরাপত্তা পরিস্থিতির বিষয়ে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী জানান, গুলশান এলাকায় নিয়মিত টহল ও চেকপোস্টের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও নজরদারি চালানো হচ্ছে। অপরাধীরা মূলত রাত বা ভোরে ফাঁকা রাস্তার সুযোগ নিয়ে এসব সংঘবদ্ধ অপরাধ ঘটায়। এদের প্রতিরোধে নাগরিকদের দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তথ্য দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। অন্যদিকে সদ্য যোগদানকারী গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু জায়েদ মো. নাজমুন নূর দাবি করেন, অন্যান্য এলাকার তুলনায় গুলশানের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো ভালো অবস্থানে রয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

নতুন হুমকির মুখে যুক্তরাজ্য ছাড়ল মার্কিন বোমারু বিমান

কড়া নজরদারির গুলশানেও বাড়ছে চাঞ্চল্যকর অপরাধ, আতঙ্কে বাসিন্দারা

প্রকাশিত হয়েছে: ০২:৪৬:২১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

কড়া নিরাপত্তা বলয়, সিসি ক্যামেরা, পুলিশের নিয়মিত টহল আর চেকপোস্টের নজরদারি পেরিয়েও রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানে একের পর এক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটে চলেছে। বিদেশি embassy, করপোরেট কার্যালয় ও ভিআইপিদের এই এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অপহরণ, ডাকাতির চেষ্টা এমনকি নিষিদ্ধ সংগঠনের মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণের মতো ঘটনা বাসিন্দাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ১ হাজার ২৮০ জন তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজের একটি বড় অংশ গুলশান এলাকায় সক্রিয়। গুলশান-১ ও ২ নম্বর এলাকাকে কেন্দ্র করে সক্রিয় কয়েকটি অপরাধী চক্র স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ফুটপাথের দোকান, কাঁচাবাজার এবং ইন্টারনেট-ক্যাবল ব্যবসা থেকে নিয়মিত চাঁদা তুলছে। বিশেষ করে গভীর রাত ও ভোরের দিকে নির্জন সড়কগুলোতে পথচারী, মোটরসাইকেল আরোহী এবং নগদ অর্থ বহনকারীদের টার্গেট করা হচ্ছে। দিনদুপুরেও গাড়ি থামিয়ে অস্ত্রের মুখে মানুষকে তুলে নিয়ে সর্বস্ব লুটের ঘটনা ঘটছে।

গুলশান-২ এর ৯৬ নম্বর রোডের এক বাসিন্দা জানান, সম্প্রতি তার বাসার এক কর্মী ৯৯ নম্বর রোড দিয়ে হেঁটে আসার সময় একটি মাইক্রোবাসে করে ৩/৪ জন সশস্ত্র যুবক তাকে জোরপূর্বক তুলে নেয়। গাড়ির ভেতরেই তার হাত-মুখ বেঁধে মোবাইল ও মানিব্যাগ কেড়ে নেওয়া হয় এবং এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলে দেওয়ার জন্য মারধর করা হয়। পরে তাকে বনানী লেকের পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। এর আগে গুলশান-১ এর নাভানা টাওয়ারের সামনে থেকে এক ব্যক্তিকে অপহরণ করে পরিত্যক্ত কক্ষে আটকে রাখার ঘটনা ঘটে। পরে তাকে আসাদগেট এলাকায় ছেড়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় বোরহান উদ্দিন পাপ্পু নামের একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এছাড়া গুলশান-২ এর ডিএনসিসি মার্কেটের সামনে এক ব্যবসায়ী ও তার স্বজনকে ছুরিকাঘাত করে প্রায় এক কোটি টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে।

ডাকাতির বড় ধরনের একটি প্রচেষ্টা চলে গুলশান-২ এর ১০৩ নম্বর রোডের একটি ভবনে। সেখানে প্রায় ৫০ জন ব্যক্তি মোটরসাইকেল ও গাড়িতে এসে নিরাপত্তাকর্মীদের হাত বেঁধে ও মুখে স্কচটেপ লাগিয়ে ডাকাতির চেষ্টা করে। গত ৩রা সেপ্টেম্বর বনানীতে ডাকাতির প্রস্তুতির সময় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ, যাদের কাছ থেকে বিদেশি পিস্তল, ওয়াকিটকি ও পুলিশের মনোগ্রামযুক্ত হ্যান্ডকাফ উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতদের একজন র‌্যাবের সদস্য ছিলেন।

এলাকায় আধিপত্য ও ময়লা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বারিধারা জে ব্লকের একটি ডিপোতে তৌহিদ নামে এক শ্রমিককে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালানো হয়। এতে তৌহিদের পায়ে গুলি লাগলে তাকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতাল এবং পরে ঢাকা মেডিকেল ও পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় তৌহিদের ভাই শহীদ মিয়া বাদী হয়ে বরকতুল্লাহ শুভ, হেলাল, লাবু ও মোশারফসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করলে বান্দরবানের একটি রিসোর্ট থেকে ৩ জনকে আটক করা হয়। অন্যদিকে দাবিকৃত চাঁদা না দেওয়ায় গুলশান লেকপাড় এলাকায় শরিফুল ইসলাম করিম নামের এক নার্সারি ব্যবসায়ীকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। এছাড়া গুলশান এভিনিউয়ের ২৯ নম্বর রোডে যৌথ বাহিনীর পোশাক পরে এক ব্যবসায়ীর বাসায় ঢুকে ৪৬ লাখ টাকা ও ৬০ ভরি স্বর্ণালংকার লুট করা হয়।

সম্প্রতি গুলশানের ৩ নম্বর রোডে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আওয়ামী লীগের সংঘবদ্ধ মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে, যা বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। স্থানীয় বাসিন্দা নাঈমুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একটি নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মীরা যেভাবে গুলশানের মতো সুরক্ষিত এলাকায় মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটাতে পেরেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগের। এছাড়া পাকিস্তান ও চীনসহ কয়েকটি দূতাবাসে চাঁদা চেয়ে বোমা হামলার হুমকির ঘটনাও ঘটেছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে গুলশানের বিভিন্ন নাগরিক যোগাযোগ গ্রুপে রাতে চলাচলের সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের জন্য জরুরি বার্তা পোস্ট করা হচ্ছে।

নিরাপত্তা পরিস্থিতির বিষয়ে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী জানান, গুলশান এলাকায় নিয়মিত টহল ও চেকপোস্টের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও নজরদারি চালানো হচ্ছে। অপরাধীরা মূলত রাত বা ভোরে ফাঁকা রাস্তার সুযোগ নিয়ে এসব সংঘবদ্ধ অপরাধ ঘটায়। এদের প্রতিরোধে নাগরিকদের দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তথ্য দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। অন্যদিকে সদ্য যোগদানকারী গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু জায়েদ মো. নাজমুন নূর দাবি করেন, অন্যান্য এলাকার তুলনায় গুলশানের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো ভালো অবস্থানে রয়েছে।