লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৫:৩০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাহাজভাঙা শিল্পকে কমলা শ্রেণি করার সিদ্ধান্ত, বাড়ছে পরিবেশ ও শ্রমিকের ঝুঁকি

জাহাজভাঙা শিল্পকে পরিবেশের জন্য সর্বোচ্চ দূষণকারী ‘লাল’ শ্রেণি থেকে শিথিল করে ‘কমলা’ শ্রেণিতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) বাদ দিয়ে দ্রুত ইয়ার্ড স্থাপনের অনুমোদন দেওয়ার সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে এ পদক্ষেপ নেওয়া হলেও এতে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র ও শ্রমিক জীবন মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। উদ্যোক্তাদের দাবির মুখে লাল শ্রেণিতে থাকা ৯০ দিনের দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করতে গিয়ে এই শিল্পে সরকারের তদারকি ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর নেতৃত্বে গঠিত একটি বিশেষ কমিটি গত ২৯ সেপ্টেম্বর এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এর আগে আগস্ট মাসে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আইন ও নীতি পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এই কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়। শিল্পমন্ত্রী, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, অর্থ সচিব এবং আইন সচিবকে এ কমিটির সদস্য করা হলেও কোনো পরিবেশ বিশেষজ্ঞ বা পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধিকে রাখা হয়নি।

প্রস্তাবিত সিদ্ধান্তের বিষয়ে পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু জানান, হংকং কনভেনশন অনুযায়ী দেশে বর্তমানে ১৫ থেকে ২০টি গ্রিন ইয়ার্ড গড়ে উঠেছে এবং একেকটিতে উদ্যোক্তারা প্রায় ১৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। অনুমোদন পেতে দীর্ঘ তিন মাস সময় লাগায় ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, সরকার পরিবেশ ও শিল্প উভয় পক্ষকেই রক্ষা করতে চায়। এছাড়া শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান উল্লেখ করেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রায় ৬,৫০০ জাহাজ কাটার উপযোগী হবে, আর গ্রিন ইয়ার্ড বাড়িয়ে বাংলাদেশ সেই আন্তর্জাতিক বাজারের বড় অংশ দখল করতে চায়।

বিদ্যমান পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা-২০২৩ অনুযায়ী, জাহাজভাঙা কার্যক্রম ও ইয়ার্ড ছিল চরম ঝুঁকিপূর্ণ বা ‘লাল’ শ্রেণিভুক্ত। নিয়ম অনুযায়ী আগে বিশদ কার্যপরিধি (টিওআর) জমা দিয়ে সদর দপ্তরের অনুমোদনে পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) এবং স্থানীয় পর্যায়ে জনমত যাচাই শেষে অবস্থানগত ও পরিবেশগত ছাড়পত্র পেতেই ৯০ দিন সময় লাগত। ভারত ও পাকিস্তানেও এটি বাধ্যতামূলক। তবে শিল্পটি ‘কমলা’ শ্রেণিতে স্থানান্তরিত হলে প্রাথমিক সমীক্ষা বিভাগীয় কার্যালয়ে জমা দিলেই চলবে। বিভাগীয় কার্যালয় ইআইএ করার সুপারিশ করলেও তা মানার বাধ্যবাধকতা থাকবে না এবং চূড়ান্ত ছাড়পত্রের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের সদর দফতরেও যেতে হবে না।

পরিবেশ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, এই পরিবর্তনের ফলে ইয়ার্ডগুলো কতটা দূষণ ছড়াচ্ছে তা নির্ধারণ বা তদারকি করার সুযোগ আর থাকবে না। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিধিমালা শিথিলের এই সিদ্ধান্ত উচ্চ আদালতের রায় ও আদেশের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আদালতকে না জানিয়ে নেওয়া এই সিদ্ধান্তের ফলে সীতাকুণ্ড উপকূলীয় এলাকায় শ্রমিকদের জীবন আরও বিপন্ন হবে। তিনি উল্লেখ করেন, গত আগস্টেও গ্যাস নিঃসরণে ১০ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছিল। এছাড়া সেন্ট মার্টিন ইস্যুতে সরকার পরিবেশবাদীদের সাথে আলোচনা করলেও জাহাজভাঙার মতো বিপজ্জনক শিল্প নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তাদের পুরোপুরি বাদ রাখা গ্রহণযোগ্য নয়।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) জাহাজভাঙাকে পৃথিবীর অন্যতম বিপজ্জনক কাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করেছেন যে বাসেল কনভেনশন অনুযায়ী বর্জ্যের দায় উন্নত দেশগুলোকেই নিতে হবে। উন্মুক্ত সীতাকুণ্ড সমুদ্র সৈকতে কেবল কংক্রিট ঢেলে জাহাজভাঙা শিল্পকে ‘সবুজ’ বা নিরাপদ করা অসম্ভব; এর জন্য ড্রাইডক নির্মাণ ও কঠোর আইনি প্রয়োগ অপরিহার্য। বর্তমানে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে প্রতি বছর ১৫০ থেকে ২০০টি জাহাজ কাটা হয়, যেখানে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার শ্রমিক চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

মার্কিন চাপে ইরানের সীমান্তপথ বন্ধ করলো পাকিস্তান ও ইরাক

জাহাজভাঙা শিল্পকে কমলা শ্রেণি করার সিদ্ধান্ত, বাড়ছে পরিবেশ ও শ্রমিকের ঝুঁকি

প্রকাশিত হয়েছে: ১০:৩২:০৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬

জাহাজভাঙা শিল্পকে পরিবেশের জন্য সর্বোচ্চ দূষণকারী ‘লাল’ শ্রেণি থেকে শিথিল করে ‘কমলা’ শ্রেণিতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) বাদ দিয়ে দ্রুত ইয়ার্ড স্থাপনের অনুমোদন দেওয়ার সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে এ পদক্ষেপ নেওয়া হলেও এতে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র ও শ্রমিক জীবন মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। উদ্যোক্তাদের দাবির মুখে লাল শ্রেণিতে থাকা ৯০ দিনের দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করতে গিয়ে এই শিল্পে সরকারের তদারকি ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর নেতৃত্বে গঠিত একটি বিশেষ কমিটি গত ২৯ সেপ্টেম্বর এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এর আগে আগস্ট মাসে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আইন ও নীতি পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এই কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়। শিল্পমন্ত্রী, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, অর্থ সচিব এবং আইন সচিবকে এ কমিটির সদস্য করা হলেও কোনো পরিবেশ বিশেষজ্ঞ বা পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধিকে রাখা হয়নি।

প্রস্তাবিত সিদ্ধান্তের বিষয়ে পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু জানান, হংকং কনভেনশন অনুযায়ী দেশে বর্তমানে ১৫ থেকে ২০টি গ্রিন ইয়ার্ড গড়ে উঠেছে এবং একেকটিতে উদ্যোক্তারা প্রায় ১৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। অনুমোদন পেতে দীর্ঘ তিন মাস সময় লাগায় ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, সরকার পরিবেশ ও শিল্প উভয় পক্ষকেই রক্ষা করতে চায়। এছাড়া শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান উল্লেখ করেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রায় ৬,৫০০ জাহাজ কাটার উপযোগী হবে, আর গ্রিন ইয়ার্ড বাড়িয়ে বাংলাদেশ সেই আন্তর্জাতিক বাজারের বড় অংশ দখল করতে চায়।

বিদ্যমান পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা-২০২৩ অনুযায়ী, জাহাজভাঙা কার্যক্রম ও ইয়ার্ড ছিল চরম ঝুঁকিপূর্ণ বা ‘লাল’ শ্রেণিভুক্ত। নিয়ম অনুযায়ী আগে বিশদ কার্যপরিধি (টিওআর) জমা দিয়ে সদর দপ্তরের অনুমোদনে পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) এবং স্থানীয় পর্যায়ে জনমত যাচাই শেষে অবস্থানগত ও পরিবেশগত ছাড়পত্র পেতেই ৯০ দিন সময় লাগত। ভারত ও পাকিস্তানেও এটি বাধ্যতামূলক। তবে শিল্পটি ‘কমলা’ শ্রেণিতে স্থানান্তরিত হলে প্রাথমিক সমীক্ষা বিভাগীয় কার্যালয়ে জমা দিলেই চলবে। বিভাগীয় কার্যালয় ইআইএ করার সুপারিশ করলেও তা মানার বাধ্যবাধকতা থাকবে না এবং চূড়ান্ত ছাড়পত্রের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের সদর দফতরেও যেতে হবে না।

পরিবেশ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, এই পরিবর্তনের ফলে ইয়ার্ডগুলো কতটা দূষণ ছড়াচ্ছে তা নির্ধারণ বা তদারকি করার সুযোগ আর থাকবে না। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিধিমালা শিথিলের এই সিদ্ধান্ত উচ্চ আদালতের রায় ও আদেশের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আদালতকে না জানিয়ে নেওয়া এই সিদ্ধান্তের ফলে সীতাকুণ্ড উপকূলীয় এলাকায় শ্রমিকদের জীবন আরও বিপন্ন হবে। তিনি উল্লেখ করেন, গত আগস্টেও গ্যাস নিঃসরণে ১০ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছিল। এছাড়া সেন্ট মার্টিন ইস্যুতে সরকার পরিবেশবাদীদের সাথে আলোচনা করলেও জাহাজভাঙার মতো বিপজ্জনক শিল্প নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তাদের পুরোপুরি বাদ রাখা গ্রহণযোগ্য নয়।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) জাহাজভাঙাকে পৃথিবীর অন্যতম বিপজ্জনক কাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করেছেন যে বাসেল কনভেনশন অনুযায়ী বর্জ্যের দায় উন্নত দেশগুলোকেই নিতে হবে। উন্মুক্ত সীতাকুণ্ড সমুদ্র সৈকতে কেবল কংক্রিট ঢেলে জাহাজভাঙা শিল্পকে ‘সবুজ’ বা নিরাপদ করা অসম্ভব; এর জন্য ড্রাইডক নির্মাণ ও কঠোর আইনি প্রয়োগ অপরিহার্য। বর্তমানে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে প্রতি বছর ১৫০ থেকে ২০০টি জাহাজ কাটা হয়, যেখানে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার শ্রমিক চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন।