লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১০:০৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চকরিয়া সুন্দরবন পুনরুদ্ধারে আশার আলো দেখাচ্ছে বাইনগাছ

বিলীন হয়ে যাওয়া উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ম্যানগ্রোভ বন চকরিয়া সুন্দরবন আবার প্রাণ ফিরে পাওয়ার আশা জাগাচ্ছে। পরীক্ষামূলকভাবে রোপণ করা ম্যানগ্রোভ প্রজাতির বাইনগাছের বেঁচে থাকা ও বৃদ্ধির হার সন্তোষজনক হওয়ায় এই আশার আলো দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার যাওয়ার পথে মাতামুহুরী নদীর কোল ঘেঁষে চকরিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে অবস্থিত এই বনটি ভুল সরকারি নীতি ও সংঘবদ্ধ দখলের কারণে একসময় প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়। বনের জরাজীর্ণ অবস্থা নিয়ে গত বছরের ২৪ জুলাই ‘যে বনে একটিমাত্র গাছ’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল প্রথম আলো।

তবে বনের বাস্তুতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে কাজ শুরু করেছে বেসরকারি সংস্থা কোডেক (কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার)। সংস্থাটি গত বছরের জুলাই মাসে বনের বদরখালী চ্যানেলে ২৫ একর জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে ৮০ হাজার বাইনগাছ রোপণ করে। এই উদ্যোগের সফলতায় চলতি বছরের জুন মাসে বনের রামপুরা মৌজায় আরও ২৫ একর জমিতে ৪০ হাজার বাইনগাছ রোপণ করা হয়। চলতি মাসের ১০ তারিখে বন বিভাগ বনায়নের জন্য নির্ধারিত স্থানটি ম্যাপিং বা চিহ্নিত করে দিয়েছে এবং গাছগুলো রক্ষায় নিয়মিত পাহারার আশ্বাস দিয়েছে। কোডেক ছাড়াও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আরণ্যক ফাউন্ডেশনও এখানে ম্যানগ্রোভ প্রজাতির চারা রোপণ করছে।

চকরিয়া সুন্দরবনে বাইনগাছের সম্ভাবনার বিষয়টি উঠে এসেছিল ২০১৪ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ইকোলজিতে’ প্রকাশিত এক গবেষণায়। ‘গ্রোথ পারফরম্যান্স অব ম্যানগ্রোভ স্পিশিজ ইন চকরিয়া সুন্দরবন’ শীর্ষক ওই গবেষণার সাথে যুক্ত ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের অধ্যাপক খালেদ মিসবাহুজ্জামান। তিন মাস ধরে ২৪০টি ম্যানগ্রোভ চারার বৃদ্ধি ও বেঁচে থাকার হার পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, অন্যান্য প্রজাতির চেয়ে সাদা বাইন ও মরিচা বাইনের টিকে থাকার হার বেশি ছিল, যার মধ্যে মরিচা বাইনের বৃদ্ধি ছিল সবচেয়ে আশাব্যাঞ্জক।

অধ্যাপক খালেদ মিসবাহুজ্জামান চকরিয়া সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারে চারটি বড় বাধার কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, চিংড়িঘেরের ইজারাদারেরা ম্যানগ্রোভ বন ফিরিয়ে আনাকে তাদের ব্যবসার জন্য হুমকি মনে করেন। দ্বিতীয়ত, বনের মধ্যে অসংখ্য পোল্ডার ও চিংড়িঘেরের বাঁধ থাকায় জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা ম্যানগ্রোভের বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি। তৃতীয়ত, দীর্ঘ চার দশকের লবণ ও চিংড়ি চাষের কারণে বনের মাটির গুণাগুণ নষ্ট হয়ে গেছে; তাই মাটির লবণাক্ততা বুঝে সঠিক স্থানে সঠিক প্রজাতির গাছ রোপণ করতে হবে। চতুর্থত, বনের পানির প্রবাহের গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে গেছে। এসব বাধা দূর করতে বড় রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

কোডেকের প্রকল্প কর্মকর্তা শীতল কুমার নাথ জানান, বদরখালী চ্যানেলে রোপণ করা ম্যানগ্রোভের মধ্যে বাইনগাছ সবচেয়ে ভালো ফল দেখিয়েছে। তবে বনের প্রাণবৈচিত্র্য পুরোপুরি ফেরাতে চিংড়িঘেরের বাঁধগুলো অপসারণ করে জোয়ার-ভাটার প্রবাহ নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

গত ১০ আগস্ট চকরিয়া সুন্দরবন এলাকা পরিদর্শন করেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। তিনি জানান, বিভিন্ন সংস্থাকে ইজারা দেওয়ার পরও বন বিভাগের নামে ৪ হাজার একর বনভূমি রেকর্ডভুক্ত আছে। কিন্তু মৎস্য, কৃষি ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের ইজারা দেওয়া জমির সীমানা চিহ্নিত না থাকায় ইজারাদারেরা বন বিভাগের জমিও দখল করে নিয়েছেন। স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা এসব জমি দখল করে রেখেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের প্রথম লক্ষ্য হলো বন বিভাগের নিজস্ব ভূমি উদ্ধার করা এবং পরবর্তীতে অন্যান্য ইজারা বাতিল করে বনের জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা।

ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত ‘কক্সবাজার ওয়ার্কিং প্ল্যান ফর দ্য পিরিয়ড ফ্রম ১৯৫০ টু ১৯৬৯-৭০’ সরকারি নথি অনুযায়ী, চকরিয়া সুন্দরবনকে ১৯০৩ সালে সংরক্ষিত বন ঘোষণা করা হয়েছিল। ১৯৫০-এর দশকে এই বন প্রায় ২১ হাজার ১০২ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ছিল, যার মধ্যে ১৮ হাজার ৫০৮ একর সংরক্ষিত এবং বাকি অংশ রক্ষিত বন ছিল। পরবর্তীতে সরকারি সিদ্ধান্তে মাত্র ৪ হাজার একর বন বিভাগের অধীনে রেখে বাকি অংশ চিংড়ি চাষের জন্য ইজারা দেওয়া হয়। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির বলেন, সরকার দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার যে অঙ্গীকার করেছে, চকরিয়া সুন্দরবনের ঐতিহ্য ফেরানো গেলে তা হবে এক অনন্য অর্জন। এ জন্য জবরদখল উচ্ছেদে সমন্বিত উদ্যোগ ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ধাপে ধাপে কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইউএনইপি (UNEP) গত ২৪ জুলাই প্রকাশিত এক নিবন্ধে জানিয়েছে, উপকূলীয় উন্নয়ন, চিংড়ি চাষ ও জলবায়ু পরিবর্তনের চাপে হারিয়ে যাওয়া ম্যানগ্রোভ বন বিশ্বজুড়ে আবার ফিরে আসছে। ১৯৮০ থেকে ২০২৩ সালের ভূ-উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি কেনিয়া, কোস্টারিকা, বেনিন ও ভিয়েতনামে স্থানীয় উদ্যোগ, বৈজ্ঞানিক সংরক্ষণ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধারের সফলতার কথা উল্লেখ করেছে। ভিয়েতনামের কান জিও ম্যানগ্রোভ বনের উদাহরণ টেনে ভিয়েতনাম ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ফাং নুয়েন হংয়ের গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৫৫ থেকে ১৯৭৫ সালের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বোমাবর্ষণে ধ্বংস হওয়া ৪০ হাজার হেক্টরের বনটির মধ্যে প্রায় ৩৫ হাজার একর বন ১৯৯৬ সালের মধ্যে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয় সে দেশের সরকার। ইউএনইপির মতে, ম্যানগ্রোভ ক্রান্তীয় বনের মাত্র ১ শতাংশের কম হলেও উপকূলের ২৪০ কোটি মানুষের ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা, কার্বন ধারণ ও ১ হাজার ৫০০-র বেশি বন্য প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তাঁর ভাষ্য, বনের প্রাণবৈচিত্র্য ফেরাতে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা।.ইউএনইপি জানাচ্ছে, ম্যানগ্রোভ আয়তনে বিশ্বের ক্রান্তীয় বনের ১ শতাংশের কম হলেও উপকূলের ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী প্রায় ২৪০ কোটি মানুষের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ।

জনপ্রিয় সংবাদ

জাদু-টোনা সম্পর্কে ইসলাম কী বলে? জানুন ভয়াবহতা ও প্রতিকার

চকরিয়া সুন্দরবন পুনরুদ্ধারে আশার আলো দেখাচ্ছে বাইনগাছ

প্রকাশিত হয়েছে: ০২:৫৬:০৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিলীন হয়ে যাওয়া উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ম্যানগ্রোভ বন চকরিয়া সুন্দরবন আবার প্রাণ ফিরে পাওয়ার আশা জাগাচ্ছে। পরীক্ষামূলকভাবে রোপণ করা ম্যানগ্রোভ প্রজাতির বাইনগাছের বেঁচে থাকা ও বৃদ্ধির হার সন্তোষজনক হওয়ায় এই আশার আলো দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার যাওয়ার পথে মাতামুহুরী নদীর কোল ঘেঁষে চকরিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে অবস্থিত এই বনটি ভুল সরকারি নীতি ও সংঘবদ্ধ দখলের কারণে একসময় প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়। বনের জরাজীর্ণ অবস্থা নিয়ে গত বছরের ২৪ জুলাই ‘যে বনে একটিমাত্র গাছ’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল প্রথম আলো।

তবে বনের বাস্তুতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে কাজ শুরু করেছে বেসরকারি সংস্থা কোডেক (কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার)। সংস্থাটি গত বছরের জুলাই মাসে বনের বদরখালী চ্যানেলে ২৫ একর জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে ৮০ হাজার বাইনগাছ রোপণ করে। এই উদ্যোগের সফলতায় চলতি বছরের জুন মাসে বনের রামপুরা মৌজায় আরও ২৫ একর জমিতে ৪০ হাজার বাইনগাছ রোপণ করা হয়। চলতি মাসের ১০ তারিখে বন বিভাগ বনায়নের জন্য নির্ধারিত স্থানটি ম্যাপিং বা চিহ্নিত করে দিয়েছে এবং গাছগুলো রক্ষায় নিয়মিত পাহারার আশ্বাস দিয়েছে। কোডেক ছাড়াও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আরণ্যক ফাউন্ডেশনও এখানে ম্যানগ্রোভ প্রজাতির চারা রোপণ করছে।

চকরিয়া সুন্দরবনে বাইনগাছের সম্ভাবনার বিষয়টি উঠে এসেছিল ২০১৪ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ইকোলজিতে’ প্রকাশিত এক গবেষণায়। ‘গ্রোথ পারফরম্যান্স অব ম্যানগ্রোভ স্পিশিজ ইন চকরিয়া সুন্দরবন’ শীর্ষক ওই গবেষণার সাথে যুক্ত ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের অধ্যাপক খালেদ মিসবাহুজ্জামান। তিন মাস ধরে ২৪০টি ম্যানগ্রোভ চারার বৃদ্ধি ও বেঁচে থাকার হার পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, অন্যান্য প্রজাতির চেয়ে সাদা বাইন ও মরিচা বাইনের টিকে থাকার হার বেশি ছিল, যার মধ্যে মরিচা বাইনের বৃদ্ধি ছিল সবচেয়ে আশাব্যাঞ্জক।

অধ্যাপক খালেদ মিসবাহুজ্জামান চকরিয়া সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারে চারটি বড় বাধার কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, চিংড়িঘেরের ইজারাদারেরা ম্যানগ্রোভ বন ফিরিয়ে আনাকে তাদের ব্যবসার জন্য হুমকি মনে করেন। দ্বিতীয়ত, বনের মধ্যে অসংখ্য পোল্ডার ও চিংড়িঘেরের বাঁধ থাকায় জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা ম্যানগ্রোভের বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি। তৃতীয়ত, দীর্ঘ চার দশকের লবণ ও চিংড়ি চাষের কারণে বনের মাটির গুণাগুণ নষ্ট হয়ে গেছে; তাই মাটির লবণাক্ততা বুঝে সঠিক স্থানে সঠিক প্রজাতির গাছ রোপণ করতে হবে। চতুর্থত, বনের পানির প্রবাহের গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে গেছে। এসব বাধা দূর করতে বড় রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

কোডেকের প্রকল্প কর্মকর্তা শীতল কুমার নাথ জানান, বদরখালী চ্যানেলে রোপণ করা ম্যানগ্রোভের মধ্যে বাইনগাছ সবচেয়ে ভালো ফল দেখিয়েছে। তবে বনের প্রাণবৈচিত্র্য পুরোপুরি ফেরাতে চিংড়িঘেরের বাঁধগুলো অপসারণ করে জোয়ার-ভাটার প্রবাহ নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

গত ১০ আগস্ট চকরিয়া সুন্দরবন এলাকা পরিদর্শন করেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। তিনি জানান, বিভিন্ন সংস্থাকে ইজারা দেওয়ার পরও বন বিভাগের নামে ৪ হাজার একর বনভূমি রেকর্ডভুক্ত আছে। কিন্তু মৎস্য, কৃষি ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের ইজারা দেওয়া জমির সীমানা চিহ্নিত না থাকায় ইজারাদারেরা বন বিভাগের জমিও দখল করে নিয়েছেন। স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা এসব জমি দখল করে রেখেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের প্রথম লক্ষ্য হলো বন বিভাগের নিজস্ব ভূমি উদ্ধার করা এবং পরবর্তীতে অন্যান্য ইজারা বাতিল করে বনের জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা।

ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত ‘কক্সবাজার ওয়ার্কিং প্ল্যান ফর দ্য পিরিয়ড ফ্রম ১৯৫০ টু ১৯৬৯-৭০’ সরকারি নথি অনুযায়ী, চকরিয়া সুন্দরবনকে ১৯০৩ সালে সংরক্ষিত বন ঘোষণা করা হয়েছিল। ১৯৫০-এর দশকে এই বন প্রায় ২১ হাজার ১০২ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ছিল, যার মধ্যে ১৮ হাজার ৫০৮ একর সংরক্ষিত এবং বাকি অংশ রক্ষিত বন ছিল। পরবর্তীতে সরকারি সিদ্ধান্তে মাত্র ৪ হাজার একর বন বিভাগের অধীনে রেখে বাকি অংশ চিংড়ি চাষের জন্য ইজারা দেওয়া হয়। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির বলেন, সরকার দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার যে অঙ্গীকার করেছে, চকরিয়া সুন্দরবনের ঐতিহ্য ফেরানো গেলে তা হবে এক অনন্য অর্জন। এ জন্য জবরদখল উচ্ছেদে সমন্বিত উদ্যোগ ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ধাপে ধাপে কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইউএনইপি (UNEP) গত ২৪ জুলাই প্রকাশিত এক নিবন্ধে জানিয়েছে, উপকূলীয় উন্নয়ন, চিংড়ি চাষ ও জলবায়ু পরিবর্তনের চাপে হারিয়ে যাওয়া ম্যানগ্রোভ বন বিশ্বজুড়ে আবার ফিরে আসছে। ১৯৮০ থেকে ২০২৩ সালের ভূ-উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি কেনিয়া, কোস্টারিকা, বেনিন ও ভিয়েতনামে স্থানীয় উদ্যোগ, বৈজ্ঞানিক সংরক্ষণ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধারের সফলতার কথা উল্লেখ করেছে। ভিয়েতনামের কান জিও ম্যানগ্রোভ বনের উদাহরণ টেনে ভিয়েতনাম ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ফাং নুয়েন হংয়ের গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৫৫ থেকে ১৯৭৫ সালের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বোমাবর্ষণে ধ্বংস হওয়া ৪০ হাজার হেক্টরের বনটির মধ্যে প্রায় ৩৫ হাজার একর বন ১৯৯৬ সালের মধ্যে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয় সে দেশের সরকার। ইউএনইপির মতে, ম্যানগ্রোভ ক্রান্তীয় বনের মাত্র ১ শতাংশের কম হলেও উপকূলের ২৪০ কোটি মানুষের ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা, কার্বন ধারণ ও ১ হাজার ৫০০-র বেশি বন্য প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তাঁর ভাষ্য, বনের প্রাণবৈচিত্র্য ফেরাতে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা।.ইউএনইপি জানাচ্ছে, ম্যানগ্রোভ আয়তনে বিশ্বের ক্রান্তীয় বনের ১ শতাংশের কম হলেও উপকূলের ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী প্রায় ২৪০ কোটি মানুষের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ।