লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৭:৩৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শেখ হাসিনার পতনের আগের ৭২ ঘণ্টায় কী ঘটেছিল?

২০২৪ সালে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা যে শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার সরকারের পতনের এক দফার আন্দোলনে রূপ নেবে, তা ২ আগস্ট পর্যন্ত অনেকের কাছেই অকল্পনীয় ছিল। ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার পর সরকারবিরোধী আন্দোলন তীব্রতর হতে শুরু করে। জুলাইয়ের শেষ দিকে এসে এই আন্দোলন ঢাকার বাইরেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ১ আগস্ট আন্দোলনকারীরা ২ আগস্টের জন্য প্রার্থনা ও ছাত্র-জনতার গণমিছিল কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয়।

২ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী ও পেশাজীবীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ঢল নামে। সেদিন গণমিছিলকে ঘিরে ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটে। একই দিনে ইউনিসেফ কোটা আন্দোলন ঘিরে অন্তত ৩২ শিশু নিহতের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে। সেদিন রাতে গণভবনে ১৪ দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে শেখ হাসিনা ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি শান্ত করার নির্দেশ দেন। তবে সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামসহ ছয়জন সমন্বয়ক বিবৃতিতে জানান, ডিবি কার্যালয়ে তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে আগের কর্মসূচি প্রত্যাহারের ভিডিও রেকর্ড করা হয়েছিল।

৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সমাবেশের ডাক দেয় এবং সেখান থেকেই শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করা হয়। সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, এই সরকারের ক্ষমতায় থাকার কোনো অধিকার নেই এবং তারা শেখ হাসিনাকে পদত্যাগের পাশাপাশি বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান। সেদিনই আন্দোলনকারীরা 'মার্চ টু ঢাকা' কর্মসূচির তারিখ ৬ আগস্ট থেকে এগিয়ে ৫ আগস্ট করার ঘোষণা দেয়। একই দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২২ জন সেনেটর ও কংগ্রেসম্যান সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে অ্যান্থনি ব্লিংকেনের কাছে চিঠি পাঠান। শেখ হাসিনা গণভবনে আলোচনার আহ্বান জানালে সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, 'গুলি আর সন্ত্রাসের সঙ্গে কোনো সংলাপ হয় না।'

৪ আগস্ট অসহযোগ আন্দোলনের প্রথম দিনে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। সরকার ফোর-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেয় এবং সন্ধ্যা ৬টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সান্ধ্য আইন জারি করে। সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভুঁইয়া সশস্ত্র বাহিনীকে সাধারণ ছাত্র-জনতার মুখোমুখি না করার আহ্বান জানান। সেদিনই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করে। সরকার অসহযোগ আন্দোলনকে 'জঙ্গি হামলা' হিসেবে আখ্যা দিয়ে দেশবাসীকে তা দমনের আহ্বান জানায়।

৫ আগস্ট কারফিউর মধ্যেই ছাত্র-জনতা রাস্তায় নেমে আসে। সকাল থেকেই ঢাকার রাস্তায় মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং সারা দেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়। দুপুরের দিকে খবর আসে যে শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে সামরিক বাহিনীর উড়োজাহাজে ভারতে পালিয়ে গেছেন। বেলা ৪টার দিকে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে জানান যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের ঘোষণা দেন। এর পরপরই আন্দোলনকারীরা গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সংসদ ভবন দখলে নেয়। ধানমন্ডি-৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সরকারি হিসাবে এই আন্দোলনে ৮০০ জনের বেশি এবং জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৪০০ জনের মতো নিহত হয়েছেন। ৬ আগস্ট ভোর থেকে কারফিউ তুলে নেওয়া হয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

হুথি হামলার জেরে বিশ্ববাজারে বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম

শেখ হাসিনার পতনের আগের ৭২ ঘণ্টায় কী ঘটেছিল?

প্রকাশিত হয়েছে: ১২:৩৭:৪৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

২০২৪ সালে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা যে শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার সরকারের পতনের এক দফার আন্দোলনে রূপ নেবে, তা ২ আগস্ট পর্যন্ত অনেকের কাছেই অকল্পনীয় ছিল। ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার পর সরকারবিরোধী আন্দোলন তীব্রতর হতে শুরু করে। জুলাইয়ের শেষ দিকে এসে এই আন্দোলন ঢাকার বাইরেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ১ আগস্ট আন্দোলনকারীরা ২ আগস্টের জন্য প্রার্থনা ও ছাত্র-জনতার গণমিছিল কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয়।

২ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী ও পেশাজীবীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ঢল নামে। সেদিন গণমিছিলকে ঘিরে ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটে। একই দিনে ইউনিসেফ কোটা আন্দোলন ঘিরে অন্তত ৩২ শিশু নিহতের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে। সেদিন রাতে গণভবনে ১৪ দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে শেখ হাসিনা ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি শান্ত করার নির্দেশ দেন। তবে সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামসহ ছয়জন সমন্বয়ক বিবৃতিতে জানান, ডিবি কার্যালয়ে তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে আগের কর্মসূচি প্রত্যাহারের ভিডিও রেকর্ড করা হয়েছিল।

৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সমাবেশের ডাক দেয় এবং সেখান থেকেই শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করা হয়। সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, এই সরকারের ক্ষমতায় থাকার কোনো অধিকার নেই এবং তারা শেখ হাসিনাকে পদত্যাগের পাশাপাশি বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান। সেদিনই আন্দোলনকারীরা 'মার্চ টু ঢাকা' কর্মসূচির তারিখ ৬ আগস্ট থেকে এগিয়ে ৫ আগস্ট করার ঘোষণা দেয়। একই দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২২ জন সেনেটর ও কংগ্রেসম্যান সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে অ্যান্থনি ব্লিংকেনের কাছে চিঠি পাঠান। শেখ হাসিনা গণভবনে আলোচনার আহ্বান জানালে সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, 'গুলি আর সন্ত্রাসের সঙ্গে কোনো সংলাপ হয় না।'

৪ আগস্ট অসহযোগ আন্দোলনের প্রথম দিনে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। সরকার ফোর-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেয় এবং সন্ধ্যা ৬টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সান্ধ্য আইন জারি করে। সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভুঁইয়া সশস্ত্র বাহিনীকে সাধারণ ছাত্র-জনতার মুখোমুখি না করার আহ্বান জানান। সেদিনই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করে। সরকার অসহযোগ আন্দোলনকে 'জঙ্গি হামলা' হিসেবে আখ্যা দিয়ে দেশবাসীকে তা দমনের আহ্বান জানায়।

৫ আগস্ট কারফিউর মধ্যেই ছাত্র-জনতা রাস্তায় নেমে আসে। সকাল থেকেই ঢাকার রাস্তায় মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং সারা দেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়। দুপুরের দিকে খবর আসে যে শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে সামরিক বাহিনীর উড়োজাহাজে ভারতে পালিয়ে গেছেন। বেলা ৪টার দিকে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে জানান যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের ঘোষণা দেন। এর পরপরই আন্দোলনকারীরা গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সংসদ ভবন দখলে নেয়। ধানমন্ডি-৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সরকারি হিসাবে এই আন্দোলনে ৮০০ জনের বেশি এবং জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৪০০ জনের মতো নিহত হয়েছেন। ৬ আগস্ট ভোর থেকে কারফিউ তুলে নেওয়া হয়।