লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৫:১৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরান যুদ্ধ আরও ছয় মাস চলতে পারে, ট্রাম্পের সামনে ৩টি পথ: লিওন প্যানেটা

ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুরু করা ইরান যুদ্ধ আরও অন্তত ছয় মাস চলতে পারে বলে সতর্ক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সিআইএ প্রধান লিওন প্যানেটা। এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী বা ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধে’ রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে বলে মনে করেন তিনি। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্যানেটা বলেন, এই যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছেন ট্রাম্প এবং বর্তমানে সংঘাতের শেষ কোথায়, তার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই।

বারাক ওবামার মেয়াদে ২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা প্যানেটা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এক ভয়াবহ অচলাবস্থায় আটকে গেছে। এই সংঘাতটি ইরাক ও আফগানিস্তানের মতো মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি ‘ব্যর্থ যুদ্ধে’ পরিণত হওয়ার পথে রয়েছে। কোনো সমাধান ছাড়াই এই যুদ্ধ আরও ছয় মাস চলার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করেন তিনি।

পেন্টাগনের শীর্ষ পর্যায়ে চলমান অস্থিরতার মধ্যেই প্যানেটার এই মন্তব্য এলো। সম্প্রতি প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গে একাধিক কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা নিয়ে মতবিরোধের জেরে মার্কিন সেনাবাহিনীর বেসামরিক প্রধান (আর্মি সেক্রেটারি) ড্যান ড্রিসকল পদত্যাগ করেছেন। এই অস্থিরতার দিকে ইঙ্গিত করে প্যানেটা বলেন, এমন এক সময়ে মার্কিন সেনাসদস্যরা যুদ্ধে যাচ্ছেন, যখন পেন্টাগনের কমান্ড কাঠামোয় ব্যাপক বিশৃঙ্খলা চলছে। এতে এমন একটি ধারণা তৈরি হচ্ছে যে আসলে কেউ দায়িত্বে নেই। চীন, রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া, ইরান ও সন্ত্রাসবাদের মতো বড় হুমকির মুখে থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র তার প্রধান প্রতিপক্ষদের কাছে নিজেদের দুর্বলতার বার্তা পাঠাচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

তবে পেন্টাগন এই বিশৃঙ্খলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল এক বিবৃতিতে বলেন, প্রতিরক্ষা বিভাগে বিশৃঙ্খলা চলছে—এমন ধারণার কোনো ভিত্তি নেই। প্রতিদিন দেশের প্রতিরক্ষায় কাজ করা পেশাজীবী ও সেনাসদস্যদের জন্য এ ধরনের মন্তব্য অপমানজনক। তিনি দাবি করেন, যেসব পরিবর্তনকে বিশৃঙ্খলা মনে হচ্ছে, সেগুলো আসলে সংস্কার প্রক্রিয়ারই অংশ। এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের মতামত চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরুর তিন সপ্তাহ পর প্যানেটা বলেছিলেন, ট্রাম্প একটি উভয়সংকটে পড়েছেন। সাবেক এই প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মতে, ট্রাম্পের সামনে এখন তিনটি বিকল্প রয়েছে। প্রথমটি হলো, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে গিয়ে এটিকে একটি ‘ব্যর্থ যুদ্ধ’ হিসেবে স্বীকার করে নেওয়া, যা ট্রাম্পের পক্ষে করা কঠিন। দ্বিতীয়টি হলো, বর্তমান অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত করা, যেখানে দুই পক্ষই পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়ে যাবে কিন্তু কেউ আলোচনায় বসবে না। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুরু হবে। আর তৃতীয় বিকল্প হিসেবে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে, যাতে বিশ্ববাণিজ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ পথ বন্ধ বা ব্যাহত করার ইরানি সক্ষমতা কেড়ে নেওয়া যায়। প্যানেটা মনে করেন, ট্রাম্পকে হয় হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার পদক্ষেপ নিতে হবে, নয়তো অচলাবস্থার মধ্যে জেতার ভান করে এই খেলা চালিয়ে যেতে হবে।

প্যানেটা অভিযোগ করেন, ট্রাম্প বারবার ভুলভাবে দাবি করেছেন যে যুদ্ধ শেষের চুক্তি শিগগিরই হতে যাচ্ছে এবং হরমুজ প্রণালি খোলা রয়েছে, যা তাঁর নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করেছে। এদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই সংঘাতকে ‘যুদ্ধ’ বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। আগামী নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই সংঘাত শেষ হবে কি না, জানতে চাইলে ভ্যান্স বলেন, এর উত্তর তাঁর জানা নেই এবং এটি ইরানিদেরই জিজ্ঞাসা করা উচিত। প্যানেটার মতে, অনেক মার্কিন নাগরিক ট্রাম্পের এই যুদ্ধ সামলানোর সক্ষমতার ওপর আস্থা হারিয়েছেন এবং সাম্প্রতিক জনমত জরিপেও দেখা গেছে যে অধিকাংশ আমেরিকান মনে করেন ইরানের সঙ্গে সংঘাত ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।

সেনাসদস্যদের মানসিক ও শারীরিক পরিস্থিতির অবনতির দিকে ইঙ্গিত করে প্যানেটা মার্কিন রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের দীর্ঘ মোতায়েনের উদাহরণ দেন। ২৬০ দিনেরও বেশি সময় ধরে কোনো বন্দরে না থেমে মোতায়েন থাকা এই জাহাজটি সম্প্রতি থাইল্যান্ডে পৌঁছেছে। প্যানেটা বলেন, কোনো পালাবর্তন বা রোটেশন পরিকল্পনা ছাড়া অনির্দিষ্টকালের জন্য সেনাদের যুদ্ধক্ষেত্রে রাখা যায় না। এর ফলে জীবন বাজি রেখে দায়িত্ব পালন করা সেনাসদস্যদের যথাযথ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

বাংলাদেশসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের জোরপূর্বক যুদ্ধে পাঠাচ্ছে রাশিয়া

ইরান যুদ্ধ আরও ছয় মাস চলতে পারে, ট্রাম্পের সামনে ৩টি পথ: লিওন প্যানেটা

প্রকাশিত হয়েছে: ০৪:০৩:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুরু করা ইরান যুদ্ধ আরও অন্তত ছয় মাস চলতে পারে বলে সতর্ক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সিআইএ প্রধান লিওন প্যানেটা। এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী বা ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধে’ রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে বলে মনে করেন তিনি। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্যানেটা বলেন, এই যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছেন ট্রাম্প এবং বর্তমানে সংঘাতের শেষ কোথায়, তার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই।

বারাক ওবামার মেয়াদে ২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা প্যানেটা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এক ভয়াবহ অচলাবস্থায় আটকে গেছে। এই সংঘাতটি ইরাক ও আফগানিস্তানের মতো মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি ‘ব্যর্থ যুদ্ধে’ পরিণত হওয়ার পথে রয়েছে। কোনো সমাধান ছাড়াই এই যুদ্ধ আরও ছয় মাস চলার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করেন তিনি।

পেন্টাগনের শীর্ষ পর্যায়ে চলমান অস্থিরতার মধ্যেই প্যানেটার এই মন্তব্য এলো। সম্প্রতি প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গে একাধিক কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা নিয়ে মতবিরোধের জেরে মার্কিন সেনাবাহিনীর বেসামরিক প্রধান (আর্মি সেক্রেটারি) ড্যান ড্রিসকল পদত্যাগ করেছেন। এই অস্থিরতার দিকে ইঙ্গিত করে প্যানেটা বলেন, এমন এক সময়ে মার্কিন সেনাসদস্যরা যুদ্ধে যাচ্ছেন, যখন পেন্টাগনের কমান্ড কাঠামোয় ব্যাপক বিশৃঙ্খলা চলছে। এতে এমন একটি ধারণা তৈরি হচ্ছে যে আসলে কেউ দায়িত্বে নেই। চীন, রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া, ইরান ও সন্ত্রাসবাদের মতো বড় হুমকির মুখে থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র তার প্রধান প্রতিপক্ষদের কাছে নিজেদের দুর্বলতার বার্তা পাঠাচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

তবে পেন্টাগন এই বিশৃঙ্খলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল এক বিবৃতিতে বলেন, প্রতিরক্ষা বিভাগে বিশৃঙ্খলা চলছে—এমন ধারণার কোনো ভিত্তি নেই। প্রতিদিন দেশের প্রতিরক্ষায় কাজ করা পেশাজীবী ও সেনাসদস্যদের জন্য এ ধরনের মন্তব্য অপমানজনক। তিনি দাবি করেন, যেসব পরিবর্তনকে বিশৃঙ্খলা মনে হচ্ছে, সেগুলো আসলে সংস্কার প্রক্রিয়ারই অংশ। এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের মতামত চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরুর তিন সপ্তাহ পর প্যানেটা বলেছিলেন, ট্রাম্প একটি উভয়সংকটে পড়েছেন। সাবেক এই প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মতে, ট্রাম্পের সামনে এখন তিনটি বিকল্প রয়েছে। প্রথমটি হলো, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে গিয়ে এটিকে একটি ‘ব্যর্থ যুদ্ধ’ হিসেবে স্বীকার করে নেওয়া, যা ট্রাম্পের পক্ষে করা কঠিন। দ্বিতীয়টি হলো, বর্তমান অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত করা, যেখানে দুই পক্ষই পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়ে যাবে কিন্তু কেউ আলোচনায় বসবে না। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুরু হবে। আর তৃতীয় বিকল্প হিসেবে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে, যাতে বিশ্ববাণিজ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ পথ বন্ধ বা ব্যাহত করার ইরানি সক্ষমতা কেড়ে নেওয়া যায়। প্যানেটা মনে করেন, ট্রাম্পকে হয় হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার পদক্ষেপ নিতে হবে, নয়তো অচলাবস্থার মধ্যে জেতার ভান করে এই খেলা চালিয়ে যেতে হবে।

প্যানেটা অভিযোগ করেন, ট্রাম্প বারবার ভুলভাবে দাবি করেছেন যে যুদ্ধ শেষের চুক্তি শিগগিরই হতে যাচ্ছে এবং হরমুজ প্রণালি খোলা রয়েছে, যা তাঁর নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করেছে। এদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই সংঘাতকে ‘যুদ্ধ’ বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। আগামী নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই সংঘাত শেষ হবে কি না, জানতে চাইলে ভ্যান্স বলেন, এর উত্তর তাঁর জানা নেই এবং এটি ইরানিদেরই জিজ্ঞাসা করা উচিত। প্যানেটার মতে, অনেক মার্কিন নাগরিক ট্রাম্পের এই যুদ্ধ সামলানোর সক্ষমতার ওপর আস্থা হারিয়েছেন এবং সাম্প্রতিক জনমত জরিপেও দেখা গেছে যে অধিকাংশ আমেরিকান মনে করেন ইরানের সঙ্গে সংঘাত ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।

সেনাসদস্যদের মানসিক ও শারীরিক পরিস্থিতির অবনতির দিকে ইঙ্গিত করে প্যানেটা মার্কিন রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের দীর্ঘ মোতায়েনের উদাহরণ দেন। ২৬০ দিনেরও বেশি সময় ধরে কোনো বন্দরে না থেমে মোতায়েন থাকা এই জাহাজটি সম্প্রতি থাইল্যান্ডে পৌঁছেছে। প্যানেটা বলেন, কোনো পালাবর্তন বা রোটেশন পরিকল্পনা ছাড়া অনির্দিষ্টকালের জন্য সেনাদের যুদ্ধক্ষেত্রে রাখা যায় না। এর ফলে জীবন বাজি রেখে দায়িত্ব পালন করা সেনাসদস্যদের যথাযথ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।