লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৭:৪৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা বেশি, জাতীয় জরিপে উদ্বেগজনক তথ্য

বাংলাদেশের নিম্ন আয়ের পরিবারের তুলনায় উচ্চ আয়ের বা ধনী পরিবারের পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের রক্তে বিষাক্ত সিসার মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেশি পাওয়া গেছে। দেশের ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ওপর পরিচালিত একটি জাতীয় জরিপের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। গবেষণায় দেখা যায়, দেশের এই বয়সসীমার ৩৮ দশমিক ৫ শতাংশ শিশুর রক্তে প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি পরিমাণে সিসা রয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জন শিশুর মধ্যে প্রায় ৩৯ জনের রক্তে নির্ধারিত নিরাপদ সীমার ওপরে সিসার উপস্থিতি রয়েছে।

পরিবারের অর্থনৈতিক সংগতির ভিত্তিতে শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রায় বড় ধরনের বৈষম্য ফুটে উঠেছে। গবেষণায় পরিবারের সম্পদ অনুযায়ী শিশুদের পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, দেশের সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের মধ্যে সিসার উচ্চমাত্রার হার ৩০ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার দাঁড়িয়েছে ৫১ দশমিক ৯ শতাংশে। ধনী ও দরিদ্র—এই দুই শ্রেণির মধ্যে ব্যবধান ২১ দশমিক ৭ শতাংশীয় পয়েন্ট। পরিবারের অর্থনৈতিক শ্রেণি যত ওপরের দিকে উঠেছে, শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার হারও তত বেড়েছে। মায়ের শিক্ষা, ঘরবাড়ির অবস্থা বা বসবাসের এলাকার মতো অন্যান্য আর্থসামাজিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নেওয়ার পরও এই সম্পর্ক অপরিবর্তিত থাকে।

উদ্বেগজনক এই গবেষণাটি চালিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকসের গবেষক সৈয়দ তৌসিক হোসেন ও মো. ইমাম হাসান। তাঁদের গবেষণাপত্রটির শিরোনাম ‘সোশ্যাল প্যাটার্নিং অব এলিভেটেড ব্লাড লিড অ্যামাং চিলড্রেন এজড ১২-৫৯ মান্থস ইন বাংলাদেশ: অ্যা ন্যাশনাল ক্রস-সেকশনাল অ্যানালাইসিস অব মিকস ২০২৫’। চলতি মাসের ১৪ তারিখে এটি চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য গবেষণার অনলাইন প্ল্যাটফর্ম মেডআর্কাইভে প্রকাশিত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) উদ্যোগে ১৮ থেকে ২৪ অক্টোবর পালিত ১৪তম আন্তর্জাতিক সিসা বিষক্রিয়া প্রতিরোধ সপ্তাহের প্রেক্ষাপটে গবেষণাটি প্রকাশ পায়, যার এবারের প্রতিপাদ্য ‘শনাক্তকরণ থেকে প্রতিরোধে’।

গবেষকেরা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত ২০২৫ সালের ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে’ (মিকস) থেকে প্রাপ্ত তথ্য ব্যবহার করেছেন। জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)-এর কারিগরি সহায়তায় পরিচালিত এই মিকস প্রতিবেদনে প্রথমবারের মতো জাতীয় পর্যায়ে অনূর্ধ্ব-পাঁচ শিশুদের রক্তে সিসাসহ ভারী ধাতুর উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়েছিল। জরিপে ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১৮ হাজার ৯০৫ জন শিশুকে বিবেচনায় নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে ১০ হাজার ৬২২ জন শিশুর রক্ত পরীক্ষার ফল পাওয়া যায় এবং পূর্ণাঙ্গ মাল্টিভেরিয়েবল বিশ্লেষণে স্থান পায় ৯ হাজার ৭১৭ জন শিশু। সেখানে প্রতি ডেসিলিটার রক্তে ৫ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি সিসা থাকাকে উচ্চমাত্রা ধরা হয়।

ধনী পরিবারের শিশুদের শরীরে অতিরিক্ত সিসা প্রবেশের সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে গবেষক সৈয়দ তৌসিক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ধনী পরিবারের শিশুরা তুলনামূলক বেশি প্যাকেটজাত খাবার খেয়ে থাকে। এ ছাড়া তাদের ঘরে আসবাব, দেয়ালের রং ও বিভিন্ন পাত্র বা তৈজসপত্রের ব্যবহার বেশি থাকে, যা সিসার সম্ভাব্য উৎস হতে পারে। তবে গবেষণায় এসব উৎস আলাদাভাবে পরীক্ষা করা হয়নি, তাই সরাসরি কোনো সুনির্দিষ্ট পণ্যের কারণে এমনটি হচ্ছে তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। অন্যদিকে বিশিষ্ট শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লা মনে করেন, ধনী পরিবারের শিশুরা বেশি পরিমাণে আমদানি করা খেলনা ও গৃহসজ্জা সামগ্রীর সংস্পর্শে আসে। এ ছাড়া সম্পন্ন পরিবারের শিশুরা পোলট্রির মুরগির মাংস বেশি খায়; আর পোলট্রি খাদ্যে সিসা থাকতে পারে, যা খাবারের মাধ্যমে শিশুর শরীরে ঢুকতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, শিশুদের রক্তে সিসার এমন কোনো মাত্রা নেই যাকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা যাবে। শরীরের রক্তে প্রবেশ করে সিসা মস্তিষ্ক, কিডনি, যকৃৎ ও হাড়ে ছড়িয়ে পড়ে। শিশুবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, শিশুর শরীরে সিসার ক্ষতিকর প্রভাব বাইরে থেকে বা তাৎক্ষণিক উপসর্গ দেখে বোঝা যায় না। সিসার সংস্পর্শ মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত করে এবং অনুভূতি সৃষ্টিকারী স্নায়ুর কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয়, যার ফলে বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা, মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা ও আচরণে স্থায়ী সমস্যা দেখা দেয়। এটি রক্তস্বল্পতা, হিমোগ্লোবিনের মাত্রা হ্রাস, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনির ক্ষতিও করতে পারে। অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা ও অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লা দুজনই জানান, বর্তমানে তাঁদের কাছে স্নায়ুর বিকাশজনিত সমস্যায় আক্রান্ত শিশু আগের চেয়ে বেশি আসছে।

ভৌগোলিক বিন্যাস অনুযায়ী, দেশের বিভাগগুলোর মধ্যেও শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রায় ব্যাপক তারতম্য দেখা গেছে। মিকসের প্রাথমিক উপাত্ত অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগে ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের সর্বোচ্চ ৬৫ দশমিক ২ শতাংশের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা রেকর্ড করা হয়। সিলেটে এই হার ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৪২ দশমিক ১ শতাংশ। অপরদিকে বরিশালে ২৯ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ, রংপুরে ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ, খুলনায় ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ এবং রাজশাহীতে সবচেয়ে কম ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ পাওয়া গেছে। গবেষণার মূল বিশ্লেষণে বরিশালকে তুলনার ভিত্তি ধরলে ঢাকায় ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি এবং রাজশাহীতে কম বলে উঠে আসে।

বাংলাদেশে শিশুদের রক্তে সিসার উপস্থিতি ও এর প্রভাব নিয়ে পূর্বেও উল্লেখযোগ্য গবেষণা হয়েছে। ২০১৬ সালে ‘এনভায়রনমেন্টাল হেলথ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত সিরাজদিখান ও পাবনার ৫২৪ জন শিশুর ওপর করা এক গবেষণায় সিরাজদিখানের শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা বেশি পাওয়া যায় এবং তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক পরীক্ষার স্কোর কম আসে। ২০২০ সালে ‘জার্নাল অব নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডারস’-এ প্রকাশিত ৭৩৪ জন শিশুর ওপর করা অপর এক গবেষণায় দেখা যায়, গর্ভাবস্থায় নাড়ির রক্তে সিসার সংস্পর্শে থাকা অপুষ্টি ও খর্বাকৃতি শিশুদের দুই থেকে তিন বছর বয়সে বুদ্ধিবৃত্তিক স্কোর কমে যায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ২০৩৫ সালের মধ্যে সিসামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শিশুদের সিসা বিষক্রিয়া প্রতিরোধে এখনই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

জনপ্রিয় সংবাদ

সীতাকুণ্ডে প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার পথে ছাত্রীকে কুপিয়ে স্বর্ণালংকার ছিনতাই

ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা বেশি, জাতীয় জরিপে উদ্বেগজনক তথ্য

প্রকাশিত হয়েছে: ০৬:৩৭:১২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশের নিম্ন আয়ের পরিবারের তুলনায় উচ্চ আয়ের বা ধনী পরিবারের পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের রক্তে বিষাক্ত সিসার মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেশি পাওয়া গেছে। দেশের ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ওপর পরিচালিত একটি জাতীয় জরিপের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। গবেষণায় দেখা যায়, দেশের এই বয়সসীমার ৩৮ দশমিক ৫ শতাংশ শিশুর রক্তে প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি পরিমাণে সিসা রয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জন শিশুর মধ্যে প্রায় ৩৯ জনের রক্তে নির্ধারিত নিরাপদ সীমার ওপরে সিসার উপস্থিতি রয়েছে।

পরিবারের অর্থনৈতিক সংগতির ভিত্তিতে শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রায় বড় ধরনের বৈষম্য ফুটে উঠেছে। গবেষণায় পরিবারের সম্পদ অনুযায়ী শিশুদের পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, দেশের সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের মধ্যে সিসার উচ্চমাত্রার হার ৩০ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার দাঁড়িয়েছে ৫১ দশমিক ৯ শতাংশে। ধনী ও দরিদ্র—এই দুই শ্রেণির মধ্যে ব্যবধান ২১ দশমিক ৭ শতাংশীয় পয়েন্ট। পরিবারের অর্থনৈতিক শ্রেণি যত ওপরের দিকে উঠেছে, শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার হারও তত বেড়েছে। মায়ের শিক্ষা, ঘরবাড়ির অবস্থা বা বসবাসের এলাকার মতো অন্যান্য আর্থসামাজিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নেওয়ার পরও এই সম্পর্ক অপরিবর্তিত থাকে।

উদ্বেগজনক এই গবেষণাটি চালিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকসের গবেষক সৈয়দ তৌসিক হোসেন ও মো. ইমাম হাসান। তাঁদের গবেষণাপত্রটির শিরোনাম ‘সোশ্যাল প্যাটার্নিং অব এলিভেটেড ব্লাড লিড অ্যামাং চিলড্রেন এজড ১২-৫৯ মান্থস ইন বাংলাদেশ: অ্যা ন্যাশনাল ক্রস-সেকশনাল অ্যানালাইসিস অব মিকস ২০২৫’। চলতি মাসের ১৪ তারিখে এটি চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য গবেষণার অনলাইন প্ল্যাটফর্ম মেডআর্কাইভে প্রকাশিত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) উদ্যোগে ১৮ থেকে ২৪ অক্টোবর পালিত ১৪তম আন্তর্জাতিক সিসা বিষক্রিয়া প্রতিরোধ সপ্তাহের প্রেক্ষাপটে গবেষণাটি প্রকাশ পায়, যার এবারের প্রতিপাদ্য ‘শনাক্তকরণ থেকে প্রতিরোধে’।

গবেষকেরা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত ২০২৫ সালের ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে’ (মিকস) থেকে প্রাপ্ত তথ্য ব্যবহার করেছেন। জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)-এর কারিগরি সহায়তায় পরিচালিত এই মিকস প্রতিবেদনে প্রথমবারের মতো জাতীয় পর্যায়ে অনূর্ধ্ব-পাঁচ শিশুদের রক্তে সিসাসহ ভারী ধাতুর উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়েছিল। জরিপে ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১৮ হাজার ৯০৫ জন শিশুকে বিবেচনায় নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে ১০ হাজার ৬২২ জন শিশুর রক্ত পরীক্ষার ফল পাওয়া যায় এবং পূর্ণাঙ্গ মাল্টিভেরিয়েবল বিশ্লেষণে স্থান পায় ৯ হাজার ৭১৭ জন শিশু। সেখানে প্রতি ডেসিলিটার রক্তে ৫ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি সিসা থাকাকে উচ্চমাত্রা ধরা হয়।

ধনী পরিবারের শিশুদের শরীরে অতিরিক্ত সিসা প্রবেশের সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে গবেষক সৈয়দ তৌসিক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ধনী পরিবারের শিশুরা তুলনামূলক বেশি প্যাকেটজাত খাবার খেয়ে থাকে। এ ছাড়া তাদের ঘরে আসবাব, দেয়ালের রং ও বিভিন্ন পাত্র বা তৈজসপত্রের ব্যবহার বেশি থাকে, যা সিসার সম্ভাব্য উৎস হতে পারে। তবে গবেষণায় এসব উৎস আলাদাভাবে পরীক্ষা করা হয়নি, তাই সরাসরি কোনো সুনির্দিষ্ট পণ্যের কারণে এমনটি হচ্ছে তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। অন্যদিকে বিশিষ্ট শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লা মনে করেন, ধনী পরিবারের শিশুরা বেশি পরিমাণে আমদানি করা খেলনা ও গৃহসজ্জা সামগ্রীর সংস্পর্শে আসে। এ ছাড়া সম্পন্ন পরিবারের শিশুরা পোলট্রির মুরগির মাংস বেশি খায়; আর পোলট্রি খাদ্যে সিসা থাকতে পারে, যা খাবারের মাধ্যমে শিশুর শরীরে ঢুকতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, শিশুদের রক্তে সিসার এমন কোনো মাত্রা নেই যাকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা যাবে। শরীরের রক্তে প্রবেশ করে সিসা মস্তিষ্ক, কিডনি, যকৃৎ ও হাড়ে ছড়িয়ে পড়ে। শিশুবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, শিশুর শরীরে সিসার ক্ষতিকর প্রভাব বাইরে থেকে বা তাৎক্ষণিক উপসর্গ দেখে বোঝা যায় না। সিসার সংস্পর্শ মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত করে এবং অনুভূতি সৃষ্টিকারী স্নায়ুর কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয়, যার ফলে বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা, মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা ও আচরণে স্থায়ী সমস্যা দেখা দেয়। এটি রক্তস্বল্পতা, হিমোগ্লোবিনের মাত্রা হ্রাস, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনির ক্ষতিও করতে পারে। অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা ও অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লা দুজনই জানান, বর্তমানে তাঁদের কাছে স্নায়ুর বিকাশজনিত সমস্যায় আক্রান্ত শিশু আগের চেয়ে বেশি আসছে।

ভৌগোলিক বিন্যাস অনুযায়ী, দেশের বিভাগগুলোর মধ্যেও শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রায় ব্যাপক তারতম্য দেখা গেছে। মিকসের প্রাথমিক উপাত্ত অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগে ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের সর্বোচ্চ ৬৫ দশমিক ২ শতাংশের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা রেকর্ড করা হয়। সিলেটে এই হার ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৪২ দশমিক ১ শতাংশ। অপরদিকে বরিশালে ২৯ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ, রংপুরে ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ, খুলনায় ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ এবং রাজশাহীতে সবচেয়ে কম ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ পাওয়া গেছে। গবেষণার মূল বিশ্লেষণে বরিশালকে তুলনার ভিত্তি ধরলে ঢাকায় ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি এবং রাজশাহীতে কম বলে উঠে আসে।

বাংলাদেশে শিশুদের রক্তে সিসার উপস্থিতি ও এর প্রভাব নিয়ে পূর্বেও উল্লেখযোগ্য গবেষণা হয়েছে। ২০১৬ সালে ‘এনভায়রনমেন্টাল হেলথ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত সিরাজদিখান ও পাবনার ৫২৪ জন শিশুর ওপর করা এক গবেষণায় সিরাজদিখানের শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা বেশি পাওয়া যায় এবং তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক পরীক্ষার স্কোর কম আসে। ২০২০ সালে ‘জার্নাল অব নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডারস’-এ প্রকাশিত ৭৩৪ জন শিশুর ওপর করা অপর এক গবেষণায় দেখা যায়, গর্ভাবস্থায় নাড়ির রক্তে সিসার সংস্পর্শে থাকা অপুষ্টি ও খর্বাকৃতি শিশুদের দুই থেকে তিন বছর বয়সে বুদ্ধিবৃত্তিক স্কোর কমে যায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ২০৩৫ সালের মধ্যে সিসামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শিশুদের সিসা বিষক্রিয়া প্রতিরোধে এখনই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।