লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৭:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এসএসসিতে অকৃতকার্য ৬ লাখ ৯০ হাজার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা

চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি। ফল প্রকাশের পরপরই অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র হতাশা ও অবসাদ দেখা দিয়েছে, যার ফলে অন্তত চারজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই ঝরে পড়ার হার বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কুড়িগ্রামের উলিপুরের মার্জিয়া খাতুন গত বছর এসএসসি পরীক্ষায় গণিতে ফেল করেছিলেন। মা-হারা মার্জিয়ার কাঁধে বাবার দায়িত্ব ছিল, বড় তিন ভাইয়ের সংসার রয়েছে এবং বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন বাবা। তিনি ২০২৫ সালে যখন এসএসসি পরীক্ষা দেন, তখন তার বিয়ে নিয়ে কথা চলছিল। পরীক্ষার পর বিয়ের বিষয়টি আরও সামনে আসে এবং ফল প্রকাশের আগেই তার বিয়ে হয়ে যায়। তিনি জানান, তার ভাইয়েরা কেউই এইচএইচসি’র পর লেখাপড়া করেনি। মা মারা যাওয়ার পর থেকে তার জন্য লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছিল। তিনি গণিতে ফেল করলেও এবছর আর পরীক্ষা দেননি, কেউ চাপও দেয়নি এবং তার নিজেরও ইচ্ছা ছিল না।

মার্জিয়ার মতো লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারেননি গাইবান্ধার মো. মিলন। তিনি ২০২৫ সালে দুই বিষয়ে ফেল করেছিলেন। ২০২৬ সালে আর পরীক্ষা দেননি। তিনি পরিবারের দায়িত্ব নেন এবং আয়ের সন্ধানে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে এখন ফ্রিজ, টিভি, ওভেন ইত্যাদি মেরামতের কাজে সহযোগিতা করেন।

উত্তরাঞ্চলের তিন জেলা—রংপুর, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করা দাতব্য সংস্থা ‘রং পেন্সিল’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে নির্দিষ্ট এলাকার ৬২ জন অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর মধ্যে পরবর্তী বছর পরীক্ষা দিয়েছিল ১৮ জন। এই ১৮ জনের মধ্যে ৪ জন পুনরায় ফেল করে। সব মিলিয়ে ৬২ জনের মধ্যে ৫৫ জনই বিয়ে বা নিয়মিত-অনিয়মিত কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এই ৬২ জনের মধ্যে ২৯ জন ছিল ছাত্রী।

বাংলাদেশে শিক্ষায় ঝরে পড়া নতুন কিছু নয়। ব্যানবেইস-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে মাধ্যমিক স্তরে (ষষ্ঠ-দশম) ঝরে পড়ার হার ছিল ৩২.৮৫ শতাংশ। ২০২২ সালে এই হার ছিল ৩৫.৯৮ শতাংশ। ২০২৩ সালের হারটি ছেলে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ৩০.৬৩ শতাংশ এবং মেয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ৩৪.৮৭ শতাংশ। বিবিএস-২০২৩-এর তথ্যানুযায়ী, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৪২ শতাংশ বিয়ের কারণে পড়াশোনা ছেড়েছে, যেখানে মেয়েদের ক্ষেত্রে এই হার ৭১ শতাংশ। এছাড়া কাজ/চাকরি, আর্থিক অসচ্ছলতা, পড়াশোনায় অনীহা এবং করোনা-পরবর্তী সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে না আসাও ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ।

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার শিক্ষক ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, ফেল করা শিক্ষার্থীরা মানসিক ট্যাবুর মধ্যে পড়ে যায়। অনেক মেয়ে শিক্ষার্থী নবম-দশম শ্রেণিতে ওঠা মানেই বিয়ের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করে। তিনি একটি মেয়ের উদাহরণ দিয়ে বলেন, সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় বিয়ে ঠিক হলে তারা তা আটকানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু মেয়ের বাবা জানান, মেয়ে বড় হলে 'শেয়ানা' হয়ে যাবে এবং পরে বিয়ে দেওয়া কঠিন হবে। কুড়িগ্রামের চরের শিক্ষক সাদেকুল ইসলাম জানান, এসব এলাকায় এসএসসি পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা পড়েই না। তার মতে, এসএসসি ফেল করা ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী আর লেখাপড়ায় ফিরবে না। তিনি এসব শিক্ষার্থীদের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেন।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ফাহমিদা আক্তারের মতে, অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস ঠিক রাখা জরুরি। তাদের সামাজিকভাবে হেয় না করে উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষা গবেষক রেজওয়ানুল ইসলাম মনে করেন, অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের সবাইকে প্রচলিত ধারায় না ফিরিয়ে ইলেকট্রিক্যাল, অটোমোবাইল, কম্পিউটার, কৃষি ও গ্রাফিক ডিজাইনের মতো স্বল্পমেয়াদী কারিগরি প্রশিক্ষণের আওতায় আনা উচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. এসএম হাফিজুর রহমান বলেন, শিক্ষার্থী কেন ফেল করল তা নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন এবং এসএসসিতে ফেল করা মানেই জীবনের শেষ নয়।

শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের ভেঙে না পড়ে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ফেসবুক বার্তায় উল্লেখ করেন, পরীক্ষা জীবনের চূড়ান্ত পরিমাপক নয় এবং অকৃতকার্য হওয়া মানেই জীবনের গল্প শেষ হয়ে যাওয়া নয়। আজকের এই ফল কারও মূল পরিচয় হতে পারে না।

উত্তরাঞ্চলের তিন জেলার (রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম) শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করে দাতব্য সংস্থা ‘রং পেন্সিল’। তারা ২০২৩ ও ২০২৪ সালের শিক্ষার অবস্থা নিয়ে একটি তথ্য প্রকাশ করেছিল। যাতে এই দুই বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি অংশ ছিল। যাতে দেখা যায়, ২০২৩ সালে নির্দিষ্ট কয়েকটি এলাকার ৬২ জন অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর মধ্যে পরবর্তী বছর পরীক্ষা দেয় ১৮ জন। এই ১৮ জনের মধ্যে ৪ জন পুনরায় ফেল করে। আর ৬২ জনের মধ্যে ৫৫ জনই বিয়ে, নিয়মিত-অনিয়মিত কাজের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। ৬২ জনের মধ্যে ছাত্রী ছিল ২৯ জন।

জনপ্রিয় সংবাদ

কেরানীগঞ্জে সেলুনে ঢুকে যুবককে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা

এসএসসিতে অকৃতকার্য ৬ লাখ ৯০ হাজার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা

প্রকাশিত হয়েছে: ০৩:০৫:২৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬

চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি। ফল প্রকাশের পরপরই অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র হতাশা ও অবসাদ দেখা দিয়েছে, যার ফলে অন্তত চারজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই ঝরে পড়ার হার বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কুড়িগ্রামের উলিপুরের মার্জিয়া খাতুন গত বছর এসএসসি পরীক্ষায় গণিতে ফেল করেছিলেন। মা-হারা মার্জিয়ার কাঁধে বাবার দায়িত্ব ছিল, বড় তিন ভাইয়ের সংসার রয়েছে এবং বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন বাবা। তিনি ২০২৫ সালে যখন এসএসসি পরীক্ষা দেন, তখন তার বিয়ে নিয়ে কথা চলছিল। পরীক্ষার পর বিয়ের বিষয়টি আরও সামনে আসে এবং ফল প্রকাশের আগেই তার বিয়ে হয়ে যায়। তিনি জানান, তার ভাইয়েরা কেউই এইচএইচসি’র পর লেখাপড়া করেনি। মা মারা যাওয়ার পর থেকে তার জন্য লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছিল। তিনি গণিতে ফেল করলেও এবছর আর পরীক্ষা দেননি, কেউ চাপও দেয়নি এবং তার নিজেরও ইচ্ছা ছিল না।

মার্জিয়ার মতো লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারেননি গাইবান্ধার মো. মিলন। তিনি ২০২৫ সালে দুই বিষয়ে ফেল করেছিলেন। ২০২৬ সালে আর পরীক্ষা দেননি। তিনি পরিবারের দায়িত্ব নেন এবং আয়ের সন্ধানে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে এখন ফ্রিজ, টিভি, ওভেন ইত্যাদি মেরামতের কাজে সহযোগিতা করেন।

উত্তরাঞ্চলের তিন জেলা—রংপুর, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করা দাতব্য সংস্থা ‘রং পেন্সিল’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে নির্দিষ্ট এলাকার ৬২ জন অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর মধ্যে পরবর্তী বছর পরীক্ষা দিয়েছিল ১৮ জন। এই ১৮ জনের মধ্যে ৪ জন পুনরায় ফেল করে। সব মিলিয়ে ৬২ জনের মধ্যে ৫৫ জনই বিয়ে বা নিয়মিত-অনিয়মিত কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এই ৬২ জনের মধ্যে ২৯ জন ছিল ছাত্রী।

বাংলাদেশে শিক্ষায় ঝরে পড়া নতুন কিছু নয়। ব্যানবেইস-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে মাধ্যমিক স্তরে (ষষ্ঠ-দশম) ঝরে পড়ার হার ছিল ৩২.৮৫ শতাংশ। ২০২২ সালে এই হার ছিল ৩৫.৯৮ শতাংশ। ২০২৩ সালের হারটি ছেলে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ৩০.৬৩ শতাংশ এবং মেয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ৩৪.৮৭ শতাংশ। বিবিএস-২০২৩-এর তথ্যানুযায়ী, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৪২ শতাংশ বিয়ের কারণে পড়াশোনা ছেড়েছে, যেখানে মেয়েদের ক্ষেত্রে এই হার ৭১ শতাংশ। এছাড়া কাজ/চাকরি, আর্থিক অসচ্ছলতা, পড়াশোনায় অনীহা এবং করোনা-পরবর্তী সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে না আসাও ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ।

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার শিক্ষক ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, ফেল করা শিক্ষার্থীরা মানসিক ট্যাবুর মধ্যে পড়ে যায়। অনেক মেয়ে শিক্ষার্থী নবম-দশম শ্রেণিতে ওঠা মানেই বিয়ের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করে। তিনি একটি মেয়ের উদাহরণ দিয়ে বলেন, সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় বিয়ে ঠিক হলে তারা তা আটকানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু মেয়ের বাবা জানান, মেয়ে বড় হলে 'শেয়ানা' হয়ে যাবে এবং পরে বিয়ে দেওয়া কঠিন হবে। কুড়িগ্রামের চরের শিক্ষক সাদেকুল ইসলাম জানান, এসব এলাকায় এসএসসি পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা পড়েই না। তার মতে, এসএসসি ফেল করা ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী আর লেখাপড়ায় ফিরবে না। তিনি এসব শিক্ষার্থীদের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেন।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ফাহমিদা আক্তারের মতে, অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস ঠিক রাখা জরুরি। তাদের সামাজিকভাবে হেয় না করে উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষা গবেষক রেজওয়ানুল ইসলাম মনে করেন, অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের সবাইকে প্রচলিত ধারায় না ফিরিয়ে ইলেকট্রিক্যাল, অটোমোবাইল, কম্পিউটার, কৃষি ও গ্রাফিক ডিজাইনের মতো স্বল্পমেয়াদী কারিগরি প্রশিক্ষণের আওতায় আনা উচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. এসএম হাফিজুর রহমান বলেন, শিক্ষার্থী কেন ফেল করল তা নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন এবং এসএসসিতে ফেল করা মানেই জীবনের শেষ নয়।

শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের ভেঙে না পড়ে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ফেসবুক বার্তায় উল্লেখ করেন, পরীক্ষা জীবনের চূড়ান্ত পরিমাপক নয় এবং অকৃতকার্য হওয়া মানেই জীবনের গল্প শেষ হয়ে যাওয়া নয়। আজকের এই ফল কারও মূল পরিচয় হতে পারে না।

উত্তরাঞ্চলের তিন জেলার (রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম) শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করে দাতব্য সংস্থা ‘রং পেন্সিল’। তারা ২০২৩ ও ২০২৪ সালের শিক্ষার অবস্থা নিয়ে একটি তথ্য প্রকাশ করেছিল। যাতে এই দুই বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি অংশ ছিল। যাতে দেখা যায়, ২০২৩ সালে নির্দিষ্ট কয়েকটি এলাকার ৬২ জন অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর মধ্যে পরবর্তী বছর পরীক্ষা দেয় ১৮ জন। এই ১৮ জনের মধ্যে ৪ জন পুনরায় ফেল করে। আর ৬২ জনের মধ্যে ৫৫ জনই বিয়ে, নিয়মিত-অনিয়মিত কাজের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। ৬২ জনের মধ্যে ছাত্রী ছিল ২৯ জন।