লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৬:২১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কমিউনিস্ট স্লোগান ও বাংলাদেশের রাজনীতির স্লোগানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

রাজনীতির ইতিহাসে স্লোগান কখনো নিছক শব্দ নয়। কখনো তা শ্রেণিসংগ্রামের ভাষা, কখনো গণ-অভ্যুত্থানের আহ্বান, আবার কখনো জাতীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষা হিসেবে আবির্ভূত হয়। প্রতিটি স্লোগানের জন্ম হয় নির্দিষ্ট সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে; সময়ের সঙ্গে তার অর্থ বদলায়, বিস্তৃত হয়, আবার কখনো দলীয় পরিচয়ের গণ্ডিতে আটকে যায়। তাই কমিউনিস্ট ও বামপন্থী রাজনীতির স্লোগান বুঝতে হলে শুধু পরিচিত বাক্য মুখস্থ করলেই চলে না, বুঝতে হয় সেগুলোর পেছনের ইতিহাস ও মতাদর্শ।

কমিউনিস্ট আন্দোলনের সবচেয়ে পরিচিত আন্তর্জাতিক স্লোগান হলো 'দুনিয়ার মজদুর এক হও'। ১৮৪৮ সালে কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের 'কমিউনিস্ট ইশতেহার'-এর শেষ আহ্বানের সঙ্গে এটি যুক্ত। ইংরেজিতে স্লোগানটি 'Workers of the world, unite!' নামে পরিচিত। এর কেন্দ্রীয় বক্তব্য হলো, শ্রমিকের অধিকার ও মুক্তির সংগ্রামকে জাতীয় সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না; পুঁজি যেমন আন্তর্জাতিক, শ্রমিকের সংহতির প্রশ্নটিও তেমন আন্তর্জাতিক। তবে কমিউনিস্ট রাজনীতির ইতিহাস এই একটি স্লোগানে সীমাবদ্ধ নয়। শ্রমিকের সংগঠন, কৃষকের জমির দাবি, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন, পুঁজিবাদী শোষণের বিরোধিতা এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে নানা স্লোগান তৈরি হয়েছে।

'শ্রমিক-কৃষক এক হও' বামপন্থী রাজনীতির একটি বহুল পরিচিত আহ্বান। শ্রমিক ও কৃষকের সামাজিক অবস্থান এক নয় এবং তাঁদের সমস্যা ও স্বার্থেও পার্থক্য রয়েছে। তবু উৎপাদন, শ্রমের মূল্য এবং সম্পদের বণ্টনের প্রশ্নে তাঁদের অভিজ্ঞতার মধ্যে কিছু মিল রয়েছে। এই মিলের ভিত্তিতে ঐক্য গড়ে তোলাই স্লোগানটির রাজনৈতিক তাৎপর্য। বাংলাদেশের বামপন্থী আন্দোলনের ইতিহাসে ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় 'কৃষক শ্রমিক অস্ত্র ধর, জনগণতন্ত্র কায়েম কর' এবং 'মুক্তির এই পথ, সশস্ত্র বিপ্লব'-এর মতো স্লোগান শোনা গেছে। এগুলো সেই সময়ের বিপ্লবী রাজনীতির একটি বিশেষ ধারার পরিচয় বহন করে; সব বামপন্থী দল বা সব কমিউনিস্ট সংগঠনের অভিন্ন অবস্থান হিসেবে এগুলোকে দেখা ঠিক হবে না।

শ্রমিক আন্দোলনের আরেকটি পরিচিত দাবি হলো 'শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি চাই'। এর সঙ্গে যুক্ত হয় নিরাপদ কর্মপরিবেশ, শ্রমঘণ্টা নিয়ন্ত্রণ, সংগঠন করার অধিকার এবং সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। একইভাবে কৃষকের ন্যায্য মূল্য, জমির অধিকার এবং ঋণের বোঝা কমানোর দাবি বামপন্থী রাজনীতির দীর্ঘদিনের আলোচ্য বিষয়। তবে মনে রাখা দরকার, শ্রমিকের অধিকার বা কৃষকের ন্যায্য মূল্য কেবল কমিউনিস্টদের দাবি নয়; বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের সংগঠনও এসব দাবি তুলতে পারে। কোনো দাবি বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেই সেটি একান্ত কমিউনিস্ট স্লোগান হয়ে যায় না।

ভারতীয় উপমহাদেশের বিপ্লবী রাজনীতির বহুল পরিচিত স্লোগান 'ইনকিলাব জিন্দাবাদ'-এর অর্থ হলো বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন বামপন্থী ও বিপ্লবী ধারার রাজনৈতিক কর্মসূচিতে এটি ব্যবহৃত হয়েছে। তবে একে শুধু কমিউনিস্টদের স্লোগান বলা ইতিহাসকে সংকীর্ণ করে দেখা হবে। একইভাবে 'বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক', 'সমাজতন্ত্র দীর্ঘজীবী হোক', 'শোষণমুক্ত সমাজ চাই'-এ ধরনের আহ্বান বামপন্থী রাজনীতির আদর্শগত আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে 'জয় বাংলা' একটি গুরুত্বপূর্ণ স্লোগান, যা বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, স্বাধিকার এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য এবং কমিউনিস্ট আন্দোলনের শ্রেণিভিত্তিক স্লোগান এক বিষয় নয়। মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী ও সংগঠনের অংশগ্রহণ ছিল, কিন্তু সেই অংশগ্রহণের কারণে 'জয় বাংলা'কে কমিউনিস্ট মতাদর্শের নিজস্ব স্লোগান বলা যায় না। আবার কোনো নির্দিষ্ট দল দীর্ঘদিন স্লোগানটি ব্যবহার করেছে বলেই তার ঐতিহাসিক অর্থকে শুধু দলীয় পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করাও যথার্থ নয়।

মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সভা-সমাবেশে ব্যবহৃত 'ভোটের আগে ভাত চাই' স্লোগানটি রাজনৈতিক অধিকার ও অর্থনৈতিক অধিকারের সম্পর্ককে সামনে আনে। কমিউনিস্ট ও বামপন্থী রাজনীতির সামনে আজও একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে: স্লোগানের বক্তব্য বাস্তব জীবনে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে? শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, কৃষকের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির প্রশ্নে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর কাজের মধ্য দিয়েই তাদের আদর্শের বাস্তবতা যাচাই করা যায়।

জনপ্রিয় সংবাদ

কমিউনিস্ট স্লোগান ও বাংলাদেশের রাজনীতির স্লোগানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

কমিউনিস্ট স্লোগান ও বাংলাদেশের রাজনীতির স্লোগানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

প্রকাশিত হয়েছে: ১১:৩১:২৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

রাজনীতির ইতিহাসে স্লোগান কখনো নিছক শব্দ নয়। কখনো তা শ্রেণিসংগ্রামের ভাষা, কখনো গণ-অভ্যুত্থানের আহ্বান, আবার কখনো জাতীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষা হিসেবে আবির্ভূত হয়। প্রতিটি স্লোগানের জন্ম হয় নির্দিষ্ট সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে; সময়ের সঙ্গে তার অর্থ বদলায়, বিস্তৃত হয়, আবার কখনো দলীয় পরিচয়ের গণ্ডিতে আটকে যায়। তাই কমিউনিস্ট ও বামপন্থী রাজনীতির স্লোগান বুঝতে হলে শুধু পরিচিত বাক্য মুখস্থ করলেই চলে না, বুঝতে হয় সেগুলোর পেছনের ইতিহাস ও মতাদর্শ।

কমিউনিস্ট আন্দোলনের সবচেয়ে পরিচিত আন্তর্জাতিক স্লোগান হলো 'দুনিয়ার মজদুর এক হও'। ১৮৪৮ সালে কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের 'কমিউনিস্ট ইশতেহার'-এর শেষ আহ্বানের সঙ্গে এটি যুক্ত। ইংরেজিতে স্লোগানটি 'Workers of the world, unite!' নামে পরিচিত। এর কেন্দ্রীয় বক্তব্য হলো, শ্রমিকের অধিকার ও মুক্তির সংগ্রামকে জাতীয় সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না; পুঁজি যেমন আন্তর্জাতিক, শ্রমিকের সংহতির প্রশ্নটিও তেমন আন্তর্জাতিক। তবে কমিউনিস্ট রাজনীতির ইতিহাস এই একটি স্লোগানে সীমাবদ্ধ নয়। শ্রমিকের সংগঠন, কৃষকের জমির দাবি, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন, পুঁজিবাদী শোষণের বিরোধিতা এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে নানা স্লোগান তৈরি হয়েছে।

'শ্রমিক-কৃষক এক হও' বামপন্থী রাজনীতির একটি বহুল পরিচিত আহ্বান। শ্রমিক ও কৃষকের সামাজিক অবস্থান এক নয় এবং তাঁদের সমস্যা ও স্বার্থেও পার্থক্য রয়েছে। তবু উৎপাদন, শ্রমের মূল্য এবং সম্পদের বণ্টনের প্রশ্নে তাঁদের অভিজ্ঞতার মধ্যে কিছু মিল রয়েছে। এই মিলের ভিত্তিতে ঐক্য গড়ে তোলাই স্লোগানটির রাজনৈতিক তাৎপর্য। বাংলাদেশের বামপন্থী আন্দোলনের ইতিহাসে ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় 'কৃষক শ্রমিক অস্ত্র ধর, জনগণতন্ত্র কায়েম কর' এবং 'মুক্তির এই পথ, সশস্ত্র বিপ্লব'-এর মতো স্লোগান শোনা গেছে। এগুলো সেই সময়ের বিপ্লবী রাজনীতির একটি বিশেষ ধারার পরিচয় বহন করে; সব বামপন্থী দল বা সব কমিউনিস্ট সংগঠনের অভিন্ন অবস্থান হিসেবে এগুলোকে দেখা ঠিক হবে না।

শ্রমিক আন্দোলনের আরেকটি পরিচিত দাবি হলো 'শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি চাই'। এর সঙ্গে যুক্ত হয় নিরাপদ কর্মপরিবেশ, শ্রমঘণ্টা নিয়ন্ত্রণ, সংগঠন করার অধিকার এবং সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। একইভাবে কৃষকের ন্যায্য মূল্য, জমির অধিকার এবং ঋণের বোঝা কমানোর দাবি বামপন্থী রাজনীতির দীর্ঘদিনের আলোচ্য বিষয়। তবে মনে রাখা দরকার, শ্রমিকের অধিকার বা কৃষকের ন্যায্য মূল্য কেবল কমিউনিস্টদের দাবি নয়; বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের সংগঠনও এসব দাবি তুলতে পারে। কোনো দাবি বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেই সেটি একান্ত কমিউনিস্ট স্লোগান হয়ে যায় না।

ভারতীয় উপমহাদেশের বিপ্লবী রাজনীতির বহুল পরিচিত স্লোগান 'ইনকিলাব জিন্দাবাদ'-এর অর্থ হলো বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন বামপন্থী ও বিপ্লবী ধারার রাজনৈতিক কর্মসূচিতে এটি ব্যবহৃত হয়েছে। তবে একে শুধু কমিউনিস্টদের স্লোগান বলা ইতিহাসকে সংকীর্ণ করে দেখা হবে। একইভাবে 'বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক', 'সমাজতন্ত্র দীর্ঘজীবী হোক', 'শোষণমুক্ত সমাজ চাই'-এ ধরনের আহ্বান বামপন্থী রাজনীতির আদর্শগত আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে 'জয় বাংলা' একটি গুরুত্বপূর্ণ স্লোগান, যা বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, স্বাধিকার এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য এবং কমিউনিস্ট আন্দোলনের শ্রেণিভিত্তিক স্লোগান এক বিষয় নয়। মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী ও সংগঠনের অংশগ্রহণ ছিল, কিন্তু সেই অংশগ্রহণের কারণে 'জয় বাংলা'কে কমিউনিস্ট মতাদর্শের নিজস্ব স্লোগান বলা যায় না। আবার কোনো নির্দিষ্ট দল দীর্ঘদিন স্লোগানটি ব্যবহার করেছে বলেই তার ঐতিহাসিক অর্থকে শুধু দলীয় পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করাও যথার্থ নয়।

মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সভা-সমাবেশে ব্যবহৃত 'ভোটের আগে ভাত চাই' স্লোগানটি রাজনৈতিক অধিকার ও অর্থনৈতিক অধিকারের সম্পর্ককে সামনে আনে। কমিউনিস্ট ও বামপন্থী রাজনীতির সামনে আজও একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে: স্লোগানের বক্তব্য বাস্তব জীবনে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে? শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, কৃষকের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির প্রশ্নে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর কাজের মধ্য দিয়েই তাদের আদর্শের বাস্তবতা যাচাই করা যায়।