লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০১:৪০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সরকার ও দলে একাকার বিএনপি, ৮ মাসে স্তিমিত সাংগঠনিক তৎপরতা

দীর্ঘ প্রায় আঠারো বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা-হামলার পথ পেরিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরলেও সরকার গঠনের আট মাসের মাথায় সাংগঠনিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার আশঙ্কায় পড়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠন করে এবং দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। তবে রাষ্ট্র পরিচালনায় মন্ত্রী, এমপি ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের ব্যস্ততা বাড়লেও দলীয় ব্যানারে স্বাধীন ও জনসম্পৃক্ত রাজনৈতিক কর্মসূচির দৃশ্যমানতা অনেকটাই কমে গেছে। ফলে দীর্ঘদিন রাজপথে থাকা দলটি এখন সরকারের মধ্যেই অনেকটা একাকার হয়ে পড়েছে বলে আলোচনা চলছে।

দল ও সরকারকে পৃথক সত্তা হিসেবে রাখার বিষয়ে বিএনপির নীতিগত সিদ্ধান্ত থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন কম। গত ৯ মে দলের এক বিশেষ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দল ও সরকার আলাদা রাখার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন। তবে এর পর ছয় মাস অতিবাহিত হলেও বিষয়টির কার্যকর কোনো বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। জ্বালানি সংকট, হাম প্রাদুর্ভাব কিংবা শিশু নির্যাতনের মতো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়েও অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এই স্থবিরতার প্রভাব আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও পড়তে পারে।

সাংগঠনিক চিত্রে দেখা যায়, বর্তমানে বিএনপির ৮২টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে ৭৪টি জেলা কমিটিরই মেয়াদ পার হয়ে গেছে। সিংহভাগ উপজেলা ও থানায় কোনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই, আর দু-একটি জায়গায় যা-ও আছে, তা স্থানীয় প্রভাবশালী মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের নিয়ন্ত্রণে। সারা দেশে তৃণমূল কমিটি পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত হাইকমান্ড থেকে থাকলেও তা বাস্তবায়নে গতি নেই। একই সঙ্গে সরকারের কর্মসূচি ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে নেতাদের উপস্থিতি দেখা গেলেও নিজস্ব দলীয় কার্যালয়ভিত্তিক কর্মকাণ্ড, কর্মিসভা কিংবা রাজনৈতিক ইস্যুতে প্রচার ধারাবাহিকতা আগের তুলনায় অনেকটাই কমে গেছে।

দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ছিল সব ধরনের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক তৎপরতার মূল কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নেতা-কর্মী ও সংবাদকর্মীদের পদচারণায় মুখর থাকা নয়াপল্টন কার্যালয় এখন অনেকটাই শান্ত ও নীরব। দলের জ্যেষ্ঠ নেতা থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলার শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা এখন সচিবালয় কিংবা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় সময় দিচ্ছেন। কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম আজম সৈকত জানান, আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা ২৫ থেকে ৩০ জনের বেশি সাবেক ছাত্রদল নেতাকে এবার মন্ত্রী ও এমপি করা হয়েছে। অন্য ত্যাগী নেতাদেরও ধাপে ধাপে পদায়ন ও মূল্যায়ন করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ক্ষমতায় আসার পর মন্ত্রী-এমপিদের ঘিরে স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাববলয় ও নিজস্ব গ্রুপ তৈরির অভিযোগ তুলেছেন তৃণমূলের একশ্রেণির নেতা-কর্মী। দীর্ঘদিনের পুরোনো ও ত্যাগী কর্মীদের অবমূল্যায়ন করে অপেক্ষাকৃত নতুন ও প্রভাবশালী অংশ সুযোগ-সুবিধা পাওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় কোন্দল তৈরি হচ্ছে। এই সাংগঠনিক দুর্বলতা ও স্থানীয় অভ্যন্তরীণ দূরত্বের সুযোগে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য বিরোধী দল মাঠপর্যায়ে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান ও তৎপরতা বৃদ্ধির চেষ্টা চালাচ্ছে।

দল ও সরকার আলাদা রাখার বিষয়ে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স জানান, যারা দলের শীর্ষ নেতা, তারাই সরকারের মন্ত্রী ও এমপি হওয়ায় দুটি কাজ পৃথক করা বেশ কঠিন। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম থেকেই বিষয় দুটিকে আলাদা রাখার চেষ্টা চালাচ্ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের অপর এক জ্যেষ্ঠ নেতাও জানান, একই ব্যক্তির ওপর দুই দায়িত্ব থাকায় সমন্বয়ে জটিলতা হচ্ছে, তাই 'এক ব্যক্তি এক পদ' নীতি বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। অন্যদিকে কৃষক দলের কেন্দ্রীয় ধর্মবিষয়ক সম্পাদক কাদের সিদ্দিকী বলেন, আন্দোলন শেষ হওয়ার পর নেতাদের ওপর সরকার পরিচালনার দায়িত্ব বেড়েছে, তবে সরকারের সিদ্ধান্তের পক্ষে জনমত গঠন ও তৃণমূলের কথা শোনার কাজ নিয়মিত করা প্রয়োজন।

দলটির জ্যেষ্ঠ নেতৃত্ব অবশ্য স্থবিরতার অভিযোগ পুরোপুরি মেনে নিতে রাজি নন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিএনপি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। দল পুনর্গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং সম্প্রতি দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও সর্বস্তরের কমিটি নতুন করে সাজানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, সরকার গঠনের পর কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়নি, কেবল কিছুটা স্তিমিত হয়েছে। আর দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বলেন, সরকার গঠনের পর প্রথম প্রাধান্য ছিল জনগণের চাহিদা পূরণ করা। তার পাশাপাশি সাংগঠনিক কাজও চলছে এবং দ্রুতই তা আরও জোরদার করা হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাজেকে সড়ক অবরোধকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলি

সরকার ও দলে একাকার বিএনপি, ৮ মাসে স্তিমিত সাংগঠনিক তৎপরতা

প্রকাশিত হয়েছে: ০৬:০১:১৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

দীর্ঘ প্রায় আঠারো বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা-হামলার পথ পেরিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরলেও সরকার গঠনের আট মাসের মাথায় সাংগঠনিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার আশঙ্কায় পড়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠন করে এবং দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। তবে রাষ্ট্র পরিচালনায় মন্ত্রী, এমপি ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের ব্যস্ততা বাড়লেও দলীয় ব্যানারে স্বাধীন ও জনসম্পৃক্ত রাজনৈতিক কর্মসূচির দৃশ্যমানতা অনেকটাই কমে গেছে। ফলে দীর্ঘদিন রাজপথে থাকা দলটি এখন সরকারের মধ্যেই অনেকটা একাকার হয়ে পড়েছে বলে আলোচনা চলছে।

দল ও সরকারকে পৃথক সত্তা হিসেবে রাখার বিষয়ে বিএনপির নীতিগত সিদ্ধান্ত থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন কম। গত ৯ মে দলের এক বিশেষ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দল ও সরকার আলাদা রাখার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন। তবে এর পর ছয় মাস অতিবাহিত হলেও বিষয়টির কার্যকর কোনো বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। জ্বালানি সংকট, হাম প্রাদুর্ভাব কিংবা শিশু নির্যাতনের মতো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়েও অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এই স্থবিরতার প্রভাব আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও পড়তে পারে।

সাংগঠনিক চিত্রে দেখা যায়, বর্তমানে বিএনপির ৮২টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে ৭৪টি জেলা কমিটিরই মেয়াদ পার হয়ে গেছে। সিংহভাগ উপজেলা ও থানায় কোনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই, আর দু-একটি জায়গায় যা-ও আছে, তা স্থানীয় প্রভাবশালী মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের নিয়ন্ত্রণে। সারা দেশে তৃণমূল কমিটি পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত হাইকমান্ড থেকে থাকলেও তা বাস্তবায়নে গতি নেই। একই সঙ্গে সরকারের কর্মসূচি ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে নেতাদের উপস্থিতি দেখা গেলেও নিজস্ব দলীয় কার্যালয়ভিত্তিক কর্মকাণ্ড, কর্মিসভা কিংবা রাজনৈতিক ইস্যুতে প্রচার ধারাবাহিকতা আগের তুলনায় অনেকটাই কমে গেছে।

দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ছিল সব ধরনের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক তৎপরতার মূল কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নেতা-কর্মী ও সংবাদকর্মীদের পদচারণায় মুখর থাকা নয়াপল্টন কার্যালয় এখন অনেকটাই শান্ত ও নীরব। দলের জ্যেষ্ঠ নেতা থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলার শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা এখন সচিবালয় কিংবা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় সময় দিচ্ছেন। কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম আজম সৈকত জানান, আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা ২৫ থেকে ৩০ জনের বেশি সাবেক ছাত্রদল নেতাকে এবার মন্ত্রী ও এমপি করা হয়েছে। অন্য ত্যাগী নেতাদেরও ধাপে ধাপে পদায়ন ও মূল্যায়ন করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ক্ষমতায় আসার পর মন্ত্রী-এমপিদের ঘিরে স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাববলয় ও নিজস্ব গ্রুপ তৈরির অভিযোগ তুলেছেন তৃণমূলের একশ্রেণির নেতা-কর্মী। দীর্ঘদিনের পুরোনো ও ত্যাগী কর্মীদের অবমূল্যায়ন করে অপেক্ষাকৃত নতুন ও প্রভাবশালী অংশ সুযোগ-সুবিধা পাওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় কোন্দল তৈরি হচ্ছে। এই সাংগঠনিক দুর্বলতা ও স্থানীয় অভ্যন্তরীণ দূরত্বের সুযোগে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য বিরোধী দল মাঠপর্যায়ে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান ও তৎপরতা বৃদ্ধির চেষ্টা চালাচ্ছে।

দল ও সরকার আলাদা রাখার বিষয়ে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স জানান, যারা দলের শীর্ষ নেতা, তারাই সরকারের মন্ত্রী ও এমপি হওয়ায় দুটি কাজ পৃথক করা বেশ কঠিন। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম থেকেই বিষয় দুটিকে আলাদা রাখার চেষ্টা চালাচ্ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের অপর এক জ্যেষ্ঠ নেতাও জানান, একই ব্যক্তির ওপর দুই দায়িত্ব থাকায় সমন্বয়ে জটিলতা হচ্ছে, তাই 'এক ব্যক্তি এক পদ' নীতি বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। অন্যদিকে কৃষক দলের কেন্দ্রীয় ধর্মবিষয়ক সম্পাদক কাদের সিদ্দিকী বলেন, আন্দোলন শেষ হওয়ার পর নেতাদের ওপর সরকার পরিচালনার দায়িত্ব বেড়েছে, তবে সরকারের সিদ্ধান্তের পক্ষে জনমত গঠন ও তৃণমূলের কথা শোনার কাজ নিয়মিত করা প্রয়োজন।

দলটির জ্যেষ্ঠ নেতৃত্ব অবশ্য স্থবিরতার অভিযোগ পুরোপুরি মেনে নিতে রাজি নন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিএনপি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। দল পুনর্গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং সম্প্রতি দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও সর্বস্তরের কমিটি নতুন করে সাজানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, সরকার গঠনের পর কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়নি, কেবল কিছুটা স্তিমিত হয়েছে। আর দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বলেন, সরকার গঠনের পর প্রথম প্রাধান্য ছিল জনগণের চাহিদা পূরণ করা। তার পাশাপাশি সাংগঠনিক কাজও চলছে এবং দ্রুতই তা আরও জোরদার করা হবে।