লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১১:২৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মিয়ানমারে সার পাচার ঠেকাতে কোস্ট গার্ডের ‘অপারেশন সার সুরক্ষা’

দেশে সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকার পরও বিভিন্ন এলাকায় কৃত্রিম সংকট দেখা দিয়েছে, যা নিয়ে কৃষকদের মধ্যে বিক্ষোভ ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, আমদানি ও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সারের একটি বড় অংশ বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে গত দুই মাস ধরে মিয়ানমারে পাচার করা হচ্ছে। এই চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে এখন উপকূলজুড়ে ‘অপারেশন সার সুরক্ষা’ নামে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে সারের দামের বিশাল ব্যবধানই মূলত এই চোরাচালানের মূল কারণ। দেশের বাজারে ৫০ কেজির এক বস্তা ইউরিয়া সারের ডিলার পর্যায়ের দাম ১,২৫০ টাকা এবং কৃষক পর্যায়ে ১,৩৫০ টাকা হলেও মিয়ানমারে তা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৯,০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চোরাকারবারিরা সাধারণত একটি কাঠের বোট বা মাছ ধরার নৌকায় প্রায় এক হাজার বস্তা সার পাচার করে। বাংলাদেশে এই পরিমাণ সারের বাজারমূল্য সাড়ে ১২ লাখ টাকা হলেও মিয়ানমারে তা বিক্রি হচ্ছে ৯০ লাখ টাকায়। ক্ষেত্রবিশেষে এর চেয়েও বেশি দাম পাওয়া যায় বলে জানা গেছে।

সার পাচারের ক্ষেত্রে দুই দেশের সিন্ডিকেটের মধ্যে অগ্রিম অর্থ লেনদেনের এক অভিনব কৌশল গড়ে উঠেছে। এক হাজার বস্তা সারের একটি চালানের জন্য মিয়ানমারের সিন্ডিকেট বাংলাদেশি চোরাকারবারিদের ৯০ লাখ টাকা অগ্রিম দেয়। এই অগ্রিম অর্থের নিরাপত্তা হিসেবে একটি খালি বোট এবং একজন মাঝিকে মিয়ানমারে জিম্মি বা জামিন হিসেবে রেখে আসতে হয়। সার নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার পর বোট ও মাঝিকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। সম্প্রতি মিয়ানমার থেকে ফিরে আসা বাঁশখালীর এক তরুণ মাঝি জানান, চট্টগ্রামের মাঝিরঘাট থেকে সার বোঝাই করে মিরসরাই উপকূল হয়ে তারা মিয়ানমারে পৌঁছান। সার খালাসের পর তাকে ও একটি ট্রলারকে সেখানে রেখে বাকিরা চলে আসে। পরবর্তী চালানের অগ্রিম নিয়ে তারা চলে আসলেও কোস্ট গার্ডের অভিযানের কারণে পরবর্তী চালানটি আটকে যাওয়ায় ওই মাঝিকে এক সপ্তাহের বেশি সময় মিয়ানমারে আটকে থাকতে হয়েছিল।

কোস্ট গার্ডের তথ্যমতে, মিয়ানমারের রাখাইন, চিন ও মংডু অঞ্চলে চলমান সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সেখানে বাংলাদেশি পণ্যের বিশেষ করে সার ও নির্মাণসামগ্রীর চাহিদা ব্যাপক বেড়েছে। চোরাকারবারিরা চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিভিন্ন উপকূলীয় ঘাট থেকে সার সংগ্রহ করে গভীর সাগরের রুট ব্যবহার করে মিয়ানমারে নিয়ে যাচ্ছে। সড়কপথে সীতাকুণ্ড, মিরসরাই ও নোয়াখালীর বিভিন্ন ঘাটে সার এনে সেখান থেকে বোটে তোলা হয়। বিশেষ করে টেকনাফ, উখিয়া, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, সীতাকুণ্ড ও মিরসরাইয়ের উপকূলীয় এলাকাগুলো এই পাচারের ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

কোস্ট গার্ড পূর্ব জোন জানিয়েছে, গত জুলাই থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অভিযানে ২৫৫ টন সার জব্দ করা হয়েছে। এই সময়ে ৯৫ জন চোরাকারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট থানায় ১৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, সার চোরাচালান প্রতিরোধের আইন দুর্বল হওয়ায় আটকরা সহজেই পার পেয়ে যায়। অনেক সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত সামান্য জরিমানা করে আসামিদের ছেড়ে দেয়।

সবশেষ গত ২৫ সেপ্টেম্বর মিরসরাইয়ের ইছাখালী ঘাটে অভিযান চালিয়ে ৯৬০ বস্তা ইউরিয়াসহ চারটি ট্রাক, একটি ফিশিং বোট ও তিন চোরাকারবারিকে আটক করে কোস্ট গার্ড। মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমাইয়া আক্তার জানান, আটক তিনজন শ্রমিক হওয়ায় যাচাই-বাছাই করে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং জব্দ করা সার স্পটে নিলামে বিক্রি করে টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। ট্রাক ও বোটটি এখনো প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর আগে ১০ সেপ্টেম্বর সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ঘাটে অভিযান চালিয়ে ৭০০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করা হয়েছিল।

ব্যবসায়ীদের দাবি, মাদক পাচারের পুরোনো নেটওয়ার্ক ও যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে এখন নিত্যনতুন কৌশলে সার পাচার করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন চট্টগ্রাম ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম খান বলেন, মাদার ভেসেল থেকে খালাসের পর সার আমদানিকারকের গুদামে যায় এবং সেখান থেকে ডিলারদের অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু এক বস্তা সারে সাত হাজার টাকার বেশি লাভ থাকায় মাঝপথ থেকেই তা মিয়ানমারে পাচার করে দেওয়া হচ্ছে। এটি বন্ধ করা না গেলে দেশের বাজারে সংকট আরও তীব্র হবে।

চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, ফসল উৎপাদনের জন্য সময়মতো সার সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। সারের ঘাটতি হলে নিত্যপণ্যের বাজারে এর প্রভাব পড়তে পারে। তাই তৃণমূল পর্যায়ে প্রশাসনের তদারকি বাড়ানো উচিত। কৃষি বিভাগও অন্যান্য প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে ডিলারদের গুদামে সারের মজুত পর্যবেক্ষণসহ নজরদারি জোরদার করছে বলে তিনি জানান।

জনপ্রিয় সংবাদ

দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর অবস্থানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

মিয়ানমারে সার পাচার ঠেকাতে কোস্ট গার্ডের ‘অপারেশন সার সুরক্ষা’

প্রকাশিত হয়েছে: ০৪:৩৫:০৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬

দেশে সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকার পরও বিভিন্ন এলাকায় কৃত্রিম সংকট দেখা দিয়েছে, যা নিয়ে কৃষকদের মধ্যে বিক্ষোভ ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, আমদানি ও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সারের একটি বড় অংশ বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে গত দুই মাস ধরে মিয়ানমারে পাচার করা হচ্ছে। এই চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে এখন উপকূলজুড়ে ‘অপারেশন সার সুরক্ষা’ নামে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে সারের দামের বিশাল ব্যবধানই মূলত এই চোরাচালানের মূল কারণ। দেশের বাজারে ৫০ কেজির এক বস্তা ইউরিয়া সারের ডিলার পর্যায়ের দাম ১,২৫০ টাকা এবং কৃষক পর্যায়ে ১,৩৫০ টাকা হলেও মিয়ানমারে তা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৯,০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চোরাকারবারিরা সাধারণত একটি কাঠের বোট বা মাছ ধরার নৌকায় প্রায় এক হাজার বস্তা সার পাচার করে। বাংলাদেশে এই পরিমাণ সারের বাজারমূল্য সাড়ে ১২ লাখ টাকা হলেও মিয়ানমারে তা বিক্রি হচ্ছে ৯০ লাখ টাকায়। ক্ষেত্রবিশেষে এর চেয়েও বেশি দাম পাওয়া যায় বলে জানা গেছে।

সার পাচারের ক্ষেত্রে দুই দেশের সিন্ডিকেটের মধ্যে অগ্রিম অর্থ লেনদেনের এক অভিনব কৌশল গড়ে উঠেছে। এক হাজার বস্তা সারের একটি চালানের জন্য মিয়ানমারের সিন্ডিকেট বাংলাদেশি চোরাকারবারিদের ৯০ লাখ টাকা অগ্রিম দেয়। এই অগ্রিম অর্থের নিরাপত্তা হিসেবে একটি খালি বোট এবং একজন মাঝিকে মিয়ানমারে জিম্মি বা জামিন হিসেবে রেখে আসতে হয়। সার নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার পর বোট ও মাঝিকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। সম্প্রতি মিয়ানমার থেকে ফিরে আসা বাঁশখালীর এক তরুণ মাঝি জানান, চট্টগ্রামের মাঝিরঘাট থেকে সার বোঝাই করে মিরসরাই উপকূল হয়ে তারা মিয়ানমারে পৌঁছান। সার খালাসের পর তাকে ও একটি ট্রলারকে সেখানে রেখে বাকিরা চলে আসে। পরবর্তী চালানের অগ্রিম নিয়ে তারা চলে আসলেও কোস্ট গার্ডের অভিযানের কারণে পরবর্তী চালানটি আটকে যাওয়ায় ওই মাঝিকে এক সপ্তাহের বেশি সময় মিয়ানমারে আটকে থাকতে হয়েছিল।

কোস্ট গার্ডের তথ্যমতে, মিয়ানমারের রাখাইন, চিন ও মংডু অঞ্চলে চলমান সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সেখানে বাংলাদেশি পণ্যের বিশেষ করে সার ও নির্মাণসামগ্রীর চাহিদা ব্যাপক বেড়েছে। চোরাকারবারিরা চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিভিন্ন উপকূলীয় ঘাট থেকে সার সংগ্রহ করে গভীর সাগরের রুট ব্যবহার করে মিয়ানমারে নিয়ে যাচ্ছে। সড়কপথে সীতাকুণ্ড, মিরসরাই ও নোয়াখালীর বিভিন্ন ঘাটে সার এনে সেখান থেকে বোটে তোলা হয়। বিশেষ করে টেকনাফ, উখিয়া, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, সীতাকুণ্ড ও মিরসরাইয়ের উপকূলীয় এলাকাগুলো এই পাচারের ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

কোস্ট গার্ড পূর্ব জোন জানিয়েছে, গত জুলাই থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অভিযানে ২৫৫ টন সার জব্দ করা হয়েছে। এই সময়ে ৯৫ জন চোরাকারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট থানায় ১৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, সার চোরাচালান প্রতিরোধের আইন দুর্বল হওয়ায় আটকরা সহজেই পার পেয়ে যায়। অনেক সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত সামান্য জরিমানা করে আসামিদের ছেড়ে দেয়।

সবশেষ গত ২৫ সেপ্টেম্বর মিরসরাইয়ের ইছাখালী ঘাটে অভিযান চালিয়ে ৯৬০ বস্তা ইউরিয়াসহ চারটি ট্রাক, একটি ফিশিং বোট ও তিন চোরাকারবারিকে আটক করে কোস্ট গার্ড। মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমাইয়া আক্তার জানান, আটক তিনজন শ্রমিক হওয়ায় যাচাই-বাছাই করে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং জব্দ করা সার স্পটে নিলামে বিক্রি করে টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। ট্রাক ও বোটটি এখনো প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর আগে ১০ সেপ্টেম্বর সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ঘাটে অভিযান চালিয়ে ৭০০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করা হয়েছিল।

ব্যবসায়ীদের দাবি, মাদক পাচারের পুরোনো নেটওয়ার্ক ও যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে এখন নিত্যনতুন কৌশলে সার পাচার করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন চট্টগ্রাম ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম খান বলেন, মাদার ভেসেল থেকে খালাসের পর সার আমদানিকারকের গুদামে যায় এবং সেখান থেকে ডিলারদের অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু এক বস্তা সারে সাত হাজার টাকার বেশি লাভ থাকায় মাঝপথ থেকেই তা মিয়ানমারে পাচার করে দেওয়া হচ্ছে। এটি বন্ধ করা না গেলে দেশের বাজারে সংকট আরও তীব্র হবে।

চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, ফসল উৎপাদনের জন্য সময়মতো সার সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। সারের ঘাটতি হলে নিত্যপণ্যের বাজারে এর প্রভাব পড়তে পারে। তাই তৃণমূল পর্যায়ে প্রশাসনের তদারকি বাড়ানো উচিত। কৃষি বিভাগও অন্যান্য প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে ডিলারদের গুদামে সারের মজুত পর্যবেক্ষণসহ নজরদারি জোরদার করছে বলে তিনি জানান।