লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০১:৪২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বুড়িচংয়ে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা জাকির হত্যার ৪ বছরেও হয়নি মামলা, আতঙ্কে পরিবার

কুমিল্লার বুড়িচংয়ে পুলিশের অভিযান ও রাজনৈতিক ক্যাডারদের নির্যাতনের মুখে প্রাণ হারানো মোকাম ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি জাকির হোসেনের মৃত্যুর চার বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত কোনো মামলা করতে পারেনি তার পরিবার। ভয় ও আতঙ্কের মধ্যে এক ভাঙা ঘরে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন পার করছেন নিহতের স্ত্রী ও দুই সন্তান। ঘটনার পর দীর্ঘ সময় অতিক্রম হলেও কোনো আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ায় বিচার পাওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

পরিবারের অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর ভোরে বুড়িচং উপজেলার মোকাম এলাকায় জাকির হোসেনের নিজ বাড়ির পাশ থেকে তার নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। স্বজনদের দাবি, তৎকালীন সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কামরান হোসেন, বুড়িচং থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসনাত খন্দকার, দেবপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জাবেদ এবং এসআই রাজীবের যৌথ নেতৃত্বে জাকিরের বাড়িতে গভীর রাতে অভিযান চালানো হয়। ওই অভিযানে স্থানীয় নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করে এবং তাদের নির্যাতনেই জাকিরের মৃত্যু হয়।

উদ্ধারের সময় জাকিরের শরীরে নির্যাতনের ভয়াবহ ছাপ ছিল বলে জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী। তারা জানান, নিহতের হাতে হাতকড়ার স্পষ্ট দাগ এবং চেহারা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মক আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। এমনকি তার অণ্ডকোষ নষ্ট করে ফেলা হয়েছিল বলেও তারা উল্লেখ করেন। ঘটনার দিন ভোরে মিজান নামের এক প্রতিবেশী ফজরের নামাজের জন্য মসজিদে যাওয়ার সময় জাকিরকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেন। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক জাকিরকে মৃত ঘোষণা করেন।

ঘটনার পর তৎকালীন পুলিশ প্রশাসন পুরো বিষয়টি অস্বীকার করেছিল। তৎকালীন ওসি আবুল হাসনাত খন্দকার ও তৎসংলগ্ন সময়ের পুলিশ সুপার আব্দুল মান্নান দাবি করেছিলেন, জাকিরকে বাড়িতে না পেয়ে পুলিশ দল ফিরে এসেছিল এবং পরিবারের পক্ষ থেকে তোলা হত্যার অভিযোগ সম্পূর্ণ অসত্য। তবে দেবপুর ফাঁড়ির তৎকালীন ইনচার্জ জাবেদ উল ইসলাম রাতে জাকিরের বাড়িতে পুলিশি অভিযানের কথা স্বীকার করে বলেছিলেন, আসামিকে না পেয়ে পুলিশ ফিরে আসে। ওই সময় জাকিরকে যে ঘরের পাশে ফেলে রাখা হয়েছিল, সেই ঘরের মালিক মাজেদা খাতুন জানান, পুলিশ ও আওয়ামী লীগের ভয়ে জাকির প্রায়ই ঘরের নিচে লুকিয়ে থাকতেন। হত্যার দিন তারা কোনো চিৎকার শোনেননি, কেবল ফজরের সময় জাকিরের মরদেহ উদ্ধারের চিৎকার শুনতে পান।

স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর পর চার বছর কেটে গেলেও মামলার সাহস পাননি তার স্ত্রী আকলিমা আক্তার পলি। তিনি জানান, স্বামী হত্যাকাণ্ডের পর মামলা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ছোট এক ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে এবং আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের হুমকির ভয়ে পিছু হটতে বাধ্য হন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, তার স্বামী বিএনপির রাজনীতি করার কারণে জীবন দিয়েছেন, অথচ দীর্ঘ তিন-চার বছর ধরে তারা চরম কষ্টে একটি ভাঙা টিনের ঘরে বসবাস করছেন এবং অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। কেবল গত দুটি ঈদে বিএনপির কয়েকজন নেতা খোঁজ নিলেও বাকি সময় দলীয় কোনো সাহায্য তারা পাননি।

একই পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন জাকিরের শাশুড়ি আনোয়ারা বেগম। তিনি বলেন, বর্তমানে মামলা করলে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের স্থানীয় ক্যাডাররা তার মেয়ে ও নাতি-নাতনিদের মেরে ফেলতে পারে—এই আতঙ্কে তারা মামলা করছেন না। জাকির হোসেনের জানাজায় বক্তব্য দেওয়ায় ঘটনার দুদিন পর নিজেকে গ্রেপ্তার হতে হয়েছিল বলে জানিয়েছেন উপজেলা মোকাম ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম। তিনি জানান, জাকিরের পরিবার কেন মামলা করতে পারছে না, তা তার স্ত্রীই ভালো বলতে পারবেন।

দীর্ঘ দিন আগের এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বুড়িচং থানার বর্তমান ওসি লুৎফুর রহমান জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি নতুন জানতে পেরেছেন। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলে পুলিশ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১১: ৫৪আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১১: ৫৫

গত ১৫ সেপ্টেম্বর জাকির হোসেনের বাড়িতে গিয়ে কথা হয় প্রতিবেশী শাকিব হোসেনের সঙ্গে। যে স্থানটিতে জাকির হোসেনের মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছিল, তা দেখিয়ে শাকিব বলেন, ওই দিন ভোরে মিজান কাকা নামাজের জন্য মসজিদে যাওয়ার সময় দেখেন জাকির মাটিতে পড়ে আছেন। তখন তিনি সবাইকে ডাকাডাকি করেন। আমরা সবাই মিলে তাকে ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজ হাস

জনপ্রিয় সংবাদ

ইসরাইলের সরকার গঠনে চাবিকাঠি এখন আরব দলগুলোর হাতে

বুড়িচংয়ে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা জাকির হত্যার ৪ বছরেও হয়নি মামলা, আতঙ্কে পরিবার

প্রকাশিত হয়েছে: ০৬:০৩:২০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

কুমিল্লার বুড়িচংয়ে পুলিশের অভিযান ও রাজনৈতিক ক্যাডারদের নির্যাতনের মুখে প্রাণ হারানো মোকাম ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি জাকির হোসেনের মৃত্যুর চার বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত কোনো মামলা করতে পারেনি তার পরিবার। ভয় ও আতঙ্কের মধ্যে এক ভাঙা ঘরে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন পার করছেন নিহতের স্ত্রী ও দুই সন্তান। ঘটনার পর দীর্ঘ সময় অতিক্রম হলেও কোনো আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ায় বিচার পাওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

পরিবারের অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর ভোরে বুড়িচং উপজেলার মোকাম এলাকায় জাকির হোসেনের নিজ বাড়ির পাশ থেকে তার নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। স্বজনদের দাবি, তৎকালীন সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কামরান হোসেন, বুড়িচং থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসনাত খন্দকার, দেবপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জাবেদ এবং এসআই রাজীবের যৌথ নেতৃত্বে জাকিরের বাড়িতে গভীর রাতে অভিযান চালানো হয়। ওই অভিযানে স্থানীয় নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করে এবং তাদের নির্যাতনেই জাকিরের মৃত্যু হয়।

উদ্ধারের সময় জাকিরের শরীরে নির্যাতনের ভয়াবহ ছাপ ছিল বলে জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী। তারা জানান, নিহতের হাতে হাতকড়ার স্পষ্ট দাগ এবং চেহারা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মক আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। এমনকি তার অণ্ডকোষ নষ্ট করে ফেলা হয়েছিল বলেও তারা উল্লেখ করেন। ঘটনার দিন ভোরে মিজান নামের এক প্রতিবেশী ফজরের নামাজের জন্য মসজিদে যাওয়ার সময় জাকিরকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেন। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক জাকিরকে মৃত ঘোষণা করেন।

ঘটনার পর তৎকালীন পুলিশ প্রশাসন পুরো বিষয়টি অস্বীকার করেছিল। তৎকালীন ওসি আবুল হাসনাত খন্দকার ও তৎসংলগ্ন সময়ের পুলিশ সুপার আব্দুল মান্নান দাবি করেছিলেন, জাকিরকে বাড়িতে না পেয়ে পুলিশ দল ফিরে এসেছিল এবং পরিবারের পক্ষ থেকে তোলা হত্যার অভিযোগ সম্পূর্ণ অসত্য। তবে দেবপুর ফাঁড়ির তৎকালীন ইনচার্জ জাবেদ উল ইসলাম রাতে জাকিরের বাড়িতে পুলিশি অভিযানের কথা স্বীকার করে বলেছিলেন, আসামিকে না পেয়ে পুলিশ ফিরে আসে। ওই সময় জাকিরকে যে ঘরের পাশে ফেলে রাখা হয়েছিল, সেই ঘরের মালিক মাজেদা খাতুন জানান, পুলিশ ও আওয়ামী লীগের ভয়ে জাকির প্রায়ই ঘরের নিচে লুকিয়ে থাকতেন। হত্যার দিন তারা কোনো চিৎকার শোনেননি, কেবল ফজরের সময় জাকিরের মরদেহ উদ্ধারের চিৎকার শুনতে পান।

স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর পর চার বছর কেটে গেলেও মামলার সাহস পাননি তার স্ত্রী আকলিমা আক্তার পলি। তিনি জানান, স্বামী হত্যাকাণ্ডের পর মামলা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ছোট এক ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে এবং আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের হুমকির ভয়ে পিছু হটতে বাধ্য হন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, তার স্বামী বিএনপির রাজনীতি করার কারণে জীবন দিয়েছেন, অথচ দীর্ঘ তিন-চার বছর ধরে তারা চরম কষ্টে একটি ভাঙা টিনের ঘরে বসবাস করছেন এবং অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। কেবল গত দুটি ঈদে বিএনপির কয়েকজন নেতা খোঁজ নিলেও বাকি সময় দলীয় কোনো সাহায্য তারা পাননি।

একই পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন জাকিরের শাশুড়ি আনোয়ারা বেগম। তিনি বলেন, বর্তমানে মামলা করলে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের স্থানীয় ক্যাডাররা তার মেয়ে ও নাতি-নাতনিদের মেরে ফেলতে পারে—এই আতঙ্কে তারা মামলা করছেন না। জাকির হোসেনের জানাজায় বক্তব্য দেওয়ায় ঘটনার দুদিন পর নিজেকে গ্রেপ্তার হতে হয়েছিল বলে জানিয়েছেন উপজেলা মোকাম ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম। তিনি জানান, জাকিরের পরিবার কেন মামলা করতে পারছে না, তা তার স্ত্রীই ভালো বলতে পারবেন।

দীর্ঘ দিন আগের এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বুড়িচং থানার বর্তমান ওসি লুৎফুর রহমান জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি নতুন জানতে পেরেছেন। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলে পুলিশ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১১: ৫৪আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১১: ৫৫

গত ১৫ সেপ্টেম্বর জাকির হোসেনের বাড়িতে গিয়ে কথা হয় প্রতিবেশী শাকিব হোসেনের সঙ্গে। যে স্থানটিতে জাকির হোসেনের মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছিল, তা দেখিয়ে শাকিব বলেন, ওই দিন ভোরে মিজান কাকা নামাজের জন্য মসজিদে যাওয়ার সময় দেখেন জাকির মাটিতে পড়ে আছেন। তখন তিনি সবাইকে ডাকাডাকি করেন। আমরা সবাই মিলে তাকে ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজ হাস