লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৬:২২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সেবা না দিয়ে সুয়ারেজ বিল আদায়: ঢাকা ওয়াসার অস্বচ্ছতা ও প্রতিকার

জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা, কিন্তু ঢাকা ওয়াসার ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। রাজধানীর অধিকাংশ এলাকায় কার্যকর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকা সত্ত্বেও পানির বিলের সঙ্গে নিয়মিত সুয়ারেজ বিল আদায় করা হচ্ছে। যে সেবা গ্রাহক পাচ্ছেন না, তার জন্য অর্থ প্রদানকে নাগরিকরা অন্যায্য এবং চরম জবাবদিহিহীনতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন। এই প্রেক্ষাপটে গত ১০ সেপ্টেম্বর গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সুয়ারেজ লাইনবিহীন এলাকায় আগামী এক বছর বিল আদায় না করার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ।

ঢাকা ওয়াসার নিজস্ব পরিসংখ্যানই সেবার বিস্তার ও বিল আদায়ের অসংগতি স্পষ্ট করে। সংস্থাটির ১০টি পরিচালন অঞ্চলের মধ্যে মাত্র দুটি অঞ্চলে পূর্ণাঙ্গ সুয়ারেজ ব্যবস্থা রয়েছে। চারটি অঞ্চলে আংশিক ব্যবস্থা থাকলেও বাকি চারটিতে কোনো সুয়ারেজ লাইনই নেই। অথচ গুলশান, বনানী, বারিধারা, নিকেতন, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা ও নিকুঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পানি সরবরাহের সংযোগ থাকায় গ্রাহকদের কাছ থেকে পয়ঃনিষ্কাশন বিল নেওয়া হচ্ছে। রাজধানীতে পানির সরবরাহ লাইন তিন হাজার পাঁচশ কিলোমিটারের বেশি হলেও সুয়ারেজ লাইন মাত্র ৯৩০ কিলোমিটার, যা সেবার সীমাবদ্ধতার বড় প্রমাণ।

এক বছরের এই সাময়িক অব্যাহতি যেন কেবল একটি আশ্বাস না হয়, বরং তা যেন সেবার সঙ্গে বিলের সামঞ্জস্য বিধান এবং পয়ঃনিষ্কাশন সংকট সমাধানের কার্যকর উদ্যোগে পরিণত হয়। এই সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা নির্ভর করছে দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর। কোন কোন এলাকা এই সুবিধার আওতায় আসবে, কবে থেকে এটি কার্যকর হবে এবং গ্রাহকরা কীভাবে বিল থেকে অব্যাহতি পাবেন—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন। এছাড়া যেসব এলাকায় কাগজে-কলমে সুয়ারেজ লাইন থাকলেও তা অকার্যকর, সেসব এলাকার বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করা জরুরি। কেবল অবকাঠামোর অস্তিত্ব নয়, সেবার কার্যকারিতাকেই বিল আদায়ের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার এই সংকট কেবল আর্থিক বিষয় নয়, বরং জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর মাত্র ২০ শতাংশ এলাকায় পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা রয়েছে। কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় বিপুল পরিমাণ পয়ঃবর্জ্য খাল, নদী ও জলাশয়ে মিশছে, যার ফলে গুলশান-বনানী লেকের মতো জলাধারগুলো দূষিত হচ্ছে। ২০১৩ সালে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা নেওয়া হলেও এক যুগেও তার প্রত্যাশিত বাস্তবায়ন হয়নি। দাশেরকান্দি শোধনাগার নির্মিত হলেও প্রয়োজনীয় নেটওয়ার্ক পাইপলাইন গড়ে ওঠেনি, অন্য শোধনাগারগুলোর অগ্রগতিও সীমিত।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ঢাকা ওয়াসাকে বিল আদায়ের হিসাবের পাশাপাশি সেবার মান ও অবকাঠামোগত অগ্রগতির হিসাব জনগণের সামনে স্বচ্ছভাবে তুলে ধরতে হবে। কোন এলাকায় কত গ্রাহক বিল দিচ্ছেন এবং কতজন প্রকৃত সেবা পাচ্ছেন, তা নিয়মিত প্রকাশ করা উচিত। পাশাপাশি পয়ঃনিষ্কাশন লাইন সম্প্রসারণ, পুরনো লাইন সংস্কার এবং বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণে সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে রাজউক, সিটি করপোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও আবাসিক সমিতিগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। সেপটিক ট্যাংক বা বর্জ্য শোধনাগার স্থাপনের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে ভবনের নকশা ও কারিগরি বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে।

পরিশেষে, জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সাফল্য কেবল রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ দিয়ে নির্ধারিত হয় না, বরং নাগরিকরা কতটা কার্যকর সেবা পাচ্ছেন সেটিই প্রধান মাপকাঠি। অতীতে সেবা না পেয়েও যাঁরা বিল দিয়েছেন, তাঁদের অভিযোগ পর্যালোচনা করে প্রতিকারের উপায় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এক বছরের সাময়িক অব্যাহতি যেন সমস্যাকে আড়াল করার সুযোগ না হয়। নাগরিকেরা বিল দিতে আপত্তি করেন না, তাঁদের ন্যায্য দাবি হলো—যে সেবার জন্য অর্থ দেওয়া হচ্ছে, সেই সেবা বাস্তবেও নিশ্চিত করতে হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

চাটমোহরে বৃত্তিপ্রাপ্ত ২৩৯ শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা প্রদান

সেবা না দিয়ে সুয়ারেজ বিল আদায়: ঢাকা ওয়াসার অস্বচ্ছতা ও প্রতিকার

প্রকাশিত হয়েছে: ০৭:৩২:৫৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬

জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা, কিন্তু ঢাকা ওয়াসার ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। রাজধানীর অধিকাংশ এলাকায় কার্যকর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকা সত্ত্বেও পানির বিলের সঙ্গে নিয়মিত সুয়ারেজ বিল আদায় করা হচ্ছে। যে সেবা গ্রাহক পাচ্ছেন না, তার জন্য অর্থ প্রদানকে নাগরিকরা অন্যায্য এবং চরম জবাবদিহিহীনতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন। এই প্রেক্ষাপটে গত ১০ সেপ্টেম্বর গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সুয়ারেজ লাইনবিহীন এলাকায় আগামী এক বছর বিল আদায় না করার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ।

ঢাকা ওয়াসার নিজস্ব পরিসংখ্যানই সেবার বিস্তার ও বিল আদায়ের অসংগতি স্পষ্ট করে। সংস্থাটির ১০টি পরিচালন অঞ্চলের মধ্যে মাত্র দুটি অঞ্চলে পূর্ণাঙ্গ সুয়ারেজ ব্যবস্থা রয়েছে। চারটি অঞ্চলে আংশিক ব্যবস্থা থাকলেও বাকি চারটিতে কোনো সুয়ারেজ লাইনই নেই। অথচ গুলশান, বনানী, বারিধারা, নিকেতন, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা ও নিকুঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পানি সরবরাহের সংযোগ থাকায় গ্রাহকদের কাছ থেকে পয়ঃনিষ্কাশন বিল নেওয়া হচ্ছে। রাজধানীতে পানির সরবরাহ লাইন তিন হাজার পাঁচশ কিলোমিটারের বেশি হলেও সুয়ারেজ লাইন মাত্র ৯৩০ কিলোমিটার, যা সেবার সীমাবদ্ধতার বড় প্রমাণ।

এক বছরের এই সাময়িক অব্যাহতি যেন কেবল একটি আশ্বাস না হয়, বরং তা যেন সেবার সঙ্গে বিলের সামঞ্জস্য বিধান এবং পয়ঃনিষ্কাশন সংকট সমাধানের কার্যকর উদ্যোগে পরিণত হয়। এই সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা নির্ভর করছে দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর। কোন কোন এলাকা এই সুবিধার আওতায় আসবে, কবে থেকে এটি কার্যকর হবে এবং গ্রাহকরা কীভাবে বিল থেকে অব্যাহতি পাবেন—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন। এছাড়া যেসব এলাকায় কাগজে-কলমে সুয়ারেজ লাইন থাকলেও তা অকার্যকর, সেসব এলাকার বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করা জরুরি। কেবল অবকাঠামোর অস্তিত্ব নয়, সেবার কার্যকারিতাকেই বিল আদায়ের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার এই সংকট কেবল আর্থিক বিষয় নয়, বরং জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর মাত্র ২০ শতাংশ এলাকায় পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা রয়েছে। কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় বিপুল পরিমাণ পয়ঃবর্জ্য খাল, নদী ও জলাশয়ে মিশছে, যার ফলে গুলশান-বনানী লেকের মতো জলাধারগুলো দূষিত হচ্ছে। ২০১৩ সালে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা নেওয়া হলেও এক যুগেও তার প্রত্যাশিত বাস্তবায়ন হয়নি। দাশেরকান্দি শোধনাগার নির্মিত হলেও প্রয়োজনীয় নেটওয়ার্ক পাইপলাইন গড়ে ওঠেনি, অন্য শোধনাগারগুলোর অগ্রগতিও সীমিত।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ঢাকা ওয়াসাকে বিল আদায়ের হিসাবের পাশাপাশি সেবার মান ও অবকাঠামোগত অগ্রগতির হিসাব জনগণের সামনে স্বচ্ছভাবে তুলে ধরতে হবে। কোন এলাকায় কত গ্রাহক বিল দিচ্ছেন এবং কতজন প্রকৃত সেবা পাচ্ছেন, তা নিয়মিত প্রকাশ করা উচিত। পাশাপাশি পয়ঃনিষ্কাশন লাইন সম্প্রসারণ, পুরনো লাইন সংস্কার এবং বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণে সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে রাজউক, সিটি করপোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও আবাসিক সমিতিগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। সেপটিক ট্যাংক বা বর্জ্য শোধনাগার স্থাপনের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে ভবনের নকশা ও কারিগরি বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে।

পরিশেষে, জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সাফল্য কেবল রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ দিয়ে নির্ধারিত হয় না, বরং নাগরিকরা কতটা কার্যকর সেবা পাচ্ছেন সেটিই প্রধান মাপকাঠি। অতীতে সেবা না পেয়েও যাঁরা বিল দিয়েছেন, তাঁদের অভিযোগ পর্যালোচনা করে প্রতিকারের উপায় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এক বছরের সাময়িক অব্যাহতি যেন সমস্যাকে আড়াল করার সুযোগ না হয়। নাগরিকেরা বিল দিতে আপত্তি করেন না, তাঁদের ন্যায্য দাবি হলো—যে সেবার জন্য অর্থ দেওয়া হচ্ছে, সেই সেবা বাস্তবেও নিশ্চিত করতে হবে।