লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০১:৪৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পোশাক কারখানায় ভূত আতঙ্কের নেপথ্যে পুষ্টিহীনতা ও মানসিক চাপ

নারায়ণগঞ্জের আদমজী ইপিজেডের অনন্ত গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সেল ম্যানসওয়্যারে গত ২২ আগস্ট দুপুরের খাবারের বিরতির পর স্বাভাবিকভাবে কাজ চলছিল। হঠাৎ তৃতীয় তলার এক নারী শ্রমিক ‘ভূত’ বলে চিৎকার দিয়ে অচেতন হয়ে পড়েন। এরপর কারখানাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং তৃতীয় তলার পাশাপাশি দ্বিতীয় তলাতেও একে একে অসুস্থ হয়ে পড়েন অর্ধশত শ্রমিক। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কারখানা কর্তৃপক্ষ ছুটি ঘোষণা করে। পরদিন সকালেও একই ঘটনা ঘটলে ওই দিনও ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।

তবে পোশাক খাতে এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। গত এক দশকে এ ধরনের অন্তত ১১টি ঘটনা ঘটেছে। এর আগে ২০০৮ সালে একই ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল একাধিক কারখানায়, যা অন্য যেকোনো বছরের তুলনায় বেশি। ঘটনাগুলো বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব কারখানা তুলনামূলক বড় এবং সেখানকার কর্মপরিবেশসহ বিভিন্ন বিষয় বিদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা নিয়মিত তদারকি করেন।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোথাও বাথরুমে ভূত দেখার গুজব ছড়িয়েছে, কোথাও ‘জিনে ধরেছে’ বলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আবার কোথাও একজন শ্রমিক অসুস্থ হওয়ার পর একে একে আরও কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, সত্যিই কি পোশাক কারখানায় ভূত দেখা যাচ্ছে, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো বাস্তবসম্মত কারণ রয়েছে।

সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, নারী পোশাকশ্রমিকেরা শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় ভোগেন। কম মজুরির কারণে মাসের অধিকাংশ দিন পুষ্টিকর খাবার খেতে পারেন না তাঁরা। আবার পারিবারিক সংকটের কারণে অনেকে মানসিক চাপে থাকেন এবং অনেক সময় অসুস্থ শরীর নিয়েও কাজ করেন। ফলে কাজের চাপে তাঁরা কারখানায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেই সুযোগে সুযোগসন্ধানী এক বা একাধিক পক্ষ আতঙ্ক ছড়িয়ে থাকতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।

ভূত বা জিন আতঙ্কে শ্রমিক অসুস্থ হওয়ার ঘটনার অনেকগুলোর সূচনা বাথরুম থেকে। শুরুতে কোনো একজন শ্রমিক অসুস্থ বা অচেতন হয়ে পড়েন, এরপর ছড়িয়ে পড়ে ভূত বা ‘জিনে ধরার’ গুজব এবং একে একে অসুস্থ হতে থাকেন আরও কয়েকজন শ্রমিক। তবে চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রাথমিক চিকিৎসায় এসব অসুস্থতা সেরে যায়।

এক দশকে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর মধ্যে ২০১৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সাভারের রাজফুলবাড়িয়া এলাকায় একেএইচ ডায়িং অ্যান্ড নিটিং কারখানার সম্প্রসারিত ভবনটি শ্মশানের জায়গার ওপর নির্মিত হয়েছে—এমন গুজব ছড়িয়ে পড়লে অর্ধশত নারী শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁরা মাথাব্যথা, বুকব্যথা ও বমি ভাব নিয়ে হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসাও নেন এবং সেদিন কারখানা কর্তৃপক্ষ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে।

২০১৬ সালের আগস্টে ঢাকার আশুলিয়ার নরসিংহপুরের ডেকো ডিজাইন নামের কারখানায় দুপুরের খাবারের পর কয়েকজন শ্রমিক বাথরুমে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ খবর জানাজানির পর কারখানার ছয়তলা ভবনের বিভিন্ন তলার শ্রমিকদের মধ্যে ভূত আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং আরও বেশ কিছু শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁদের মধ্যে ৪৯ জন শ্রমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। পরদিনও কারখানাটিতে ভূত আতঙ্কে কয়েকজন শ্রমিকের অসুস্থ হওয়ার ঘটনা ঘটে।

ওই বছরের ২৪ ডিসেম্বর দুপুরে গাজীপুরের ইউটাহ নিটিং অ্যান্ড ডায়িং কারখানার একজন শ্রমিক অসুস্থ হন। এরপর তাঁকে ‘জিনে’ ধরেছে বলে গুজব ছড়িয়ে পড়লে আরও কয়েকজন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁদের উপসর্গ ছিল পেটে ব্যথা, বমি ও মুখ দিয়ে লালা ঝরা। কারখানার ২৫ জন অসুস্থ শ্রমিককে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ আশপাশের ক্লিনিকে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

গত বছরের ১৩ মার্চ সকালে গাজীপুরের এসপি গার্মেন্টস অ্যান্ড ওয়াশিং কারখানার বাথরুমে ভূত রয়েছে—এমন আতঙ্কে ১০-১৫ শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। এমন পরিস্থিতিতে বেলা ১১টায় সেদিনের মতো কারখানা ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। এই ঘটনার চার দিন পর জিন আতঙ্কে আবার ১৩ জন শ্রমিক অসুস্থ হন এবং তাঁদের স্থানীয় একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসা দিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দেয় কর্তৃপক্ষ।

গত বছরের ১৯ মার্চ গাজীপুরের গোল্ডেন রিফিট গার্মেন্টস কারখানায় জিন আতঙ্কে অর্ধশত শ্রমিকের অসুস্থ হওয়ার ঘটনা ঘটে। চলতি বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি দিনাজপুরের নর্থ হেয়ার প্রোডাক্ট কারখানায় ভূত আতঙ্কে ৯ জন শ্রমিক অসুস্থ হলে তাঁদের দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। টঙ্গীর গাজীপুরা এলাকার হপলুন অ্যাপারেলস কারখানায় গত জুলাইয়ে একই ধরনের ঘটনায় ৬০ জনের মতো শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং কারখানাজুড়ে ভূত আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কারখানায় মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করে কর্তৃপক্ষ এবং এই ঘটনায় দুই দিন কারখানাও বন্ধ ছিল।

গত মে মাসের প্রথম সপ্তাহে আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে নিউএইজ গ্রুপের একটি কারখানার বাথরুমে দুজন নারী শ্রমিক অজ্ঞান হয়ে পড়েন। এরপর জিন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে আরও কয়েকজন শ্রমিক অসুস্থ হন এবং কয়েক দিন একই সমস্যা চলতে থাকে। এক দিন জিন তাড়াতে কারখানায় মিলাদ দেওয়া হয়, সেই মিলাদের পর আরও বেশ কয়েকজন শ্রমিক অসুস্থ হন। পরে আরেক দিন তান্ত্রিক এনে কারখানা ঝাড়ফুঁকও করানো হয়। সব মিলিয়ে কারখানাটির ১৭২ জন শ্রমিক শরীর দুর্বলতা, চোখে ঝাপসা দেখা ও মাথা ঘোরানোর সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। তাঁদের কয়েক দিন ছুটিতে রাখে কর্তৃপক্ষ এবং কারখানাও দুই দিন বন্ধ রাখা হয়। এরপর কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নতি হতে থাকে।

বিষয়টি নিয়ে নিউ এইজ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহিম প্রথম আলোকে বলেন, গত মে মাসে তাঁদের গ্রুপের কারখানাটির উৎপাদন সব মিলিয়ে ৬-৭ দিন ব্যাহত হয়েছে।

বাংলাদেশে পোশাকশিল্পের গোড়াপত্তন হয় আশির দশকের শুরুতে এবং পরের দশকে শ্রমঘন এই শিল্পের দ্রুত বিকাশ ঘটে। সেই সময় থেকেই পোশাক কারখানায় ভূত আতঙ্কের ঘটনা ঘটছে বলে জানান বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার।

নিউ এইজ গ্রুপের কারখানায় জিন আতঙ্কের ঘটনার সূত্রপাতও বাথরুম থেকে হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রথম যে দুজন নারী শ্রমিক বাথরুমে গিয়ে অসুস্থ হয়েছিলেন, তাঁদের একজনকে হাসপাতালে চিকিৎসক পরীক্ষা করে দেখেন তাঁর রক্তে সুগারের পরিমাণ অনেক বেশি, সে কারণে তিনি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। আরেকজন নারী শ্রমিক আগে থেকেই অসুস্থ ছিলেন।

অন্যদিকে গত মাসে ইউনিভার্সেল ম্যানসওয়্যারের কারখানায় ভূত দেখার যে ঘটনা ঘটে, সেটি বাথরুম থেকে নয়। এ বিষয়ে কারখানার মহাব্যবস্থাপক বিল্লাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের কারখানায় অসুস্থ হয়েছিলেন এমন ৮-৯ জনকে আমরা বেপজার হাসপাতালে নিয়েছিলাম। সেখানে তাঁরা আধা ঘণ্টার মধ্যেই সুস্থ হয়ে যান।’

বাবুল আখতার বলেন, মূলত ৩-৪টি কারণে এমন ঘটনা ঘটছে। শ্রমিকদের মধ্যে হতাশা থাকে, অনেকে পুষ্টিহীনতায় ভোগেন। আবার শারীরিক দুর্বলতার কারণেও অনেক সময় শ্রমিকেরা মাথা ঘুরে বাথরুমে পড়ে যান। এ ছাড়া শ্রমিকদের মধ্যে কুসংস্কার ও গুজব বিশ্বাস করার প্রবণতাও রয়েছে। আবার একটি স্বার্থান্বেষী মহলও কারও কারও অসুস্থতার সুযোগকে নানাভাবে কাজে লাগান।

এই শ্রমিকনেতা আরও বলেন, শ্রমিকদের কাউন্সেলিং দরকার। এ ছাড়া কারখানায় রেস্টরুম থাকা দরকার, যাতে কেউ অসুস্থ হলে বিশ্রাম নিতে পারেন। আবার শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। একই সঙ্গে শ্রমিকের মানসম্মত জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় মজুরি দিতে হবে।

পোশাকশিল্পে বর্তমানে ন্যূনতম মজুরি সাড়ে ১২ হাজার টাকা। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে এই মজুরিকাঠামো কার্যকরের আগে ন্যূনতম মজুরি ছিল ৮ হাজার টাকা। মজুরি কম হওয়ায় বাড়তি আয়ের জন্য শ্রমিকদের মধ্যে ওভারটাইম বা অতিরিক্ত কাজ করার প্রবণতাও রয়েছে, যাতে অতিরিক্ত কাজের চাপে শ্রমিকদের মানসিক ও শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়।

কম মজুরির কারণে শ্রমিকেরা প্রতিদিন প্রয়োজনীয় ক্যালরি গ্রহণ করতে পারছেন কি না, এমন প্রশ্নে নিট পোশাক শিল্পমালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, পোশাক কারখানার হেলপাররা মাসে ওভারটাইমসহ ১৪-১৫ হাজার টাকা আয় করেন এবং অপারেটররা আয় করেন ১৭-১৮ হাজার টাকা। ফলে তাঁদের প্রয়োজনীয় ক্যালরি গ্রহণে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তিনি বলেন, ভূত বা জিন আতঙ্কের বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। এটি পুরোপুরি শ্রমিকদের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়।

পোশাকশিল্প মালিকদের অনেকের ধারণা, কারখানায় ভূত বা জিন আতঙ্কের পেছনে একটি চক্র রয়েছে, তারা ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন কারখানাকে টার্গেট করে এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। মালিকপক্ষের কয়েকজনের অভিযোগ, এর পেছনে পরিকল্পিতভাবে আতঙ্ক ছড়িয়ে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত করার চেষ্টা থাকতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

গত ১৮ জুন গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা এলাকায় ড্রেসম্যান লিমিটেড নামের কারখানায় শতাধিক শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। সকালে কাজে যোগ দেওয়ার পর কারখানার সরবরাহ করা পানি পান করেন শ্রমিকেরা। কিছুক্ষণ পর তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের বমি, পেটব্যথা, মাথা ঘোরানো, দুর্বলতা ও শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দেয়। একপর্যায়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং অসুস্থ শ্রমিকের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। পরে কারখানা কর্তৃপক্ষ অসুস্থ শ্রমিকদের কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও আশপাশের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে পাঠায়।

এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মাশেদ রুম্মান আবদুল্লাহ বলেন, ‘কারখানার পানি আমরা ছাড়াও আমাদের ক্রেতা প্রতিষ্ঠান আলাদাভাবে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করিয়েছে। পানিতে কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি। একজন শ্রমিক কোনো কারণে অসুস্থ হওয়ার পর তা অন্যদের মধ্যেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া অতীতে অনেক কারখানার বাথরুম থেকে “ভূত” আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। সে জন্য আমরা আমাদের বাথরুমে প্রবেশের আগে দেয়ালে আরবি ও বাংলায় দোয়া লিখে রেখেছি।’

তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘কেউ না কেউ এসব ঘটনার পেছনে রয়েছে। তবে কারা, সেটি আমরা খুঁজে বের করতে পারিনি। যেসব কারখানায় এসব ঘটনা ঘটে, সেগুলো আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে।’ তিনি আরও বলেন, কারখানায় ভূত বলে কিছু নেই এবং এসব ঘটনা বন্ধে ব্যাপক সচেতনতা দরকার।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের সাইকিয়াট্রি বিভাগের অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, কোনো মানুষের মাথা ঘোরানো, বমি ভাব, পেটব্যথার উপসর্গগুলোকে মনোরোগ চিকিৎসার ভাষায় কনভারশন ডিজঅর্ডার বলা হয়। যখন এই উপসর্গ একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়ায়, সেটিকে মাস সাইকোজেনিক ইলনেস বা গণমনস্তাত্ত্বিক রোগ বলা হয়। এ ধরনের ঘটনা স্কুল, হোস্টেল, কারখানায় ঘটে থাকে।

হেলাল উদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, মানুষ ইচ্ছা করে এসব করে না। মানসিক চাপ, পারিবারিক ও সামাজিক দ্বন্দ্বের কারণে কনভারশন ডিজঅর্ডার হয়। এমন লক্ষণ দেখা দিলে মানসিক চিকিৎসাসেবা দিতে হবে। এ ধরনের সমস্যা প্রতিরোধের উপায় হচ্ছে কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। একমাত্র মানসিক যত্নই এ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

‎রোগীর অপেক্ষায় তালাবদ্ধ স্বাস্থ্যকেন্দ্র, দুই মাসেও খোলেনি ধনীপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিক!

পোশাক কারখানায় ভূত আতঙ্কের নেপথ্যে পুষ্টিহীনতা ও মানসিক চাপ

প্রকাশিত হয়েছে: ০৬:০২:১৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নারায়ণগঞ্জের আদমজী ইপিজেডের অনন্ত গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সেল ম্যানসওয়্যারে গত ২২ আগস্ট দুপুরের খাবারের বিরতির পর স্বাভাবিকভাবে কাজ চলছিল। হঠাৎ তৃতীয় তলার এক নারী শ্রমিক ‘ভূত’ বলে চিৎকার দিয়ে অচেতন হয়ে পড়েন। এরপর কারখানাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং তৃতীয় তলার পাশাপাশি দ্বিতীয় তলাতেও একে একে অসুস্থ হয়ে পড়েন অর্ধশত শ্রমিক। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কারখানা কর্তৃপক্ষ ছুটি ঘোষণা করে। পরদিন সকালেও একই ঘটনা ঘটলে ওই দিনও ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।

তবে পোশাক খাতে এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। গত এক দশকে এ ধরনের অন্তত ১১টি ঘটনা ঘটেছে। এর আগে ২০০৮ সালে একই ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল একাধিক কারখানায়, যা অন্য যেকোনো বছরের তুলনায় বেশি। ঘটনাগুলো বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব কারখানা তুলনামূলক বড় এবং সেখানকার কর্মপরিবেশসহ বিভিন্ন বিষয় বিদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা নিয়মিত তদারকি করেন।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোথাও বাথরুমে ভূত দেখার গুজব ছড়িয়েছে, কোথাও ‘জিনে ধরেছে’ বলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আবার কোথাও একজন শ্রমিক অসুস্থ হওয়ার পর একে একে আরও কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, সত্যিই কি পোশাক কারখানায় ভূত দেখা যাচ্ছে, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো বাস্তবসম্মত কারণ রয়েছে।

সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, নারী পোশাকশ্রমিকেরা শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় ভোগেন। কম মজুরির কারণে মাসের অধিকাংশ দিন পুষ্টিকর খাবার খেতে পারেন না তাঁরা। আবার পারিবারিক সংকটের কারণে অনেকে মানসিক চাপে থাকেন এবং অনেক সময় অসুস্থ শরীর নিয়েও কাজ করেন। ফলে কাজের চাপে তাঁরা কারখানায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেই সুযোগে সুযোগসন্ধানী এক বা একাধিক পক্ষ আতঙ্ক ছড়িয়ে থাকতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।

ভূত বা জিন আতঙ্কে শ্রমিক অসুস্থ হওয়ার ঘটনার অনেকগুলোর সূচনা বাথরুম থেকে। শুরুতে কোনো একজন শ্রমিক অসুস্থ বা অচেতন হয়ে পড়েন, এরপর ছড়িয়ে পড়ে ভূত বা ‘জিনে ধরার’ গুজব এবং একে একে অসুস্থ হতে থাকেন আরও কয়েকজন শ্রমিক। তবে চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রাথমিক চিকিৎসায় এসব অসুস্থতা সেরে যায়।

এক দশকে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর মধ্যে ২০১৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সাভারের রাজফুলবাড়িয়া এলাকায় একেএইচ ডায়িং অ্যান্ড নিটিং কারখানার সম্প্রসারিত ভবনটি শ্মশানের জায়গার ওপর নির্মিত হয়েছে—এমন গুজব ছড়িয়ে পড়লে অর্ধশত নারী শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁরা মাথাব্যথা, বুকব্যথা ও বমি ভাব নিয়ে হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসাও নেন এবং সেদিন কারখানা কর্তৃপক্ষ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে।

২০১৬ সালের আগস্টে ঢাকার আশুলিয়ার নরসিংহপুরের ডেকো ডিজাইন নামের কারখানায় দুপুরের খাবারের পর কয়েকজন শ্রমিক বাথরুমে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ খবর জানাজানির পর কারখানার ছয়তলা ভবনের বিভিন্ন তলার শ্রমিকদের মধ্যে ভূত আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং আরও বেশ কিছু শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁদের মধ্যে ৪৯ জন শ্রমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। পরদিনও কারখানাটিতে ভূত আতঙ্কে কয়েকজন শ্রমিকের অসুস্থ হওয়ার ঘটনা ঘটে।

ওই বছরের ২৪ ডিসেম্বর দুপুরে গাজীপুরের ইউটাহ নিটিং অ্যান্ড ডায়িং কারখানার একজন শ্রমিক অসুস্থ হন। এরপর তাঁকে ‘জিনে’ ধরেছে বলে গুজব ছড়িয়ে পড়লে আরও কয়েকজন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁদের উপসর্গ ছিল পেটে ব্যথা, বমি ও মুখ দিয়ে লালা ঝরা। কারখানার ২৫ জন অসুস্থ শ্রমিককে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ আশপাশের ক্লিনিকে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

গত বছরের ১৩ মার্চ সকালে গাজীপুরের এসপি গার্মেন্টস অ্যান্ড ওয়াশিং কারখানার বাথরুমে ভূত রয়েছে—এমন আতঙ্কে ১০-১৫ শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। এমন পরিস্থিতিতে বেলা ১১টায় সেদিনের মতো কারখানা ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। এই ঘটনার চার দিন পর জিন আতঙ্কে আবার ১৩ জন শ্রমিক অসুস্থ হন এবং তাঁদের স্থানীয় একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসা দিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দেয় কর্তৃপক্ষ।

গত বছরের ১৯ মার্চ গাজীপুরের গোল্ডেন রিফিট গার্মেন্টস কারখানায় জিন আতঙ্কে অর্ধশত শ্রমিকের অসুস্থ হওয়ার ঘটনা ঘটে। চলতি বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি দিনাজপুরের নর্থ হেয়ার প্রোডাক্ট কারখানায় ভূত আতঙ্কে ৯ জন শ্রমিক অসুস্থ হলে তাঁদের দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। টঙ্গীর গাজীপুরা এলাকার হপলুন অ্যাপারেলস কারখানায় গত জুলাইয়ে একই ধরনের ঘটনায় ৬০ জনের মতো শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং কারখানাজুড়ে ভূত আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কারখানায় মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করে কর্তৃপক্ষ এবং এই ঘটনায় দুই দিন কারখানাও বন্ধ ছিল।

গত মে মাসের প্রথম সপ্তাহে আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে নিউএইজ গ্রুপের একটি কারখানার বাথরুমে দুজন নারী শ্রমিক অজ্ঞান হয়ে পড়েন। এরপর জিন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে আরও কয়েকজন শ্রমিক অসুস্থ হন এবং কয়েক দিন একই সমস্যা চলতে থাকে। এক দিন জিন তাড়াতে কারখানায় মিলাদ দেওয়া হয়, সেই মিলাদের পর আরও বেশ কয়েকজন শ্রমিক অসুস্থ হন। পরে আরেক দিন তান্ত্রিক এনে কারখানা ঝাড়ফুঁকও করানো হয়। সব মিলিয়ে কারখানাটির ১৭২ জন শ্রমিক শরীর দুর্বলতা, চোখে ঝাপসা দেখা ও মাথা ঘোরানোর সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। তাঁদের কয়েক দিন ছুটিতে রাখে কর্তৃপক্ষ এবং কারখানাও দুই দিন বন্ধ রাখা হয়। এরপর কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নতি হতে থাকে।

বিষয়টি নিয়ে নিউ এইজ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহিম প্রথম আলোকে বলেন, গত মে মাসে তাঁদের গ্রুপের কারখানাটির উৎপাদন সব মিলিয়ে ৬-৭ দিন ব্যাহত হয়েছে।

বাংলাদেশে পোশাকশিল্পের গোড়াপত্তন হয় আশির দশকের শুরুতে এবং পরের দশকে শ্রমঘন এই শিল্পের দ্রুত বিকাশ ঘটে। সেই সময় থেকেই পোশাক কারখানায় ভূত আতঙ্কের ঘটনা ঘটছে বলে জানান বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার।

নিউ এইজ গ্রুপের কারখানায় জিন আতঙ্কের ঘটনার সূত্রপাতও বাথরুম থেকে হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রথম যে দুজন নারী শ্রমিক বাথরুমে গিয়ে অসুস্থ হয়েছিলেন, তাঁদের একজনকে হাসপাতালে চিকিৎসক পরীক্ষা করে দেখেন তাঁর রক্তে সুগারের পরিমাণ অনেক বেশি, সে কারণে তিনি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। আরেকজন নারী শ্রমিক আগে থেকেই অসুস্থ ছিলেন।

অন্যদিকে গত মাসে ইউনিভার্সেল ম্যানসওয়্যারের কারখানায় ভূত দেখার যে ঘটনা ঘটে, সেটি বাথরুম থেকে নয়। এ বিষয়ে কারখানার মহাব্যবস্থাপক বিল্লাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের কারখানায় অসুস্থ হয়েছিলেন এমন ৮-৯ জনকে আমরা বেপজার হাসপাতালে নিয়েছিলাম। সেখানে তাঁরা আধা ঘণ্টার মধ্যেই সুস্থ হয়ে যান।’

বাবুল আখতার বলেন, মূলত ৩-৪টি কারণে এমন ঘটনা ঘটছে। শ্রমিকদের মধ্যে হতাশা থাকে, অনেকে পুষ্টিহীনতায় ভোগেন। আবার শারীরিক দুর্বলতার কারণেও অনেক সময় শ্রমিকেরা মাথা ঘুরে বাথরুমে পড়ে যান। এ ছাড়া শ্রমিকদের মধ্যে কুসংস্কার ও গুজব বিশ্বাস করার প্রবণতাও রয়েছে। আবার একটি স্বার্থান্বেষী মহলও কারও কারও অসুস্থতার সুযোগকে নানাভাবে কাজে লাগান।

এই শ্রমিকনেতা আরও বলেন, শ্রমিকদের কাউন্সেলিং দরকার। এ ছাড়া কারখানায় রেস্টরুম থাকা দরকার, যাতে কেউ অসুস্থ হলে বিশ্রাম নিতে পারেন। আবার শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। একই সঙ্গে শ্রমিকের মানসম্মত জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় মজুরি দিতে হবে।

পোশাকশিল্পে বর্তমানে ন্যূনতম মজুরি সাড়ে ১২ হাজার টাকা। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে এই মজুরিকাঠামো কার্যকরের আগে ন্যূনতম মজুরি ছিল ৮ হাজার টাকা। মজুরি কম হওয়ায় বাড়তি আয়ের জন্য শ্রমিকদের মধ্যে ওভারটাইম বা অতিরিক্ত কাজ করার প্রবণতাও রয়েছে, যাতে অতিরিক্ত কাজের চাপে শ্রমিকদের মানসিক ও শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়।

কম মজুরির কারণে শ্রমিকেরা প্রতিদিন প্রয়োজনীয় ক্যালরি গ্রহণ করতে পারছেন কি না, এমন প্রশ্নে নিট পোশাক শিল্পমালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, পোশাক কারখানার হেলপাররা মাসে ওভারটাইমসহ ১৪-১৫ হাজার টাকা আয় করেন এবং অপারেটররা আয় করেন ১৭-১৮ হাজার টাকা। ফলে তাঁদের প্রয়োজনীয় ক্যালরি গ্রহণে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তিনি বলেন, ভূত বা জিন আতঙ্কের বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। এটি পুরোপুরি শ্রমিকদের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়।

পোশাকশিল্প মালিকদের অনেকের ধারণা, কারখানায় ভূত বা জিন আতঙ্কের পেছনে একটি চক্র রয়েছে, তারা ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন কারখানাকে টার্গেট করে এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। মালিকপক্ষের কয়েকজনের অভিযোগ, এর পেছনে পরিকল্পিতভাবে আতঙ্ক ছড়িয়ে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত করার চেষ্টা থাকতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

গত ১৮ জুন গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা এলাকায় ড্রেসম্যান লিমিটেড নামের কারখানায় শতাধিক শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। সকালে কাজে যোগ দেওয়ার পর কারখানার সরবরাহ করা পানি পান করেন শ্রমিকেরা। কিছুক্ষণ পর তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের বমি, পেটব্যথা, মাথা ঘোরানো, দুর্বলতা ও শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দেয়। একপর্যায়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং অসুস্থ শ্রমিকের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। পরে কারখানা কর্তৃপক্ষ অসুস্থ শ্রমিকদের কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও আশপাশের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে পাঠায়।

এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মাশেদ রুম্মান আবদুল্লাহ বলেন, ‘কারখানার পানি আমরা ছাড়াও আমাদের ক্রেতা প্রতিষ্ঠান আলাদাভাবে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করিয়েছে। পানিতে কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি। একজন শ্রমিক কোনো কারণে অসুস্থ হওয়ার পর তা অন্যদের মধ্যেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া অতীতে অনেক কারখানার বাথরুম থেকে “ভূত” আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। সে জন্য আমরা আমাদের বাথরুমে প্রবেশের আগে দেয়ালে আরবি ও বাংলায় দোয়া লিখে রেখেছি।’

তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘কেউ না কেউ এসব ঘটনার পেছনে রয়েছে। তবে কারা, সেটি আমরা খুঁজে বের করতে পারিনি। যেসব কারখানায় এসব ঘটনা ঘটে, সেগুলো আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে।’ তিনি আরও বলেন, কারখানায় ভূত বলে কিছু নেই এবং এসব ঘটনা বন্ধে ব্যাপক সচেতনতা দরকার।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের সাইকিয়াট্রি বিভাগের অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, কোনো মানুষের মাথা ঘোরানো, বমি ভাব, পেটব্যথার উপসর্গগুলোকে মনোরোগ চিকিৎসার ভাষায় কনভারশন ডিজঅর্ডার বলা হয়। যখন এই উপসর্গ একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়ায়, সেটিকে মাস সাইকোজেনিক ইলনেস বা গণমনস্তাত্ত্বিক রোগ বলা হয়। এ ধরনের ঘটনা স্কুল, হোস্টেল, কারখানায় ঘটে থাকে।

হেলাল উদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, মানুষ ইচ্ছা করে এসব করে না। মানসিক চাপ, পারিবারিক ও সামাজিক দ্বন্দ্বের কারণে কনভারশন ডিজঅর্ডার হয়। এমন লক্ষণ দেখা দিলে মানসিক চিকিৎসাসেবা দিতে হবে। এ ধরনের সমস্যা প্রতিরোধের উপায় হচ্ছে কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। একমাত্র মানসিক যত্নই এ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে পারে।