লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৪:৫৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শতকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত চিলাহাটি স্থলবন্দর এখন পরিত্যক্ত ও অকার্যকর

সীমান্তের কাছে অবস্থিত নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার চিলাহাটি স্থলবন্দরের দৃষ্টিনন্দন বিশাল ভবনটি এখন কেবলই এক পরিত্যক্ত স্থাপনা। একসময় যে ভবনটি দূর থেকে নজর কাড়ত, এখন সেখানে সুনসান নীরবতা। ভবনের একতলার বারান্দায় পড়ে থাকা সারি সারি ফ্যানগুলো দীর্ঘ দিন ধরে অচল। জানালা দিয়ে দেখা যায়, ধুলোবালি জমে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া প্যাকেটবন্দী চেয়ার-টেবিল ও স্টিলের টুলের স্তূপ। দ্বিতীয় তলায় ব্যাংক ও শুল্ক কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত কক্ষগুলো খালি পড়ে আছে, আর তৃতীয় তলার রেস্তোরাঁর জায়গাটিও ফাঁকা।

স্থলবন্দরের বহুমুখী এই মূল ভবনের পাশেই রয়েছে দোতলা ভিআইপি অতিথিশালা, যা বর্তমানে তালাবদ্ধ। এছাড়া যাত্রীছাউনি, ওভারব্রিজ ও গার্ডরুমগুলো বেকার পড়ে আছে। ভারত সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত রেললাইনটিতেও মরিচা ধরেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ কয়েক বছরে প্রায় ১৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে রেলের ওয়াগন, রাস্তা এবং বিদ্যুৎসহ আনুষঙ্গিক খাতগুলো বিবেচনায় নিলে মোট খরচের পরিমাণ প্রায় ২০০ কোটি টাকায় দাঁড়ায় বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক মো. আবদুর রহিম।

ব্রিটিশ আমলে চালু হওয়া চিলাহাটি-হলদিবাড়ী রেলপথ ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘ অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর এই পথ পুনরায় চালু করা হয়েছিল। রেল কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ২০১৯ সালে ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণের কাজ শুরু হয় এবং ২০২১ সালের ১ আগস্ট থেকে পণ্য চলাচল শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে যাত্রীবাহী ট্রেন ‘মিতালি এক্সপ্রেস’ চালু করা হলেও ২০২৪ সালে তা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২০২৫ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার অবকাঠামোর অভাবের কারণ দেখিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্থলবন্দরটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে।

স্থলবন্দরটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। নীলফামারী চেম্বারের সাবেক সভাপতি মো. আবদুল ওয়াহেদ বলেন, উত্তরবঙ্গের মানুষের কথা বিবেচনায় নিয়ে এটি দ্রুত চালু করা প্রয়োজন। তিনি জানান, আগে চিলাহাটি দিয়ে কম খরচে পাথর সৈয়দপুর পর্যন্ত আনা যেত, কিন্তু এখন পঞ্চগড় দিয়ে ট্রাকে পাথর আনতে খরচ অনেক বেশি পড়ছে। এর ফলে ঠিকাদাররাও বেকার হয়ে পড়েছেন।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষও এই বন্দর থেকে মোটা অঙ্কের রাজস্ব হারিয়েছে। স্টেশন মাস্টার রুহুল আমিন জানান, পণ্য পরিবহন চালু থাকাকালে প্রতি চালানে পাথর বাবদ রেলওয়ে ২০ থেকে ২৬ লাখ টাকা আয় করত। মাসে এই আয় প্রায় এক থেকে দেড় কোটি টাকায় পৌঁছাত। অথচ ২০২৩ সালের জুলাইয়ে যেখানে স্টেশনের আয় ছিল ৮০ লাখ টাকা, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে তা নেমে আসে ৩৫ লাখ টাকায়। বর্তমানে স্টেশনে কর্মরত ৫০ জনেরও বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাজের পরিধিও সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান জানিয়েছেন, বন্দরটি আপাতত চালু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এটি পুনরায় চালু করতে বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সম্মতি ও হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা ছিল, এই বন্দরটি ভারত, নেপাল, ভুটান ও চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের নতুন দুয়ার খুলে দেবে, যা এখন কেবলই আশার খাতায় পড়ে আছে।

অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর পথটি খুলে এখন আবার বন্ধ হয়ে গিয়েছে।বাংলাদেশ সরকার চিলাহাটিকে স্থলবন্দর ঘোষণা করেছিল ২০১৩ সালে।

আবদুর রহিম বলেন, ১২৮ কোটি টাকা খরচ করে প্রকল্পটি শেষ হয় ২০২৪ সালের জুন মাসে।

জনপ্রিয় সংবাদ

কুষ্টিয়ায় গাড়িতে হামলার ঘটনায় প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ আমির হামজার

শতকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত চিলাহাটি স্থলবন্দর এখন পরিত্যক্ত ও অকার্যকর

প্রকাশিত হয়েছে: ০৩:৩৮:৩৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

সীমান্তের কাছে অবস্থিত নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার চিলাহাটি স্থলবন্দরের দৃষ্টিনন্দন বিশাল ভবনটি এখন কেবলই এক পরিত্যক্ত স্থাপনা। একসময় যে ভবনটি দূর থেকে নজর কাড়ত, এখন সেখানে সুনসান নীরবতা। ভবনের একতলার বারান্দায় পড়ে থাকা সারি সারি ফ্যানগুলো দীর্ঘ দিন ধরে অচল। জানালা দিয়ে দেখা যায়, ধুলোবালি জমে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া প্যাকেটবন্দী চেয়ার-টেবিল ও স্টিলের টুলের স্তূপ। দ্বিতীয় তলায় ব্যাংক ও শুল্ক কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত কক্ষগুলো খালি পড়ে আছে, আর তৃতীয় তলার রেস্তোরাঁর জায়গাটিও ফাঁকা।

স্থলবন্দরের বহুমুখী এই মূল ভবনের পাশেই রয়েছে দোতলা ভিআইপি অতিথিশালা, যা বর্তমানে তালাবদ্ধ। এছাড়া যাত্রীছাউনি, ওভারব্রিজ ও গার্ডরুমগুলো বেকার পড়ে আছে। ভারত সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত রেললাইনটিতেও মরিচা ধরেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ কয়েক বছরে প্রায় ১৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে রেলের ওয়াগন, রাস্তা এবং বিদ্যুৎসহ আনুষঙ্গিক খাতগুলো বিবেচনায় নিলে মোট খরচের পরিমাণ প্রায় ২০০ কোটি টাকায় দাঁড়ায় বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক মো. আবদুর রহিম।

ব্রিটিশ আমলে চালু হওয়া চিলাহাটি-হলদিবাড়ী রেলপথ ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘ অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর এই পথ পুনরায় চালু করা হয়েছিল। রেল কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ২০১৯ সালে ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণের কাজ শুরু হয় এবং ২০২১ সালের ১ আগস্ট থেকে পণ্য চলাচল শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে যাত্রীবাহী ট্রেন ‘মিতালি এক্সপ্রেস’ চালু করা হলেও ২০২৪ সালে তা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২০২৫ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার অবকাঠামোর অভাবের কারণ দেখিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্থলবন্দরটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে।

স্থলবন্দরটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। নীলফামারী চেম্বারের সাবেক সভাপতি মো. আবদুল ওয়াহেদ বলেন, উত্তরবঙ্গের মানুষের কথা বিবেচনায় নিয়ে এটি দ্রুত চালু করা প্রয়োজন। তিনি জানান, আগে চিলাহাটি দিয়ে কম খরচে পাথর সৈয়দপুর পর্যন্ত আনা যেত, কিন্তু এখন পঞ্চগড় দিয়ে ট্রাকে পাথর আনতে খরচ অনেক বেশি পড়ছে। এর ফলে ঠিকাদাররাও বেকার হয়ে পড়েছেন।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষও এই বন্দর থেকে মোটা অঙ্কের রাজস্ব হারিয়েছে। স্টেশন মাস্টার রুহুল আমিন জানান, পণ্য পরিবহন চালু থাকাকালে প্রতি চালানে পাথর বাবদ রেলওয়ে ২০ থেকে ২৬ লাখ টাকা আয় করত। মাসে এই আয় প্রায় এক থেকে দেড় কোটি টাকায় পৌঁছাত। অথচ ২০২৩ সালের জুলাইয়ে যেখানে স্টেশনের আয় ছিল ৮০ লাখ টাকা, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে তা নেমে আসে ৩৫ লাখ টাকায়। বর্তমানে স্টেশনে কর্মরত ৫০ জনেরও বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাজের পরিধিও সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান জানিয়েছেন, বন্দরটি আপাতত চালু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এটি পুনরায় চালু করতে বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সম্মতি ও হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা ছিল, এই বন্দরটি ভারত, নেপাল, ভুটান ও চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের নতুন দুয়ার খুলে দেবে, যা এখন কেবলই আশার খাতায় পড়ে আছে।

অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর পথটি খুলে এখন আবার বন্ধ হয়ে গিয়েছে।বাংলাদেশ সরকার চিলাহাটিকে স্থলবন্দর ঘোষণা করেছিল ২০১৩ সালে।

আবদুর রহিম বলেন, ১২৮ কোটি টাকা খরচ করে প্রকল্পটি শেষ হয় ২০২৪ সালের জুন মাসে।