লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৫:২৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শাহজালাল বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালে হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়মের তথ্য বেরিয়ে এসেছে। মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং প্রকল্পের নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এখন এই ব্যয়কে পোস্ট-ফ্যাক্টো বা পরবর্তী অনুমোদনের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা চলছে, যা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়েছে।

প্রকল্পের অনিয়মের ফিরিস্তি দীর্ঘ। সৌন্দর্যবর্ধনের নামে লাগানো গাছগুলোর প্রতিটি ১ লাখ টাকা পর্যন্ত দাম দেখানো হলেও, বিমানবন্দরসংলগ্ন নার্সারি মালিক রবিউল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, এই গাছগুলোর দাম ২০০-৫০০ টাকার বেশি নয়। লাখ টাকার গাছ এগুলো নয়। এ খাতে ২০ কোটি টাকার পাশাপাশি পরিচর্যার নামে আরও ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। এছাড়া বিদ্যমান জলাশয়কে নতুন পুকুর খনন দেখিয়ে ১০ কোটি টাকা এবং আংশিক উদ্বোধনের ফিতা কাটার আয়োজনে ৪৪ কোটি টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। চুক্তির বাইরে দ্রুত কাজ শেষ করার অজুহাতে ঠিকাদারকে অতিরিক্ত ২১৭ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে এবং ৬৩০টি আইটেম পরিবর্তনের (ভেরিয়েশন) মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। নিরীক্ষায় আরও উঠে এসেছে যে, মাটি পরিবহণের বিল বাবদ ৮৩ কোটি টাকা খরচ দেখানো হলেও অধিকাংশ মাটি মাত্র দুই কিলোমিটারের মধ্যেই ফেলা হয়েছে। এছাড়া ডিজেল পাম্প, ইউপিএস এবং জ্বালানি তেলের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অনিয়মগুলোকে পরবর্তী অনুমোদনের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া আরেকটি দুর্নীতির শামিল। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, পোস্ট-ফ্যাক্টো অনুমোদনের পরিবর্তে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানিয়েছেন, অনিয়মের অভিযোগগুলো তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং এ বিষয়ে একটি অ্যামিকেবল সেটেলমেন্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, দুর্নীতির বিষয়ে কোনো সমঝোতা হবে না।

২০১৭ সালে গ্রহণ করা থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে। জাপানের মিতসুবিশি ও ফুজিটা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাংয়ের সমন্বয়ে গঠিত অ্যাভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম (এডিসি) ছিল এ প্রকল্পের ঠিকাদার। প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল প্রায় ২১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা, যার একটি বড় অংশ জাইকার অর্থায়ন। বর্তমানে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ ডিসপিউট বোর্ড ও অ্যামিকেবল সেটেলমেন্ট কমিটি গঠন করলেও, অভিযুক্তদেরই এসব কমিটিতে রাখার অভিযোগ উঠেছে। বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মোহাম্মদ মফিদুর রহমান মনে করেন, প্রকল্পের নথি ও চুক্তির আলোকে প্রতিটি বিষয় নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে টার্মিনালের কাজ সম্পন্ন করার সঙ্গে তদন্তের কোনো বিরোধ থাকা উচিত নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

জনপ্রিয় সংবাদ

ঢাকা সফরে আসছেন মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত সার্জিও গোর

শাহজালাল বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালে হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম

প্রকাশিত হয়েছে: ০১:০১:০৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়মের তথ্য বেরিয়ে এসেছে। মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং প্রকল্পের নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এখন এই ব্যয়কে পোস্ট-ফ্যাক্টো বা পরবর্তী অনুমোদনের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা চলছে, যা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়েছে।

প্রকল্পের অনিয়মের ফিরিস্তি দীর্ঘ। সৌন্দর্যবর্ধনের নামে লাগানো গাছগুলোর প্রতিটি ১ লাখ টাকা পর্যন্ত দাম দেখানো হলেও, বিমানবন্দরসংলগ্ন নার্সারি মালিক রবিউল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, এই গাছগুলোর দাম ২০০-৫০০ টাকার বেশি নয়। লাখ টাকার গাছ এগুলো নয়। এ খাতে ২০ কোটি টাকার পাশাপাশি পরিচর্যার নামে আরও ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। এছাড়া বিদ্যমান জলাশয়কে নতুন পুকুর খনন দেখিয়ে ১০ কোটি টাকা এবং আংশিক উদ্বোধনের ফিতা কাটার আয়োজনে ৪৪ কোটি টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। চুক্তির বাইরে দ্রুত কাজ শেষ করার অজুহাতে ঠিকাদারকে অতিরিক্ত ২১৭ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে এবং ৬৩০টি আইটেম পরিবর্তনের (ভেরিয়েশন) মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। নিরীক্ষায় আরও উঠে এসেছে যে, মাটি পরিবহণের বিল বাবদ ৮৩ কোটি টাকা খরচ দেখানো হলেও অধিকাংশ মাটি মাত্র দুই কিলোমিটারের মধ্যেই ফেলা হয়েছে। এছাড়া ডিজেল পাম্প, ইউপিএস এবং জ্বালানি তেলের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অনিয়মগুলোকে পরবর্তী অনুমোদনের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া আরেকটি দুর্নীতির শামিল। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, পোস্ট-ফ্যাক্টো অনুমোদনের পরিবর্তে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানিয়েছেন, অনিয়মের অভিযোগগুলো তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং এ বিষয়ে একটি অ্যামিকেবল সেটেলমেন্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, দুর্নীতির বিষয়ে কোনো সমঝোতা হবে না।

২০১৭ সালে গ্রহণ করা থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে। জাপানের মিতসুবিশি ও ফুজিটা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাংয়ের সমন্বয়ে গঠিত অ্যাভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম (এডিসি) ছিল এ প্রকল্পের ঠিকাদার। প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল প্রায় ২১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা, যার একটি বড় অংশ জাইকার অর্থায়ন। বর্তমানে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ ডিসপিউট বোর্ড ও অ্যামিকেবল সেটেলমেন্ট কমিটি গঠন করলেও, অভিযুক্তদেরই এসব কমিটিতে রাখার অভিযোগ উঠেছে। বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মোহাম্মদ মফিদুর রহমান মনে করেন, প্রকল্পের নথি ও চুক্তির আলোকে প্রতিটি বিষয় নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে টার্মিনালের কাজ সম্পন্ন করার সঙ্গে তদন্তের কোনো বিরোধ থাকা উচিত নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।