লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৩:১২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভাতা নিয়েও এলজিইডির প্রকল্পের গাড়ি চড়ছেন আমলারা, নিয়মের তোয়াক্কা নেই

সরকারের কাছ থেকে বিনা সুদে ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনেছেন এবং রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা সরকারি ভাতাও পাচ্ছেন। অথচ সেই গাড়ি ব্যবহার না করে নিয়মবহির্ভূতভাবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকল্পের দামি গাড়ি ব্যবহার করছেন সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের আমলারা। নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পের গাড়ি কেবল সংশ্লিষ্ট প্রকল্পেই ব্যবহার করার কথা এবং প্রকল্প শেষ হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে তা সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় পরিবহন পুলে জমা দিতে হয়। কিন্তু এই নিয়মকে তোয়াক্কা না করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কর্মকর্তারা এলজিইডির গাড়ি নিজেদের যাতায়াত ও পারিবারিক কাজে ব্যবহার করছেন।

অনুসন্ধানে এমন ৩৫ জন কর্মকর্তার নাম পাওয়া গেছে, যাঁরা একাধারে সরকারের গাড়িঋণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা নিচ্ছেন এবং একই সঙ্গে এলজিইডির প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহার করছেন। তাঁদেরই একজন স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মনিরুল ইসলাম। চার বছর আগে সরকারের কাছ থেকে বিনা সুদে ঋণ নিয়ে গাড়ি কেনার পর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মাসে ৫০ হাজার টাকা ভাতাও পান তিনি। কিন্তু তিনি ব্যবহার করছেন বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চলমান ‘প্রোগ্রাম ফর Supporting রুরাল ব্রিজ’ প্রকল্পের একটি স্পোর্ট ইউটিলিটি ভেহিকেল (এসইউভি)। গাড়িটির চালক, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচও মেটায় সরকার। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মনিরুল ইসলাম বলেন, শুধু স্থানীয় সরকার বিভাগ নয়, অন্যরাও গাড়ি ব্যবহার করেন। তাঁকে দেওয়া গাড়িটি নির্ধারিত নয় এবং তিনি এটি মাঝেমধ্যে ব্যবহার করেন। আর ঋণের কেনা গাড়িটি তিনি নিজে এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা ব্যবহার করেন বলে জানান।

একইভাবে গাড়ি ব্যবহার করছেন স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব আবুল খায়ের মোহাম্মদ হাফিজুল্লাহ খান। তিনি বিনা সুদে ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনেছেন এবং রক্ষণাবেক্ষণ ভাতাও নিচ্ছেন। তবে একই সঙ্গে দুটি গাড়ি ব্যবহারের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এই অনিয়মকে ‘যোগসাজশমূলক অনিয়ম’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে এলজিইডি যেমন অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছে, তেমনি যাঁরা গাড়ি ব্যবহার করছেন, তাঁরাও নিয়ম মানছেন না। এলজিইডি বিপুল সম্পদ ব্যবহার করে এবং তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও বেশি। নিজেদের সুরক্ষার জন্য তারা অন্য সংস্থাকে গাড়ি ব্যবহার করতে দিচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

এলজিইডির গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১১৯টি প্রকল্প রয়েছে। এসব প্রকল্পে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি গাড়ি কেনা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এলজিইডির কাছে মোট কত গাড়ি আছে, তা কর্মকর্তারা জানাতে রাজি না হলেও ২৬1টি গাড়ির একটি তালিকা পাওয়া গেছে। এই তালিকায় দেখা যায়, ২৬১টি গাড়ির মধ্যে ২১১টি এসইউভি, ৪১টি ডাবল কেবিন পিকআপ এবং ৯টি কার। এর মধ্যে ২১১টি গাড়ি চালান এলজিইডির নিজস্ব কর্মকর্তারা, যাঁদের অনেকেই গাড়ি ব্যবহারের প্রাধিকারভুক্ত নন। বাকি ৫৯টি গাড়ি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থাকে দেওয়া হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ২৬টি গাড়ি রয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে রয়েছে ৮টি। পরিকল্পনা কমিশনে ১০টি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ৬টি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ৩টি (যার একটি পরিবহন পুলে স্ট্যান্ডবাই থাকে), প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ৩টি (যা সম্প্রতি ফেরত দেওয়া হয়েছে), বগুড়া সিটি করপোরেশনে ২টি এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) ১টি গাড়ি দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের গাড়ি ব্যবহারকারীদের তালিকায় সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব থেকে শুরু করে উপসচিব ও জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নাম রয়েছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব শহীদুল হাসান, সচিবের একান্ত সচিব জিসান বিন মাজেদ, অতিরিক্ত সচিব আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, যুগ্ম সচিব পরিমল সরকার, খলিলুর রহমান, আবু রাফা মোহাম্মদ আরিফ ও কাজী আনোয়ার ইমাম, উপসচিব সুলতানা আক্তার, আশফিকুন নাহার, তৌকির হোসাইন, হেলেনা পারভিন, রবিউল ইসলাম (পরে যুগ্ম সচিব হয়েছেন), আরিফুল ইসলাম ও জিয়াউর রহমান এবং জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব জেসমিন প্রধান এলজিইডির গাড়ি ব্যবহার করেন। তবে নতুন মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর আবদুল মঈন খান এবং প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এলজিইডির প্রকল্পের গাড়ি নেননি। তাঁরা সরকারি পরিবহন পুলের গাড়ি ব্যবহার করেন। অবশ্য প্রতিমন্ত্রীর পিএস মো. তাসনিমুজ্জামান ও এপিএস তৌহিদুল ইসলাম এলজিইডির গাড়ি নিয়েছেন।

এলজিইডির প্রকল্পগুলো যাচাই ও অনুমোদনের দায়িত্বে থাকা পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তাদের ১০টি গাড়ি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৯টি গাড়ি ব্যবহার করছেন কমিশনের সদস্য নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়া ও মাহমুদুল হোসাইন খান, বিভাগীয় প্রধান কবির আহামদ, বাবুল মিঞা ও মো. আশরাফুজ্জামান, যুগ্ম সচিব মোছা. আনার কলি এবং উপপ্রধান শাহ মো. হেলাল উদ্দিন। বিভাগীয় প্রধান কবির আহামদ ঢাকা মেট্রো-ঘ ১৮-৩৫৭১ নম্বর গাড়িটি ব্যবহার করেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রজেক্টের কাজের জন্যই তাঁরা গাড়ি ব্যবহার করেন। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই গাড়িতেই তিনি নিয়মিত অফিসে যাতায়াত করেন। অন্য কর্মকর্তা বাবুল মিঞা ঢাকা মেট্রো-ঘ ১৮-২৮০১ নম্বর গাড়িটি ব্যবহার করেন। প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি অফিশিয়াল কাজে ব্যবহার করা হয় এবং তিনি একা এটি ব্যবহার করছেন না। তিনি আরও বলেন, ‘আমি যদি এসে এই ব্যবস্থা চালু করতাম, তাহলে বলতে পারতেন। আমি তো এটা চালু করিনি।’

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ছয়টি গাড়ির ব্যবহারকারী হিসেবে প্রসিকিউটরদের নাম রয়েছে। ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রসিকিউটররা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন এবং নিরাপত্তার জন্য সরকারি সংস্থার কাছ থেকে গাড়ি আনা হয়েছে। এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেন বলেন, পরিকল্পনা কমিশন ও দুদকে গাড়ি দেওয়া হয়েছে কি না, তা তিনি বলতে পারছেন না। তবে মন্ত্রণালয়ের কাজের সঙ্গে যাঁরা সম্পৃক্ত, তাঁরা এলজিইডির গাড়ি ব্যবহার করেন। কাজের প্রয়োজনে যখন যেখানে দরকার, সেখানে গাড়ি দেওয়া হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

গাড়ি নিয়ে এই অনিয়ম নতুন কিছু নয়। সাবেক স্থানীয় সরকার সচিব হেলালুদ্দীন আহমদের বিরুদ্ধে তিনটি গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল। তখন তিনি বলেছিলেন, একটি গাড়ি তিনি, একটি তাঁর পরিবার এবং অন্যটি বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করেন। তাঁর আগের সচিবও তিনটি গাড়ি ব্যবহার করতেন বলে তিনি দাবি করেছিলেন। হেলালুদ্দীন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, একটি অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চললেই তা বৈধ হয়ে যায় না।

২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সচিব থেকে শুরু করে উপসচিবদের জন্য বিনা সুদে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত গাড়ি কেনার ঋণ দেওয়া শুরু করে সরকার। এই ঋণের জন্য মাত্র ১ শতাংশ সার্ভিস চার্জ নেওয়া হয়। আট বছরে ১০ শতাংশ অবচয় সুবিধা বাদ দিলে কর্মকর্তাদের শেষ পর্যন্ত পরিশোধ করতে হয় প্রায় ১৩ লাখ টাকা, যার মাসিক কিস্তি আসে ১১ হাজার টাকার মতো। অন্যদিকে গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকার প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা দেয়, যা দিয়ে ঋণের কিস্তি, চালকের বেতন ও জ্বালানি খরচ অনায়াসেই মেটানো সম্ভব। গত ৯ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয় এই ভাতা ২৫ হাজার টাকায় নামিয়ে আনার উদ্যোগ নিলেও কর্মকর্তাদের আপত্তির মুখে ১৬ জুলাই তা বাতিল করা হয়। গত ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২ হাজার ৩৫৭ জন কর্মকর্তা এই ঋণ নিয়েছেন। পরে গত ২ এপ্রিল বিএনপি সরকার এই গাড়িঋণ সুবিধা স্থগিত করে।

প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহারের বিষয়ে কর্মকর্তাদের সতর্ক করে এবং তা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছিল, গাড়িঋণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা নেওয়ার পরও বিধিবহির্ভূতভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়ি ব্যবহার করায় প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা ও আর্থিক অপচয় ঘটছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারও এ বিষয়ে আর কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। গত পাঁচ বছরে শেষ হওয়া এলজিইডির প্রকল্পের কটি গাড়ি পরিবহন পুলে জমা পড়েছে, তার তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে গত চার বছরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সংস্থা থেকে মাত্র ১৮টি গাড়ি জমা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণকেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, রাজনৈতিক সরকার শক্ত অবস্থান নিলেই কেবল এই দীর্ঘদিনের অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব।

এতে বলা হয়, অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত ঋণ এবং গাড়িসেবা নগদায়ন নীতিমালা-২০২০-এর আওতায় গাড়ির ঋণ নেওয়া হয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ ঘোষণা

ভাতা নিয়েও এলজিইডির প্রকল্পের গাড়ি চড়ছেন আমলারা, নিয়মের তোয়াক্কা নেই

প্রকাশিত হয়েছে: ০৮:৩০:২৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সরকারের কাছ থেকে বিনা সুদে ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনেছেন এবং রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা সরকারি ভাতাও পাচ্ছেন। অথচ সেই গাড়ি ব্যবহার না করে নিয়মবহির্ভূতভাবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকল্পের দামি গাড়ি ব্যবহার করছেন সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের আমলারা। নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পের গাড়ি কেবল সংশ্লিষ্ট প্রকল্পেই ব্যবহার করার কথা এবং প্রকল্প শেষ হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে তা সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় পরিবহন পুলে জমা দিতে হয়। কিন্তু এই নিয়মকে তোয়াক্কা না করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কর্মকর্তারা এলজিইডির গাড়ি নিজেদের যাতায়াত ও পারিবারিক কাজে ব্যবহার করছেন।

অনুসন্ধানে এমন ৩৫ জন কর্মকর্তার নাম পাওয়া গেছে, যাঁরা একাধারে সরকারের গাড়িঋণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা নিচ্ছেন এবং একই সঙ্গে এলজিইডির প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহার করছেন। তাঁদেরই একজন স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মনিরুল ইসলাম। চার বছর আগে সরকারের কাছ থেকে বিনা সুদে ঋণ নিয়ে গাড়ি কেনার পর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মাসে ৫০ হাজার টাকা ভাতাও পান তিনি। কিন্তু তিনি ব্যবহার করছেন বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চলমান ‘প্রোগ্রাম ফর Supporting রুরাল ব্রিজ’ প্রকল্পের একটি স্পোর্ট ইউটিলিটি ভেহিকেল (এসইউভি)। গাড়িটির চালক, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচও মেটায় সরকার। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মনিরুল ইসলাম বলেন, শুধু স্থানীয় সরকার বিভাগ নয়, অন্যরাও গাড়ি ব্যবহার করেন। তাঁকে দেওয়া গাড়িটি নির্ধারিত নয় এবং তিনি এটি মাঝেমধ্যে ব্যবহার করেন। আর ঋণের কেনা গাড়িটি তিনি নিজে এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা ব্যবহার করেন বলে জানান।

একইভাবে গাড়ি ব্যবহার করছেন স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব আবুল খায়ের মোহাম্মদ হাফিজুল্লাহ খান। তিনি বিনা সুদে ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনেছেন এবং রক্ষণাবেক্ষণ ভাতাও নিচ্ছেন। তবে একই সঙ্গে দুটি গাড়ি ব্যবহারের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এই অনিয়মকে ‘যোগসাজশমূলক অনিয়ম’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে এলজিইডি যেমন অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছে, তেমনি যাঁরা গাড়ি ব্যবহার করছেন, তাঁরাও নিয়ম মানছেন না। এলজিইডি বিপুল সম্পদ ব্যবহার করে এবং তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও বেশি। নিজেদের সুরক্ষার জন্য তারা অন্য সংস্থাকে গাড়ি ব্যবহার করতে দিচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

এলজিইডির গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১১৯টি প্রকল্প রয়েছে। এসব প্রকল্পে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি গাড়ি কেনা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এলজিইডির কাছে মোট কত গাড়ি আছে, তা কর্মকর্তারা জানাতে রাজি না হলেও ২৬1টি গাড়ির একটি তালিকা পাওয়া গেছে। এই তালিকায় দেখা যায়, ২৬১টি গাড়ির মধ্যে ২১১টি এসইউভি, ৪১টি ডাবল কেবিন পিকআপ এবং ৯টি কার। এর মধ্যে ২১১টি গাড়ি চালান এলজিইডির নিজস্ব কর্মকর্তারা, যাঁদের অনেকেই গাড়ি ব্যবহারের প্রাধিকারভুক্ত নন। বাকি ৫৯টি গাড়ি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থাকে দেওয়া হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ২৬টি গাড়ি রয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে রয়েছে ৮টি। পরিকল্পনা কমিশনে ১০টি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ৬টি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ৩টি (যার একটি পরিবহন পুলে স্ট্যান্ডবাই থাকে), প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ৩টি (যা সম্প্রতি ফেরত দেওয়া হয়েছে), বগুড়া সিটি করপোরেশনে ২টি এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) ১টি গাড়ি দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের গাড়ি ব্যবহারকারীদের তালিকায় সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব থেকে শুরু করে উপসচিব ও জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নাম রয়েছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব শহীদুল হাসান, সচিবের একান্ত সচিব জিসান বিন মাজেদ, অতিরিক্ত সচিব আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, যুগ্ম সচিব পরিমল সরকার, খলিলুর রহমান, আবু রাফা মোহাম্মদ আরিফ ও কাজী আনোয়ার ইমাম, উপসচিব সুলতানা আক্তার, আশফিকুন নাহার, তৌকির হোসাইন, হেলেনা পারভিন, রবিউল ইসলাম (পরে যুগ্ম সচিব হয়েছেন), আরিফুল ইসলাম ও জিয়াউর রহমান এবং জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব জেসমিন প্রধান এলজিইডির গাড়ি ব্যবহার করেন। তবে নতুন মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর আবদুল মঈন খান এবং প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এলজিইডির প্রকল্পের গাড়ি নেননি। তাঁরা সরকারি পরিবহন পুলের গাড়ি ব্যবহার করেন। অবশ্য প্রতিমন্ত্রীর পিএস মো. তাসনিমুজ্জামান ও এপিএস তৌহিদুল ইসলাম এলজিইডির গাড়ি নিয়েছেন।

এলজিইডির প্রকল্পগুলো যাচাই ও অনুমোদনের দায়িত্বে থাকা পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তাদের ১০টি গাড়ি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৯টি গাড়ি ব্যবহার করছেন কমিশনের সদস্য নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়া ও মাহমুদুল হোসাইন খান, বিভাগীয় প্রধান কবির আহামদ, বাবুল মিঞা ও মো. আশরাফুজ্জামান, যুগ্ম সচিব মোছা. আনার কলি এবং উপপ্রধান শাহ মো. হেলাল উদ্দিন। বিভাগীয় প্রধান কবির আহামদ ঢাকা মেট্রো-ঘ ১৮-৩৫৭১ নম্বর গাড়িটি ব্যবহার করেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রজেক্টের কাজের জন্যই তাঁরা গাড়ি ব্যবহার করেন। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই গাড়িতেই তিনি নিয়মিত অফিসে যাতায়াত করেন। অন্য কর্মকর্তা বাবুল মিঞা ঢাকা মেট্রো-ঘ ১৮-২৮০১ নম্বর গাড়িটি ব্যবহার করেন। প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি অফিশিয়াল কাজে ব্যবহার করা হয় এবং তিনি একা এটি ব্যবহার করছেন না। তিনি আরও বলেন, ‘আমি যদি এসে এই ব্যবস্থা চালু করতাম, তাহলে বলতে পারতেন। আমি তো এটা চালু করিনি।’

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ছয়টি গাড়ির ব্যবহারকারী হিসেবে প্রসিকিউটরদের নাম রয়েছে। ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রসিকিউটররা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন এবং নিরাপত্তার জন্য সরকারি সংস্থার কাছ থেকে গাড়ি আনা হয়েছে। এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেন বলেন, পরিকল্পনা কমিশন ও দুদকে গাড়ি দেওয়া হয়েছে কি না, তা তিনি বলতে পারছেন না। তবে মন্ত্রণালয়ের কাজের সঙ্গে যাঁরা সম্পৃক্ত, তাঁরা এলজিইডির গাড়ি ব্যবহার করেন। কাজের প্রয়োজনে যখন যেখানে দরকার, সেখানে গাড়ি দেওয়া হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

গাড়ি নিয়ে এই অনিয়ম নতুন কিছু নয়। সাবেক স্থানীয় সরকার সচিব হেলালুদ্দীন আহমদের বিরুদ্ধে তিনটি গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল। তখন তিনি বলেছিলেন, একটি গাড়ি তিনি, একটি তাঁর পরিবার এবং অন্যটি বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করেন। তাঁর আগের সচিবও তিনটি গাড়ি ব্যবহার করতেন বলে তিনি দাবি করেছিলেন। হেলালুদ্দীন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, একটি অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চললেই তা বৈধ হয়ে যায় না।

২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সচিব থেকে শুরু করে উপসচিবদের জন্য বিনা সুদে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত গাড়ি কেনার ঋণ দেওয়া শুরু করে সরকার। এই ঋণের জন্য মাত্র ১ শতাংশ সার্ভিস চার্জ নেওয়া হয়। আট বছরে ১০ শতাংশ অবচয় সুবিধা বাদ দিলে কর্মকর্তাদের শেষ পর্যন্ত পরিশোধ করতে হয় প্রায় ১৩ লাখ টাকা, যার মাসিক কিস্তি আসে ১১ হাজার টাকার মতো। অন্যদিকে গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকার প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা দেয়, যা দিয়ে ঋণের কিস্তি, চালকের বেতন ও জ্বালানি খরচ অনায়াসেই মেটানো সম্ভব। গত ৯ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয় এই ভাতা ২৫ হাজার টাকায় নামিয়ে আনার উদ্যোগ নিলেও কর্মকর্তাদের আপত্তির মুখে ১৬ জুলাই তা বাতিল করা হয়। গত ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২ হাজার ৩৫৭ জন কর্মকর্তা এই ঋণ নিয়েছেন। পরে গত ২ এপ্রিল বিএনপি সরকার এই গাড়িঋণ সুবিধা স্থগিত করে।

প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহারের বিষয়ে কর্মকর্তাদের সতর্ক করে এবং তা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছিল, গাড়িঋণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা নেওয়ার পরও বিধিবহির্ভূতভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়ি ব্যবহার করায় প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা ও আর্থিক অপচয় ঘটছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারও এ বিষয়ে আর কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। গত পাঁচ বছরে শেষ হওয়া এলজিইডির প্রকল্পের কটি গাড়ি পরিবহন পুলে জমা পড়েছে, তার তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে গত চার বছরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সংস্থা থেকে মাত্র ১৮টি গাড়ি জমা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণকেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, রাজনৈতিক সরকার শক্ত অবস্থান নিলেই কেবল এই দীর্ঘদিনের অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব।

এতে বলা হয়, অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত ঋণ এবং গাড়িসেবা নগদায়ন নীতিমালা-২০২০-এর আওতায় গাড়ির ঋণ নেওয়া হয়েছে।