লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৪:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বৈপরীত্যে ভরা রাজনৈতিক জীবন: কে এই মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান?

রাজনৈতিক জীবনজুড়ে একের পর এক অবস্থান পরিবর্তন ও চরম বৈপরীত্যের কারণে বরাবরই এক আলোচিত চরিত্র মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান। ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, সরকারি কাজে বাধা দেওয়া এবং দায়িত্বরত এক নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার মামলায় সম্প্রতি গ্রেফতার হয়েছেন তিনি। গত শনিবার ঢাকার একটি আদালত তাঁর এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। গত ১ অক্টোবরের ওই ঘটনার সময় বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদকে ‘আমি কিন্তু পিটাবো ধইরা’, ‘ঘাড় ধরে বের করে দিবো’ বলে প্রকাশ্যে হুমকি দেন আখতারুজ্জামান, যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। ঘটনার দিন জামায়াতের সাবেক ও বর্তমান সংসদ সদস্য, তাঁদের পরিবার ও দলটির নেতাদের নিয়ে গঠিত ৭১ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে তিনি বিদেশ সফর শেষে দেশে ফিরেছিলেন। অবশ্য বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনার এই ঘটনার পর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বিমানবন্দর পরিদর্শন করে সেবা বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন।

১৯৫১ সালে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলায় জন্মগ্রহণ করা আখতারুজ্জামান (ডাকনাম রঞ্জন) ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালেই দলটির সঙ্গে যুক্ত হওয়া আখতারুজ্জামান কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তৎকালীন সময়ে কটিয়াদী উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনটিতে পরে পাকুন্দিয়া উপজেলা যুক্ত করা হয়। একসময় কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করা এই বীর মুক্তিযোদ্ধা দল ও দলীয় নেতাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে বারবার শাস্তির মুখোমুখি হয়েছেন। রাজনৈতিক জীবনে তিনি মোট পাঁচবার বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হন।

আখতারুজ্জামানের প্রথম বহিষ্কারাদেশ আসে ১৯৯৬ সালে, যখন তিনি তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের তত্ত্ববধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবিকে জনগণের দাবি আখ্যা দিয়ে তা মেনে নেওয়ার জন্য বিএনপির প্রতি আহ্বান জানান। এরপর ২০০০ সালে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ায় সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাঁর সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয়। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি আদালতে গেলেও ২০০১ সালের জুলাইয়ে সংসদ বিলুপ্ত হওয়ার আগে পর্যন্ত আসনটি শূন্যই ছিল এবং সেবার তিনি দ্বিতীয়বারের মতো বহিষ্কৃত হন। ২০১৪ সালে বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে অশালীন মন্তব্য করায় তৃতীয়বার এবং দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সমালোচনা করায় চতুর্থবার বহিষ্কৃত হন তিনি। তবে প্রতিবারই পরবর্তীতে তাঁর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছিল। সর্বশেষ ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি টক শোতে অংশ নিয়ে ‘বিএনপির লজ্জা-শরম নেই, কোনো ভিশন নেই’ মন্তব্য করে দলটির নেতাদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘তাদের শরম হবে যখন কর্মীরা তাদের জুতাপেটা করবে।’ এই মন্তব্যের জেরে ওই বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি পঞ্চমবারের মতো দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর তিনি আর বিএনপিতে ফিরতে পারেননি। যদিও ২০২৪ সালের শেষভাগে এসে কিশোরগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার ঘোষণা দিয়ে আবার দলে ফেরার গুঞ্জন তৈরি করেছিলেন তিনি।

বহিষ্কৃত থাকার সময়েই ২০২৩ সালের ৮ জুন গণভবনে গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন আখতারুজ্জামান। সেখানে তিনি তাঁর ছেলে সাব্বির জামানের উদ্যোগ ‘কিশোরগঞ্জ গ্রিন পাওয়ার’-এর পক্ষ থেকে ৭০ মেগাওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্টের অনুমতি চেয়ে শেখ হাসিনার হাতে লিখিত আবেদন তুলে দেন। ওই সাক্ষাতের পর থেকে তিনি শেখ হাসিনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠেন এবং এক টক শোতে শেখ হাসিনাকে ‘দশভুজা দেবী’র সঙ্গে তুলনা করেন। একই সঙ্গে বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কড়া সমালোচনাও শুরু করেন তিনি। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির বিতর্কিত ‘ডামি’ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে গণসংযোগে তিনি বলেছিলেন, ‘ঘরে ঘুমিয়ে থাকলেও পাস করব, এটাই রাজনৈতিক বাস্তবতা’। তবে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মুখে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত তাঁর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়।

জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আখতারুজ্জামানের সম্পর্ক ও তাঁর বক্তব্যও চরম বৈপরীত্যে ভরা। ১৯৯১ সালে জামায়াতের সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠনের বিরোধিতা করা আখতারুজ্জামান ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে কিশোরগঞ্জে সাংবাদিকদের দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জামায়াতকে ‘রগ কাটার দল’ আখ্যা দিয়ে নেতা-কর্মীদের সাবধান করেছিলেন। এছাড়া একাত্তরের ভূমিকার জন্য জামায়াতকে বিভিন্ন সময়ে ‘রাজাকার’ ও ‘যুদ্ধাপরাধী’ বলেও সম্বোধন করেছেন তিনি। এমনকি ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে এক টক শোতে অংশ নিয়ে আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের সন্তান’ আখ্যা দিয়ে উত্তেজিত কণ্ঠে বলেন, ‘তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী। ১০০ বার। আমি দাবি নিয়ে বলছি। তাদের পারিবারিক ঐতিহ্য দেখেন।’ সেখানে তিনি আরও দাবি করেন, ‘সমস্ত রাজাকার, যুদ্ধাপরাধী, জামায়াত এটাতে যুক্ত।’ অথচ অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে, গত ১৩ ডিসেম্বর ঢাকার মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে দলটির আমির শফিকুর রহমানের সঙ্গে দেখা করে প্রাথমিক সহযোগী সদস্য ফরম পূরণের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে যোগ দেন তিনি। এই যোগদানের পর তিনি দাবি করেন, জামায়াতের কার্যক্রমে অনেক পরিবর্তন এসেছে। তবে জুলাই অভ্যুত্থানের সাবেক সমন্বয়ক আবদুল কাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন, আন্দোলনের বিরোধিতা করা এবং শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মাঠে নামা আখতারুজ্জামানকে কেন বিচারের আওতায় না এনে জামায়াত ‘শেল্টার’ দিল।

বেসরকারি টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের টক শোতে নিয়মিত আলোচক হিসেবে অংশ নিয়ে প্রায়ই সহ-আলোচকদের প্রতি আক্রমণাত্মক আচরণের জন্য আখতারুজ্জামান পরিচিত। একবার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাহবুব কামালের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে তিনি ক্ষুব্ধ আচরণ করেন। আবার আমজনতার দলের সদস্যসচিব তারেক রহমানের সঙ্গে তুমুল বিতর্কের একপর্যায়ে বলেন, ‘আপনার জিহ্বা ছিঁড়ে ফেলা দরকার’ এবং তারেক রহমানের মতো রাজনীতিবিদদের কারণেই গুম-খুনের কালচার আসে বলে মন্তব্য করেন। এছাড়া চলতি বছরের মাঝামাঝি এক টক শোতে জবান ম্যাগাজিনের সম্পাদক রেজাউল করিম রনির সঙ্গে একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে তর্কে জড়িয়ে আখতারুজ্জামান দাবি করেন, ‘১৬ ডিসেম্বরের আগপর্যন্ত জামায়াত পাকিস্তানের পক্ষে ছিল, কিন্তু তারা গণহত্যা করে নাই।’

প্রমাণ আছে।’.বিএনপির মনোনয়নে ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে নির্বাচন করে হেরে যান আখতারুজ্জামান।

আখতারুজ্জামান এই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গেলেও ২০০১ সালের জুলাই মাসে সপ্তম সংসদ (১৯৯১-৯৬) বিলুপ্ত হওয়ার আগপর্যন্ত তাঁর আসনটি শূন্যই ছিল।

জনপ্রিয় সংবাদ

আফগানিস্তানের বিপক্ষে পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ খেলবে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল

বৈপরীত্যে ভরা রাজনৈতিক জীবন: কে এই মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান?

প্রকাশিত হয়েছে: ০৬:৪৪:০৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬

রাজনৈতিক জীবনজুড়ে একের পর এক অবস্থান পরিবর্তন ও চরম বৈপরীত্যের কারণে বরাবরই এক আলোচিত চরিত্র মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান। ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, সরকারি কাজে বাধা দেওয়া এবং দায়িত্বরত এক নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার মামলায় সম্প্রতি গ্রেফতার হয়েছেন তিনি। গত শনিবার ঢাকার একটি আদালত তাঁর এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। গত ১ অক্টোবরের ওই ঘটনার সময় বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদকে ‘আমি কিন্তু পিটাবো ধইরা’, ‘ঘাড় ধরে বের করে দিবো’ বলে প্রকাশ্যে হুমকি দেন আখতারুজ্জামান, যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। ঘটনার দিন জামায়াতের সাবেক ও বর্তমান সংসদ সদস্য, তাঁদের পরিবার ও দলটির নেতাদের নিয়ে গঠিত ৭১ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে তিনি বিদেশ সফর শেষে দেশে ফিরেছিলেন। অবশ্য বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনার এই ঘটনার পর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বিমানবন্দর পরিদর্শন করে সেবা বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন।

১৯৫১ সালে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলায় জন্মগ্রহণ করা আখতারুজ্জামান (ডাকনাম রঞ্জন) ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালেই দলটির সঙ্গে যুক্ত হওয়া আখতারুজ্জামান কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তৎকালীন সময়ে কটিয়াদী উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনটিতে পরে পাকুন্দিয়া উপজেলা যুক্ত করা হয়। একসময় কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করা এই বীর মুক্তিযোদ্ধা দল ও দলীয় নেতাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে বারবার শাস্তির মুখোমুখি হয়েছেন। রাজনৈতিক জীবনে তিনি মোট পাঁচবার বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হন।

আখতারুজ্জামানের প্রথম বহিষ্কারাদেশ আসে ১৯৯৬ সালে, যখন তিনি তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের তত্ত্ববধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবিকে জনগণের দাবি আখ্যা দিয়ে তা মেনে নেওয়ার জন্য বিএনপির প্রতি আহ্বান জানান। এরপর ২০০০ সালে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ায় সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাঁর সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয়। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি আদালতে গেলেও ২০০১ সালের জুলাইয়ে সংসদ বিলুপ্ত হওয়ার আগে পর্যন্ত আসনটি শূন্যই ছিল এবং সেবার তিনি দ্বিতীয়বারের মতো বহিষ্কৃত হন। ২০১৪ সালে বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে অশালীন মন্তব্য করায় তৃতীয়বার এবং দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সমালোচনা করায় চতুর্থবার বহিষ্কৃত হন তিনি। তবে প্রতিবারই পরবর্তীতে তাঁর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছিল। সর্বশেষ ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি টক শোতে অংশ নিয়ে ‘বিএনপির লজ্জা-শরম নেই, কোনো ভিশন নেই’ মন্তব্য করে দলটির নেতাদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘তাদের শরম হবে যখন কর্মীরা তাদের জুতাপেটা করবে।’ এই মন্তব্যের জেরে ওই বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি পঞ্চমবারের মতো দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর তিনি আর বিএনপিতে ফিরতে পারেননি। যদিও ২০২৪ সালের শেষভাগে এসে কিশোরগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার ঘোষণা দিয়ে আবার দলে ফেরার গুঞ্জন তৈরি করেছিলেন তিনি।

বহিষ্কৃত থাকার সময়েই ২০২৩ সালের ৮ জুন গণভবনে গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন আখতারুজ্জামান। সেখানে তিনি তাঁর ছেলে সাব্বির জামানের উদ্যোগ ‘কিশোরগঞ্জ গ্রিন পাওয়ার’-এর পক্ষ থেকে ৭০ মেগাওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্টের অনুমতি চেয়ে শেখ হাসিনার হাতে লিখিত আবেদন তুলে দেন। ওই সাক্ষাতের পর থেকে তিনি শেখ হাসিনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠেন এবং এক টক শোতে শেখ হাসিনাকে ‘দশভুজা দেবী’র সঙ্গে তুলনা করেন। একই সঙ্গে বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কড়া সমালোচনাও শুরু করেন তিনি। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির বিতর্কিত ‘ডামি’ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে গণসংযোগে তিনি বলেছিলেন, ‘ঘরে ঘুমিয়ে থাকলেও পাস করব, এটাই রাজনৈতিক বাস্তবতা’। তবে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মুখে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত তাঁর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়।

জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আখতারুজ্জামানের সম্পর্ক ও তাঁর বক্তব্যও চরম বৈপরীত্যে ভরা। ১৯৯১ সালে জামায়াতের সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠনের বিরোধিতা করা আখতারুজ্জামান ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে কিশোরগঞ্জে সাংবাদিকদের দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জামায়াতকে ‘রগ কাটার দল’ আখ্যা দিয়ে নেতা-কর্মীদের সাবধান করেছিলেন। এছাড়া একাত্তরের ভূমিকার জন্য জামায়াতকে বিভিন্ন সময়ে ‘রাজাকার’ ও ‘যুদ্ধাপরাধী’ বলেও সম্বোধন করেছেন তিনি। এমনকি ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে এক টক শোতে অংশ নিয়ে আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের সন্তান’ আখ্যা দিয়ে উত্তেজিত কণ্ঠে বলেন, ‘তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী। ১০০ বার। আমি দাবি নিয়ে বলছি। তাদের পারিবারিক ঐতিহ্য দেখেন।’ সেখানে তিনি আরও দাবি করেন, ‘সমস্ত রাজাকার, যুদ্ধাপরাধী, জামায়াত এটাতে যুক্ত।’ অথচ অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে, গত ১৩ ডিসেম্বর ঢাকার মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে দলটির আমির শফিকুর রহমানের সঙ্গে দেখা করে প্রাথমিক সহযোগী সদস্য ফরম পূরণের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে যোগ দেন তিনি। এই যোগদানের পর তিনি দাবি করেন, জামায়াতের কার্যক্রমে অনেক পরিবর্তন এসেছে। তবে জুলাই অভ্যুত্থানের সাবেক সমন্বয়ক আবদুল কাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন, আন্দোলনের বিরোধিতা করা এবং শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মাঠে নামা আখতারুজ্জামানকে কেন বিচারের আওতায় না এনে জামায়াত ‘শেল্টার’ দিল।

বেসরকারি টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের টক শোতে নিয়মিত আলোচক হিসেবে অংশ নিয়ে প্রায়ই সহ-আলোচকদের প্রতি আক্রমণাত্মক আচরণের জন্য আখতারুজ্জামান পরিচিত। একবার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাহবুব কামালের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে তিনি ক্ষুব্ধ আচরণ করেন। আবার আমজনতার দলের সদস্যসচিব তারেক রহমানের সঙ্গে তুমুল বিতর্কের একপর্যায়ে বলেন, ‘আপনার জিহ্বা ছিঁড়ে ফেলা দরকার’ এবং তারেক রহমানের মতো রাজনীতিবিদদের কারণেই গুম-খুনের কালচার আসে বলে মন্তব্য করেন। এছাড়া চলতি বছরের মাঝামাঝি এক টক শোতে জবান ম্যাগাজিনের সম্পাদক রেজাউল করিম রনির সঙ্গে একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে তর্কে জড়িয়ে আখতারুজ্জামান দাবি করেন, ‘১৬ ডিসেম্বরের আগপর্যন্ত জামায়াত পাকিস্তানের পক্ষে ছিল, কিন্তু তারা গণহত্যা করে নাই।’

প্রমাণ আছে।’.বিএনপির মনোনয়নে ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে নির্বাচন করে হেরে যান আখতারুজ্জামান।

আখতারুজ্জামান এই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গেলেও ২০০১ সালের জুলাই মাসে সপ্তম সংসদ (১৯৯১-৯৬) বিলুপ্ত হওয়ার আগপর্যন্ত তাঁর আসনটি শূন্যই ছিল।