লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০১:৪০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মহাকাশে খুনের তদন্ত হবে যেভাবে, জানাচ্ছে প্রযুক্তি ও ফরেনসিক বিজ্ঞান

মহাকাশে মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছে। ভবিষ্যতে বেসরকারি মহাকাশ ভ্রমণও সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে। এমন বাস্তবতায় একটি অদ্ভুত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে- মহাকাশে যদি কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটে, তাহলে তার তদন্ত হবে কীভাবে? বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের (আইএসএস) মতো সীমাবদ্ধ পরিবেশে খুনের তদন্তে ৫টি প্রধান চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ৬ জন বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে গঠিত একটি দল এই বিষয়ে কাজ করছে। বৃটেনের নর্থাম্ব্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞানী ড. মেহযেব চৌধুরীর মতে, মহাকাশে অপরাধ তদন্তে রোবট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং উন্নত ডিজিটাল ইমেজিং প্রযুক্তি অপরিহার্য হয়ে উঠবে। প্রচলিত তদন্ত পদ্ধতি মহাকাশের সীমাবদ্ধ পরিবেশে পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে, তাই প্রযুক্তিনির্ভর সমাধানই হতে পারে একমাত্র উপায়।

ড. মেহযেব চৌধুরী ২০১৬ সালে ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণার সময় ‘ম্যাবম্যাট’ নামক একটি বিশেষ রোবট উদ্ভাবন করেন। এই রোবট অপরাধস্থলের ৩৬০ ডিগ্রি ছবি ও ভিডিও ধারণ করে ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মাধ্যমে পৃথিবীতে বসেই ঘটনাস্থল পুনর্নির্মাণের সুযোগ করে দেয়। ভবিষ্যতে এই রোবটগুলোতে উচ্চ-রেজ্যুলুশনের ত্রিমাত্রিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যানার ও হাইপারস্পেকট্রাল ইমেজিং যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা খালি চোখে অদৃশ্য প্রমাণ শনাক্ত করতে সক্ষম হবে।

মহাকাশ স্টেশনের মতো মাইক্রোগ্র্যাভিটি বা অতি স্বল্প মাধ্যাকর্ষণ পরিবেশে ফরেনসিক তদন্তের চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে গবেষণা করছেন জর্জিয়ার রোজওয়েল পুলিশ বিভাগের ফরেনসিক গোয়েন্দা জ্যাক কোয়ালস্কে। তিনি ইউনিভার্সিটি অব লুইসভিলের মহাকাশ চিকিৎসাবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ ড. জর্জ প্যান্টালোসের সাথে যৌথভাবে ‘ভমিট কমেট’ নামক বিশেষ বিমানে পরীক্ষা চালিয়েছেন। গবেষণাটি পরিচালিত হয় বিশেষ গবেষণা বিমান ‘ভমিট কমেট’-এ, যা অল্প সময়ের জন্য মাইক্রোগ্র্যাভিটি তৈরি করে। কিন্তু এই পরীক্ষা সহজ ছিল না। কোয়ালস্কে জানান, মাইক্রোগ্র্যাভিটির পরপরই বিমানটি দ্বিগুণ মাধ্যাকর্ষণের (২জি) অবস্থায় প্রবেশ করে। ফলে তৈরি হওয়া রক্তের দাগ সঙ্গে সঙ্গেই পরিবর্তিত হয়ে যায় এবং পরীক্ষার ফল আংশিকভাবে নষ্ট হয়। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীতে রক্ত যেভাবে ছড়িয়ে পড়ে, মহাকাশে মাধ্যাকর্ষণের অভাবে তার আচরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে পৃষ্ঠটানের কারণে রক্তের ফোঁটা গোলাকার থাকে এবং তা কোনো পৃষ্ঠে আঘাত না করা পর্যন্ত সরলরেখায় চলতে থাকে, যা অপরাধের উৎস খুঁজে বের করা কঠিন করে তোলে।

হত্যার অস্ত্র শনাক্তকরণ নিয়েও চলছে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ। ইউনিভার্সিটি অব কেন্টের ফরেনসিক ব্যালিস্টিকস বিশেষজ্ঞ ড. ক্রিস শেফার্ডের মতে, মহাকাশে গুলি চালানো হলে বন্দুকের বিস্ফোরণ থেকে উৎপন্ন রাসায়নিক কণা বা গানশট রেসিড্যু বাতাসে ভেসে থাকে। এগুলো মহাকাশ স্টেশনের এয়ার ফিল্টারে আটকে পড়ার সম্ভাবনা থাকে, যা থেকে অস্ত্র ও গুলির ধরন শনাক্ত করা সম্ভব। ১৯৮০ সালে সোভিয়েত নভোচারী ভ্যালেরি রিউমিন তার ডায়েরিতে ছোট কেবিনে দীর্ঘ সময় আটকা থাকার ফলে অপরাধের ঝুঁকি নিয়ে যে শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, বর্তমান প্রযুক্তিবিদরা সেই ঝুঁকি মাথায় রেখেই ২০টি ভিন্ন প্যারামিটার বিশ্লেষণ করে ‘অ্যাস্ট্রোফরেনসিকস’ নামে একটি নতুন গবেষণার ক্ষেত্র গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

শান্তি ও উন্নয়নকে আলাদা দেখার সুযোগ নেই: জাতিসংঘ মহাসচিব

মহাকাশে খুনের তদন্ত হবে যেভাবে, জানাচ্ছে প্রযুক্তি ও ফরেনসিক বিজ্ঞান

প্রকাশিত হয়েছে: ০৫:৫২:৫৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬

মহাকাশে মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছে। ভবিষ্যতে বেসরকারি মহাকাশ ভ্রমণও সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে। এমন বাস্তবতায় একটি অদ্ভুত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে- মহাকাশে যদি কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটে, তাহলে তার তদন্ত হবে কীভাবে? বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের (আইএসএস) মতো সীমাবদ্ধ পরিবেশে খুনের তদন্তে ৫টি প্রধান চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ৬ জন বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে গঠিত একটি দল এই বিষয়ে কাজ করছে। বৃটেনের নর্থাম্ব্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞানী ড. মেহযেব চৌধুরীর মতে, মহাকাশে অপরাধ তদন্তে রোবট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং উন্নত ডিজিটাল ইমেজিং প্রযুক্তি অপরিহার্য হয়ে উঠবে। প্রচলিত তদন্ত পদ্ধতি মহাকাশের সীমাবদ্ধ পরিবেশে পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে, তাই প্রযুক্তিনির্ভর সমাধানই হতে পারে একমাত্র উপায়।

ড. মেহযেব চৌধুরী ২০১৬ সালে ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণার সময় ‘ম্যাবম্যাট’ নামক একটি বিশেষ রোবট উদ্ভাবন করেন। এই রোবট অপরাধস্থলের ৩৬০ ডিগ্রি ছবি ও ভিডিও ধারণ করে ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মাধ্যমে পৃথিবীতে বসেই ঘটনাস্থল পুনর্নির্মাণের সুযোগ করে দেয়। ভবিষ্যতে এই রোবটগুলোতে উচ্চ-রেজ্যুলুশনের ত্রিমাত্রিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যানার ও হাইপারস্পেকট্রাল ইমেজিং যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা খালি চোখে অদৃশ্য প্রমাণ শনাক্ত করতে সক্ষম হবে।

মহাকাশ স্টেশনের মতো মাইক্রোগ্র্যাভিটি বা অতি স্বল্প মাধ্যাকর্ষণ পরিবেশে ফরেনসিক তদন্তের চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে গবেষণা করছেন জর্জিয়ার রোজওয়েল পুলিশ বিভাগের ফরেনসিক গোয়েন্দা জ্যাক কোয়ালস্কে। তিনি ইউনিভার্সিটি অব লুইসভিলের মহাকাশ চিকিৎসাবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ ড. জর্জ প্যান্টালোসের সাথে যৌথভাবে ‘ভমিট কমেট’ নামক বিশেষ বিমানে পরীক্ষা চালিয়েছেন। গবেষণাটি পরিচালিত হয় বিশেষ গবেষণা বিমান ‘ভমিট কমেট’-এ, যা অল্প সময়ের জন্য মাইক্রোগ্র্যাভিটি তৈরি করে। কিন্তু এই পরীক্ষা সহজ ছিল না। কোয়ালস্কে জানান, মাইক্রোগ্র্যাভিটির পরপরই বিমানটি দ্বিগুণ মাধ্যাকর্ষণের (২জি) অবস্থায় প্রবেশ করে। ফলে তৈরি হওয়া রক্তের দাগ সঙ্গে সঙ্গেই পরিবর্তিত হয়ে যায় এবং পরীক্ষার ফল আংশিকভাবে নষ্ট হয়। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীতে রক্ত যেভাবে ছড়িয়ে পড়ে, মহাকাশে মাধ্যাকর্ষণের অভাবে তার আচরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে পৃষ্ঠটানের কারণে রক্তের ফোঁটা গোলাকার থাকে এবং তা কোনো পৃষ্ঠে আঘাত না করা পর্যন্ত সরলরেখায় চলতে থাকে, যা অপরাধের উৎস খুঁজে বের করা কঠিন করে তোলে।

হত্যার অস্ত্র শনাক্তকরণ নিয়েও চলছে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ। ইউনিভার্সিটি অব কেন্টের ফরেনসিক ব্যালিস্টিকস বিশেষজ্ঞ ড. ক্রিস শেফার্ডের মতে, মহাকাশে গুলি চালানো হলে বন্দুকের বিস্ফোরণ থেকে উৎপন্ন রাসায়নিক কণা বা গানশট রেসিড্যু বাতাসে ভেসে থাকে। এগুলো মহাকাশ স্টেশনের এয়ার ফিল্টারে আটকে পড়ার সম্ভাবনা থাকে, যা থেকে অস্ত্র ও গুলির ধরন শনাক্ত করা সম্ভব। ১৯৮০ সালে সোভিয়েত নভোচারী ভ্যালেরি রিউমিন তার ডায়েরিতে ছোট কেবিনে দীর্ঘ সময় আটকা থাকার ফলে অপরাধের ঝুঁকি নিয়ে যে শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, বর্তমান প্রযুক্তিবিদরা সেই ঝুঁকি মাথায় রেখেই ২০টি ভিন্ন প্যারামিটার বিশ্লেষণ করে ‘অ্যাস্ট্রোফরেনসিকস’ নামে একটি নতুন গবেষণার ক্ষেত্র গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছেন।