লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১২:০১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জুলাই সনদের সংস্কার ও পুরোনো রাজনৈতিক ধারায় ফেরার শঙ্কা

একটি জাতির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার অবসান ঘটাতে পরিবর্তনের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়, তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে। এই গণঅভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য শুধু সরকার পরিবর্তন ছিল না, বরং রাষ্ট্রের চরিত্র পরিবর্তন করাও ছিল। এই লক্ষ্য অর্জনে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পর নির্বাচনব্যবস্থা, বিচারবিভাগ, প্রশাসন, পুলিশ এবং দুর্নীতি দমনের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারে একটি রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক 'জুলাই সনদ'।

পরবর্তীতে এই সনদের সংস্কার প্রস্তাবগুলো জনগণের রায়ের জন্য গণভোটে পাঠানো হয়। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত সেই গণভোটে দেশের মানুষ জুলাই সনদের সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে তাদের রায় দেয়। আন্তর্জাতিক IDEA-এর বিশ্লেষণেও গণভোটটিকে বাংলাদেশের পরবর্তী সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু জনগণের সরাসরি রায় এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও এই সংস্কার বাস্তবায়নের পথে নানা জটিলতা ও বিলম্ব দেখা দিচ্ছে, যা নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।

সম্প্রতি ২০২৬ সালের ২০ আগস্ট দীর্ঘ ৩৫ বছর পর বাংলাদেশে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে সংসদ সদস্যরা vote দিয়েছেন। তবে এই নির্বাচনের আগেই বিএনপির চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি স্পষ্ট করে জানান যে, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ বহাল থাকায় কোনো সংসদ সদস্য দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে তাঁর সংসদ সদস্য পদ থাকবে না। এটি মূলত বর্তমান সংবিধানেরই একটি বিধান। কিন্তু জুলাই সনদের সংস্কার প্রস্তাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল এই ৭০ অনুচ্ছেদের পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গোপন ব্যালটে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করা। এই সংস্কার কার্যকর থাকলে সংসদ সদস্যরা দলের অন্ধ আনুগত্যের বাইরে গিয়ে নিজেদের বিবেক ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেতেন। পুরোনো এই ব্যবস্থার বহাল থাকা নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ার পথে একটি বড় অন্তরায় হিসেবে দেখা দিয়েছে।

রাষ্ট্রের এই সংকটের পাশাপাশি দেশের দুর্নীতি পরিস্থিতিও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (TI) ২০২৫ সালের দুর্নীতি ধারণা সূচকে (CPI) ১৮২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫০তম এবং স্কোর মাত্র ২৪। আগের বছরের চেয়ে সামান্য উন্নতি হলেও এই সূচকটি প্রমাণ করে যে, দুর্নীতি প্রতিরোধে এখনও অনেক কাজ বাকি রয়েছে এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অন্যায়ের সঙ্গে আপসের সংস্কৃতি আমাদের গভীরভাবে আঁকড়ে ধরে আছে।

এই অবস্থা থেকে উত্তরণে এবং জুলাই সনদের কার্যকর বাস্তবায়নে লেখক ও গবেষক রহমান মৃধা (সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন) পাঁচটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, একটি সর্বসম্মত, প্রকাশ্য এবং সময়সীমাবদ্ধ বাস্তবায়ন রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে, যেখানে কোন সংস্কার কীভাবে এবং কতদিনের মধ্যে সম্পন্ন হবে তা স্পষ্ট থাকবে। দ্বিতীয়ত, নির্দিষ্ট সময় পরপর একটি July Charter Implementation Report প্রকাশ করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বিচারবিদ, নাগরিক সমাজ, তরুণ প্রজন্ম এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের পর্যবেক্ষণের সুযোগ দিতে হবে। চতুর্থত, রাজনৈতিক দলগুলোকে অঙ্গীকার করতে হবে যে, ক্ষমতায় গিয়ে তারা নিজেদের সুবিধামতো এসব গণতান্ত্রিক নিয়ম পরিবর্তন করবে না। পঞ্চমত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নাগরিকদের নিজেদেরও নৈতিকভাবে পরিবর্তিত হতে হবে, কারণ শুধু সংবিধান বা প্রতিষ্ঠান বদলালেই দেশ বদলায় না, যদি না মানুষের চিন্তা ও সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটে।

জুলাই সনদের বাস্তবায়ন তাই শুধু একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরণের বিষয় নয়, বরং এটি জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের বিশ্বাসের পরীক্ষা। এই পরীক্ষা ও সুযোগকে নষ্ট না করে রাজনৈতিক দলগুলোকে পারস্পরিক সমঝোতা ও সদিচ্ছার মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেটকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে। তা না হলে গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের আস্থা চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ফ্যাসিস্ট আমলেও জনগণের পাশে ছিল জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন: রিজভী

জুলাই সনদের সংস্কার ও পুরোনো রাজনৈতিক ধারায় ফেরার শঙ্কা

প্রকাশিত হয়েছে: ০৬:০৯:০২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬

একটি জাতির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার অবসান ঘটাতে পরিবর্তনের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়, তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে। এই গণঅভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য শুধু সরকার পরিবর্তন ছিল না, বরং রাষ্ট্রের চরিত্র পরিবর্তন করাও ছিল। এই লক্ষ্য অর্জনে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পর নির্বাচনব্যবস্থা, বিচারবিভাগ, প্রশাসন, পুলিশ এবং দুর্নীতি দমনের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারে একটি রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক 'জুলাই সনদ'।

পরবর্তীতে এই সনদের সংস্কার প্রস্তাবগুলো জনগণের রায়ের জন্য গণভোটে পাঠানো হয়। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত সেই গণভোটে দেশের মানুষ জুলাই সনদের সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে তাদের রায় দেয়। আন্তর্জাতিক IDEA-এর বিশ্লেষণেও গণভোটটিকে বাংলাদেশের পরবর্তী সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু জনগণের সরাসরি রায় এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও এই সংস্কার বাস্তবায়নের পথে নানা জটিলতা ও বিলম্ব দেখা দিচ্ছে, যা নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।

সম্প্রতি ২০২৬ সালের ২০ আগস্ট দীর্ঘ ৩৫ বছর পর বাংলাদেশে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে সংসদ সদস্যরা vote দিয়েছেন। তবে এই নির্বাচনের আগেই বিএনপির চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি স্পষ্ট করে জানান যে, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ বহাল থাকায় কোনো সংসদ সদস্য দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে তাঁর সংসদ সদস্য পদ থাকবে না। এটি মূলত বর্তমান সংবিধানেরই একটি বিধান। কিন্তু জুলাই সনদের সংস্কার প্রস্তাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল এই ৭০ অনুচ্ছেদের পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গোপন ব্যালটে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করা। এই সংস্কার কার্যকর থাকলে সংসদ সদস্যরা দলের অন্ধ আনুগত্যের বাইরে গিয়ে নিজেদের বিবেক ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেতেন। পুরোনো এই ব্যবস্থার বহাল থাকা নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ার পথে একটি বড় অন্তরায় হিসেবে দেখা দিয়েছে।

রাষ্ট্রের এই সংকটের পাশাপাশি দেশের দুর্নীতি পরিস্থিতিও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (TI) ২০২৫ সালের দুর্নীতি ধারণা সূচকে (CPI) ১৮২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫০তম এবং স্কোর মাত্র ২৪। আগের বছরের চেয়ে সামান্য উন্নতি হলেও এই সূচকটি প্রমাণ করে যে, দুর্নীতি প্রতিরোধে এখনও অনেক কাজ বাকি রয়েছে এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অন্যায়ের সঙ্গে আপসের সংস্কৃতি আমাদের গভীরভাবে আঁকড়ে ধরে আছে।

এই অবস্থা থেকে উত্তরণে এবং জুলাই সনদের কার্যকর বাস্তবায়নে লেখক ও গবেষক রহমান মৃধা (সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন) পাঁচটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, একটি সর্বসম্মত, প্রকাশ্য এবং সময়সীমাবদ্ধ বাস্তবায়ন রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে, যেখানে কোন সংস্কার কীভাবে এবং কতদিনের মধ্যে সম্পন্ন হবে তা স্পষ্ট থাকবে। দ্বিতীয়ত, নির্দিষ্ট সময় পরপর একটি July Charter Implementation Report প্রকাশ করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বিচারবিদ, নাগরিক সমাজ, তরুণ প্রজন্ম এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের পর্যবেক্ষণের সুযোগ দিতে হবে। চতুর্থত, রাজনৈতিক দলগুলোকে অঙ্গীকার করতে হবে যে, ক্ষমতায় গিয়ে তারা নিজেদের সুবিধামতো এসব গণতান্ত্রিক নিয়ম পরিবর্তন করবে না। পঞ্চমত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নাগরিকদের নিজেদেরও নৈতিকভাবে পরিবর্তিত হতে হবে, কারণ শুধু সংবিধান বা প্রতিষ্ঠান বদলালেই দেশ বদলায় না, যদি না মানুষের চিন্তা ও সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটে।

জুলাই সনদের বাস্তবায়ন তাই শুধু একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরণের বিষয় নয়, বরং এটি জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের বিশ্বাসের পরীক্ষা। এই পরীক্ষা ও সুযোগকে নষ্ট না করে রাজনৈতিক দলগুলোকে পারস্পরিক সমঝোতা ও সদিচ্ছার মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেটকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে। তা না হলে গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের আস্থা চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।