লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৭:১৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৭ অগাস্ট ২০২৬, ২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিশুদের সুরক্ষায় ব্যর্থতা: মেটাকে আরও ৫৬৭ মিলিয়ন ডলার জরিমানা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের নিরাপত্তা ঝুঁকি সম্পর্কে জনসাধারণকে সতর্ক করতে ব্যর্থ হওয়ার দায়ে মেটাকে আরও ৫৬৭ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোর একটি আদালত। শিশু নিরাপত্তা ইস্যুতে ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটার বিরুদ্ধে এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় অঙ্কের জরিমানা।

মামলার রায় দেওয়ার সময় বিচারক ব্রায়ান বিডশিড মেটার প্ল্যাটফর্মগুলোকে জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার জন্য ব্যাপক ক্ষতিকর বা ‘পাবলিক নিউস্যান্স’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি নির্দেশ দেন, মেটাকে একটি বিশেষ তহবিল গঠন করতে হবে, যা ভবিষ্যতে শিশুদের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার কাজে ব্যবহার করা হবে। নতুন এই ৫৬৭ মিলিয়ন ডলারের জরিমানার ফলে, আগের রায়ের ৩৭৫ মিলিয়ন ডলারসহ এই মামলায় মেটার মোট জরিমানার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৪২ মিলিয়ন ডলার।

রায়ে বিচারক বিডশিড মেটাকে একটি কারখানার সঙ্গে তুলনা করে বলেন, মেটার পণ্য হলো বিজ্ঞাপন ও কনটেন্ট, আর শিশুদের মানসিক ক্ষতি ও যৌন শোষণ হলো সেই কারখানার নির্গত দূষণ, যা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। তবে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ ও থ্রেডসের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান মেটা আদালতের এই রায় প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রতিষ্ঠানটির এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, তারা এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন। মেটার দাবি, তারা প্ল্যাটফর্মগুলোকে নিরাপদ রাখতে নিয়মিত কাজ করছে এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট ও অপরাধীদের শনাক্তকরণের চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে সবসময় স্বচ্ছ ছিল।

২০২৩ সালে নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নিদের দায়ের করা একটি অভিযোগের ভিত্তিতে এই মামলার সূত্রপাত হয়। তাদের অভিযোগ ছিল, মেটার প্ল্যাটফর্মগুলো শিশুদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে এবং তাদের যৌন কনটেন্ট ও যৌন অপরাধীদের সংস্পর্শে নিয়ে যাচ্ছে। বিচারকের মতে, মেটার প্ল্যাটফর্মে শিশুদের ওপর যে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে, তা শুধু অনলাইনেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং বাস্তব জীবনে ছড়িয়ে পড়ে পরিবার, স্কুল, হাসপাতাল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর বড় সামাজিক বোঝা তৈরি করছে।

আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী গঠিতব্য তহবিলের একটি বড় অংশ শিশুদের ইতিমধ্যে হওয়া ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চিকিৎসায় ব্যয় করতে হবে। এর মধ্যে ৪২০ মিলিয়ন ডলার উপযুক্ত ক্লিনিক্যাল ও আচরণগত স্বাস্থ্যসেবা এবং সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের পেছনে ব্যয় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণসহ সচেতনতামূলক কার্যক্রমেও এই অর্থ ব্যবহার করা হবে।

শিশুদের সুরক্ষায় মেটাকে বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এর মধ্যে রয়েছে—১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্ট কোনো প্রাপ্তবয়স্কের কাছে সুপারিশ না করা, প্রাপ্তবয়স্কদের কাছ থেকে অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে মেসেজ পাঠানোর সুযোগ বন্ধ করা এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের নগ্ন ছবি আদান-প্রদান নিষিদ্ধ করা। এছাড়া শিশু যৌন শোষণে জড়িত প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ‘একবারেই আজীবন নিষেধাজ্ঞা’ নীতি চালু করতে হবে। অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের ‘লাইক’ সংখ্যা গোপন রাখার পাশাপাশি রাত ১০টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত এবং স্কুল চলাকালে (সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত, সাপ্তাহিক ছুটি ছাড়া) তাদের পুশ নোটিফিকেশন পাঠানো বন্ধ রাখতে হবে। একই সঙ্গে ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ব্যবহারের সর্বোচ্চ সীমা মাসে ৯০ ঘণ্টা নির্ধারণ করে দিতে হবে।

শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয়, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নও কঠোর পদক্ষেপের কথা ভাবছে। যুক্তরাজ্য ইতিমধ্যে ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার বন্ধ করা এবং রাতের বেলায় কিশোরদের ব্যবহারের ওপর ‘কারফিউ’ চালুর পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। বর্তমানে মেটার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে একই ধরনের হাজারো মামলা চলছে। চলতি বছরের শুরুতে লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি মামলায় আদালত রায় দিয়েছিলেন যে, ব্যবহারকারীদের আসক্ত করে তোলার মতো প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার জন্য মেটাকে দায়ী করা যেতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

হাসিনার বক্তব্যে ভারত সরকারের সমর্থন নেই: রণধীর জয়সওয়াল

শিশুদের সুরক্ষায় ব্যর্থতা: মেটাকে আরও ৫৬৭ মিলিয়ন ডলার জরিমানা

প্রকাশিত হয়েছে: ১০:২১:৪৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৭ অগাস্ট ২০২৬

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের নিরাপত্তা ঝুঁকি সম্পর্কে জনসাধারণকে সতর্ক করতে ব্যর্থ হওয়ার দায়ে মেটাকে আরও ৫৬৭ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোর একটি আদালত। শিশু নিরাপত্তা ইস্যুতে ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটার বিরুদ্ধে এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় অঙ্কের জরিমানা।

মামলার রায় দেওয়ার সময় বিচারক ব্রায়ান বিডশিড মেটার প্ল্যাটফর্মগুলোকে জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার জন্য ব্যাপক ক্ষতিকর বা ‘পাবলিক নিউস্যান্স’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি নির্দেশ দেন, মেটাকে একটি বিশেষ তহবিল গঠন করতে হবে, যা ভবিষ্যতে শিশুদের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার কাজে ব্যবহার করা হবে। নতুন এই ৫৬৭ মিলিয়ন ডলারের জরিমানার ফলে, আগের রায়ের ৩৭৫ মিলিয়ন ডলারসহ এই মামলায় মেটার মোট জরিমানার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৪২ মিলিয়ন ডলার।

রায়ে বিচারক বিডশিড মেটাকে একটি কারখানার সঙ্গে তুলনা করে বলেন, মেটার পণ্য হলো বিজ্ঞাপন ও কনটেন্ট, আর শিশুদের মানসিক ক্ষতি ও যৌন শোষণ হলো সেই কারখানার নির্গত দূষণ, যা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। তবে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ ও থ্রেডসের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান মেটা আদালতের এই রায় প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রতিষ্ঠানটির এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, তারা এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন। মেটার দাবি, তারা প্ল্যাটফর্মগুলোকে নিরাপদ রাখতে নিয়মিত কাজ করছে এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট ও অপরাধীদের শনাক্তকরণের চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে সবসময় স্বচ্ছ ছিল।

২০২৩ সালে নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নিদের দায়ের করা একটি অভিযোগের ভিত্তিতে এই মামলার সূত্রপাত হয়। তাদের অভিযোগ ছিল, মেটার প্ল্যাটফর্মগুলো শিশুদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে এবং তাদের যৌন কনটেন্ট ও যৌন অপরাধীদের সংস্পর্শে নিয়ে যাচ্ছে। বিচারকের মতে, মেটার প্ল্যাটফর্মে শিশুদের ওপর যে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে, তা শুধু অনলাইনেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং বাস্তব জীবনে ছড়িয়ে পড়ে পরিবার, স্কুল, হাসপাতাল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর বড় সামাজিক বোঝা তৈরি করছে।

আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী গঠিতব্য তহবিলের একটি বড় অংশ শিশুদের ইতিমধ্যে হওয়া ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চিকিৎসায় ব্যয় করতে হবে। এর মধ্যে ৪২০ মিলিয়ন ডলার উপযুক্ত ক্লিনিক্যাল ও আচরণগত স্বাস্থ্যসেবা এবং সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের পেছনে ব্যয় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণসহ সচেতনতামূলক কার্যক্রমেও এই অর্থ ব্যবহার করা হবে।

শিশুদের সুরক্ষায় মেটাকে বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এর মধ্যে রয়েছে—১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্ট কোনো প্রাপ্তবয়স্কের কাছে সুপারিশ না করা, প্রাপ্তবয়স্কদের কাছ থেকে অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে মেসেজ পাঠানোর সুযোগ বন্ধ করা এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের নগ্ন ছবি আদান-প্রদান নিষিদ্ধ করা। এছাড়া শিশু যৌন শোষণে জড়িত প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ‘একবারেই আজীবন নিষেধাজ্ঞা’ নীতি চালু করতে হবে। অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের ‘লাইক’ সংখ্যা গোপন রাখার পাশাপাশি রাত ১০টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত এবং স্কুল চলাকালে (সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত, সাপ্তাহিক ছুটি ছাড়া) তাদের পুশ নোটিফিকেশন পাঠানো বন্ধ রাখতে হবে। একই সঙ্গে ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ব্যবহারের সর্বোচ্চ সীমা মাসে ৯০ ঘণ্টা নির্ধারণ করে দিতে হবে।

শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয়, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নও কঠোর পদক্ষেপের কথা ভাবছে। যুক্তরাজ্য ইতিমধ্যে ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার বন্ধ করা এবং রাতের বেলায় কিশোরদের ব্যবহারের ওপর ‘কারফিউ’ চালুর পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। বর্তমানে মেটার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে একই ধরনের হাজারো মামলা চলছে। চলতি বছরের শুরুতে লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি মামলায় আদালত রায় দিয়েছিলেন যে, ব্যবহারকারীদের আসক্ত করে তোলার মতো প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার জন্য মেটাকে দায়ী করা যেতে পারে।