লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০১:১৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা ও পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানোর গুরুত্ব

পার্থিব জীবনে মানুষের চলাচলের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো রাস্তা। এই রাস্তাঘাটকে নিরাপদ, নির্বিঘ্ন ও নিষ্কণ্টক রাখা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা মানুষের সুস্থ মনন ও সুরুচির পরিচয় বহন করে। পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে মানুষের শরীর ও মন যেমন সুস্থ থাকে, তেমনি মহান আল্লাহও তাদের ওপর সন্তুষ্ট হন। ইসলামে বাড়িঘর ও এর আঙিনা পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি প্রতিবেশীদের যাতে ময়লা-আবর্জনার কারণে কোনো কষ্ট না হয়, সে বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক করা হয়েছে। তবে বাস্তব চিত্র হলো, আমাদের সমাজের অনেকেই রাস্তাঘাট পরিষ্কার রাখার ব্যাপারে অত্যন্ত উদাসীন।

বর্তমানে রাস্তাঘাটে যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। মানুষ গাড়ি থেকে বা রাস্তার পাশে কলা ও আমের খোসা, সিগারেটের প্যাকেট, পানের পিক ও নানা উচ্ছিষ্ট ফেলছে। এছাড়া যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ, রাস্তা বন্ধ করা, রাস্তা কেটে রাখা, ড্রেনের ময়লা পানি বা রিজার্ভ ট্যাঙ্কের পানি রাস্তায় ফেলা এবং ইট, বালু, রড ও সুরকি স্তূপ করে রাখার কারণে পথচারীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়। বিশেষ করে ফুটপাতে বা রাস্তার ধারে প্রস্রাব করার মতো লজ্জাহীনতা ও অসভ্যতা সমাজে অহরহ দেখা যায়, যা ইসলামে কবিরা গোনাহ হিসেবে গণ্য। একটু বৃষ্টি হলেই ড্রেন ও নালার নোংরা পানি মিশে উৎকট দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয়, যা মানুষের স্বাভাবিক চলাচলকে অসম্ভব করে তোলে। অনেকেই মনে করেন এই কাজগুলো কেবল সিটি কর্পোরেশন বা সরকারের, কিন্তু একজন মুসলিম হিসেবে রাস্তা পরিষ্কার রাখা আমাদেরও নৈতিক দায়িত্ব।

ইসলামে পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেয়াকে ঈমানের একটি অন্যতম শাখা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'ঈমানের সত্তরোর্ধ্ব বা ষাটোর্ধ্ব শাখা রয়েছে। এর মধ্যে সর্বোত্তম শাখা হলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা এবং সর্বনিম্ন শাখা হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া।' (বোখারি: ৯, মুসলিম: ৩৫)। ইমাম নববি (রহ.)-এর মতে, কষ্টদায়ক বস্তু বলতে পাথর, মাটির টুকরো, কাঁটাসহ মানুষের চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী সবকিছুকেই বোঝায়। চলার পথে কোনো গর্তে পড়ে পা মচকে যাওয়া, ভাঙা কাঁচ বা কাঁটা পায়ে বিঁধে যাওয়া, ইটের টুকরোয় হোঁচট খাওয়া কিংবা পলিথিন বা ফলের খোসায় পা পিছলে পড়ে যাওয়ার মতো যেকোনো দুর্ঘটনা থেকে মানুষকে রক্ষা করা ঈমানের ন্যূনতম দাবি।

পথের কষ্ট দূর করাকে ইসলামে সদকা বা দানের সমতুল্য পুণ্যময় কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'পথের কষ্টদায়ক জিনিস সরিয়ে দেওয়া সদকা।' (মুসলিম: ১০০৯)। এছাড়া তিনি হযরত আবু জর গিফারি (রা.)-কে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, 'রাস্তা থেকে পাথর, কাঁটা ও হাড্ডি সরানোও তোমার জন্য একটি সদকা।' (তিরমিজি: ১৯৫৬)। এভাবে অন্য মানুষের যাতায়াত সহজ ও নিরাপদ করার মাধ্যমে আল্লাহর দরবারে সদকার সওয়াব লাভ করা সম্ভব।

রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা কেবল সওয়াবের কাজই নয়, বরং এটি আল্লাহর দরবারে ক্ষমা পাওয়ার অন্যতম একটি মাধ্যম। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'এক ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় একটি কাঁটাদার গাছের ডাল দেখতে পেয়ে তা সরিয়ে দেয়। আল্লাহ তার এই কাজের কদর করেন এবং তাকে ক্ষমা করে দেন।' (বোখারি: ৬৫২, মুসলিম: ৫০৪৯)। সামান্য একটি কাঁটার ডাল সরানোর উসিলায় আল্লাহ তাআলা সেই ব্যক্তিকে জান্নাত দান করেছেন। অতএব, চলার পথে যেকোনো কষ্টদায়ক বা দৃষ্টিকটু জিনিস দেখলেই তা সরিয়ে ফেলা প্রতিটি মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব, যা পরকালে নাজাতের উসিলা হতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

আগামী বছরের জুনের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন: প্রতিমন্ত্রী

পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা ও পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানোর গুরুত্ব

প্রকাশিত হয়েছে: ০৫:৩৭:০১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পার্থিব জীবনে মানুষের চলাচলের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো রাস্তা। এই রাস্তাঘাটকে নিরাপদ, নির্বিঘ্ন ও নিষ্কণ্টক রাখা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা মানুষের সুস্থ মনন ও সুরুচির পরিচয় বহন করে। পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে মানুষের শরীর ও মন যেমন সুস্থ থাকে, তেমনি মহান আল্লাহও তাদের ওপর সন্তুষ্ট হন। ইসলামে বাড়িঘর ও এর আঙিনা পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি প্রতিবেশীদের যাতে ময়লা-আবর্জনার কারণে কোনো কষ্ট না হয়, সে বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক করা হয়েছে। তবে বাস্তব চিত্র হলো, আমাদের সমাজের অনেকেই রাস্তাঘাট পরিষ্কার রাখার ব্যাপারে অত্যন্ত উদাসীন।

বর্তমানে রাস্তাঘাটে যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। মানুষ গাড়ি থেকে বা রাস্তার পাশে কলা ও আমের খোসা, সিগারেটের প্যাকেট, পানের পিক ও নানা উচ্ছিষ্ট ফেলছে। এছাড়া যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ, রাস্তা বন্ধ করা, রাস্তা কেটে রাখা, ড্রেনের ময়লা পানি বা রিজার্ভ ট্যাঙ্কের পানি রাস্তায় ফেলা এবং ইট, বালু, রড ও সুরকি স্তূপ করে রাখার কারণে পথচারীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়। বিশেষ করে ফুটপাতে বা রাস্তার ধারে প্রস্রাব করার মতো লজ্জাহীনতা ও অসভ্যতা সমাজে অহরহ দেখা যায়, যা ইসলামে কবিরা গোনাহ হিসেবে গণ্য। একটু বৃষ্টি হলেই ড্রেন ও নালার নোংরা পানি মিশে উৎকট দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয়, যা মানুষের স্বাভাবিক চলাচলকে অসম্ভব করে তোলে। অনেকেই মনে করেন এই কাজগুলো কেবল সিটি কর্পোরেশন বা সরকারের, কিন্তু একজন মুসলিম হিসেবে রাস্তা পরিষ্কার রাখা আমাদেরও নৈতিক দায়িত্ব।

ইসলামে পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেয়াকে ঈমানের একটি অন্যতম শাখা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'ঈমানের সত্তরোর্ধ্ব বা ষাটোর্ধ্ব শাখা রয়েছে। এর মধ্যে সর্বোত্তম শাখা হলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা এবং সর্বনিম্ন শাখা হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া।' (বোখারি: ৯, মুসলিম: ৩৫)। ইমাম নববি (রহ.)-এর মতে, কষ্টদায়ক বস্তু বলতে পাথর, মাটির টুকরো, কাঁটাসহ মানুষের চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী সবকিছুকেই বোঝায়। চলার পথে কোনো গর্তে পড়ে পা মচকে যাওয়া, ভাঙা কাঁচ বা কাঁটা পায়ে বিঁধে যাওয়া, ইটের টুকরোয় হোঁচট খাওয়া কিংবা পলিথিন বা ফলের খোসায় পা পিছলে পড়ে যাওয়ার মতো যেকোনো দুর্ঘটনা থেকে মানুষকে রক্ষা করা ঈমানের ন্যূনতম দাবি।

পথের কষ্ট দূর করাকে ইসলামে সদকা বা দানের সমতুল্য পুণ্যময় কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'পথের কষ্টদায়ক জিনিস সরিয়ে দেওয়া সদকা।' (মুসলিম: ১০০৯)। এছাড়া তিনি হযরত আবু জর গিফারি (রা.)-কে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, 'রাস্তা থেকে পাথর, কাঁটা ও হাড্ডি সরানোও তোমার জন্য একটি সদকা।' (তিরমিজি: ১৯৫৬)। এভাবে অন্য মানুষের যাতায়াত সহজ ও নিরাপদ করার মাধ্যমে আল্লাহর দরবারে সদকার সওয়াব লাভ করা সম্ভব।

রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা কেবল সওয়াবের কাজই নয়, বরং এটি আল্লাহর দরবারে ক্ষমা পাওয়ার অন্যতম একটি মাধ্যম। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'এক ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় একটি কাঁটাদার গাছের ডাল দেখতে পেয়ে তা সরিয়ে দেয়। আল্লাহ তার এই কাজের কদর করেন এবং তাকে ক্ষমা করে দেন।' (বোখারি: ৬৫২, মুসলিম: ৫০৪৯)। সামান্য একটি কাঁটার ডাল সরানোর উসিলায় আল্লাহ তাআলা সেই ব্যক্তিকে জান্নাত দান করেছেন। অতএব, চলার পথে যেকোনো কষ্টদায়ক বা দৃষ্টিকটু জিনিস দেখলেই তা সরিয়ে ফেলা প্রতিটি মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব, যা পরকালে নাজাতের উসিলা হতে পারে।