লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৪:৪৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কক্সবাজারে ছেলেকে হারিয়ে আকাশপথে নিউজিল্যান্ডে ফিরছেন এডওয়ার্ড

নিজের তৈরি কাঠের নৌযান ‘আইল্যান্ড গার্ল’ নিয়ে সমুদ্রপথে বিশ্বভ্রমণের এক বুক স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন নিউজিল্যান্ডের নাগরিক জন এডওয়ার্ড পুডনি। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে কক্সবাজারে আড়াই বছর ধরে তৈরি করেছিলেন সেই স্বপ্নের নৌযান। কিন্তু কক্সবাজারের মোহনায় এক মর্মান্তিক নৌকাডুবিতে বড় ছেলেকে হারিয়ে অবশেষে আজ শুক্রবার রাতে সপরিবারে আকাশপথে নিউজিল্যান্ডে ফিরে যাচ্ছেন তিনি। পেছনে পড়ে রইল ছেলের স্মৃতি আর বাঁকখালী নদীর তীরে পড়ে থাকা তাঁদের স্বপ্নের সেই নৌযান।

গত ২৫ আগস্ট সকালে কক্সবাজারের নাজিরারটেক থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল পরিবারটি। সকাল সাড়ে নয়টার দিকে মহেশখালী চ্যানেলের সোনাদিয়া মোহনায় তীব্র স্রোত ও বড় ঢেউয়ের কবলে পড়ে তাঁদের কাঠের তৈরি দোতলা সদৃশ নৌযানটি। প্রত্যক্ষদর্শী সোনাদিয়ার জেলে আবদুর রহমান জানান, দুটি কাঠের নৌকা জোড়া দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল ‘আইল্যান্ড গার্ল’। ঢেউয়ের প্রচণ্ড ধাক্কায় নৌকা দুটির সংযোগস্থল বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুরো নৌযানটি সাগরে ডুবে যায়।

দুর্ঘটনার পর স্থানীয় জেলেরা জন এডওয়ার্ড, তাঁর স্ত্রী বেলা এবং ১৩ বছর বয়সী ছোট ছেলে রালফকে জীবিত উদ্ধার করতে পারলেও নিখোঁজ থাকে তাঁদের ১৬ বছর বয়সী বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বড় ছেলে আলবার্ট। সাঁতার না জানা আলবার্টের লাইফ জ্যাকেটের ক্লিপটি সম্ভবত ঠিকমতো আটকানো ছিল না বলে ধারণা করছে পরিবারটি। দীর্ঘ ৩২ ঘণ্টা পর, ২৬ আগস্ট বিকেলে কক্সবাজার পৌরসভার সমিতিরপাড়া সৈকতে আলবার্টের মরদেহ ভেসে ওঠে।

কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী জানান, ময়নাতদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে নিউজিল্যান্ড দূতাবাস এবং পরিবারের সম্মতিতে গত ১৫ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের একটি হিন্দু শ্মশানে আলবার্টের দাহকর্ম সম্পন্ন করা হয়। বাংলাদেশে নিউজিল্যান্ডের কোনো দূতাবাস না থাকায় নিকটবর্তী শ্রীলঙ্কা দূতাবাসের সহায়তায় পরিবারটিকে দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।

নৌকাডুবির পর থেকে জন এডওয়ার্ড ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের কক্সবাজারের পর্যটন করপোরেশনের মোটেল শৈবালে কড়া নিরাপত্তায় রাখা হয়েছিল বলে জানান জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের ইনচার্জ ও সহকারী কমিশনার মাহমুদুর রহমান। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান জানান, দুর্ঘটনায় তাঁদের পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র হারিয়ে যাওয়ায় বিকল্প উপায়ে তাঁদের দেশে ফেরার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত নৌযানটি কোস্টগার্ডের হেফাজতে রয়েছে এবং উদ্ধার হওয়া কিছু মালামাল পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

কোস্টগার্ড পূর্ব জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, নিরাপত্তার ঝুঁকি বিবেচনা করে এই পরিবারটিকে আগেই সমুদ্রযাত্রা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। এর আগে গত ৭ এপ্রিলও বৈরী আবহাওয়ার কারণে মহেশখালী চ্যানেলে তাঁদের নৌযানটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সে সময় সোনাদিয়া দ্বীপে আশ্রয় নিলে দুর্বৃত্তরা তাঁদের ওপর হামলা চালিয়ে ক্যামেরা, মোবাইল, পাসপোর্ট ও ডলার লুট করে। পরে কোস্টগার্ড তাঁদের উদ্ধার করে এবং লুটের অধিকাংশ মালামাল উদ্ধার করে দেয়। তবে তাঁরা সমুদ্রযাত্রার পরিকল্পনা থেকে সরে আসেননি।

জন এডওয়ার্ডের স্থানীয় সহযোগী আবদুর রউফ জানান, প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে স্থানীয় কারিগরদের সহযোগিতায় কক্সবাজারের এসএম পাড়ায় আড়াই বছর ধরে ‘আইল্যান্ড গার্ল’ তৈরি করা হয়েছিল। শীততাপনিয়ন্ত্রিত কক্ষ, ফ্রিজ ও রান্নাঘর সমৃদ্ধ এই নৌযানে করে প্রায় ১১ হাজার কিলোমিটার সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে নিউজিল্যান্ডে পৌঁছানোর পরিকল্পনা ছিল তাঁদের। নাজিরারটেক এলাকার বাসিন্দা দিদারুল ইসলাম রুবেলও জানান, স্থানীয় কারিগরদের নিয়ে দীর্ঘ আড়াই বছর ধরে চলে এই নৌযানের নির্মাণকাজ। তবে জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের ইনচার্জ মাহমুদুর রহমান জানান, কাঠের তৈরি নৌযানে এমন দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার পরিকল্পনা সম্পর্কে জেলা প্রশাসন আগে থেকে অবগত ছিল না।

জনপ্রিয় সংবাদ

রংপুরে শিক্ষক পরিবার হত্যা: ২ আসামির ডিএনএ শনাক্ত

কক্সবাজারে ছেলেকে হারিয়ে আকাশপথে নিউজিল্যান্ডে ফিরছেন এডওয়ার্ড

প্রকাশিত হয়েছে: ০৯:০৩:১১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬

নিজের তৈরি কাঠের নৌযান ‘আইল্যান্ড গার্ল’ নিয়ে সমুদ্রপথে বিশ্বভ্রমণের এক বুক স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন নিউজিল্যান্ডের নাগরিক জন এডওয়ার্ড পুডনি। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে কক্সবাজারে আড়াই বছর ধরে তৈরি করেছিলেন সেই স্বপ্নের নৌযান। কিন্তু কক্সবাজারের মোহনায় এক মর্মান্তিক নৌকাডুবিতে বড় ছেলেকে হারিয়ে অবশেষে আজ শুক্রবার রাতে সপরিবারে আকাশপথে নিউজিল্যান্ডে ফিরে যাচ্ছেন তিনি। পেছনে পড়ে রইল ছেলের স্মৃতি আর বাঁকখালী নদীর তীরে পড়ে থাকা তাঁদের স্বপ্নের সেই নৌযান।

গত ২৫ আগস্ট সকালে কক্সবাজারের নাজিরারটেক থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল পরিবারটি। সকাল সাড়ে নয়টার দিকে মহেশখালী চ্যানেলের সোনাদিয়া মোহনায় তীব্র স্রোত ও বড় ঢেউয়ের কবলে পড়ে তাঁদের কাঠের তৈরি দোতলা সদৃশ নৌযানটি। প্রত্যক্ষদর্শী সোনাদিয়ার জেলে আবদুর রহমান জানান, দুটি কাঠের নৌকা জোড়া দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল ‘আইল্যান্ড গার্ল’। ঢেউয়ের প্রচণ্ড ধাক্কায় নৌকা দুটির সংযোগস্থল বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুরো নৌযানটি সাগরে ডুবে যায়।

দুর্ঘটনার পর স্থানীয় জেলেরা জন এডওয়ার্ড, তাঁর স্ত্রী বেলা এবং ১৩ বছর বয়সী ছোট ছেলে রালফকে জীবিত উদ্ধার করতে পারলেও নিখোঁজ থাকে তাঁদের ১৬ বছর বয়সী বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বড় ছেলে আলবার্ট। সাঁতার না জানা আলবার্টের লাইফ জ্যাকেটের ক্লিপটি সম্ভবত ঠিকমতো আটকানো ছিল না বলে ধারণা করছে পরিবারটি। দীর্ঘ ৩২ ঘণ্টা পর, ২৬ আগস্ট বিকেলে কক্সবাজার পৌরসভার সমিতিরপাড়া সৈকতে আলবার্টের মরদেহ ভেসে ওঠে।

কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী জানান, ময়নাতদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে নিউজিল্যান্ড দূতাবাস এবং পরিবারের সম্মতিতে গত ১৫ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের একটি হিন্দু শ্মশানে আলবার্টের দাহকর্ম সম্পন্ন করা হয়। বাংলাদেশে নিউজিল্যান্ডের কোনো দূতাবাস না থাকায় নিকটবর্তী শ্রীলঙ্কা দূতাবাসের সহায়তায় পরিবারটিকে দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।

নৌকাডুবির পর থেকে জন এডওয়ার্ড ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের কক্সবাজারের পর্যটন করপোরেশনের মোটেল শৈবালে কড়া নিরাপত্তায় রাখা হয়েছিল বলে জানান জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের ইনচার্জ ও সহকারী কমিশনার মাহমুদুর রহমান। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান জানান, দুর্ঘটনায় তাঁদের পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র হারিয়ে যাওয়ায় বিকল্প উপায়ে তাঁদের দেশে ফেরার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত নৌযানটি কোস্টগার্ডের হেফাজতে রয়েছে এবং উদ্ধার হওয়া কিছু মালামাল পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

কোস্টগার্ড পূর্ব জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, নিরাপত্তার ঝুঁকি বিবেচনা করে এই পরিবারটিকে আগেই সমুদ্রযাত্রা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। এর আগে গত ৭ এপ্রিলও বৈরী আবহাওয়ার কারণে মহেশখালী চ্যানেলে তাঁদের নৌযানটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সে সময় সোনাদিয়া দ্বীপে আশ্রয় নিলে দুর্বৃত্তরা তাঁদের ওপর হামলা চালিয়ে ক্যামেরা, মোবাইল, পাসপোর্ট ও ডলার লুট করে। পরে কোস্টগার্ড তাঁদের উদ্ধার করে এবং লুটের অধিকাংশ মালামাল উদ্ধার করে দেয়। তবে তাঁরা সমুদ্রযাত্রার পরিকল্পনা থেকে সরে আসেননি।

জন এডওয়ার্ডের স্থানীয় সহযোগী আবদুর রউফ জানান, প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে স্থানীয় কারিগরদের সহযোগিতায় কক্সবাজারের এসএম পাড়ায় আড়াই বছর ধরে ‘আইল্যান্ড গার্ল’ তৈরি করা হয়েছিল। শীততাপনিয়ন্ত্রিত কক্ষ, ফ্রিজ ও রান্নাঘর সমৃদ্ধ এই নৌযানে করে প্রায় ১১ হাজার কিলোমিটার সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে নিউজিল্যান্ডে পৌঁছানোর পরিকল্পনা ছিল তাঁদের। নাজিরারটেক এলাকার বাসিন্দা দিদারুল ইসলাম রুবেলও জানান, স্থানীয় কারিগরদের নিয়ে দীর্ঘ আড়াই বছর ধরে চলে এই নৌযানের নির্মাণকাজ। তবে জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের ইনচার্জ মাহমুদুর রহমান জানান, কাঠের তৈরি নৌযানে এমন দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার পরিকল্পনা সম্পর্কে জেলা প্রশাসন আগে থেকে অবগত ছিল না।