লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১১:৪৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সীমান্তের অপরাধ নিয়ে অনুসন্ধানের জেরে প্রাণ হারালেন সাংবাদিক আলিফ

নেত্রকোনার কলমাকান্দা ও দুর্গাপুর সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান, মাদক, অস্ত্র ও স্থানীয় অনিয়ম নিয়ে কাজ করা সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ১৫ অক্টোবর রাত সাড়ে আটটার দিকে দুর্গাপুর উপজেলার বিরিশিরি ইউনিয়নের তেলুনঞ্জিয়া গ্রামে নিজের শ্বশুরবাড়ির কাছে একটি দোকানে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। ৪৪ বছর বয়সী আলিফ অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য ছিলেন এবং আইপি টেলিভিশন চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন। পাশাপাশি তিনি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী দোকানদার রবিন রাংসা জানান, রাত আটটার দিকে আলিফ তাঁর দোকান থেকে সিগারেট কিনে শ্বশুরবাড়ির দিকে যান। কিছুক্ষণ পর তিনি ফিরে এসে ভুলে রেখে যাওয়া মুঠোফোনটি নিয়ে আবারও বের হন। এর পরপরই গুলির শব্দ শোনা যায়। রবিন গুলির শব্দের সময় চায়ের কাপ ধুচ্ছিলেন। তিনি দেখেন, আলিফ মাটিতে পড়ে আছেন। আর লোক দুজন সেখানেই। তখন তিনি ভয়ে দোকানের পেছনের অংশে তাঁর বাসার ভেতরে ঢুকে যান। রবিন রাংসার দোকান থেকে আলিফের শ্বশুরবাড়ির দূরত্ব ৩০০ গজের মতো। আলিফের মাথা, গলা ও বুকে মোট ছয়টি গুলির আঘাত ছিল। ঘটনার পরদিন তাঁর স্ত্রী খাদিজা আক্তার সাত থেকে আটজন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে তাজুল ইসলাম ও শামীম আহমেদ নামের দুই ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা সন্দেহ করা হচ্ছে। শামীমের বিরুদ্ধে ২০১৪ থেকে ২০২৬ সাল সময়ে দুর্গাপুর থানায় অন্তত ২৫টি মামলার খোঁজ পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ১১টিতে হত্যাচেষ্টার ধারা রয়েছে এবং ১৯টি মামলা এখনো চলমান। শামীমের বিরুদ্ধে ২০২২ সালের ৮ অক্টোবর দুর্গাপুরের কুল্লাগড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সুব্রত সাংমা এবং ২০২৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বিরিশিরি ইউনিয়নের নলজোরা গ্রামের মজিবুর রহমান ওরফে ‘দা মজিবুর’ হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে তাজুলের বিরুদ্ধে ২০০৬ থেকে ২০২২ সাল সময়ে অন্তত ১৩টি মামলা রয়েছে, যার মধ্যে তিনটি হত্যাচেষ্টা ও চারটি অস্ত্র আইনের ধারা রয়েছে।

আলিফের স্ত্রী খাদিজা জানান, সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান ও অস্ত্র আসার তথ্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দেওয়ায় এবং ফেসবুকে এসব অপরাধের ভিডিও ও ছবি প্রকাশ করায় সন্ত্রাসীরা তাঁর স্বামীর ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। এমনকি কারাগারের ভেতরেও তাঁকে বিষ প্রয়োগে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের ভাষ্যমতে, হত্যাকাণ্ডের দিন সন্ধ্যায় তাজুলের মোটরসাইকেল চালিয়েছিলেন ইমন এবং সেখানে সৌরভ নামের আরেক সহযোগী উপস্থিত ছিলেন। বর্তমানে পুলিশ এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে কাজ করছে এবং সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্ব ও আশিকুর রহমান ওরফে প্রাঙ্গণ নামের দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

আলিফকে হত্যার আগের চেষ্টাগুলোর মধ্যে একটি ঘটনায় ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি দুর্গাপুর পৌরসভার পানমহাল এলাকায় পুলিশের উপপরিদর্শক মো. শফিকুল ইসলাম নিহত হন, যেখানে হামলাকারীদের মূল লক্ষ্য ছিলেন আলিফ। এছাড়া ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় তাঁকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম করা হয়েছিল। নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম জানান, কিলার গ্রুপটি মোটামুটি পরিষ্কার এবং তাদের নিয়ন্ত্রণকারীদের সম্পৃক্ততা খোঁজা হচ্ছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ, পাশের হার ৫২.১২ শতাংশ

সীমান্তের অপরাধ নিয়ে অনুসন্ধানের জেরে প্রাণ হারালেন সাংবাদিক আলিফ

প্রকাশিত হয়েছে: ০৫:০৮:৪৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

নেত্রকোনার কলমাকান্দা ও দুর্গাপুর সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান, মাদক, অস্ত্র ও স্থানীয় অনিয়ম নিয়ে কাজ করা সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ১৫ অক্টোবর রাত সাড়ে আটটার দিকে দুর্গাপুর উপজেলার বিরিশিরি ইউনিয়নের তেলুনঞ্জিয়া গ্রামে নিজের শ্বশুরবাড়ির কাছে একটি দোকানে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। ৪৪ বছর বয়সী আলিফ অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য ছিলেন এবং আইপি টেলিভিশন চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন। পাশাপাশি তিনি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী দোকানদার রবিন রাংসা জানান, রাত আটটার দিকে আলিফ তাঁর দোকান থেকে সিগারেট কিনে শ্বশুরবাড়ির দিকে যান। কিছুক্ষণ পর তিনি ফিরে এসে ভুলে রেখে যাওয়া মুঠোফোনটি নিয়ে আবারও বের হন। এর পরপরই গুলির শব্দ শোনা যায়। রবিন গুলির শব্দের সময় চায়ের কাপ ধুচ্ছিলেন। তিনি দেখেন, আলিফ মাটিতে পড়ে আছেন। আর লোক দুজন সেখানেই। তখন তিনি ভয়ে দোকানের পেছনের অংশে তাঁর বাসার ভেতরে ঢুকে যান। রবিন রাংসার দোকান থেকে আলিফের শ্বশুরবাড়ির দূরত্ব ৩০০ গজের মতো। আলিফের মাথা, গলা ও বুকে মোট ছয়টি গুলির আঘাত ছিল। ঘটনার পরদিন তাঁর স্ত্রী খাদিজা আক্তার সাত থেকে আটজন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে তাজুল ইসলাম ও শামীম আহমেদ নামের দুই ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা সন্দেহ করা হচ্ছে। শামীমের বিরুদ্ধে ২০১৪ থেকে ২০২৬ সাল সময়ে দুর্গাপুর থানায় অন্তত ২৫টি মামলার খোঁজ পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ১১টিতে হত্যাচেষ্টার ধারা রয়েছে এবং ১৯টি মামলা এখনো চলমান। শামীমের বিরুদ্ধে ২০২২ সালের ৮ অক্টোবর দুর্গাপুরের কুল্লাগড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সুব্রত সাংমা এবং ২০২৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বিরিশিরি ইউনিয়নের নলজোরা গ্রামের মজিবুর রহমান ওরফে ‘দা মজিবুর’ হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে তাজুলের বিরুদ্ধে ২০০৬ থেকে ২০২২ সাল সময়ে অন্তত ১৩টি মামলা রয়েছে, যার মধ্যে তিনটি হত্যাচেষ্টা ও চারটি অস্ত্র আইনের ধারা রয়েছে।

আলিফের স্ত্রী খাদিজা জানান, সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান ও অস্ত্র আসার তথ্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দেওয়ায় এবং ফেসবুকে এসব অপরাধের ভিডিও ও ছবি প্রকাশ করায় সন্ত্রাসীরা তাঁর স্বামীর ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। এমনকি কারাগারের ভেতরেও তাঁকে বিষ প্রয়োগে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের ভাষ্যমতে, হত্যাকাণ্ডের দিন সন্ধ্যায় তাজুলের মোটরসাইকেল চালিয়েছিলেন ইমন এবং সেখানে সৌরভ নামের আরেক সহযোগী উপস্থিত ছিলেন। বর্তমানে পুলিশ এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে কাজ করছে এবং সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্ব ও আশিকুর রহমান ওরফে প্রাঙ্গণ নামের দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

আলিফকে হত্যার আগের চেষ্টাগুলোর মধ্যে একটি ঘটনায় ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি দুর্গাপুর পৌরসভার পানমহাল এলাকায় পুলিশের উপপরিদর্শক মো. শফিকুল ইসলাম নিহত হন, যেখানে হামলাকারীদের মূল লক্ষ্য ছিলেন আলিফ। এছাড়া ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় তাঁকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম করা হয়েছিল। নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম জানান, কিলার গ্রুপটি মোটামুটি পরিষ্কার এবং তাদের নিয়ন্ত্রণকারীদের সম্পৃক্ততা খোঁজা হচ্ছে।