লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৯:০৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এনবিআরের ঢালাও ব্যাংক হিসাব জব্দে ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ

তৈরি পোশাকশিল্পে সম্প্রতি শুরু হওয়া মজুরি আন্দোলন ও অস্থিরতায় বাইরে থেকে ইন্ধন জোগানোর সন্দেহে ২০০টির বেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চেয়ে এনবিআরের নেওয়া পদক্ষেপ ব্যবসাবাণিজ্যে নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। ইতিমধ্যে অন্তত ১০০ জনের ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে করা এই তালিকায় একাধিক নির্দোষ ও অরাজনৈতিক শীর্ষস্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তার নাম চলে আসায় তৈরি পোশাক খাতের মালিকসহ পুরো ব্যবসায়ী মহলে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।

তৈরি পোশাক খাতে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা আন্দোলনের পর গত রোববার সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করে। এরপরও পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত না হওয়ায় শিল্পমালিকেরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে বৈঠক করেন। গত সোমবার সচিবালয়ে পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সাবেক সংসদ সদস্য ও কতিপয় শিল্পমালিক এই অস্থিরতার পেছনে ইন্ধন জোগাচ্ছেন। এই বক্তব্যের পরপরই এনবিআরের আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট (আইটিআইআইইউ) এবং কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) যৌথ ও পৃথকভাবে ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করে ব্যাংক হিসাব তলব ও জব্দের প্রক্রিয়া শুরু করে।

প্রথম আলোর হাতে আসা আইটিআইআইইউ-এর ১১০ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তালিকায় দেখা যায়, সেখানে ৬৭ জনই ব্যবসায়ী। তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের শীর্ষস্থানীয় সাতটি শিল্প গ্রুপের। এই ৬৭ জন ব্যবসায়ীর মধ্যে ছয়জন ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংসদ সদস্য ছিলেন এবং দুজন ছিলেন আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের পদধারী। বাকিদের একটি বড় অংশই দেশের সুনামধন্য পোশাক রপ্তানিকারক ও শিল্পোদ্যোক্তা।

রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা না থাকা সত্ত্বেও ব্যাংক হিসাব জব্দের তালিকায় নাম এসেছে শেল্‌টেক্‌ গ্রুপ ও এনভয় লিগ্যাসি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তানভীর আহমেদ এবং তাঁর মা রাশিদা আহমেদের। তানভীর আহমেদ তৈরি পোশাক, বস্ত্র, সিরামিক ও আবাসন খাতের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এবং তাঁর বাবা দেশের বিশিষ্ট শিল্পোদ্যোক্তা ও এনভয় টেক্সটাইলের চেয়ারম্যান কুতুবউদ্দিন আহমেদ। কুতুবউদ্দিন আহমেদ ও তাঁর ছেলে চার বছর আগে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুস সালাম মুর্শেদীর মালিকানাধীন এনভয় গ্রুপ থেকে ব্যবসায়িকভাবে আলাদা হয়ে যান। কিন্তু এনবিআর পুরানো সূত্রের সূত্র ধরে তানভীর আহমেদ ও তাঁর মায়ের অ্যাকাউন্ট জব্দ করেছে। এ বিষয়ে তানভীর আহমেদ বলেন, ৪০ বছর ধরে গড়ে ওঠা একটা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে কথা বলা যেত। সুনির্দিষ্ট যাচাই-বাছাই না করে এমন পদক্ষেপ নেওয়ায় হয়রানির সৃষ্টি হয়েছে।

অন্যদিকে সালাম মুর্শেদী, তাঁর স্ত্রী শারমিন সালাম ও মেয়ে শেহরীন সালামের হিসাবও জব্দ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এনভয় গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের হিসাব তলব করা হয়েছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর সালাম মুর্শেদী গ্রেপ্তার হওয়ার পর বর্তমানে তাঁর দুই সন্তান শেহরীন সালাম ঐশী ও ইশমাম সালাম ব্যবসা পরিচালনা করছেন।

পোশাক খাতের আশির দশকের শীর্ষ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা এ কে এম মোশাররফ হোসেন, আতিকুর রহমান ও এমডি হাসনাত মোশাররফসহ আটজনের ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং গ্রুপের তিনটি প্রতিষ্ঠানের হিসাব তলব করেছে এনবিআর। অথচ এই উদ্যোক্তাদের রাজনীতির সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা নেই। অন্যায্যভাবে তালিকায় নাম দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের এমডি হাসনাত মোশাররফ জানান, দেশের অন্যান্য কারখানার মতো তাঁদের কারখানার শ্রমিকেরাও আন্দোলনে নামলেও তাঁরা কোনো শ্রমিককে ইন্ধন দেননি।

একইভাবে তুসুকা গ্রুপের ১০টি প্রতিষ্ঠানের হিসাব তলব এবং পরিচালক আরশাদ জামাল, রেফায়েত উল্লাহ, ফিরোজ আলম ও সাবেক সংসদ সদস্য ফয়জুর রহমানসহ নয়জনের হিসাব জব্দ করা হয়েছে। সাবেক সংসদ সদস্য ফয়জুর রহমান রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গ্রেপ্তার হলেও গ্রুপের বাকি তিন উদ্যোক্তা কখনোই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তাঁদের একজন বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি আরশাদ জামালের ব্যবসায়ী হিসেবে ইতিবাচক ভাবমূর্তি রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তুসুকা গ্রুপের এক পরিচালক জানান, তাঁদের কারখানায় ২০-২৫ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। এক দিন উৎপাদন বন্ধ থাকলে এক থেকে দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হয়। ইতিমধ্যে হিসাব জব্দের কারণে কিছু কর্মী বেতন পাননি, যা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে ভুল বার্তা পাঠাচ্ছে।

রপ্তানি খাতের অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান মণ্ডল গ্রুপের ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫৬ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানির রেকর্ড রয়েছে এবং এতে প্রায় ৫০ হাজার কর্মী কাজ করেন। গ্রুপটির ২৮টি প্রতিষ্ঠানের হিসাব তলবসহ চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল মমিন মণ্ডল, এমডি আবদুল আলিম মণ্ডল, পরিচালক জোবায়ের মণ্ডল ও আসাদুর রহমানসহ ১৯ জনের হিসাব জব্দ করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল মমিন মণ্ডল পটপরিবর্তনের পর একাধিক মামলায় আত্মগোপনে আছেন।

চট্টগ্রামের ওয়েল গ্রুপের তিন প্রতিষ্ঠানের হিসাব তলব ও ১১ জনের হিসাব জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে আছেন গ্রুপের চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক কোষাধ্যক্ষ আবদুস সালাম, বর্তমানে কারাবন্দী সাবেক স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা সৈয়দ নুরুল ইসলাম, এবং পরিচালক সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম, সৈয়দ শহীদুল ইসলাম ও সৈয়দ তারিকুল ইসলাম। ওয়েল গ্রুপের খাদ্য, তৈরি পোশাক ও বস্ত্র ব্যবসা রয়েছে।

এ ছাড়া উত্তরাভিত্তিক নিপা গ্রুপের তিনটি প্রতিষ্ঠানের হিসাব তলব এবং সাবেক স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা খসরু চৌধুরীসহ চারজনের হিসাব জব্দ করা হয়েছে। গিভেন্সি গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের হিসাব তলব ও চেয়ারম্যান খতিব আবদুল জাহিদসহ চারজনের ব্যাংক হিসাব স্থগিত করা হয়েছে। বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি এস এম আবদুল মান্নান ও তাঁর স্ত্রী ফরিদা মান্নান এবং সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা ও তাঁর পরিবারের সদস্য ফরিদা ইলিয়াসের হিসাবও ফ্রিজ করেছে এনবিআর।

এনবিআরের ঢালাও ব্যাংক হিসাব জব্দ করার এমন উদ্যোগে ক্ষোভ ও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ী নেতারা। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক জানান, আন্দোলনে কোনো তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন থাকলে তা ভালোভাবে তদন্ত করে সুনির্দিষ্ট দোষীদের শাস্তি দেওয়া উচিত। কিন্তু ঢালাওভাবে হিসাব জব্দ ও তলব ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে এবং এতে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত অভিযোগ আনার আগে সঠিক তদন্ত দরকার। পুরো তালিকা পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ করা হবে বলে তিনি জানান।

পাশাপাশি গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুল মমিন মণ্ডল, ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল আলিম মণ্ডল, পরিচালক জোবায়ের মণ্ডল, আসাদুর রহমানসহ ১৯ জনের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে।সিরাজগঞ্জ-৫ (বেলকুচি-চৌহালী) আসন থেকে ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন গ্রুপটির চেয়ারম্যান আবদুল মমিন মণ্ডল।

২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চেয়ে পাননি।

জনপ্রিয় সংবাদ

আ.লীগকে ফেরানোর মাশুল যেন প্রধানমন্ত্রীকে দিতে না হয়: নাহিদ

এনবিআরের ঢালাও ব্যাংক হিসাব জব্দে ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ

প্রকাশিত হয়েছে: ০১:০৭:২০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬

তৈরি পোশাকশিল্পে সম্প্রতি শুরু হওয়া মজুরি আন্দোলন ও অস্থিরতায় বাইরে থেকে ইন্ধন জোগানোর সন্দেহে ২০০টির বেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চেয়ে এনবিআরের নেওয়া পদক্ষেপ ব্যবসাবাণিজ্যে নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। ইতিমধ্যে অন্তত ১০০ জনের ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে করা এই তালিকায় একাধিক নির্দোষ ও অরাজনৈতিক শীর্ষস্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তার নাম চলে আসায় তৈরি পোশাক খাতের মালিকসহ পুরো ব্যবসায়ী মহলে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।

তৈরি পোশাক খাতে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা আন্দোলনের পর গত রোববার সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করে। এরপরও পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত না হওয়ায় শিল্পমালিকেরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে বৈঠক করেন। গত সোমবার সচিবালয়ে পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সাবেক সংসদ সদস্য ও কতিপয় শিল্পমালিক এই অস্থিরতার পেছনে ইন্ধন জোগাচ্ছেন। এই বক্তব্যের পরপরই এনবিআরের আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট (আইটিআইআইইউ) এবং কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) যৌথ ও পৃথকভাবে ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করে ব্যাংক হিসাব তলব ও জব্দের প্রক্রিয়া শুরু করে।

প্রথম আলোর হাতে আসা আইটিআইআইইউ-এর ১১০ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তালিকায় দেখা যায়, সেখানে ৬৭ জনই ব্যবসায়ী। তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের শীর্ষস্থানীয় সাতটি শিল্প গ্রুপের। এই ৬৭ জন ব্যবসায়ীর মধ্যে ছয়জন ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংসদ সদস্য ছিলেন এবং দুজন ছিলেন আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের পদধারী। বাকিদের একটি বড় অংশই দেশের সুনামধন্য পোশাক রপ্তানিকারক ও শিল্পোদ্যোক্তা।

রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা না থাকা সত্ত্বেও ব্যাংক হিসাব জব্দের তালিকায় নাম এসেছে শেল্‌টেক্‌ গ্রুপ ও এনভয় লিগ্যাসি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তানভীর আহমেদ এবং তাঁর মা রাশিদা আহমেদের। তানভীর আহমেদ তৈরি পোশাক, বস্ত্র, সিরামিক ও আবাসন খাতের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এবং তাঁর বাবা দেশের বিশিষ্ট শিল্পোদ্যোক্তা ও এনভয় টেক্সটাইলের চেয়ারম্যান কুতুবউদ্দিন আহমেদ। কুতুবউদ্দিন আহমেদ ও তাঁর ছেলে চার বছর আগে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুস সালাম মুর্শেদীর মালিকানাধীন এনভয় গ্রুপ থেকে ব্যবসায়িকভাবে আলাদা হয়ে যান। কিন্তু এনবিআর পুরানো সূত্রের সূত্র ধরে তানভীর আহমেদ ও তাঁর মায়ের অ্যাকাউন্ট জব্দ করেছে। এ বিষয়ে তানভীর আহমেদ বলেন, ৪০ বছর ধরে গড়ে ওঠা একটা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে কথা বলা যেত। সুনির্দিষ্ট যাচাই-বাছাই না করে এমন পদক্ষেপ নেওয়ায় হয়রানির সৃষ্টি হয়েছে।

অন্যদিকে সালাম মুর্শেদী, তাঁর স্ত্রী শারমিন সালাম ও মেয়ে শেহরীন সালামের হিসাবও জব্দ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এনভয় গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের হিসাব তলব করা হয়েছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর সালাম মুর্শেদী গ্রেপ্তার হওয়ার পর বর্তমানে তাঁর দুই সন্তান শেহরীন সালাম ঐশী ও ইশমাম সালাম ব্যবসা পরিচালনা করছেন।

পোশাক খাতের আশির দশকের শীর্ষ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা এ কে এম মোশাররফ হোসেন, আতিকুর রহমান ও এমডি হাসনাত মোশাররফসহ আটজনের ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং গ্রুপের তিনটি প্রতিষ্ঠানের হিসাব তলব করেছে এনবিআর। অথচ এই উদ্যোক্তাদের রাজনীতির সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা নেই। অন্যায্যভাবে তালিকায় নাম দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের এমডি হাসনাত মোশাররফ জানান, দেশের অন্যান্য কারখানার মতো তাঁদের কারখানার শ্রমিকেরাও আন্দোলনে নামলেও তাঁরা কোনো শ্রমিককে ইন্ধন দেননি।

একইভাবে তুসুকা গ্রুপের ১০টি প্রতিষ্ঠানের হিসাব তলব এবং পরিচালক আরশাদ জামাল, রেফায়েত উল্লাহ, ফিরোজ আলম ও সাবেক সংসদ সদস্য ফয়জুর রহমানসহ নয়জনের হিসাব জব্দ করা হয়েছে। সাবেক সংসদ সদস্য ফয়জুর রহমান রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গ্রেপ্তার হলেও গ্রুপের বাকি তিন উদ্যোক্তা কখনোই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তাঁদের একজন বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি আরশাদ জামালের ব্যবসায়ী হিসেবে ইতিবাচক ভাবমূর্তি রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তুসুকা গ্রুপের এক পরিচালক জানান, তাঁদের কারখানায় ২০-২৫ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। এক দিন উৎপাদন বন্ধ থাকলে এক থেকে দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হয়। ইতিমধ্যে হিসাব জব্দের কারণে কিছু কর্মী বেতন পাননি, যা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে ভুল বার্তা পাঠাচ্ছে।

রপ্তানি খাতের অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান মণ্ডল গ্রুপের ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫৬ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানির রেকর্ড রয়েছে এবং এতে প্রায় ৫০ হাজার কর্মী কাজ করেন। গ্রুপটির ২৮টি প্রতিষ্ঠানের হিসাব তলবসহ চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল মমিন মণ্ডল, এমডি আবদুল আলিম মণ্ডল, পরিচালক জোবায়ের মণ্ডল ও আসাদুর রহমানসহ ১৯ জনের হিসাব জব্দ করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল মমিন মণ্ডল পটপরিবর্তনের পর একাধিক মামলায় আত্মগোপনে আছেন।

চট্টগ্রামের ওয়েল গ্রুপের তিন প্রতিষ্ঠানের হিসাব তলব ও ১১ জনের হিসাব জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে আছেন গ্রুপের চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক কোষাধ্যক্ষ আবদুস সালাম, বর্তমানে কারাবন্দী সাবেক স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা সৈয়দ নুরুল ইসলাম, এবং পরিচালক সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম, সৈয়দ শহীদুল ইসলাম ও সৈয়দ তারিকুল ইসলাম। ওয়েল গ্রুপের খাদ্য, তৈরি পোশাক ও বস্ত্র ব্যবসা রয়েছে।

এ ছাড়া উত্তরাভিত্তিক নিপা গ্রুপের তিনটি প্রতিষ্ঠানের হিসাব তলব এবং সাবেক স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা খসরু চৌধুরীসহ চারজনের হিসাব জব্দ করা হয়েছে। গিভেন্সি গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের হিসাব তলব ও চেয়ারম্যান খতিব আবদুল জাহিদসহ চারজনের ব্যাংক হিসাব স্থগিত করা হয়েছে। বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি এস এম আবদুল মান্নান ও তাঁর স্ত্রী ফরিদা মান্নান এবং সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা ও তাঁর পরিবারের সদস্য ফরিদা ইলিয়াসের হিসাবও ফ্রিজ করেছে এনবিআর।

এনবিআরের ঢালাও ব্যাংক হিসাব জব্দ করার এমন উদ্যোগে ক্ষোভ ও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ী নেতারা। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক জানান, আন্দোলনে কোনো তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন থাকলে তা ভালোভাবে তদন্ত করে সুনির্দিষ্ট দোষীদের শাস্তি দেওয়া উচিত। কিন্তু ঢালাওভাবে হিসাব জব্দ ও তলব ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে এবং এতে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত অভিযোগ আনার আগে সঠিক তদন্ত দরকার। পুরো তালিকা পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ করা হবে বলে তিনি জানান।

পাশাপাশি গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুল মমিন মণ্ডল, ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল আলিম মণ্ডল, পরিচালক জোবায়ের মণ্ডল, আসাদুর রহমানসহ ১৯ জনের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে।সিরাজগঞ্জ-৫ (বেলকুচি-চৌহালী) আসন থেকে ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন গ্রুপটির চেয়ারম্যান আবদুল মমিন মণ্ডল।

২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চেয়ে পাননি।