লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৩:৪৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসলামি শরিয়তে হালাল উপার্জনের গুরুত্ব ও এর প্রভাব

আল্লাহতায়ালা মানবজাতিকে হালাল উপার্জন এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণের কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ১৬৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, 'হে মানবজাতি! তোমরা পৃথিবীর হালাল ও পবিত্র বস্তু আহার কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না। নিঃসন্দেহে সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।' ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, উপার্জনের উৎস যেমন বৈধ হতে হবে, তেমনি দান-সদকার ক্ষেত্রেও হালাল অর্থ ব্যবহার করা অপরিহার্য। কারণ, আল্লাহ কেবল মুত্তাকি বা পরহেজগারদের নেক আমল কবুল করেন, যেমনটি সুরা মায়িদার ২৭ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে।

উপার্জিত অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে ইসলামের একটি সুনির্দিষ্ট নীতি রয়েছে। একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো, প্রথমে নিজের ও পরিবার-পরিজনের অন্ন-বস্ত্রের সংস্থান করা। এরপর যদি উদ্বৃত্ত অর্থ থাকে, তবেই তা অসহায় ও দুস্থদের জন্য ব্যয় করা উচিত। সুরা বাকারার ২১৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট করেছেন যে, মানুষ যখন অতিরিক্ত ও উদ্বৃত্ত অর্থ দান করে, তখনই তা তার জন্য কল্যাণকর। যদি হালাল উপার্জনের পর নিজের ও পরিবারের প্রয়োজনে কিছুই অবশিষ্ট না থাকে, তবে অন্যের জন্য ব্যয় করা জরুরি নয়।

হারাম সম্পদ দিয়ে কোনো ধরনের ব্যয় বা দান করলে তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। রাসুল (সা.)-এর হাদিস অনুযায়ী, আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্র ও হালাল বস্তু ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করেন না। রাসুল (সা.) আরও সতর্ক করেছেন যে, এমন ব্যক্তিও থাকতে পারে যে দীর্ঘ সফরের ক্লান্তিতে ধুলি ধূসরিত হয়ে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে, অথচ তার খাদ্য, পানীয় ও পোশাক হারাম। এমন ব্যক্তির দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

অবৈধ উপার্জনের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করা প্রতারণার শামিল, যা ইসলামের দৃষ্টিতে কবিরা গোনাহ। প্রতারণা করে বা অন্যের অধিকার হরণ করে উপার্জিত অর্থ কেবল নৈতিক স্খলনই নয়, বরং দেশের আইনের দৃষ্টিতেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। পরকালে এ বিষয়ে কঠোর জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে। তিরমিজি শরিফের হাদিসে উল্লেখ আছে, কেয়ামতের দিন প্রতিটি মানুষ চারটি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এক কদমও নড়তে পারবে না, যার মধ্যে অন্যতম হলো—তার সম্পদ কোথা থেকে এসেছে এবং কোথায় ব্যয় হয়েছে।

হারাম অর্থ ব্যয় করলে কবুল হয় না : হারাম সম্পদ থেকে অর্থ ব্যয় করলে তা কবুল হবে না। কেননা, আল্লাহতায়ালা পবিত্র। তিনি শুধু পবিত্র বস্তু কবুল করেন। আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত; রাসুল (সা.) বলেন, 'আল্লাহতায়ালা পবিত্র; তিনি পবিত্র ও হালাল বস্তু ছাড়া গ্রহণ করেন না। আর আল্লাহতায়ালা তাঁর প্রেরিত রাসুলদের যে নির্দেশ দিয়েছেন, মোমিনদেরও সে আদেশ করেছেন।' আল্লাহতায়ালা বলেন, 'হে রাসুলগণ! তোমরা পবিত্র ও হালাল জিনিস আহার কর এবং ভালো কাজ কর। আমি তোমাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে অবগত।' (সুরা মোমিনুন : ৫১)। আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, 'তোমরা যারা ঈমান এনেছ, আমি তোমাদের যেসব পবিত্র জিনিস রিজিক হিসেবে দিয়েছি, তা থেকে খাও।' (সুরা বাকারা : ১৭২)। এরপর রাসুল (সা.) এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, সে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত দীর্ঘ সফর করে। ফলে ধুলি ধূসরিত রুক্ষ্ম কেশধারী হয়ে পড়ে। অতঃপর সে আকাশের দিকে হাত তুলে বলে, 'হে আমার রব!' অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পরিধেয় বস্ত্র হারাম এবং আহার্যও হারাম। কাজেই এমন ব্যক্তির দোয়া তিনি কী করে কবুল করতে পারেন? (মুসলিম : ২২৩৬)।

অবৈধ উপার্জনের জন্য জবাব দিতে হবে : হারাম সম্পদ থেকে অর্থ ব্যয় করলে পরকালে এর সুফল পাওয়া যাবে না। কেননা, এটি এক ধরনের প্রতারণা। ইসলামের দৃষ্টিতে ধোঁকাবাজি বা প্রতারণা করা কবিরা গোনাহ। রাসুল (সা.) বলেন, 'যে আমাদের ধোঁকা দেয়, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।' (মুসলিম : ১০১)। হারাম উপার্জন করা প্রচলিত আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সুতরাং কেউ যদি প্রতারণার মাধ্যমে কারও অর্থ আত্মসাৎ করে, তাহলে তার অপরাধ তিনটি। যথা— ১. প্রতারণা ও অনৈতিক কাজ; ২. অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস, যা হক্কুল ইবাদ বা মানুষের অধিকার হরণের শামিল; ৩. প্রতারণা করার মাধ্যমে দেশের আইন লঙ্ঘন। আর অবৈধ উপার্জনের জন্য অবশ্যই কেয়ামতের দিন জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে। রাসুল (সা.) বলেন, 'কেয়ামতের দিন কোনো মানুষ নিজের স্থান থেকে এক বিন্দুও সরতে পারবে না, যতক্ষণ না তার কাছ থেকে চারটি প্রশ্নের জবাব নিয়ে নেওয়া হবে। তার একটি প্রশ্ন হচ্ছে, নিজের ধন-সম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করেছে এবং কোথায় ব্যয় করেছে?' (তিরমিজি : ২৪১৭)।

জনপ্রিয় সংবাদ

আদাবরে রামদা-চাপাতি নিয়ে বাড়ি দখলের চেষ্টা, আতঙ্কে ভুক্তভোগী পরিবার

ইসলামি শরিয়তে হালাল উপার্জনের গুরুত্ব ও এর প্রভাব

প্রকাশিত হয়েছে: ০৫:৩১:১৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আল্লাহতায়ালা মানবজাতিকে হালাল উপার্জন এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণের কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ১৬৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, 'হে মানবজাতি! তোমরা পৃথিবীর হালাল ও পবিত্র বস্তু আহার কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না। নিঃসন্দেহে সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।' ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, উপার্জনের উৎস যেমন বৈধ হতে হবে, তেমনি দান-সদকার ক্ষেত্রেও হালাল অর্থ ব্যবহার করা অপরিহার্য। কারণ, আল্লাহ কেবল মুত্তাকি বা পরহেজগারদের নেক আমল কবুল করেন, যেমনটি সুরা মায়িদার ২৭ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে।

উপার্জিত অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে ইসলামের একটি সুনির্দিষ্ট নীতি রয়েছে। একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো, প্রথমে নিজের ও পরিবার-পরিজনের অন্ন-বস্ত্রের সংস্থান করা। এরপর যদি উদ্বৃত্ত অর্থ থাকে, তবেই তা অসহায় ও দুস্থদের জন্য ব্যয় করা উচিত। সুরা বাকারার ২১৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট করেছেন যে, মানুষ যখন অতিরিক্ত ও উদ্বৃত্ত অর্থ দান করে, তখনই তা তার জন্য কল্যাণকর। যদি হালাল উপার্জনের পর নিজের ও পরিবারের প্রয়োজনে কিছুই অবশিষ্ট না থাকে, তবে অন্যের জন্য ব্যয় করা জরুরি নয়।

হারাম সম্পদ দিয়ে কোনো ধরনের ব্যয় বা দান করলে তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। রাসুল (সা.)-এর হাদিস অনুযায়ী, আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্র ও হালাল বস্তু ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করেন না। রাসুল (সা.) আরও সতর্ক করেছেন যে, এমন ব্যক্তিও থাকতে পারে যে দীর্ঘ সফরের ক্লান্তিতে ধুলি ধূসরিত হয়ে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে, অথচ তার খাদ্য, পানীয় ও পোশাক হারাম। এমন ব্যক্তির দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

অবৈধ উপার্জনের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করা প্রতারণার শামিল, যা ইসলামের দৃষ্টিতে কবিরা গোনাহ। প্রতারণা করে বা অন্যের অধিকার হরণ করে উপার্জিত অর্থ কেবল নৈতিক স্খলনই নয়, বরং দেশের আইনের দৃষ্টিতেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। পরকালে এ বিষয়ে কঠোর জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে। তিরমিজি শরিফের হাদিসে উল্লেখ আছে, কেয়ামতের দিন প্রতিটি মানুষ চারটি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এক কদমও নড়তে পারবে না, যার মধ্যে অন্যতম হলো—তার সম্পদ কোথা থেকে এসেছে এবং কোথায় ব্যয় হয়েছে।

হারাম অর্থ ব্যয় করলে কবুল হয় না : হারাম সম্পদ থেকে অর্থ ব্যয় করলে তা কবুল হবে না। কেননা, আল্লাহতায়ালা পবিত্র। তিনি শুধু পবিত্র বস্তু কবুল করেন। আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত; রাসুল (সা.) বলেন, 'আল্লাহতায়ালা পবিত্র; তিনি পবিত্র ও হালাল বস্তু ছাড়া গ্রহণ করেন না। আর আল্লাহতায়ালা তাঁর প্রেরিত রাসুলদের যে নির্দেশ দিয়েছেন, মোমিনদেরও সে আদেশ করেছেন।' আল্লাহতায়ালা বলেন, 'হে রাসুলগণ! তোমরা পবিত্র ও হালাল জিনিস আহার কর এবং ভালো কাজ কর। আমি তোমাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে অবগত।' (সুরা মোমিনুন : ৫১)। আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, 'তোমরা যারা ঈমান এনেছ, আমি তোমাদের যেসব পবিত্র জিনিস রিজিক হিসেবে দিয়েছি, তা থেকে খাও।' (সুরা বাকারা : ১৭২)। এরপর রাসুল (সা.) এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, সে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত দীর্ঘ সফর করে। ফলে ধুলি ধূসরিত রুক্ষ্ম কেশধারী হয়ে পড়ে। অতঃপর সে আকাশের দিকে হাত তুলে বলে, 'হে আমার রব!' অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পরিধেয় বস্ত্র হারাম এবং আহার্যও হারাম। কাজেই এমন ব্যক্তির দোয়া তিনি কী করে কবুল করতে পারেন? (মুসলিম : ২২৩৬)।

অবৈধ উপার্জনের জন্য জবাব দিতে হবে : হারাম সম্পদ থেকে অর্থ ব্যয় করলে পরকালে এর সুফল পাওয়া যাবে না। কেননা, এটি এক ধরনের প্রতারণা। ইসলামের দৃষ্টিতে ধোঁকাবাজি বা প্রতারণা করা কবিরা গোনাহ। রাসুল (সা.) বলেন, 'যে আমাদের ধোঁকা দেয়, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।' (মুসলিম : ১০১)। হারাম উপার্জন করা প্রচলিত আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সুতরাং কেউ যদি প্রতারণার মাধ্যমে কারও অর্থ আত্মসাৎ করে, তাহলে তার অপরাধ তিনটি। যথা— ১. প্রতারণা ও অনৈতিক কাজ; ২. অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস, যা হক্কুল ইবাদ বা মানুষের অধিকার হরণের শামিল; ৩. প্রতারণা করার মাধ্যমে দেশের আইন লঙ্ঘন। আর অবৈধ উপার্জনের জন্য অবশ্যই কেয়ামতের দিন জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে। রাসুল (সা.) বলেন, 'কেয়ামতের দিন কোনো মানুষ নিজের স্থান থেকে এক বিন্দুও সরতে পারবে না, যতক্ষণ না তার কাছ থেকে চারটি প্রশ্নের জবাব নিয়ে নেওয়া হবে। তার একটি প্রশ্ন হচ্ছে, নিজের ধন-সম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করেছে এবং কোথায় ব্যয় করেছে?' (তিরমিজি : ২৪১৭)।