লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০১:৪১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটে চরম চাপে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত

ঢাকার অদূরে আশুলিয়ায় হা–মীম গ্রুপের বিশাল পোশাক কারখানায় প্রতিদিন সকাল থেকে শুরু হয় কর্মযজ্ঞ। প্রতিটি তলায় কাটিং মেশিনে ডেনিম কাপড় কাটা থেকে শুরু করে সেলাই, ধোয়া, ইস্তিরি করা, বোতাম ও চেইন লাগানো এবং ব্র্যান্ডের লেবেল যুক্ত করে বাক্সে ভরার কাজ চলে নিরবচ্ছিন্নভাবে। গ্যাপ, আমেরিকান ইগল ও জেসি পেনির মতো শীর্ষস্থানীয় বিশ্বখ্যাত ক্রেতাদের জন্য প্রতি মাসে ৯৩ লাখ পোশাক তৈরি করে এই প্রতিষ্ঠানটি। তবে চলতি উৎপাদন প্রক্রিয়ার মধ্যেই হঠাৎ আলো নিভে কারখানা অন্ধকারে ডুবে যাওয়া এখন নিয়মিত চিত্রে পরিণত হয়েছে। পরক্ষণেই আবার বিকট শব্দে চালু করতে হয় চারটি বড় ডিজেল জেনারেটর, কারণ গ্যাসের সরবরাহ কমলেই এগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়ে যায়।

জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের জোগান অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় দেশের শিল্প খাতকে বাধ্য হয়ে ডিজেলের ওপর ভরসা করতে হচ্ছে। হা–মীম গ্রুপের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পরিবেশগত টেকসই উন্নয়ন বিভাগের প্রধান তনুল চক্রবর্তী জানান, বাংলাদেশে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের অবস্থা খারাপ হওয়ায় ঘন ঘন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। গ্যাসের পর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করতে হচ্ছে, আর গ্রিডের বিদ্যুতের অবস্থান এখন তৃতীয়। তাঁর মতে, দেশের প্রায় পুরো অর্থনীতিই যেন এখন ডিজেলের ওপর ভর দিয়ে চলছে।

পরিহাসের বিষয় হলো, জ্বালানিসংকটের মধ্যেও হা–মীম গ্রুপের পোশাকের চাহিদা কমেেনি, বরং বেড়েছে। গত তিন বছরে দেশে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়া ৪০০টিরও বেশি ছোট কারখানার অনেক ক্রয়াদেশ যেমন তাদের কাছে এসেছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি এড়াতে চীন থেকে উৎপাদন সরিয়ে নেওয়া কিছু ক্রেতাও তাদের কাছে অর্ডার পাঠিয়েছেন। কিন্তু একই সাথে প্রতিষ্ঠানটির দৈনিক জ্বালানি বিল দুই লাখ ডলার থেকে লাফিয়ে তিন লাখ ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা পোশাকের দাম বাড়াতে রাজি না থাকায় কারখানাগুলোতে উৎপাদনদক্ষতা বাড়ানোর চাপ চরম রূপ নিয়েছে।

হা–মীম গ্রুপের জ্যেষ্ঠ নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল মঈন জানান, স্প্রেডশিটের মাধ্যমে প্রতি কর্মীর ঘণ্টাভিত্তিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নজরদারিতে রাখা হয়। লক্ষ্যমাত্রা পূরণে পিছিয়ে পড়া কর্মীদের অতিরিক্ত সাহায্য ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তবে ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হলে নতুন কর্মী নিয়োগ করতে হয়। প্রতিদিন সকালে কারখানার ফটকে জীবনবৃত্তান্ত হাতে চাকরিপ্রার্থীদের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। আবদুল মঈন বলেন, আমরা হয়তো জ্বালানিসংকটের মুখোমুখি হয়েছি, কিন্তু সেটাই উৎপাদনশীলতার সঙ্গে আপস না করার আরও বড় কারণ। তৈরি পোশাক খাতে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া বা পাকিস্তানের মতো প্রতিযোগী দেশের কাছে ক্রয়াদেশ চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকায় খরচ বৃদ্ধি বা সরবরাহে বিঘ্ন বরদাশত করা কঠিন।

বাংলাদেশের ৫১ হাজার কোটি (৫১০ বিলিয়ন) ডলারের অর্থনীতি এখন ভূরাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ নানা জটিলতায় জর্জরিত। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর শিল্পে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ১৫০ শতাংশ এবং ডিজেলের দাম প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে খোলাবাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় উৎস এই তৈরি পোশাক খাত, যা সরাসরি ৪০ লাখ মানুষের জীবিকা নিশ্চিত করে। গত বছর পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩ হাজার ৮৭০ কোটি (৩৮.৭ বিলিয়ন) ডলার, যা দেশের মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে শুধু হা–মীম গ্রুপ থেকেই রপ্তানি হয়েছে ১০০ কোটি ডলারের পোশাক।

অভ্যন্তরীণ নীতিগত ভুলের কারণেও এই সংকট উসকে উঠেছে। ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের এই দেশে বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো ও নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ হয়নি। ফলে মোট জ্বালানির প্রায় অর্ধেকই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করতে হয়। গত জুলাই থেকে আগস্টের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ ও দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে অগ্নিকাণ্ডের ফলে এলএনজি আমদানি ৮৩ শতাংশ কমে যায়। গৃহস্থালিতেও ভোরে না উঠলে গ্যাসের চাপ পাওয়া যায় না। আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, নতুন সরকারের জন্য জ্বালানি খাতই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এবং বিরোধীদের একত্র হওয়ার মূল ইস্যু।

২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ক্ষমতায় আসে। শেখ হাসিনাকে ভারত আশ্রয় দেওয়ায় প্রতিবেশী দেশটির সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ তার মোট বিদ্যুতের প্রায় এক–ষষ্ঠাংশ ভারত থেকে আমদানি করায় কৌশলগত উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। এর পাশাপাশি সাবেক সরকারের ১৫ বছরের জ্বালানি নীতি বাস্তবায়নে যুক্ত অনেক অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে বিশেষ দায়িত্বে (ওএসডি) পাঠানোয় প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা এসেছে।

বিদ্যুৎ সংকটের সমাধানের অংশ হিসেবে ডিসেম্বরে ১,২০০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে গত ১১ অক্টোবর প্রথম নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া সম্পন্ন হয়। তবে গত ১৮ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট’-এর কারণে জটিলতা তৈরি হয়েছে। এতে করে রূপপুরের ঋণ পরিশোধ ও পারমাণবিক জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রে ঢাকা মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ছাড় বা অনুমোদিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

বিকল্প জ্বালানি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আগামী ১৫ বছরে ১ হাজার ৫০০ কোটি (১৫ বিলিয়ন) ডলারের জ্বালানিপণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ। একই সাথে চীনের দিকেও ঢাকার ঝোঁক স্পষ্ট। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত জুনে মালয়েশিয়া ও চীন সফরকালে বেইজিংয়ের সাথে ১৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই করেন, যার একটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ক। তবে এর মধ্যে দুটি চুক্তি মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় থাকা ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সাথে সম্পর্কিত হওয়ায় ওয়াশিংটন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সূত্রে জানা গেছে। এছাড়া চীনের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সাথে ৩য় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে।

সরকার সম্প্রতি ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে বিশেষ প্রণোদনা দিয়ে সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক ১৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করেছে। হা–মীম গ্রুপ তাদের কারখানার ছাদে ২৯.২ মেগাওয়াটের দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করলেও এটি চব্বিশ ঘণ্টা সচল থাকা কারখানার জন্য মাত্র চার ঘণ্টার মতো কার্যকর জোগান দেয়। অন্যদিকে, পশ্চিমা ব্র্যান্ডগুলো জীবাশ্ম জ্বালানিমুক্ত টেকসই উৎপাদনের তাগিদ দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হচ্ছে। ওষুধ, চামড়া, গাড়ি, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও সেমিকন্ডাক্টরের মতো নতুন খাতে অর্থনীতি বৈচিত্র্যময় করার পরিকল্পনা থাকলেও মোমবাতির আলোয় বৈঠক করার মতো বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে বড় বিনিয়োগ টানা দুরুহ।

জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশ সম্প্রতি নতুন রোডম্যাপ প্রকাশ করেছে। এতে সৌর ও কয়লাভিত্তিক প্রকল্পের মাধ্যমে ১২,৯৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ করা এবং ৩০০টি অনুসন্ধান কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যার ৩১টি ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, এই পরিকল্পনা নিয়ে তারা সন্তুষ্ট এবং আশা করছেন ৩-৪ বছরের মধ্যে সংকট থাকবে না। তবে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ায় বিশ্ব তেলের বাজারে স্বস্তির লক্ষণ নেই। প্রতিদিন ২২ হাজার পোশাক উৎপাদনকারী ফতুল্লা অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলে শামীম এহসান জানান, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ না থাকলে বর্তমান সরকারের জন্য পরিস্থিতি অনেক সহজ হতো, তবে আপাতত সংকট সহ্য করা ছাড়া বিকল্প নেই।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাজেকে সড়ক অবরোধকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলি

বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটে চরম চাপে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত

প্রকাশিত হয়েছে: ০৫:০০:২৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

ঢাকার অদূরে আশুলিয়ায় হা–মীম গ্রুপের বিশাল পোশাক কারখানায় প্রতিদিন সকাল থেকে শুরু হয় কর্মযজ্ঞ। প্রতিটি তলায় কাটিং মেশিনে ডেনিম কাপড় কাটা থেকে শুরু করে সেলাই, ধোয়া, ইস্তিরি করা, বোতাম ও চেইন লাগানো এবং ব্র্যান্ডের লেবেল যুক্ত করে বাক্সে ভরার কাজ চলে নিরবচ্ছিন্নভাবে। গ্যাপ, আমেরিকান ইগল ও জেসি পেনির মতো শীর্ষস্থানীয় বিশ্বখ্যাত ক্রেতাদের জন্য প্রতি মাসে ৯৩ লাখ পোশাক তৈরি করে এই প্রতিষ্ঠানটি। তবে চলতি উৎপাদন প্রক্রিয়ার মধ্যেই হঠাৎ আলো নিভে কারখানা অন্ধকারে ডুবে যাওয়া এখন নিয়মিত চিত্রে পরিণত হয়েছে। পরক্ষণেই আবার বিকট শব্দে চালু করতে হয় চারটি বড় ডিজেল জেনারেটর, কারণ গ্যাসের সরবরাহ কমলেই এগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়ে যায়।

জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের জোগান অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় দেশের শিল্প খাতকে বাধ্য হয়ে ডিজেলের ওপর ভরসা করতে হচ্ছে। হা–মীম গ্রুপের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পরিবেশগত টেকসই উন্নয়ন বিভাগের প্রধান তনুল চক্রবর্তী জানান, বাংলাদেশে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের অবস্থা খারাপ হওয়ায় ঘন ঘন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। গ্যাসের পর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করতে হচ্ছে, আর গ্রিডের বিদ্যুতের অবস্থান এখন তৃতীয়। তাঁর মতে, দেশের প্রায় পুরো অর্থনীতিই যেন এখন ডিজেলের ওপর ভর দিয়ে চলছে।

পরিহাসের বিষয় হলো, জ্বালানিসংকটের মধ্যেও হা–মীম গ্রুপের পোশাকের চাহিদা কমেেনি, বরং বেড়েছে। গত তিন বছরে দেশে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়া ৪০০টিরও বেশি ছোট কারখানার অনেক ক্রয়াদেশ যেমন তাদের কাছে এসেছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি এড়াতে চীন থেকে উৎপাদন সরিয়ে নেওয়া কিছু ক্রেতাও তাদের কাছে অর্ডার পাঠিয়েছেন। কিন্তু একই সাথে প্রতিষ্ঠানটির দৈনিক জ্বালানি বিল দুই লাখ ডলার থেকে লাফিয়ে তিন লাখ ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা পোশাকের দাম বাড়াতে রাজি না থাকায় কারখানাগুলোতে উৎপাদনদক্ষতা বাড়ানোর চাপ চরম রূপ নিয়েছে।

হা–মীম গ্রুপের জ্যেষ্ঠ নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল মঈন জানান, স্প্রেডশিটের মাধ্যমে প্রতি কর্মীর ঘণ্টাভিত্তিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নজরদারিতে রাখা হয়। লক্ষ্যমাত্রা পূরণে পিছিয়ে পড়া কর্মীদের অতিরিক্ত সাহায্য ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তবে ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হলে নতুন কর্মী নিয়োগ করতে হয়। প্রতিদিন সকালে কারখানার ফটকে জীবনবৃত্তান্ত হাতে চাকরিপ্রার্থীদের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। আবদুল মঈন বলেন, আমরা হয়তো জ্বালানিসংকটের মুখোমুখি হয়েছি, কিন্তু সেটাই উৎপাদনশীলতার সঙ্গে আপস না করার আরও বড় কারণ। তৈরি পোশাক খাতে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া বা পাকিস্তানের মতো প্রতিযোগী দেশের কাছে ক্রয়াদেশ চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকায় খরচ বৃদ্ধি বা সরবরাহে বিঘ্ন বরদাশত করা কঠিন।

বাংলাদেশের ৫১ হাজার কোটি (৫১০ বিলিয়ন) ডলারের অর্থনীতি এখন ভূরাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ নানা জটিলতায় জর্জরিত। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর শিল্পে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ১৫০ শতাংশ এবং ডিজেলের দাম প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে খোলাবাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় উৎস এই তৈরি পোশাক খাত, যা সরাসরি ৪০ লাখ মানুষের জীবিকা নিশ্চিত করে। গত বছর পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩ হাজার ৮৭০ কোটি (৩৮.৭ বিলিয়ন) ডলার, যা দেশের মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে শুধু হা–মীম গ্রুপ থেকেই রপ্তানি হয়েছে ১০০ কোটি ডলারের পোশাক।

অভ্যন্তরীণ নীতিগত ভুলের কারণেও এই সংকট উসকে উঠেছে। ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের এই দেশে বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো ও নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ হয়নি। ফলে মোট জ্বালানির প্রায় অর্ধেকই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করতে হয়। গত জুলাই থেকে আগস্টের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ ও দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে অগ্নিকাণ্ডের ফলে এলএনজি আমদানি ৮৩ শতাংশ কমে যায়। গৃহস্থালিতেও ভোরে না উঠলে গ্যাসের চাপ পাওয়া যায় না। আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, নতুন সরকারের জন্য জ্বালানি খাতই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এবং বিরোধীদের একত্র হওয়ার মূল ইস্যু।

২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ক্ষমতায় আসে। শেখ হাসিনাকে ভারত আশ্রয় দেওয়ায় প্রতিবেশী দেশটির সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ তার মোট বিদ্যুতের প্রায় এক–ষষ্ঠাংশ ভারত থেকে আমদানি করায় কৌশলগত উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। এর পাশাপাশি সাবেক সরকারের ১৫ বছরের জ্বালানি নীতি বাস্তবায়নে যুক্ত অনেক অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে বিশেষ দায়িত্বে (ওএসডি) পাঠানোয় প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা এসেছে।

বিদ্যুৎ সংকটের সমাধানের অংশ হিসেবে ডিসেম্বরে ১,২০০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে গত ১১ অক্টোবর প্রথম নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া সম্পন্ন হয়। তবে গত ১৮ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট’-এর কারণে জটিলতা তৈরি হয়েছে। এতে করে রূপপুরের ঋণ পরিশোধ ও পারমাণবিক জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রে ঢাকা মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ছাড় বা অনুমোদিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

বিকল্প জ্বালানি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আগামী ১৫ বছরে ১ হাজার ৫০০ কোটি (১৫ বিলিয়ন) ডলারের জ্বালানিপণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ। একই সাথে চীনের দিকেও ঢাকার ঝোঁক স্পষ্ট। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত জুনে মালয়েশিয়া ও চীন সফরকালে বেইজিংয়ের সাথে ১৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই করেন, যার একটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ক। তবে এর মধ্যে দুটি চুক্তি মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় থাকা ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সাথে সম্পর্কিত হওয়ায় ওয়াশিংটন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সূত্রে জানা গেছে। এছাড়া চীনের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সাথে ৩য় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে।

সরকার সম্প্রতি ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে বিশেষ প্রণোদনা দিয়ে সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক ১৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করেছে। হা–মীম গ্রুপ তাদের কারখানার ছাদে ২৯.২ মেগাওয়াটের দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করলেও এটি চব্বিশ ঘণ্টা সচল থাকা কারখানার জন্য মাত্র চার ঘণ্টার মতো কার্যকর জোগান দেয়। অন্যদিকে, পশ্চিমা ব্র্যান্ডগুলো জীবাশ্ম জ্বালানিমুক্ত টেকসই উৎপাদনের তাগিদ দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হচ্ছে। ওষুধ, চামড়া, গাড়ি, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও সেমিকন্ডাক্টরের মতো নতুন খাতে অর্থনীতি বৈচিত্র্যময় করার পরিকল্পনা থাকলেও মোমবাতির আলোয় বৈঠক করার মতো বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে বড় বিনিয়োগ টানা দুরুহ।

জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশ সম্প্রতি নতুন রোডম্যাপ প্রকাশ করেছে। এতে সৌর ও কয়লাভিত্তিক প্রকল্পের মাধ্যমে ১২,৯৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ করা এবং ৩০০টি অনুসন্ধান কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যার ৩১টি ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, এই পরিকল্পনা নিয়ে তারা সন্তুষ্ট এবং আশা করছেন ৩-৪ বছরের মধ্যে সংকট থাকবে না। তবে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ায় বিশ্ব তেলের বাজারে স্বস্তির লক্ষণ নেই। প্রতিদিন ২২ হাজার পোশাক উৎপাদনকারী ফতুল্লা অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলে শামীম এহসান জানান, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ না থাকলে বর্তমান সরকারের জন্য পরিস্থিতি অনেক সহজ হতো, তবে আপাতত সংকট সহ্য করা ছাড়া বিকল্প নেই।