লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৯:২৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পোশাক খাতে শ্রমিক আন্দোলনে হাজার কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতি

পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে চলমান একটানা বিক্ষোভ, কর্মবিরতি ও সংঘর্ষের জেরে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত পোশাকশিল্প বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। গত প্রায় এক সপ্তাহের আন্দোলনে শত শত কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকায় রপ্তানি কার্যক্রমে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটেছে। বিভিন্ন সূত্র ও মালিক পক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এই কয়েকদিনের আন্দোলনে পোশাক খাতের সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে সম্পদহানি এবং রপ্তানি ব্যাহতের হিসাব পুনরাবৃত্তিমূলক হওয়ায় প্রকৃত ক্ষতির চূড়ান্ত চিত্র পেতে আরও সপ্তাহখানেক সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন যে, এই দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা নতুন ক্রয়াদেশ হারানোর পাশাপাশি রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র তথ্য অনুযায়ী, ১লা নভেম্বর মিরপুর, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়াসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের ৫২৯টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। এতে প্রায় ৩ কোটি ডলার বা প্রায় ৩৭৩ কোটি টাকার রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হয়। পরদিন ২রা নভেম্বর ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে ৬৯০টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকায় আরও প্রায় ৪ কোটি ডলারের রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং প্রায় ১৬ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক কাজে যোগ দিতে পারেননি। সবমিলিয়ে প্রথম দুইদিনেই প্রায় ৭ কোটি ডলার বা ৮৫০ কোটি টাকার রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। পরবর্তী তিন দিনে অর্থাৎ ৩রা নভেম্বর ১৫০টি, ৪ঠা নভেম্বর ২০০টি এবং ৫ই নভেম্বর ৭০টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধের তথ্য পাওয়া যায়। এই তিন দিনে মোট ৪২০টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকায় আরও প্রায় ৩ কোটি ডলার বা ৩৭৩ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। সবমিলিয়ে আলোচ্য সময়ে রপ্তানিকারকরা ১ হাজার ২২৩ কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

বিজিএমইএ’র হিসাব অনুযায়ী, অন্তত ২০-২৫টি কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া গাজীপুরে গত ছয়দিনের আন্দোলনে প্রায় ৮৫০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে সংগঠনটি জানিয়েছে। তবে গাজীপুরের এই হিসাব এবং রপ্তানি বিঘ্নের হিসাবের মধ্যে সময়ের আংশিক পুনরাবৃত্তি থাকতে পারে, তাই সব মিলিয়ে আন্দোলনের কয়েকদিনে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই জানিয়েছে, চলমান শ্রমিক অসন্তোষে পোশাক খাতের পাশাপাশি অন্যান্য শিল্প কারখানাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে।

আন্দোলনের সময় গাজীপুরের কোনাবাড়ী ও কালিয়াকৈরসহ বিভিন্ন এলাকায় কারখানা ও গুদামে আগুন এবং মিরপুরে পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরিস্থিতির কারণে মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী মেট্রোরেল স্টেশনে সাময়িকভাবে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে কারখানা ছুটি ঘোষণা করতে হয়। কারখানা বন্ধ থাকলেও উদ্যোক্তাদের বিদ্যুৎ, গ্যাস, প্রশাসনিক ব্যয় এবং যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের মতো নির্দিষ্ট পরিচালন ব্যয়গুলো বহন করতে হচ্ছে, যা মালিকপক্ষের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে।

স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম জানান, তার প্রতিষ্ঠানের ৪৫টি উৎপাদন লাইনবিশিষ্ট দু’টি কারখানা বন্ধ রাখতে হওয়ায় প্রতিদিন প্রায় ৯০ হাজার ডলার ব্যয় হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, উৎপাদন সূচি ব্যাহত হওয়ায় ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে, যা ভবিষ্যতে ক্রয়াদেশ অন্য দেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি (অর্থ) মো. মিজানুর রহমান জানান, শ্রমিকরা কারখানায় এসে আন্দোলনে যোগ দেয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন চালানো সম্ভব হয়নি, তবে সরাসরি সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। এফবিসিসিআই’র প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, পোশাক খাতে এমন বিশৃঙ্খলা কাম্য নয়, কারণ এটি আমাদের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের ক্রয়াদেশ ও সরবরাহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। ব্যবসায়ীদের শঙ্কা, নির্ধারিত সময়ে পণ্য জাহাজীকরণ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তি রক্ষা করা কঠিন হবে। পণ্য পাঠাতে দেরি হলে জরিমানা, আকাশপথে অতিরিক্ত ব্যয়ে পণ্য পরিবহন কিংবা ভবিষ্যতে ক্রয়াদেশ অন্য দেশে চলে যাওয়ার মতো গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

আ.লীগকে ফেরানোর মাশুল যেন প্রধানমন্ত্রীকে দিতে না হয়: নাহিদ

পোশাক খাতে শ্রমিক আন্দোলনে হাজার কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতি

প্রকাশিত হয়েছে: ০১:২১:০১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬

পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে চলমান একটানা বিক্ষোভ, কর্মবিরতি ও সংঘর্ষের জেরে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত পোশাকশিল্প বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। গত প্রায় এক সপ্তাহের আন্দোলনে শত শত কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকায় রপ্তানি কার্যক্রমে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটেছে। বিভিন্ন সূত্র ও মালিক পক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এই কয়েকদিনের আন্দোলনে পোশাক খাতের সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে সম্পদহানি এবং রপ্তানি ব্যাহতের হিসাব পুনরাবৃত্তিমূলক হওয়ায় প্রকৃত ক্ষতির চূড়ান্ত চিত্র পেতে আরও সপ্তাহখানেক সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন যে, এই দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা নতুন ক্রয়াদেশ হারানোর পাশাপাশি রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র তথ্য অনুযায়ী, ১লা নভেম্বর মিরপুর, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়াসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের ৫২৯টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। এতে প্রায় ৩ কোটি ডলার বা প্রায় ৩৭৩ কোটি টাকার রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হয়। পরদিন ২রা নভেম্বর ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে ৬৯০টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকায় আরও প্রায় ৪ কোটি ডলারের রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং প্রায় ১৬ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক কাজে যোগ দিতে পারেননি। সবমিলিয়ে প্রথম দুইদিনেই প্রায় ৭ কোটি ডলার বা ৮৫০ কোটি টাকার রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। পরবর্তী তিন দিনে অর্থাৎ ৩রা নভেম্বর ১৫০টি, ৪ঠা নভেম্বর ২০০টি এবং ৫ই নভেম্বর ৭০টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধের তথ্য পাওয়া যায়। এই তিন দিনে মোট ৪২০টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকায় আরও প্রায় ৩ কোটি ডলার বা ৩৭৩ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। সবমিলিয়ে আলোচ্য সময়ে রপ্তানিকারকরা ১ হাজার ২২৩ কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

বিজিএমইএ’র হিসাব অনুযায়ী, অন্তত ২০-২৫টি কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া গাজীপুরে গত ছয়দিনের আন্দোলনে প্রায় ৮৫০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে সংগঠনটি জানিয়েছে। তবে গাজীপুরের এই হিসাব এবং রপ্তানি বিঘ্নের হিসাবের মধ্যে সময়ের আংশিক পুনরাবৃত্তি থাকতে পারে, তাই সব মিলিয়ে আন্দোলনের কয়েকদিনে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই জানিয়েছে, চলমান শ্রমিক অসন্তোষে পোশাক খাতের পাশাপাশি অন্যান্য শিল্প কারখানাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে।

আন্দোলনের সময় গাজীপুরের কোনাবাড়ী ও কালিয়াকৈরসহ বিভিন্ন এলাকায় কারখানা ও গুদামে আগুন এবং মিরপুরে পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরিস্থিতির কারণে মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী মেট্রোরেল স্টেশনে সাময়িকভাবে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে কারখানা ছুটি ঘোষণা করতে হয়। কারখানা বন্ধ থাকলেও উদ্যোক্তাদের বিদ্যুৎ, গ্যাস, প্রশাসনিক ব্যয় এবং যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের মতো নির্দিষ্ট পরিচালন ব্যয়গুলো বহন করতে হচ্ছে, যা মালিকপক্ষের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে।

স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম জানান, তার প্রতিষ্ঠানের ৪৫টি উৎপাদন লাইনবিশিষ্ট দু’টি কারখানা বন্ধ রাখতে হওয়ায় প্রতিদিন প্রায় ৯০ হাজার ডলার ব্যয় হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, উৎপাদন সূচি ব্যাহত হওয়ায় ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে, যা ভবিষ্যতে ক্রয়াদেশ অন্য দেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি (অর্থ) মো. মিজানুর রহমান জানান, শ্রমিকরা কারখানায় এসে আন্দোলনে যোগ দেয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন চালানো সম্ভব হয়নি, তবে সরাসরি সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। এফবিসিসিআই’র প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, পোশাক খাতে এমন বিশৃঙ্খলা কাম্য নয়, কারণ এটি আমাদের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের ক্রয়াদেশ ও সরবরাহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। ব্যবসায়ীদের শঙ্কা, নির্ধারিত সময়ে পণ্য জাহাজীকরণ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তি রক্ষা করা কঠিন হবে। পণ্য পাঠাতে দেরি হলে জরিমানা, আকাশপথে অতিরিক্ত ব্যয়ে পণ্য পরিবহন কিংবা ভবিষ্যতে ক্রয়াদেশ অন্য দেশে চলে যাওয়ার মতো গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।