লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৯:০০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ঐতিহ্য বিনির্মাণের নতুন লড়াই বাংলাদেশে

প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮: ০০ (15 September 2026, 08:00)

জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পাশাপাশি জাতীয় আত্মপরিচয় ও সংস্কৃতির গভীর কিছু প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। গত পাঁচ দশকে দেশের শিক্ষিত ও সচেতন সমাজের বড় একটি অংশ যেসব বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে দ্বিধাবোধ করতেন, নতুন প্রজন্ম এখন সেই জড়তা ভেঙে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। তারা নিজেদের ইতিহাস, বিশ্বাস, সংগীত, সাহিত্য ও জীবনবোধের সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণের দাবি জানাচ্ছে।

একটি রাষ্ট্র কেবল সংবিধান, নির্বাচন কিংবা অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে না। জাতির প্রকৃত ভিত্তি হলো তার ইতিহাস, স্মৃতি, মূল্যবোধ এবং নিজস্ব গল্প নিজে বলার সক্ষমতা। যে জাতি নিজের গল্প নিজে বলতে পারে না, তারা একসময় অন্যের তৈরি করা আখ্যানের মধ্যে নিজেদের অস্তিত্ব খুঁজতে বাধ্য হয়। এই বাস্তবতায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কেমন সাংস্কৃতিক বাংলাদেশ রেখে যাওয়া হবে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

এই মৌলিক প্রশ্নটি সাহসের সঙ্গে তুলেছিলেন শহীদ শরীফ ওসমান হাদি। তার প্রতিষ্ঠিত ইনকিলাব মঞ্চ ও ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার দেশে একটি বিকল্প সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিল। তার সব বক্তব্যের সঙ্গে সবার একমত হওয়ার প্রয়োজন না থাকলেও, তার উত্থাপিত প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রশ্নটি হলো—দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও ইতিহাসকে বাদ দিয়ে কি বাংলাদেশের সংস্কৃতির একটি পূর্ণাঙ্গ পরিচয় দাঁড় করানো সম্ভব?

এখন সময় এসেছে এই বিষয়টিকে কেবল প্রতিবাদ বা পাল্টা বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আরও বড় পরিসরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার। সমাজে যখন নিজস্ব সংস্কৃতির চেয়ে осуществ বহিরাগত সংস্কৃতির প্রভাব অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়, তখন তার পেছনে সুনির্দিষ্ট সামাজিক, ঐতিহাসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণ থাকে। তাই কেবল সমালোচনা না করে সেই মূল সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা জরুরি। সাংস্কৃতিক জগতে কোনো শূন্যস্থান থাকে না; আমরা যদি নতুন প্রজন্মের জন্য নিজেদের ইতিহাস ও মূল্যবোধভিত্তিক ভালো সিনেমা, নাটক, গান বা অ্যানিমেশন তৈরি করতে না পারি, তবে তারা স্বাভাবিকভাবেই বিকল্প উৎস খুঁজবে।

আমাদের নিজেদেরই প্রশ্ন করা উচিত, দেশের সন্তানদের জন্য বিশ্বমানের অ্যানিমেশন বা আমাদের মনীষী ও সমাজসংস্কারকদের নিয়ে আকর্ষণীয় উপস্থাপনা কোথায়? আমাদের গৌরবময় সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ইতিহাস নিয়ে মানসম্মত সাংস্কৃতিক আয়োজনের অভাব স্পষ্ট, কারণ আমরা তা পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরি করতে পারিনি।

পার্শ্ববর্তী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক অঙ্গন থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার থাকলেও, তাদের নিজেদের সাংস্কৃতিক অভিভাবক মনে করা সমীচীন নয়। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের সমাজের একটি অংশের মধ্যে এমন মানসিকতা তৈরি হয়েছে যে, 'শুদ্ধ' উচ্চারণ বা সাহিত্যিক স্বীকৃতির জন্য কলকাতার দিকে তাকাতে হবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের নিজস্ব সৃষ্টিশীলতাকে খাটো করে। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আমাদের ভাষার মিল থাকলেও ইতিহাসবোধ, ধর্মীয়-সামাজিক অভিজ্ঞতা এবং জীবনদর্শন সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। প্রতিটি জনগোষ্ঠীর শিল্প ও সংস্কৃতিতে তার নিজস্ব জীবনবোধ ও বিশ্বাসের প্রতিফলন থাকাটাই স্বাভাবিক। তাই পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কটি হওয়া উচিত সমমর্যাদার দুই প্রতিবেশীর মতো, কোনোভাবেই গুরু-শিষ্যের সম্পর্কে নয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

সিলেট সফরে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ঐতিহ্য বিনির্মাণের নতুন লড়াই বাংলাদেশে

প্রকাশিত হয়েছে: ০২:০৪:২১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮: ০০ (15 September 2026, 08:00)

জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পাশাপাশি জাতীয় আত্মপরিচয় ও সংস্কৃতির গভীর কিছু প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। গত পাঁচ দশকে দেশের শিক্ষিত ও সচেতন সমাজের বড় একটি অংশ যেসব বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে দ্বিধাবোধ করতেন, নতুন প্রজন্ম এখন সেই জড়তা ভেঙে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। তারা নিজেদের ইতিহাস, বিশ্বাস, সংগীত, সাহিত্য ও জীবনবোধের সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণের দাবি জানাচ্ছে।

একটি রাষ্ট্র কেবল সংবিধান, নির্বাচন কিংবা অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে না। জাতির প্রকৃত ভিত্তি হলো তার ইতিহাস, স্মৃতি, মূল্যবোধ এবং নিজস্ব গল্প নিজে বলার সক্ষমতা। যে জাতি নিজের গল্প নিজে বলতে পারে না, তারা একসময় অন্যের তৈরি করা আখ্যানের মধ্যে নিজেদের অস্তিত্ব খুঁজতে বাধ্য হয়। এই বাস্তবতায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কেমন সাংস্কৃতিক বাংলাদেশ রেখে যাওয়া হবে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

এই মৌলিক প্রশ্নটি সাহসের সঙ্গে তুলেছিলেন শহীদ শরীফ ওসমান হাদি। তার প্রতিষ্ঠিত ইনকিলাব মঞ্চ ও ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার দেশে একটি বিকল্প সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিল। তার সব বক্তব্যের সঙ্গে সবার একমত হওয়ার প্রয়োজন না থাকলেও, তার উত্থাপিত প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রশ্নটি হলো—দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও ইতিহাসকে বাদ দিয়ে কি বাংলাদেশের সংস্কৃতির একটি পূর্ণাঙ্গ পরিচয় দাঁড় করানো সম্ভব?

এখন সময় এসেছে এই বিষয়টিকে কেবল প্রতিবাদ বা পাল্টা বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আরও বড় পরিসরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার। সমাজে যখন নিজস্ব সংস্কৃতির চেয়ে осуществ বহিরাগত সংস্কৃতির প্রভাব অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়, তখন তার পেছনে সুনির্দিষ্ট সামাজিক, ঐতিহাসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণ থাকে। তাই কেবল সমালোচনা না করে সেই মূল সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা জরুরি। সাংস্কৃতিক জগতে কোনো শূন্যস্থান থাকে না; আমরা যদি নতুন প্রজন্মের জন্য নিজেদের ইতিহাস ও মূল্যবোধভিত্তিক ভালো সিনেমা, নাটক, গান বা অ্যানিমেশন তৈরি করতে না পারি, তবে তারা স্বাভাবিকভাবেই বিকল্প উৎস খুঁজবে।

আমাদের নিজেদেরই প্রশ্ন করা উচিত, দেশের সন্তানদের জন্য বিশ্বমানের অ্যানিমেশন বা আমাদের মনীষী ও সমাজসংস্কারকদের নিয়ে আকর্ষণীয় উপস্থাপনা কোথায়? আমাদের গৌরবময় সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ইতিহাস নিয়ে মানসম্মত সাংস্কৃতিক আয়োজনের অভাব স্পষ্ট, কারণ আমরা তা পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরি করতে পারিনি।

পার্শ্ববর্তী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক অঙ্গন থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার থাকলেও, তাদের নিজেদের সাংস্কৃতিক অভিভাবক মনে করা সমীচীন নয়। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের সমাজের একটি অংশের মধ্যে এমন মানসিকতা তৈরি হয়েছে যে, 'শুদ্ধ' উচ্চারণ বা সাহিত্যিক স্বীকৃতির জন্য কলকাতার দিকে তাকাতে হবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের নিজস্ব সৃষ্টিশীলতাকে খাটো করে। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আমাদের ভাষার মিল থাকলেও ইতিহাসবোধ, ধর্মীয়-সামাজিক অভিজ্ঞতা এবং জীবনদর্শন সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। প্রতিটি জনগোষ্ঠীর শিল্প ও সংস্কৃতিতে তার নিজস্ব জীবনবোধ ও বিশ্বাসের প্রতিফলন থাকাটাই স্বাভাবিক। তাই পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কটি হওয়া উচিত সমমর্যাদার দুই প্রতিবেশীর মতো, কোনোভাবেই গুরু-শিষ্যের সম্পর্কে নয়।