লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৯:২৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হালাল উপার্জন: ইবাদত কবুল ও মানসিক প্রশান্তির অলঙ্ঘনীয় শর্ত

মোমিন জীবনে ইবাদত কবুল হওয়া এবং ইহ-পরকালীন কল্যাণ লাভের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো হালাল উপার্জন। ইসলামে নামাজ, রোজা, হজ বা জাকাতের মতো ইবাদতগুলো যেভাবে ফরজ করা হয়েছে, তেমনি বৈধ পন্থায় জীবিকা নির্বাহ করাকেও একটি অলঙ্ঘনীয় ফরজ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে—ব্যবসা-বাণিজ্য, পোশাক-পরিচ্ছদ, খাদ্য-পানীয় ও বাসস্থান—হালালকে গ্রহণ করা এবং সন্দেহযুক্ত বিষয় থেকে দূরে থাকা আবশ্যক।

শরিয়তের পরিভাষায় যা কিছু অনুমোদিত ও নিষেধাজ্ঞামুক্ত, তা-ই হালাল। আর যা স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ, তা হারাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) হালাল-হারামের পরিধি স্পষ্ট করে বলেছেন, আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাবে যা হালাল করেছেন তা হালাল এবং যা হারাম করেছেন তা হারাম; আর যে বিষয়ে তিনি নীরব থেকেছেন, তা ক্ষমা হিসেবে গণ্য (তিরমিজি: ১৭২৬)। কোনো বস্তু হালাল হওয়ার জন্য দুটি শর্ত রয়েছে—প্রথমত, বস্তুটি নিজে পবিত্র হতে হবে এবং দ্বিতীয়ত, তা অর্জনের মাধ্যমটিও বৈধ হতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, মানুষ খাবারের ক্ষেত্রে হালাল-হারাম বাছবিচার করলেও উপার্জনের উৎসের দিকে খেয়াল রাখে না, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

সুখময় ও মানসিক প্রশান্তিময় জীবন গঠনে হালাল রিজিকের কোনো বিকল্প নেই। মুসনাদে আহমদের (৬৬৫২) একটি হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, আমানত রক্ষা, সত্য বলা, সুন্দর চরিত্র এবং হালাল খাবার—এই চারটি গুণ থাকলে দুনিয়ার অন্য কিছু না থাকলেও কোনো ক্ষতি নেই। এ কারণে প্রত্যেক মুসলিমের জন্য নিজ নিজ কর্মক্ষেত্র ও অবস্থা অনুযায়ী হালাল-হারামের মৌলিক জ্ঞান অর্জন করা ফরজ, যাকে শরিয়তের পরিভাষায় 'ইলমুল হাল' বলা হয়। এ বিষয়ে আহমদ বিন আহমদ মুহাম্মদ আবদুল্লাহ (রহ.) বলেছেন, হারাম-হালালের জ্ঞান রাখা আবশ্যক যাতে মানুষ নিষিদ্ধ কাজে পতিত না হয় এবং দ্বীনের নিয়মের বিরোধিতা না করে।

পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারার ১৬৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ মানবজাতিকে জমিন থেকে হালাল ও পবিত্র বস্তু ভক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে নিষেধ করেছেন। ইমাম কুরতুবি (রহ.) তাঁর তাফসিরে উল্লেখ করেছেন, সাহল বিন আবদুল্লাহ (রহ.)-এর মতে মুক্তি পাওয়ার তিনটি উপায়ের একটি হলো হালাল খাবার গ্রহণ। অন্যদিকে সাঈদ বিন ইয়াজিদ (রহ.) আমল কবুল ও পরিপূর্ণ হওয়ার জন্য পাঁচটি গুণের কথা বলেছেন। তা হলো, আল্লাহর প্রতি ঈমান, সত্যের পরিচয় লাভ, আল্লাহর জন্য ইখলাসপূর্ণ আমল, সুন্নাহ মোতাবেক জীবনযাপন ও হালাল খাদ্য গ্রহণ। আর এর একটিও নষ্ট হলে আমল কবুল হবে না।' (তাফসিরে কুরতুবি : ২/২০৮)। কারণ, কেউ যদি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে; কিন্তু সত্যের পরিচয় তার সামনে স্পষ্ট না থাকে, ঈমান দ্বারা সে যথাযথ উপকৃত হতে পারবে না। সত্যের পরিচয় পেল, কিন্তু ঈমান আনল না; সেও পথভ্রষ্ট। ঈমান আনল, সত্যও চিনল, কিন্তু আমলে ইখলাস নেই; সেও প্রবঞ্চিত। আগের চারটি বিদ্যমান; কিন্তু খাবার হালাল নয়, তার ইবাদতও কোনো কাজে আসবে না। হালাল উপার্জন অন্যতম ফরজ ইবাদত। হাদিস শরিফে রাসুল (সা.) বলেন, 'হালাল জীবিকা সন্ধান করা নির্ধারিত ফরজসমূহের পরে বিশেষ একটি ফরজ।' (সুনানে বায়হাকি : ৬/১২৮)।

ইবাদত ও দোয়া কবুল হওয়ার প্রধান পূর্বশর্ত হলো হালাল রিজিক। তিনি মোমিনদেরও সেই আদেশ করেছেন, কোরআনে যে আদেশ করেছেন তার রাসুলদের। আল্লাহতায়ালা বলেন, 'হে রাসুলগণ! পবিত্র বস্তু ভক্ষণ কর ও সৎকর্ম কর।' (সুরা মোমিনুন : ৫১)। ঈমানদারদের লক্ষ্য করে তিনি বলেন, 'হে মোমিনরা! আমার দেওয়া রিজিক থেকে পবিত্র বস্তু ভক্ষণ কর।' (সুরা বাকারা : ১৭২)। শত কষ্ট করে নামাজ, রোজা বা হজের মতো ইবাদত করলেও উপার্জন হারাম হলে তা আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। সহিহ মুসলিমের (১০১৫) একটি হাদিসে রাসুল (সা.) এক ধূলিমলিন মুসাফিরের উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, যে ব্যক্তি দুই হাত তুলে ব্যাকুল হয়ে ডাকছে কিন্তু তার খাদ্য, পানীয় ও পোশাক হারাম উপার্জনের, তার দোয়া কীভাবে কবুল হতে পারে? হালাল খাবার মানুষের মন-মেজাজ ও আচরণে গভীর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে; এটি অন্তরে তাকওয়া সৃষ্টি করে, ইবাদতে একাগ্রতা আনে এবং পারিবারিক জীবনে অশান্তি দূর করে।

জনপ্রিয় সংবাদ

২০৩০ সাল পর্যন্ত বার্সেলোনায় থাকছেন মিশরীয় ফরোয়ার্ড হামজা

হালাল উপার্জন: ইবাদত কবুল ও মানসিক প্রশান্তির অলঙ্ঘনীয় শর্ত

প্রকাশিত হয়েছে: ০২:৪৬:০৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মোমিন জীবনে ইবাদত কবুল হওয়া এবং ইহ-পরকালীন কল্যাণ লাভের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো হালাল উপার্জন। ইসলামে নামাজ, রোজা, হজ বা জাকাতের মতো ইবাদতগুলো যেভাবে ফরজ করা হয়েছে, তেমনি বৈধ পন্থায় জীবিকা নির্বাহ করাকেও একটি অলঙ্ঘনীয় ফরজ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে—ব্যবসা-বাণিজ্য, পোশাক-পরিচ্ছদ, খাদ্য-পানীয় ও বাসস্থান—হালালকে গ্রহণ করা এবং সন্দেহযুক্ত বিষয় থেকে দূরে থাকা আবশ্যক।

শরিয়তের পরিভাষায় যা কিছু অনুমোদিত ও নিষেধাজ্ঞামুক্ত, তা-ই হালাল। আর যা স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ, তা হারাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) হালাল-হারামের পরিধি স্পষ্ট করে বলেছেন, আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাবে যা হালাল করেছেন তা হালাল এবং যা হারাম করেছেন তা হারাম; আর যে বিষয়ে তিনি নীরব থেকেছেন, তা ক্ষমা হিসেবে গণ্য (তিরমিজি: ১৭২৬)। কোনো বস্তু হালাল হওয়ার জন্য দুটি শর্ত রয়েছে—প্রথমত, বস্তুটি নিজে পবিত্র হতে হবে এবং দ্বিতীয়ত, তা অর্জনের মাধ্যমটিও বৈধ হতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, মানুষ খাবারের ক্ষেত্রে হালাল-হারাম বাছবিচার করলেও উপার্জনের উৎসের দিকে খেয়াল রাখে না, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

সুখময় ও মানসিক প্রশান্তিময় জীবন গঠনে হালাল রিজিকের কোনো বিকল্প নেই। মুসনাদে আহমদের (৬৬৫২) একটি হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, আমানত রক্ষা, সত্য বলা, সুন্দর চরিত্র এবং হালাল খাবার—এই চারটি গুণ থাকলে দুনিয়ার অন্য কিছু না থাকলেও কোনো ক্ষতি নেই। এ কারণে প্রত্যেক মুসলিমের জন্য নিজ নিজ কর্মক্ষেত্র ও অবস্থা অনুযায়ী হালাল-হারামের মৌলিক জ্ঞান অর্জন করা ফরজ, যাকে শরিয়তের পরিভাষায় 'ইলমুল হাল' বলা হয়। এ বিষয়ে আহমদ বিন আহমদ মুহাম্মদ আবদুল্লাহ (রহ.) বলেছেন, হারাম-হালালের জ্ঞান রাখা আবশ্যক যাতে মানুষ নিষিদ্ধ কাজে পতিত না হয় এবং দ্বীনের নিয়মের বিরোধিতা না করে।

পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারার ১৬৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ মানবজাতিকে জমিন থেকে হালাল ও পবিত্র বস্তু ভক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে নিষেধ করেছেন। ইমাম কুরতুবি (রহ.) তাঁর তাফসিরে উল্লেখ করেছেন, সাহল বিন আবদুল্লাহ (রহ.)-এর মতে মুক্তি পাওয়ার তিনটি উপায়ের একটি হলো হালাল খাবার গ্রহণ। অন্যদিকে সাঈদ বিন ইয়াজিদ (রহ.) আমল কবুল ও পরিপূর্ণ হওয়ার জন্য পাঁচটি গুণের কথা বলেছেন। তা হলো, আল্লাহর প্রতি ঈমান, সত্যের পরিচয় লাভ, আল্লাহর জন্য ইখলাসপূর্ণ আমল, সুন্নাহ মোতাবেক জীবনযাপন ও হালাল খাদ্য গ্রহণ। আর এর একটিও নষ্ট হলে আমল কবুল হবে না।' (তাফসিরে কুরতুবি : ২/২০৮)। কারণ, কেউ যদি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে; কিন্তু সত্যের পরিচয় তার সামনে স্পষ্ট না থাকে, ঈমান দ্বারা সে যথাযথ উপকৃত হতে পারবে না। সত্যের পরিচয় পেল, কিন্তু ঈমান আনল না; সেও পথভ্রষ্ট। ঈমান আনল, সত্যও চিনল, কিন্তু আমলে ইখলাস নেই; সেও প্রবঞ্চিত। আগের চারটি বিদ্যমান; কিন্তু খাবার হালাল নয়, তার ইবাদতও কোনো কাজে আসবে না। হালাল উপার্জন অন্যতম ফরজ ইবাদত। হাদিস শরিফে রাসুল (সা.) বলেন, 'হালাল জীবিকা সন্ধান করা নির্ধারিত ফরজসমূহের পরে বিশেষ একটি ফরজ।' (সুনানে বায়হাকি : ৬/১২৮)।

ইবাদত ও দোয়া কবুল হওয়ার প্রধান পূর্বশর্ত হলো হালাল রিজিক। তিনি মোমিনদেরও সেই আদেশ করেছেন, কোরআনে যে আদেশ করেছেন তার রাসুলদের। আল্লাহতায়ালা বলেন, 'হে রাসুলগণ! পবিত্র বস্তু ভক্ষণ কর ও সৎকর্ম কর।' (সুরা মোমিনুন : ৫১)। ঈমানদারদের লক্ষ্য করে তিনি বলেন, 'হে মোমিনরা! আমার দেওয়া রিজিক থেকে পবিত্র বস্তু ভক্ষণ কর।' (সুরা বাকারা : ১৭২)। শত কষ্ট করে নামাজ, রোজা বা হজের মতো ইবাদত করলেও উপার্জন হারাম হলে তা আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। সহিহ মুসলিমের (১০১৫) একটি হাদিসে রাসুল (সা.) এক ধূলিমলিন মুসাফিরের উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, যে ব্যক্তি দুই হাত তুলে ব্যাকুল হয়ে ডাকছে কিন্তু তার খাদ্য, পানীয় ও পোশাক হারাম উপার্জনের, তার দোয়া কীভাবে কবুল হতে পারে? হালাল খাবার মানুষের মন-মেজাজ ও আচরণে গভীর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে; এটি অন্তরে তাকওয়া সৃষ্টি করে, ইবাদতে একাগ্রতা আনে এবং পারিবারিক জীবনে অশান্তি দূর করে।