লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৮:১৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাবেক জবি ছাত্রীকে র‍্যাবের আটকের চেষ্টা ও ‘জিনের ভর’ কাহিনীর নেপথ্য

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) নাট্যকলা বিভাগের ২০১৫-২০১৬ শিক্ষাবর্ষের সাবেক শিক্ষার্থী মমতাজ আরা বর্ষাকে (যিনি ২০২৩ সালে স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন) সাদাপোশাকে আটকের চেষ্টা নিয়ে দেশজুড়ে নানা আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ঘটনার পর থেকে বর্ষা আত্মগোপনে রয়েছেন এবং তাঁর মুঠোফোনও বন্ধ রয়েছে। তাঁর বোন বৃষ্টি জানিয়েছেন, পরিবারের সঙ্গেও বর্ষার কোনো যোগাযোগ নেই। এদিকে পুলিশ ও র‍্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ‘জিনে ভর করার’ কথা বলে এক পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রীর কাছ থেকে অর্থ ও সোনা হাতিয়ে নেওয়ার একটি চুরির মামলায় বর্ষা এজাহারভুক্ত আসামি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১২ আগস্ট রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানায় এই চুরির মামলাটি করেন একজন সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার, যিনি বর্তমানে র‍্যাব-২-এ কর্মরত। মামলার এজাহার অনুযায়ী, ওই কর্মকর্তার গাড়িচালক মো. রাসেল তাঁর স্ত্রী মাছুরা বেগমকে নিয়ে একটি অভিনব প্রতারণার জাল বোনেন। রাসেল পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রীকে (যিনি একজন সিনিয়র সহকারী সচিব) জানান যে তাঁর স্ত্রী মাছুরার ওপর ‘কোনো এক জিনের ভর’ রয়েছে। সেই জিন নাকি তাঁদের পরিবারের অনেক গোপন কথা জানে এবং জিনের কথামতো চললে বৈষয়িক উন্নতি ও পারিবারিক বিপদ কেটে যাবে। এই ফাঁদে ফেলে চেতনানাশক খাইয়ে এবং জিনের ভয় দেখিয়ে ওই কর্মকর্তার বাসা থেকে ১৪ লাখ টাকা ও ১০ ভরি সোনা চুরি করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়া রাসেল ও মাছুরা পুলিশকে জানিয়েছেন, চুরির সেই সোনা তাঁরা বর্ষার কাছে বিক্রি করেছিলেন।

ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাকিবুল হাসান জানান, মামলার দুই আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর সন্দেহভাজন হিসেবে বর্ষার নাম আসে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন ছিল বলেই পুলিশ র‍্যাবের কাছে বর্ষাকে আটকের জন্য রিকুইজিশন বা আবেদন করেছিল।

তবে গত ৬ সেপ্টেম্বর সকালে পুরান ঢাকার কলতাবাজারে বর্ষার মেসে যেভাবে সাদাপোশাকে অভিযান চালানো হয়, তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন উঠেছে। বর্ষার রুমমেট ও মেসের নিরাপত্তাকর্মী জানান, সকাল পৌনে সাতটার দিকে একটি মাইক্রোবাসে করে তিনজন ব্যক্তি এসে নিরাপত্তাকর্মীকে নিয়ে মেসে যান এবং দরজা খুলতে বলেন। প্রথমে দরজা না খোলায় তাঁরা গালিগালাজ ও ধাক্কাধাক্কি করেন। মেসে ঢুকে তল্লাশি চালিয়ে কিছু না পেয়ে তাঁরা বর্ষাকে জোরপূর্বক নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

মেসের বাসিন্দারা দ্রুত বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ছাত্র সংসদের (জকসু) নেতাদের জানান। ঘটনাস্থলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন প্রশাসক তারেক বিন আতিকসহ প্রক্টরিয়াল টিম পৌঁছায়। এর মধ্যে সেখানে র‍্যাবের আরেকটি গাড়ি ও স্থানীয় থানার পুলিশ সদস্যরা আসেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা বাধা দেওয়ায় শেষ পর্যন্ত বর্ষাকে গাড়িতে তুলতে পারেনি র‍্যাব। জকসুর সমাজসেবা সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, শিক্ষক ও প্রক্টরিয়াল টিমের সহযোগিতায় বর্ষাকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।

জবির সহকারী প্রক্টর আহমেদ ইহসানুল কবির জানান, প্রথম দিকে যাঁরা বর্ষাকে আটক করতে এসেছিলেন, তাঁরা নিজেদের পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেননি এবং তাঁদের কাছে কোনো মামলা বা আইনি নথি ছিল না। এ কারণেই সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছিল। তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমাদের প্রাক্তন ছাত্রী যদি অপরাধী হন, তাহলে ফৌজদারি আইন অনুসারে তাঁর বিচার হবে।’ তবে ৬ সেপ্টেম্বরের পর থেকে বর্ষা বা তাঁর পরিবারের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।

আটকের চেষ্টার পর ওই দিন বিকেলেই জবির ভাষাশহীদ রফিক ভবনের নিচে সংবাদ সম্মেলন করেন বর্ষা। সেখানে তিনি দাবি করেন, তাঁর বোনের সাবেক স্বামী সুমন মিয়া র‍্যাবের তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) বিভাগে কর্মরত এবং প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তিনি র‍্যাবকে দিয়ে এই ঘটনা ঘটিয়েছেন। তবে র‍্যাব-২-এর পরিচালক এবং পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক নয়মুল হাসান জানান, অভিযানে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। এজাহারনামীয় আসামি ধরতেই সেখানে যাওয়া হয়েছিল, কিন্তু আসামিকে না ধরতে র‍্যাবের ওপর চাপ তৈরি করা হয়। তিনি আরও জানান, র‍্যাব-২-এ সুমন নামে কেউ কাজ করেন না। পুরো নাম ও পদবি ছাড়া বাহিনীর ১৫টি ব্যাটালিয়নের মধ্যে কাউকে খুঁজে বের করা কঠিন।

উল্লেখ্য, র‍্যাবের বিরুদ্ধে অতীতে গুম, খুন ও অপহরণের মতো নানা অভিযোগ রয়েছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়া এই বাহিনীটিকে বিলুপ্ত করে সরকার এখন স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠনের আইন আনার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে, যা বর্তমানে সংসদীয় কমিটিতে রয়েছে।

বর্ষার বোন বৃষ্টি জানান, বর্ষা দিনাজপুরের বাসিন্দা এবং বাবা তাঁর খরচের টাকা পাঠাতেন। বর্ষা অনলাইনে চাকরি করতেন, একসময় নিজের প্রতিষ্ঠানও ছিল এবং তিনি হ্যাকিংয়ে পারদর্শী ছিলেন। কলতাবাজারের মেসে তিনি দুটি আসন ভাড়া নিয়ে থাকতেন, যার ভাড়া ছিল ছয় হাজার টাকা। এর আগে সাড়ে সাত হাজার টাকার দুটি টিউশনি করলেও মাস তিনেক আগে তা ছেড়ে দেন। মেসের নিরাপত্তাকর্মী জানান, ঘটনার পর বর্ষা মেস ছেড়ে চলে গেছেন এবং যাওয়ার আগে বলে গেছেন, কেউ খুঁজতে এলে যেন বলা হয় তিনি এখানে থাকেন না।

জনপ্রিয় সংবাদ

মেলান্দহে বিতরণের আগেই সরকারি ত্রাণের মেয়াদ শেষ, দরিদ্রদের ক্ষোভ

সাবেক জবি ছাত্রীকে র‍্যাবের আটকের চেষ্টা ও ‘জিনের ভর’ কাহিনীর নেপথ্য

প্রকাশিত হয়েছে: ০১:৩২:৫৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) নাট্যকলা বিভাগের ২০১৫-২০১৬ শিক্ষাবর্ষের সাবেক শিক্ষার্থী মমতাজ আরা বর্ষাকে (যিনি ২০২৩ সালে স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন) সাদাপোশাকে আটকের চেষ্টা নিয়ে দেশজুড়ে নানা আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ঘটনার পর থেকে বর্ষা আত্মগোপনে রয়েছেন এবং তাঁর মুঠোফোনও বন্ধ রয়েছে। তাঁর বোন বৃষ্টি জানিয়েছেন, পরিবারের সঙ্গেও বর্ষার কোনো যোগাযোগ নেই। এদিকে পুলিশ ও র‍্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ‘জিনে ভর করার’ কথা বলে এক পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রীর কাছ থেকে অর্থ ও সোনা হাতিয়ে নেওয়ার একটি চুরির মামলায় বর্ষা এজাহারভুক্ত আসামি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১২ আগস্ট রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানায় এই চুরির মামলাটি করেন একজন সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার, যিনি বর্তমানে র‍্যাব-২-এ কর্মরত। মামলার এজাহার অনুযায়ী, ওই কর্মকর্তার গাড়িচালক মো. রাসেল তাঁর স্ত্রী মাছুরা বেগমকে নিয়ে একটি অভিনব প্রতারণার জাল বোনেন। রাসেল পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রীকে (যিনি একজন সিনিয়র সহকারী সচিব) জানান যে তাঁর স্ত্রী মাছুরার ওপর ‘কোনো এক জিনের ভর’ রয়েছে। সেই জিন নাকি তাঁদের পরিবারের অনেক গোপন কথা জানে এবং জিনের কথামতো চললে বৈষয়িক উন্নতি ও পারিবারিক বিপদ কেটে যাবে। এই ফাঁদে ফেলে চেতনানাশক খাইয়ে এবং জিনের ভয় দেখিয়ে ওই কর্মকর্তার বাসা থেকে ১৪ লাখ টাকা ও ১০ ভরি সোনা চুরি করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়া রাসেল ও মাছুরা পুলিশকে জানিয়েছেন, চুরির সেই সোনা তাঁরা বর্ষার কাছে বিক্রি করেছিলেন।

ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাকিবুল হাসান জানান, মামলার দুই আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর সন্দেহভাজন হিসেবে বর্ষার নাম আসে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন ছিল বলেই পুলিশ র‍্যাবের কাছে বর্ষাকে আটকের জন্য রিকুইজিশন বা আবেদন করেছিল।

তবে গত ৬ সেপ্টেম্বর সকালে পুরান ঢাকার কলতাবাজারে বর্ষার মেসে যেভাবে সাদাপোশাকে অভিযান চালানো হয়, তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন উঠেছে। বর্ষার রুমমেট ও মেসের নিরাপত্তাকর্মী জানান, সকাল পৌনে সাতটার দিকে একটি মাইক্রোবাসে করে তিনজন ব্যক্তি এসে নিরাপত্তাকর্মীকে নিয়ে মেসে যান এবং দরজা খুলতে বলেন। প্রথমে দরজা না খোলায় তাঁরা গালিগালাজ ও ধাক্কাধাক্কি করেন। মেসে ঢুকে তল্লাশি চালিয়ে কিছু না পেয়ে তাঁরা বর্ষাকে জোরপূর্বক নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

মেসের বাসিন্দারা দ্রুত বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ছাত্র সংসদের (জকসু) নেতাদের জানান। ঘটনাস্থলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন প্রশাসক তারেক বিন আতিকসহ প্রক্টরিয়াল টিম পৌঁছায়। এর মধ্যে সেখানে র‍্যাবের আরেকটি গাড়ি ও স্থানীয় থানার পুলিশ সদস্যরা আসেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা বাধা দেওয়ায় শেষ পর্যন্ত বর্ষাকে গাড়িতে তুলতে পারেনি র‍্যাব। জকসুর সমাজসেবা সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, শিক্ষক ও প্রক্টরিয়াল টিমের সহযোগিতায় বর্ষাকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।

জবির সহকারী প্রক্টর আহমেদ ইহসানুল কবির জানান, প্রথম দিকে যাঁরা বর্ষাকে আটক করতে এসেছিলেন, তাঁরা নিজেদের পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেননি এবং তাঁদের কাছে কোনো মামলা বা আইনি নথি ছিল না। এ কারণেই সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছিল। তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমাদের প্রাক্তন ছাত্রী যদি অপরাধী হন, তাহলে ফৌজদারি আইন অনুসারে তাঁর বিচার হবে।’ তবে ৬ সেপ্টেম্বরের পর থেকে বর্ষা বা তাঁর পরিবারের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।

আটকের চেষ্টার পর ওই দিন বিকেলেই জবির ভাষাশহীদ রফিক ভবনের নিচে সংবাদ সম্মেলন করেন বর্ষা। সেখানে তিনি দাবি করেন, তাঁর বোনের সাবেক স্বামী সুমন মিয়া র‍্যাবের তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) বিভাগে কর্মরত এবং প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তিনি র‍্যাবকে দিয়ে এই ঘটনা ঘটিয়েছেন। তবে র‍্যাব-২-এর পরিচালক এবং পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক নয়মুল হাসান জানান, অভিযানে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। এজাহারনামীয় আসামি ধরতেই সেখানে যাওয়া হয়েছিল, কিন্তু আসামিকে না ধরতে র‍্যাবের ওপর চাপ তৈরি করা হয়। তিনি আরও জানান, র‍্যাব-২-এ সুমন নামে কেউ কাজ করেন না। পুরো নাম ও পদবি ছাড়া বাহিনীর ১৫টি ব্যাটালিয়নের মধ্যে কাউকে খুঁজে বের করা কঠিন।

উল্লেখ্য, র‍্যাবের বিরুদ্ধে অতীতে গুম, খুন ও অপহরণের মতো নানা অভিযোগ রয়েছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়া এই বাহিনীটিকে বিলুপ্ত করে সরকার এখন স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠনের আইন আনার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে, যা বর্তমানে সংসদীয় কমিটিতে রয়েছে।

বর্ষার বোন বৃষ্টি জানান, বর্ষা দিনাজপুরের বাসিন্দা এবং বাবা তাঁর খরচের টাকা পাঠাতেন। বর্ষা অনলাইনে চাকরি করতেন, একসময় নিজের প্রতিষ্ঠানও ছিল এবং তিনি হ্যাকিংয়ে পারদর্শী ছিলেন। কলতাবাজারের মেসে তিনি দুটি আসন ভাড়া নিয়ে থাকতেন, যার ভাড়া ছিল ছয় হাজার টাকা। এর আগে সাড়ে সাত হাজার টাকার দুটি টিউশনি করলেও মাস তিনেক আগে তা ছেড়ে দেন। মেসের নিরাপত্তাকর্মী জানান, ঘটনার পর বর্ষা মেস ছেড়ে চলে গেছেন এবং যাওয়ার আগে বলে গেছেন, কেউ খুঁজতে এলে যেন বলা হয় তিনি এখানে থাকেন না।