লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১১:৩৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইউরোপের অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে চাপে পড়তে পারে বাংলাদেশের রফতানি

ইউরোপের দেশগুলোতে চলমান রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং তা আমদানি চাহিদাকে কীভাবে প্রভাবিত করবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে রফতানি খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে। বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রফতানির প্রায় অর্ধেকই ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোতে যায়, ফলে সেখানকার ভোক্তাদের ক্রয় আচরণে পরিবর্তন এলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের রফতানি আয়ে।

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারি সেবার মান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ থেকে ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়েছে সহিংস বিক্ষোভ। ১৭ অক্টোবর প্যারিস, লিওঁ, মার্সেই, লিমোজসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, দোকানপাটে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে দেড় শতাব্দী পুরনো লিমোজের ঐতিহ্যবাহী সিটি হল। একই দিন ইতালির মিলানেও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদ ও যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ সহিংস হয়ে ওঠে। শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ক্রেতা ও পর্যটকদের পদচারণায় মুখর থাকা পিয়াজ্জা দেল দুয়োমো ও এর পাশের বিলাসপণ্যের বিপণিবিতান খালি হয়ে যায়। ফ্রান্স ও ইতালির পাশাপাশি বেলজিয়াম ও পর্তুগালেও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে।

তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পর্যটকরা সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা। অস্থিরতার কারণে পর্যটন ও মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হলে পণ্য বিক্রিতে প্রভাব পড়তে পারে। ফলে বাংলাদেশের রফতানিকারকদের জন্যও চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে এবং ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পোশাক রফতানির ৪৯ দশমিক ২৫ শতাংশ গেছে ইইউর দেশগুলোয়। এ সময়ে বাজারটিতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি হয়েছে ১ হাজার ৯০৬ কোটি ডলারের, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩ দশমিক ৩১ শতাংশ কম। ইইউর বড় বাজারগুলোর মধ্যে জার্মানিতে বাংলাদেশের মোট পোশাক রফতানির ১১ দশমিক ৩২ শতাংশ, স্পেনে ৯ দশমিক ৩১, নেদারল্যান্ডসে ৫ দশমিক ৬১, ফ্রান্সে ৫ দশমিক শূন্য ৯ এবং ইতালিতে ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ গেছে। বছরওয়ারি হিসাবে জার্মানিতে রফতানি কমেছে ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ, ফ্রান্সে ৮ দশমিক ৭৪ ও ইতালিতে ৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের পরিসংখ্যানে ইইউর বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানির চিত্র কিছুটা ভিন্ন। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ইইউর দেশগুলোয় তৈরি পোশাক রফতানি হয়েছে ৪৯০ কোটি ৪০ লাখ ডলারের, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে স্পেনে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি বেড়েছে ১৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ, নেদারল্যান্ডসে ৯ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ, পোল্যান্ডে ৫ দশমিক ৭৭ ও সুইডেনে ১৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ। বিপরীতে ফ্রান্সে রফতানি কমেছে ৪ দশমিক ৯১ শতাংশ, ইতালিতে ৫ দশমিক ৮২ এবং জার্মানিতে দশমিক ১৫ শতাংশ।

বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে তৈরি পোশাকের অন্যতম বৃহৎ রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান এমএস ডায়িং প্রিন্টিং অ্যান্ড ফিনিশিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মামুনুর রশিদ জানিয়েছেন, ইউরোপের বর্তমান অস্থিরতার প্রভাব তারা অনুভব করছেন। তিনি বলেন, সেখানকার পরিস্থিতি আমরাও ফিল করছি। আমাদের কাছে এখন অর্ডার তুলনামূলক কম। নিয়মিত যা থাকে, তার চেয়ে এ মুহূর্তে কম আছে। বর্তমান যে অস্থিরতা, সেটা নতুন। কিন্তু তার আগে মন্দা পরিস্থিতির কারণে অর্ডার কম ছিল।

ইউরোপভিত্তিক বড় পোশাক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রয়কৌশলে পরিবর্তন আসছে। এইচঅ্যান্ডএম, ইন্ডিটেক্স ও প্রাইমার্কের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড বাংলাদেশ থেকে ক্রয়াদেশের একটি অংশ ভারত, মিসরসহ অন্যান্য গন্তব্যে সরিয়ে নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্য, একক কোনো দেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে উৎপাদন ও পণ্য সংগ্রহের উৎসে বৈচিত্র্য আনার পাশাপাশি ক্রয়মূল্য, সরবরাহের সময় ও উৎপাদন ব্যয় বিবেচনায় নিচ্ছেন ক্রেতারা।

ইউরোপীয় চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (ইউরোচেম) চেয়ারপারসন নুরিয়া লোপেজ বলেন, ইউরোপের অস্থিরতা বাংলাদেশের রফতানিতে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এর প্রভাব শুধু বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বিশ্বজুড়েই ব্যবসা ও বাণিজ্যে এর প্রভাব পড়তে পারে। তার মতে, বিশেষ করে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট, শ্রম অসন্তোষ, মজুরি নিয়ে বিরোধ এবং ব্যবসার পরিবেশে স্থিতিশীলতার অভাব বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিনিয়োগকারী ও ক্রেতাদের কাছে স্থিতিশীলতার শক্তিশালী বার্তা দিতে হবে বাংলাদেশকে। একই সঙ্গে ইইউর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা শুরু করাও গুরুত্বপূর্ণ।

ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-আগস্টে ইইউর দেশগুলোয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পোশাক আমদানি কমেছে ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইইউর পোশাক আমদানির মূল্য ১ হাজার ৩৫০ কোটি ৪৫ লাখ ইউরো থেকে কমে ১ হাজার ১৯২ কোটি ৮০ লাখ ইউরো হয়েছে। অর্থাৎ আট মাসে বাংলাদেশ থেকে আমদানি কমেছে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ইউরোপের অস্থির পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তা বাংলাদেশের রফতানির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হবে। রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‍্যাপিড) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বলেন, যারা ইউরোপীয় ইউনিয়নে পোশাক রফতানি করে, তাদের সবার ওপরই প্রভাব পড়তে পারে। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে তেলের দাম। আবার শীতকালে ইউরোপে গ্যাসের চাহিদা ও দাম বাড়তে পারে। মূল্যস্ফীতির চাপ এবং বর্তমান অস্থিরতা—এ দুটি বিষয় বিবেচনায় নিলে আমার মনে হয়, সামনের দিনগুলোয় ইউরোপের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যে একটা সংকোচন থাকবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঝুঁকির মাত্রা বেশি হওয়ার কারণ আমাদের বাজারের ঘনত্ব। ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, প্রলম্বিত হলে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা আসলে আগে থেকে অনুমান করা যায় না। ব্যবসা-বাণিজ্যে এ ধরনের সংকট আসতেই থাকবে। আমাদের রফতানিকারকদের এগুলো মোকাবেলা করতে শিখতে হবে এবং সম্ভাব্য সংকটের জন্য সবসময় প্রস্তুতি রাখতে হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

চুয়াডাঙ্গায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গরুবোঝাই লাটাহাম্বার উল্টে ব্যবসায়ী নিহত

ইউরোপের অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে চাপে পড়তে পারে বাংলাদেশের রফতানি

প্রকাশিত হয়েছে: ০৩:৫১:২২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

ইউরোপের দেশগুলোতে চলমান রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং তা আমদানি চাহিদাকে কীভাবে প্রভাবিত করবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে রফতানি খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে। বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রফতানির প্রায় অর্ধেকই ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোতে যায়, ফলে সেখানকার ভোক্তাদের ক্রয় আচরণে পরিবর্তন এলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের রফতানি আয়ে।

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারি সেবার মান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ থেকে ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়েছে সহিংস বিক্ষোভ। ১৭ অক্টোবর প্যারিস, লিওঁ, মার্সেই, লিমোজসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, দোকানপাটে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে দেড় শতাব্দী পুরনো লিমোজের ঐতিহ্যবাহী সিটি হল। একই দিন ইতালির মিলানেও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদ ও যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ সহিংস হয়ে ওঠে। শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ক্রেতা ও পর্যটকদের পদচারণায় মুখর থাকা পিয়াজ্জা দেল দুয়োমো ও এর পাশের বিলাসপণ্যের বিপণিবিতান খালি হয়ে যায়। ফ্রান্স ও ইতালির পাশাপাশি বেলজিয়াম ও পর্তুগালেও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে।

তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পর্যটকরা সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা। অস্থিরতার কারণে পর্যটন ও মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হলে পণ্য বিক্রিতে প্রভাব পড়তে পারে। ফলে বাংলাদেশের রফতানিকারকদের জন্যও চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে এবং ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পোশাক রফতানির ৪৯ দশমিক ২৫ শতাংশ গেছে ইইউর দেশগুলোয়। এ সময়ে বাজারটিতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি হয়েছে ১ হাজার ৯০৬ কোটি ডলারের, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩ দশমিক ৩১ শতাংশ কম। ইইউর বড় বাজারগুলোর মধ্যে জার্মানিতে বাংলাদেশের মোট পোশাক রফতানির ১১ দশমিক ৩২ শতাংশ, স্পেনে ৯ দশমিক ৩১, নেদারল্যান্ডসে ৫ দশমিক ৬১, ফ্রান্সে ৫ দশমিক শূন্য ৯ এবং ইতালিতে ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ গেছে। বছরওয়ারি হিসাবে জার্মানিতে রফতানি কমেছে ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ, ফ্রান্সে ৮ দশমিক ৭৪ ও ইতালিতে ৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের পরিসংখ্যানে ইইউর বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানির চিত্র কিছুটা ভিন্ন। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ইইউর দেশগুলোয় তৈরি পোশাক রফতানি হয়েছে ৪৯০ কোটি ৪০ লাখ ডলারের, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে স্পেনে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি বেড়েছে ১৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ, নেদারল্যান্ডসে ৯ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ, পোল্যান্ডে ৫ দশমিক ৭৭ ও সুইডেনে ১৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ। বিপরীতে ফ্রান্সে রফতানি কমেছে ৪ দশমিক ৯১ শতাংশ, ইতালিতে ৫ দশমিক ৮২ এবং জার্মানিতে দশমিক ১৫ শতাংশ।

বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে তৈরি পোশাকের অন্যতম বৃহৎ রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান এমএস ডায়িং প্রিন্টিং অ্যান্ড ফিনিশিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মামুনুর রশিদ জানিয়েছেন, ইউরোপের বর্তমান অস্থিরতার প্রভাব তারা অনুভব করছেন। তিনি বলেন, সেখানকার পরিস্থিতি আমরাও ফিল করছি। আমাদের কাছে এখন অর্ডার তুলনামূলক কম। নিয়মিত যা থাকে, তার চেয়ে এ মুহূর্তে কম আছে। বর্তমান যে অস্থিরতা, সেটা নতুন। কিন্তু তার আগে মন্দা পরিস্থিতির কারণে অর্ডার কম ছিল।

ইউরোপভিত্তিক বড় পোশাক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রয়কৌশলে পরিবর্তন আসছে। এইচঅ্যান্ডএম, ইন্ডিটেক্স ও প্রাইমার্কের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড বাংলাদেশ থেকে ক্রয়াদেশের একটি অংশ ভারত, মিসরসহ অন্যান্য গন্তব্যে সরিয়ে নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্য, একক কোনো দেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে উৎপাদন ও পণ্য সংগ্রহের উৎসে বৈচিত্র্য আনার পাশাপাশি ক্রয়মূল্য, সরবরাহের সময় ও উৎপাদন ব্যয় বিবেচনায় নিচ্ছেন ক্রেতারা।

ইউরোপীয় চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (ইউরোচেম) চেয়ারপারসন নুরিয়া লোপেজ বলেন, ইউরোপের অস্থিরতা বাংলাদেশের রফতানিতে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এর প্রভাব শুধু বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বিশ্বজুড়েই ব্যবসা ও বাণিজ্যে এর প্রভাব পড়তে পারে। তার মতে, বিশেষ করে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট, শ্রম অসন্তোষ, মজুরি নিয়ে বিরোধ এবং ব্যবসার পরিবেশে স্থিতিশীলতার অভাব বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিনিয়োগকারী ও ক্রেতাদের কাছে স্থিতিশীলতার শক্তিশালী বার্তা দিতে হবে বাংলাদেশকে। একই সঙ্গে ইইউর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা শুরু করাও গুরুত্বপূর্ণ।

ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-আগস্টে ইইউর দেশগুলোয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পোশাক আমদানি কমেছে ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইইউর পোশাক আমদানির মূল্য ১ হাজার ৩৫০ কোটি ৪৫ লাখ ইউরো থেকে কমে ১ হাজার ১৯২ কোটি ৮০ লাখ ইউরো হয়েছে। অর্থাৎ আট মাসে বাংলাদেশ থেকে আমদানি কমেছে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ইউরোপের অস্থির পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তা বাংলাদেশের রফতানির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হবে। রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‍্যাপিড) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বলেন, যারা ইউরোপীয় ইউনিয়নে পোশাক রফতানি করে, তাদের সবার ওপরই প্রভাব পড়তে পারে। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে তেলের দাম। আবার শীতকালে ইউরোপে গ্যাসের চাহিদা ও দাম বাড়তে পারে। মূল্যস্ফীতির চাপ এবং বর্তমান অস্থিরতা—এ দুটি বিষয় বিবেচনায় নিলে আমার মনে হয়, সামনের দিনগুলোয় ইউরোপের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যে একটা সংকোচন থাকবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঝুঁকির মাত্রা বেশি হওয়ার কারণ আমাদের বাজারের ঘনত্ব। ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, প্রলম্বিত হলে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা আসলে আগে থেকে অনুমান করা যায় না। ব্যবসা-বাণিজ্যে এ ধরনের সংকট আসতেই থাকবে। আমাদের রফতানিকারকদের এগুলো মোকাবেলা করতে শিখতে হবে এবং সম্ভাব্য সংকটের জন্য সবসময় প্রস্তুতি রাখতে হবে।