লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১১:৫৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারত সফর ও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির নতুন সমীকরণ

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন ভারত সফর নিয়ে তৈরি হওয়া কূটনৈতিক অনিশ্চয়তা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সফরটি আদৌ হবে কি না, হলে কবে হবে অথবা কোন পরিস্থিতিতে হবে—এসবের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, এই ঘটনাপ্রবাহ দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতা ও আঞ্চলিক শক্তি-সমীকরণ সম্পর্কে কী বার্তা বহন করছে। এই সফর কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক কর্মসূচির প্রশ্ন নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, চলমান বিচার প্রক্রিয়া, ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের কৌশলগত বাস্তবতা।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পর সৃষ্ট নতুন পরিস্থিতি উভয় দেশকেই নিজেদের অবস্থান পুনর্মূল্যায়নে বাধ্য করছে। বিশেষত শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাঁকে প্রত্যর্পণের বাংলাদেশি দাবি সম্পর্কের একটি সংবেদনশীল মাত্রা যোগ করেছে। এ বিষয়ে দুই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। বাংলাদেশের একাংশের মতে, শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া এবং তাঁকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পরোক্ষ প্রভাব বিস্তারের শামিল। অন্যদিকে ভারতের অবস্থান হলো, বিষয়টি মানবিক ও আইনগত, যা আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তির শর্তাবলি অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। এই মতপার্থক্যই বর্তমান সম্পর্কের জটিলতার কেন্দ্রবিন্দু।

বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল শেখ হাসিনা ইস্যুতে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে সমান গুরুত্ব বহন করে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। দলটির ওপর নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রত্যাবর্তন এবং চলমান বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে দেশে-বিদেশে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান রয়েছে। ভারতের নীতিনির্ধারক মহলের একটি অংশ মনে করে, দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে রাখা প্রয়োজন। বিপরীতে বাংলাদেশের অনেক রাজনৈতিক শক্তি ও নাগরিক সমাজের মতে, বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই রাজনৈতিক পুনর্বাসনের কথা বলা ন্যায়বিচারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই দুই অবস্থানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষাই এখন দুই দেশের কূটনীতির বড় চ্যালেঞ্জ।

ভারত কি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করতে চায়, নাকি কেবল একটি স্থিতিশীল প্রতিবেশী রাষ্ট্র দেখতে চায়—এই প্রশ্নের সরল উত্তর নেই। রাষ্ট্রসমূহ সাধারণত আদর্শিক বিবেচনার চেয়ে কৌশলগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে সংযোগ, সীমান্ত নিরাপত্তা, আঞ্চলিক বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক সামুদ্রিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গুরুত্ব অপরিসীম। তবে বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ না করার আন্তর্জাতিক নীতিও দিল্লির নীতিনির্ধারণে গুরুত্ব পাওয়ার কথা।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ঐতিহাসিকভাবেই ভারসাম্যমুখী। 'সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়'—এই নীতির ভিত্তিতে দেশটি ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। বর্তমান পরিস্থিতিকে নতুন কোনো পররাষ্ট্রনীতি হিসেবে না দেখে, বরং পরিবর্তিত বাস্তবতায় পুরোনো নীতির নতুন প্রয়োগ হিসেবে দেখাই যুক্তিসঙ্গত। এই সমীকরণে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। এই প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি ও সুযোগ উভয়ই তৈরি করেছে।

প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফরটি অনুষ্ঠিত হলে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, সীমান্ত নিরাপত্তা, পানি বণ্টন, বাণিজ্য, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হতে পারে। এটি দুই দেশের আস্থার ঘাটতি কমানোর সুযোগও তৈরি করতে পারে। বিপরীতভাবে, সফর না হলে বা অনির্দিষ্টকাল পিছিয়ে গেলে সম্পর্কের সংবেদনশীলতা আরও প্রকট হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে কোনো সম্পর্ক কেবল আবেগ বা ব্যক্তিবিশেষের ওপর নির্ভর করে না; তা টিকে থাকে পারস্পরিক স্বার্থ, বাস্তবতা ও সম্মানের ভিত্তিতে। এই সফরের সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ধারণ করবে আগামী দিনগুলোতে ঢাকা ও দিল্লি পারস্পরিক আস্থা ও স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে পারে কি না।

জনপ্রিয় সংবাদ

সেন্ট যোসেফ কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি: জেনে নিন বিস্তারিত

ভারত সফর ও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির নতুন সমীকরণ

প্রকাশিত হয়েছে: ০৮:৩০:২১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন ভারত সফর নিয়ে তৈরি হওয়া কূটনৈতিক অনিশ্চয়তা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সফরটি আদৌ হবে কি না, হলে কবে হবে অথবা কোন পরিস্থিতিতে হবে—এসবের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, এই ঘটনাপ্রবাহ দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতা ও আঞ্চলিক শক্তি-সমীকরণ সম্পর্কে কী বার্তা বহন করছে। এই সফর কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক কর্মসূচির প্রশ্ন নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, চলমান বিচার প্রক্রিয়া, ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের কৌশলগত বাস্তবতা।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পর সৃষ্ট নতুন পরিস্থিতি উভয় দেশকেই নিজেদের অবস্থান পুনর্মূল্যায়নে বাধ্য করছে। বিশেষত শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাঁকে প্রত্যর্পণের বাংলাদেশি দাবি সম্পর্কের একটি সংবেদনশীল মাত্রা যোগ করেছে। এ বিষয়ে দুই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। বাংলাদেশের একাংশের মতে, শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া এবং তাঁকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পরোক্ষ প্রভাব বিস্তারের শামিল। অন্যদিকে ভারতের অবস্থান হলো, বিষয়টি মানবিক ও আইনগত, যা আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তির শর্তাবলি অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। এই মতপার্থক্যই বর্তমান সম্পর্কের জটিলতার কেন্দ্রবিন্দু।

বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল শেখ হাসিনা ইস্যুতে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে সমান গুরুত্ব বহন করে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। দলটির ওপর নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রত্যাবর্তন এবং চলমান বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে দেশে-বিদেশে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান রয়েছে। ভারতের নীতিনির্ধারক মহলের একটি অংশ মনে করে, দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে রাখা প্রয়োজন। বিপরীতে বাংলাদেশের অনেক রাজনৈতিক শক্তি ও নাগরিক সমাজের মতে, বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই রাজনৈতিক পুনর্বাসনের কথা বলা ন্যায়বিচারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই দুই অবস্থানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষাই এখন দুই দেশের কূটনীতির বড় চ্যালেঞ্জ।

ভারত কি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করতে চায়, নাকি কেবল একটি স্থিতিশীল প্রতিবেশী রাষ্ট্র দেখতে চায়—এই প্রশ্নের সরল উত্তর নেই। রাষ্ট্রসমূহ সাধারণত আদর্শিক বিবেচনার চেয়ে কৌশলগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে সংযোগ, সীমান্ত নিরাপত্তা, আঞ্চলিক বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক সামুদ্রিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গুরুত্ব অপরিসীম। তবে বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ না করার আন্তর্জাতিক নীতিও দিল্লির নীতিনির্ধারণে গুরুত্ব পাওয়ার কথা।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ঐতিহাসিকভাবেই ভারসাম্যমুখী। 'সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়'—এই নীতির ভিত্তিতে দেশটি ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। বর্তমান পরিস্থিতিকে নতুন কোনো পররাষ্ট্রনীতি হিসেবে না দেখে, বরং পরিবর্তিত বাস্তবতায় পুরোনো নীতির নতুন প্রয়োগ হিসেবে দেখাই যুক্তিসঙ্গত। এই সমীকরণে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। এই প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি ও সুযোগ উভয়ই তৈরি করেছে।

প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফরটি অনুষ্ঠিত হলে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, সীমান্ত নিরাপত্তা, পানি বণ্টন, বাণিজ্য, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হতে পারে। এটি দুই দেশের আস্থার ঘাটতি কমানোর সুযোগও তৈরি করতে পারে। বিপরীতভাবে, সফর না হলে বা অনির্দিষ্টকাল পিছিয়ে গেলে সম্পর্কের সংবেদনশীলতা আরও প্রকট হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে কোনো সম্পর্ক কেবল আবেগ বা ব্যক্তিবিশেষের ওপর নির্ভর করে না; তা টিকে থাকে পারস্পরিক স্বার্থ, বাস্তবতা ও সম্মানের ভিত্তিতে। এই সফরের সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ধারণ করবে আগামী দিনগুলোতে ঢাকা ও দিল্লি পারস্পরিক আস্থা ও স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে পারে কি না।