লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৯:২৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিটিআরসি কর্মীদের ৬০% রেগুলেটরি ভাতার প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রতি মাসে মূল বেতনের ৬০ শতাংশ হারে ‘রেগুলেটরি ভাতা’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। সংস্থাটির সর্বশেষ কমিশন সভায় সরকারের কাছে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২০০২ সালে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১-এর অধীনে প্রতিষ্ঠিত এই নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের সুশৃঙ্খল উন্নয়ন, সেবার মান নিশ্চিত করা এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালন করে।

ভাতা দেওয়ার পক্ষে কমিশনের কর্মকর্তারা বেশ কিছু যুক্তি তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে সরকারের রাজস্ব আদায়ে কমিশনের ভূমিকা, টেলিযোগাযোগ খাত নিয়ন্ত্রণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব এবং চাকরি ছাড়ার পর ছয় মাস পর্যন্ত অন্য কোনো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে যোগ না দেওয়ার বাধ্যবাধকতা। বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী জানান, টেলিযোগাযোগ খাতে প্রতিদিন দ্রুত পরিবর্তন আসে। তাই একজন কর্মকর্তা চাকরি ছাড়ার পর ছয় মাস এই খাতের বাইরে থাকলে তাঁর পেশাগত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা পুরোনো হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এই ক্ষতিপূরণ এবং অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রণোদনার উদাহরণ বিবেচনায় নিয়ে রেগুলেটরি ভাতার প্রস্তাব করা হয়েছে। নথিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কর্মকর্তাদের জন্য মূল বেতনের সমপরিমাণ ইনসেনটিভ বোনাস এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কর্মকর্তাদের জন্য ২০ শতাংশ ঝুঁকি ভাতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

বিটিআরসির অর্থ, হিসাব ও রাজস্ব বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১-০২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত ২৫ বছরে কমিশন মোট ৮৫ হাজার ৭৭৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ৩ হাজার ৮৮৫ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এছাড়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ হাজার ৩৬ কোটি, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৬ হাজার ৬৪০ কোটি এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরের জন্য ৭ হাজার ৩০৪ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০০৫ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ২১ বছরে কমিশন বিভিন্ন প্রশাসনিক জরিমানা, শেয়ার ট্রান্সফার ফি ও মার্জার ফি বাবদ ১ হাজার ২১৫ কোটি টাকার বেশি আদায় করেছে। বিপরীতে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ মাসে প্রায় ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়, যা ২১ বছরে প্রায় ৬১৭ কোটি টাকা।

তবে এই ভাতার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা। সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, 'টেলিযোগাযোগ খাতের রাজস্ব আদায় করা বিটিআরসির কাজের অংশ। এটার জন্যই তাঁরা চাকরিতে এসেছেন। তাই রাজস্ব আদায় বেশি করার অজুহাতে বাড়তি কিছু দাবি করা যুক্তিসংগত নয়।' বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ দিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভাতার যৌক্তিকতা নির্ধারণ করা যায় না। টেলিযোগাযোগ সেবার মান, গ্রাহকের অভিযোগ, অপারেটরদের লাইসেন্সের শর্ত পরিপালন এবং স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কমিশনের কার্যকারিতা নিয়ে বিভিন্ন সময় প্রশ্ন উঠেছে। চলতি বছরের জুনে সংসদে দেওয়া তথ্যে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, দেশের চার মোবাইল অপারেটরের কাছে সরকারের মোট ১৩ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা রাজস্ব পাওনা রয়েছে। এর মধ্যে গ্রামীণফোনের কাছে ৬ হাজার ১০১ কোটি ৮২ লাখ, টেলিটকের কাছে ৫ হাজার ৯৫৪ কোটি, রবির কাছে ৬১৫ কোটি এবং বাংলালিংকের কাছে ৪৭৩ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। এছাড়া ২৪টি ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা বকেয়া পাওনা রয়েছে। এই বিপুল পাওনা আদায় এবং সেবার মান নিশ্চিত করাও কমিশনের দায়িত্বের অংশ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

লন্ডনে চিকিৎসাধীন বিডিনিউজের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী মারা গেছেন

বিটিআরসি কর্মীদের ৬০% রেগুলেটরি ভাতার প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশিত হয়েছে: ০২:১২:২১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রতি মাসে মূল বেতনের ৬০ শতাংশ হারে ‘রেগুলেটরি ভাতা’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। সংস্থাটির সর্বশেষ কমিশন সভায় সরকারের কাছে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২০০২ সালে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১-এর অধীনে প্রতিষ্ঠিত এই নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের সুশৃঙ্খল উন্নয়ন, সেবার মান নিশ্চিত করা এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালন করে।

ভাতা দেওয়ার পক্ষে কমিশনের কর্মকর্তারা বেশ কিছু যুক্তি তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে সরকারের রাজস্ব আদায়ে কমিশনের ভূমিকা, টেলিযোগাযোগ খাত নিয়ন্ত্রণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব এবং চাকরি ছাড়ার পর ছয় মাস পর্যন্ত অন্য কোনো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে যোগ না দেওয়ার বাধ্যবাধকতা। বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী জানান, টেলিযোগাযোগ খাতে প্রতিদিন দ্রুত পরিবর্তন আসে। তাই একজন কর্মকর্তা চাকরি ছাড়ার পর ছয় মাস এই খাতের বাইরে থাকলে তাঁর পেশাগত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা পুরোনো হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এই ক্ষতিপূরণ এবং অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রণোদনার উদাহরণ বিবেচনায় নিয়ে রেগুলেটরি ভাতার প্রস্তাব করা হয়েছে। নথিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কর্মকর্তাদের জন্য মূল বেতনের সমপরিমাণ ইনসেনটিভ বোনাস এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কর্মকর্তাদের জন্য ২০ শতাংশ ঝুঁকি ভাতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

বিটিআরসির অর্থ, হিসাব ও রাজস্ব বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১-০২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত ২৫ বছরে কমিশন মোট ৮৫ হাজার ৭৭৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ৩ হাজার ৮৮৫ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এছাড়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ হাজার ৩৬ কোটি, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৬ হাজার ৬৪০ কোটি এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরের জন্য ৭ হাজার ৩০৪ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০০৫ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ২১ বছরে কমিশন বিভিন্ন প্রশাসনিক জরিমানা, শেয়ার ট্রান্সফার ফি ও মার্জার ফি বাবদ ১ হাজার ২১৫ কোটি টাকার বেশি আদায় করেছে। বিপরীতে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ মাসে প্রায় ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়, যা ২১ বছরে প্রায় ৬১৭ কোটি টাকা।

তবে এই ভাতার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা। সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, 'টেলিযোগাযোগ খাতের রাজস্ব আদায় করা বিটিআরসির কাজের অংশ। এটার জন্যই তাঁরা চাকরিতে এসেছেন। তাই রাজস্ব আদায় বেশি করার অজুহাতে বাড়তি কিছু দাবি করা যুক্তিসংগত নয়।' বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ দিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভাতার যৌক্তিকতা নির্ধারণ করা যায় না। টেলিযোগাযোগ সেবার মান, গ্রাহকের অভিযোগ, অপারেটরদের লাইসেন্সের শর্ত পরিপালন এবং স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কমিশনের কার্যকারিতা নিয়ে বিভিন্ন সময় প্রশ্ন উঠেছে। চলতি বছরের জুনে সংসদে দেওয়া তথ্যে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, দেশের চার মোবাইল অপারেটরের কাছে সরকারের মোট ১৩ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা রাজস্ব পাওনা রয়েছে। এর মধ্যে গ্রামীণফোনের কাছে ৬ হাজার ১০১ কোটি ৮২ লাখ, টেলিটকের কাছে ৫ হাজার ৯৫৪ কোটি, রবির কাছে ৬১৫ কোটি এবং বাংলালিংকের কাছে ৪৭৩ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। এছাড়া ২৪টি ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা বকেয়া পাওনা রয়েছে। এই বিপুল পাওনা আদায় এবং সেবার মান নিশ্চিত করাও কমিশনের দায়িত্বের অংশ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।