লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৬:০৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নদীপথে বাড়ছে হত্যা, ডাকাতি ও চাঁদাবাজি, অভিযানে হামলায় জখম পুলিশও

দেশের বিস্তৃত নদীপথজুড়ে দিন দিন বেড়েই চলেছে হত্যা, ডাকাতি, অপহরণ, বালু উত্তোলন ও চাঁদাবাজির মতো মারাত্মক সব অপরাধ। পণ্যবাহী জাহাজ ও জেলেদের নৌকায় হামলার পাশাপাশি সন্ধ্যা নামলেই নদীগুলোতে তৈরি হচ্ছে চরম আতঙ্কের পরিবেশ। এসব অপরাধ দমনে টহল ও অভিযানে গিয়ে সশস্ত্র জলদস্যু ও চাঁদাবাজ চক্রের হামলার শিকার হতে হচ্ছে নৌ পুলিশের সদস্যদেরও। স্থলভাগের তুলনায় বিস্তৃত জলপথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় অপরাধীরা নদীপথকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিচ্ছে বলে মনে করছেন পুলিশ কর্মকর্তা ও মৎস্যজীবীরা।

নৌ পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের নৌপথকে ১১টি অঞ্চলে বিভক্ত করে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে দেশে প্রায় সাভার থেকে শুরু করে সাড়ে সাত হাজার কিলোমিটার নৌপথ সচল থাকে, যা শুষ্ক মৌসুমে কমে দাঁড়ায় চার হাজার ৫০০ কিলোমিটারে। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার পথে নিয়মিত নৌযান চলাচল করে। বিশাল এই জলসীমায় নজরদারির জন্য বর্তমানে নৌ পুলিশের ১২৪টি ফাঁড়ি রয়েছে।

পুলিশের নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নদীপথে অপরাধ সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা প্রতিবছরই বাড়ছে। ২০২৪ সালে ১১টি অঞ্চলে হত্যা, অপমৃত্যু, ডাকাতি, ছিনতাই, অস্ত্র ও মাদক বহন, চোরাই পণ্য পরিবহন, অবৈধ বালু উত্তোলন, অপহরণ ও চাঁদাবাজির ঘটনায় ২ হাজার ৮৫টি মামলা নথিভুক্ত হয়। পরের বছর ২০২৫ সালে মামলা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৩৯৯টিতে, যা এক বছরের ব্যবধানে ১ হাজার ৩১৪টি বেশি। এ ছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে কেবল হত্যা, ডাকাতি, দস্যুতা, অপহরণ ও অপমৃত্যুর ঘটনাতেই আরও ৫০৫টি মামলা হয়েছে। সব মিলিয়ে এই সময়কালে মোট মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৯৮৯টিতে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে চাঁদপুর অঞ্চলে। ২০২৪ সালে চাঁদপুরে ৮৫০টি মামলা থাকলেও পরের বছর তা লাফিয়ে ২ হাজার ১৭টিতে পৌঁছায়। দুই বছরই মামলার তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল বরিশাল অঞ্চল, যেখানে মামলা ৪৪৮টি থেকে বেড়ে ৬১১টি হয়। এ ছাড়া অন্য অঞ্চলগুলোর মধ্যে ২০২৪ সালে চট্টগ্রামে ১৮২, ঢাকায় ১২০, ফরিদপুরে ১১৩, নারায়ণগঞ্জে ১০৬, রাজশাহীতে ৯০, সিলেটে ৫৮, কিশোরগঞ্জে ৪৯, টাঙ্গাইলে ৩৫ ও খুলনায় ৩৪টি মামলা হয়। ২০২৫ সালে ফরিদপুরে ১৪৭, ঢাকায় ১২৮, রাজশাহীতে ১২১, চট্টগ্রামে ১১৮, নারায়ণগঞ্জে ৯১, টাঙ্গাইলে ৬৬, সিলেটে ৪৫, কিশোরগঞ্জে ৩০ এবং খুলনায় ২৫টি মামলা রেজিস্টার করা হয়। এর মধ্যে চাঁদপুর, বরিশাল, ফরিদপুর, ঢাকা, রাজশাহী ও টাঙ্গাইলে অপরাধ বাড়লেও নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কিশোরগঞ্জ, খুলনা ও সিলেটে মামলা কমেছে।

চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে কেবল হত্যা, ডাকাতি, অপহরণ, দস্যুতা ও অপমৃত্যু—এই পাঁচ প্রধান অপরাধে ঢাকা অঞ্চলে সর্বোচ্চ ৮৬টি মামলা হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৮২টি মামলা হয়েছে নারায়ণগঞ্জে। একই সময়ে বরিশাল ও রাজশাহীতে ৭০টি করে, ফরিদপুরে ৫৭টি, টাঙ্গাইলে ৩২টি, খুলনায় ৩০টি, চট্টগ্রাম ও কিশোরগঞ্জে ২৫টি করে, চাঁদপুরে ২২টি এবং সিলেটে ৬টি মামলা নথিভুক্ত করা হয়। নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন জানান, রাতের অন্ধকারে দূরবর্তী স্থান থেকে হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। আবার অন্য অঞ্চলের নদীর স্রোতে ভেসে আসা মরদেহও নারায়ণগঞ্জের নদীসীমানায় পাওয়া যায়।

নদীপথে জেলে ও নৌযান শ্রমিকেরা নিয়মিত সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। গত বছরের ১ ফেব্রুয়ারি রাতে ভোলা সদর উপজেলার পূর্ব ইলিশা ইউনিয়নের কাছে মেঘনা নদীতে মাছ ধরার সময় জলদস্যুরা জেলেদের ট্রলারে ডাকাতির চেষ্টা চালায়। জেলেরা বাধা দিলে জলদস্যুদের গুলিতে মো. হোসেন (৩০) নামের এক জেলে নিহত হন এবং আব্বাস (৩২), কাঞ্চন (৩৪) ও সোহেল (২৯) নামের আরও তিন জেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। তাঁদের সবার বাড়ি ভোলা সদরের বাঘার হাওলা গ্রামে। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর চাঁদপুরের হাইমচরে মেঘনা নদীতে সারবাহী জাহাজ 'এমভি আল-বাখেরা'র সাত কর্মচারীকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। আবার গত বছরের ১০ অক্টোবর নরসিংদী সংলগ্ন মেঘনা নদী থেকে একটি বাল্কহেড থামিয়ে ৩১৭ মেট্রিক টন বা প্রায় সাড়ে ৬ হাজার বস্তা সার ডাকাতি করে নিয়ে যায় একটি চক্র। পরবর্তীতে অভিযান চালিয়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে নৌ পুলিশ।

বাংলাদেশ মৎস্যজীবী ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম মল্লিক জানান, সাধারণত সন্ধ্যার পর চাঁদপুরের হাইমচর, শরীয়তপুরের লক্ষ্মীচর ও কাঁচিকাটা, মুন্সিগঞ্জের পদ্মা-মেঘনার মোহনা, লক্ষ্মীপুরের রায়পুর এবং বরিশালের হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ সংলগ্ন মেঘনার দুর্গম চরাঞ্চলে ডাকাতি ও হামলা বেশি ঘটে। জলদস্যুরা টাকা, মাছ ও মালপত্র কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি জেলে ও চালকদের ওপর নির্যাতন চালায়। বর্তমানে পদ্মা-মেঘনায় মা ইলিশ রক্ষায় কোস্টগার্ড, পুলিশ ও মৎস্য বিভাগ একযোগে দিনরাত অভিযান চালানোয় ডাকাতি কিছুটা কম রয়েছে। তবে অভিযান শেষ হলে দুর্গম চরাঞ্চলে রাতে আবার ডাকাতি বাড়ার আশঙ্কা থাকায় জেলা সীমানা ও প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে নিয়মিত টহল জোরদার রাখার দাবি জানান তিনি।

পণ্যবাহী নৌযানে নিয়মিত চাঁদা দাবির মারাত্মক অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ বাল্কহেড মালিক সমিতির সহসভাপতি আহমাদুল কবির মোল্লা অভিযোগ করেন, দেশের বিভিন্ন নদীর পয়েন্টে টোলের নামে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে পণ্য বোঝাইকালে নৌযানপ্রতি ২ হাজার টাকা, ভোলার ইলিশায় ৫০০ টাকা এবং সাভারের রুস্তমপুর ও আমিনবাজারে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হয়। এই বেআইনি চাঁদাবাজি বন্ধে তিনি প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ দাবি করেন।

চাঁদাবাজি ও অবৈধ কার্যকলাপ ঠেকাতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও রেহাই পাচ্ছে না। গত বছরের ৭ অক্টোবর সকালে নারায়ণগঞ্জের মেঘনা নদীতে 'এমভি জয়নব বৃষ্টি পরিবহন' নামের একটি বাল্কহেড থামিয়ে টেঁটা, বল্লম ও রামদাসহ দেশি অস্ত্র নিয়ে চাঁদা দাবি করে একদল চাঁদাবাজ। চাঁদা না দেওয়ায় শ্রমিক মহিবুল্লাহ ও জাকারিয়াকে কুপিয়ে আহত করা হয়। খবর পেয়ে চালিভাঙ্গা নৌ পুলিশ ফাঁড়ির দল ঘটনাস্থলে গেলে তাদের ওপরও টেঁটা-বল্লম নিয়ে হামলা চালানো হয়। এতে নৌ পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মাকসুদ এবং কনস্টেবল সোহাগ ও সাইদুর জখম হন। পরে পুলিশ আত্মরক্ষার্থে রাবার বুলেট ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং রানা ও সাজ্জাদ নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করে।

একইভাবে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে চলতি বছরের ২১ এপ্রিল রাতে কুষ্টিয়া সদরের হরিপুর সংলগ্ন পদ্মা নদীতে অভিযানে গেলে পাবনার ঈশ্বরদীর লক্ষ্মীকুণ্ডা নৌ পুলিশ ফাঁড়ির পাঁচ সদস্য গুলিবিদ্ধ হন। এর আগে ১৯ আগস্ট বিকেলে পিরোজপুরের কাউখালীতে টহল শেষে ফেরার পথে নৌ পুলিশের কনস্টেবল জাকির হোসেনকে কুপিয়ে ও মাথায় ইট দিয়ে আঘাত করা হয়। তাঁকে বাঁচাতে গিয়ে নৌ পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক মো. আরমান হোসেনসহ আরও পাঁচ পুলিশ সদস্য জখম হন।

নৌ পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিম বলেন, চাঁদাবাজির ভুক্তভোগীরা প্রায়ই লিখিত মামলা করতে চান না। ফলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করলেও আদালতে প্রয়োজনীয় সাক্ষীর অভাবে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি আরও জানান, নদীপথে চোরাচালান ও মাদকের বিস্তার রোধে জেলা ও মহানগর পুলিশের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত অপরাধীদের ডেটাবেজ তৈরি করে চিহ্নিত চক্রগুলোকে আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে।

তবে নথিভুক্ত পরিসংখ্যানের চেয়ে বাস্তবে অপরাধের সংখ্যা আরও বেশি বলে মনে করেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক। তিনি জানান, নৌ পুলিশের কার্যক্রম কেবল পাহারা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নজরদারি ও তত্ত্বাবধান জোরদার করতে হবে। বাহিনীর প্রয়োজনীয় জনবল, সরঞ্জাম ও বিশেষ প্রশিক্ষণের ঘাটতি দূর করে অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ অভিযান পরিচালনার তাগিদ দেন এই অপরাধবিশেষজ্ঞ।

জনপ্রিয় সংবাদ

কলাবাগান বাসস্ট্যান্ডে ককটেল নিক্ষেপ, আটক ৪

নদীপথে বাড়ছে হত্যা, ডাকাতি ও চাঁদাবাজি, অভিযানে হামলায় জখম পুলিশও

প্রকাশিত হয়েছে: ০৩:২১:২৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬

দেশের বিস্তৃত নদীপথজুড়ে দিন দিন বেড়েই চলেছে হত্যা, ডাকাতি, অপহরণ, বালু উত্তোলন ও চাঁদাবাজির মতো মারাত্মক সব অপরাধ। পণ্যবাহী জাহাজ ও জেলেদের নৌকায় হামলার পাশাপাশি সন্ধ্যা নামলেই নদীগুলোতে তৈরি হচ্ছে চরম আতঙ্কের পরিবেশ। এসব অপরাধ দমনে টহল ও অভিযানে গিয়ে সশস্ত্র জলদস্যু ও চাঁদাবাজ চক্রের হামলার শিকার হতে হচ্ছে নৌ পুলিশের সদস্যদেরও। স্থলভাগের তুলনায় বিস্তৃত জলপথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় অপরাধীরা নদীপথকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিচ্ছে বলে মনে করছেন পুলিশ কর্মকর্তা ও মৎস্যজীবীরা।

নৌ পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের নৌপথকে ১১টি অঞ্চলে বিভক্ত করে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে দেশে প্রায় সাভার থেকে শুরু করে সাড়ে সাত হাজার কিলোমিটার নৌপথ সচল থাকে, যা শুষ্ক মৌসুমে কমে দাঁড়ায় চার হাজার ৫০০ কিলোমিটারে। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার পথে নিয়মিত নৌযান চলাচল করে। বিশাল এই জলসীমায় নজরদারির জন্য বর্তমানে নৌ পুলিশের ১২৪টি ফাঁড়ি রয়েছে।

পুলিশের নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নদীপথে অপরাধ সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা প্রতিবছরই বাড়ছে। ২০২৪ সালে ১১টি অঞ্চলে হত্যা, অপমৃত্যু, ডাকাতি, ছিনতাই, অস্ত্র ও মাদক বহন, চোরাই পণ্য পরিবহন, অবৈধ বালু উত্তোলন, অপহরণ ও চাঁদাবাজির ঘটনায় ২ হাজার ৮৫টি মামলা নথিভুক্ত হয়। পরের বছর ২০২৫ সালে মামলা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৩৯৯টিতে, যা এক বছরের ব্যবধানে ১ হাজার ৩১৪টি বেশি। এ ছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে কেবল হত্যা, ডাকাতি, দস্যুতা, অপহরণ ও অপমৃত্যুর ঘটনাতেই আরও ৫০৫টি মামলা হয়েছে। সব মিলিয়ে এই সময়কালে মোট মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৯৮৯টিতে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে চাঁদপুর অঞ্চলে। ২০২৪ সালে চাঁদপুরে ৮৫০টি মামলা থাকলেও পরের বছর তা লাফিয়ে ২ হাজার ১৭টিতে পৌঁছায়। দুই বছরই মামলার তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল বরিশাল অঞ্চল, যেখানে মামলা ৪৪৮টি থেকে বেড়ে ৬১১টি হয়। এ ছাড়া অন্য অঞ্চলগুলোর মধ্যে ২০২৪ সালে চট্টগ্রামে ১৮২, ঢাকায় ১২০, ফরিদপুরে ১১৩, নারায়ণগঞ্জে ১০৬, রাজশাহীতে ৯০, সিলেটে ৫৮, কিশোরগঞ্জে ৪৯, টাঙ্গাইলে ৩৫ ও খুলনায় ৩৪টি মামলা হয়। ২০২৫ সালে ফরিদপুরে ১৪৭, ঢাকায় ১২৮, রাজশাহীতে ১২১, চট্টগ্রামে ১১৮, নারায়ণগঞ্জে ৯১, টাঙ্গাইলে ৬৬, সিলেটে ৪৫, কিশোরগঞ্জে ৩০ এবং খুলনায় ২৫টি মামলা রেজিস্টার করা হয়। এর মধ্যে চাঁদপুর, বরিশাল, ফরিদপুর, ঢাকা, রাজশাহী ও টাঙ্গাইলে অপরাধ বাড়লেও নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কিশোরগঞ্জ, খুলনা ও সিলেটে মামলা কমেছে।

চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে কেবল হত্যা, ডাকাতি, অপহরণ, দস্যুতা ও অপমৃত্যু—এই পাঁচ প্রধান অপরাধে ঢাকা অঞ্চলে সর্বোচ্চ ৮৬টি মামলা হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৮২টি মামলা হয়েছে নারায়ণগঞ্জে। একই সময়ে বরিশাল ও রাজশাহীতে ৭০টি করে, ফরিদপুরে ৫৭টি, টাঙ্গাইলে ৩২টি, খুলনায় ৩০টি, চট্টগ্রাম ও কিশোরগঞ্জে ২৫টি করে, চাঁদপুরে ২২টি এবং সিলেটে ৬টি মামলা নথিভুক্ত করা হয়। নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন জানান, রাতের অন্ধকারে দূরবর্তী স্থান থেকে হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। আবার অন্য অঞ্চলের নদীর স্রোতে ভেসে আসা মরদেহও নারায়ণগঞ্জের নদীসীমানায় পাওয়া যায়।

নদীপথে জেলে ও নৌযান শ্রমিকেরা নিয়মিত সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। গত বছরের ১ ফেব্রুয়ারি রাতে ভোলা সদর উপজেলার পূর্ব ইলিশা ইউনিয়নের কাছে মেঘনা নদীতে মাছ ধরার সময় জলদস্যুরা জেলেদের ট্রলারে ডাকাতির চেষ্টা চালায়। জেলেরা বাধা দিলে জলদস্যুদের গুলিতে মো. হোসেন (৩০) নামের এক জেলে নিহত হন এবং আব্বাস (৩২), কাঞ্চন (৩৪) ও সোহেল (২৯) নামের আরও তিন জেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। তাঁদের সবার বাড়ি ভোলা সদরের বাঘার হাওলা গ্রামে। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর চাঁদপুরের হাইমচরে মেঘনা নদীতে সারবাহী জাহাজ 'এমভি আল-বাখেরা'র সাত কর্মচারীকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। আবার গত বছরের ১০ অক্টোবর নরসিংদী সংলগ্ন মেঘনা নদী থেকে একটি বাল্কহেড থামিয়ে ৩১৭ মেট্রিক টন বা প্রায় সাড়ে ৬ হাজার বস্তা সার ডাকাতি করে নিয়ে যায় একটি চক্র। পরবর্তীতে অভিযান চালিয়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে নৌ পুলিশ।

বাংলাদেশ মৎস্যজীবী ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম মল্লিক জানান, সাধারণত সন্ধ্যার পর চাঁদপুরের হাইমচর, শরীয়তপুরের লক্ষ্মীচর ও কাঁচিকাটা, মুন্সিগঞ্জের পদ্মা-মেঘনার মোহনা, লক্ষ্মীপুরের রায়পুর এবং বরিশালের হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ সংলগ্ন মেঘনার দুর্গম চরাঞ্চলে ডাকাতি ও হামলা বেশি ঘটে। জলদস্যুরা টাকা, মাছ ও মালপত্র কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি জেলে ও চালকদের ওপর নির্যাতন চালায়। বর্তমানে পদ্মা-মেঘনায় মা ইলিশ রক্ষায় কোস্টগার্ড, পুলিশ ও মৎস্য বিভাগ একযোগে দিনরাত অভিযান চালানোয় ডাকাতি কিছুটা কম রয়েছে। তবে অভিযান শেষ হলে দুর্গম চরাঞ্চলে রাতে আবার ডাকাতি বাড়ার আশঙ্কা থাকায় জেলা সীমানা ও প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে নিয়মিত টহল জোরদার রাখার দাবি জানান তিনি।

পণ্যবাহী নৌযানে নিয়মিত চাঁদা দাবির মারাত্মক অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ বাল্কহেড মালিক সমিতির সহসভাপতি আহমাদুল কবির মোল্লা অভিযোগ করেন, দেশের বিভিন্ন নদীর পয়েন্টে টোলের নামে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে পণ্য বোঝাইকালে নৌযানপ্রতি ২ হাজার টাকা, ভোলার ইলিশায় ৫০০ টাকা এবং সাভারের রুস্তমপুর ও আমিনবাজারে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হয়। এই বেআইনি চাঁদাবাজি বন্ধে তিনি প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ দাবি করেন।

চাঁদাবাজি ও অবৈধ কার্যকলাপ ঠেকাতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও রেহাই পাচ্ছে না। গত বছরের ৭ অক্টোবর সকালে নারায়ণগঞ্জের মেঘনা নদীতে 'এমভি জয়নব বৃষ্টি পরিবহন' নামের একটি বাল্কহেড থামিয়ে টেঁটা, বল্লম ও রামদাসহ দেশি অস্ত্র নিয়ে চাঁদা দাবি করে একদল চাঁদাবাজ। চাঁদা না দেওয়ায় শ্রমিক মহিবুল্লাহ ও জাকারিয়াকে কুপিয়ে আহত করা হয়। খবর পেয়ে চালিভাঙ্গা নৌ পুলিশ ফাঁড়ির দল ঘটনাস্থলে গেলে তাদের ওপরও টেঁটা-বল্লম নিয়ে হামলা চালানো হয়। এতে নৌ পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মাকসুদ এবং কনস্টেবল সোহাগ ও সাইদুর জখম হন। পরে পুলিশ আত্মরক্ষার্থে রাবার বুলেট ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং রানা ও সাজ্জাদ নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করে।

একইভাবে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে চলতি বছরের ২১ এপ্রিল রাতে কুষ্টিয়া সদরের হরিপুর সংলগ্ন পদ্মা নদীতে অভিযানে গেলে পাবনার ঈশ্বরদীর লক্ষ্মীকুণ্ডা নৌ পুলিশ ফাঁড়ির পাঁচ সদস্য গুলিবিদ্ধ হন। এর আগে ১৯ আগস্ট বিকেলে পিরোজপুরের কাউখালীতে টহল শেষে ফেরার পথে নৌ পুলিশের কনস্টেবল জাকির হোসেনকে কুপিয়ে ও মাথায় ইট দিয়ে আঘাত করা হয়। তাঁকে বাঁচাতে গিয়ে নৌ পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক মো. আরমান হোসেনসহ আরও পাঁচ পুলিশ সদস্য জখম হন।

নৌ পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিম বলেন, চাঁদাবাজির ভুক্তভোগীরা প্রায়ই লিখিত মামলা করতে চান না। ফলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করলেও আদালতে প্রয়োজনীয় সাক্ষীর অভাবে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি আরও জানান, নদীপথে চোরাচালান ও মাদকের বিস্তার রোধে জেলা ও মহানগর পুলিশের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত অপরাধীদের ডেটাবেজ তৈরি করে চিহ্নিত চক্রগুলোকে আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে।

তবে নথিভুক্ত পরিসংখ্যানের চেয়ে বাস্তবে অপরাধের সংখ্যা আরও বেশি বলে মনে করেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক। তিনি জানান, নৌ পুলিশের কার্যক্রম কেবল পাহারা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নজরদারি ও তত্ত্বাবধান জোরদার করতে হবে। বাহিনীর প্রয়োজনীয় জনবল, সরঞ্জাম ও বিশেষ প্রশিক্ষণের ঘাটতি দূর করে অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ অভিযান পরিচালনার তাগিদ দেন এই অপরাধবিশেষজ্ঞ।