লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৯:১৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতন: দোষারোপের বদলে প্রয়োজন কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা

গ্রামের মক্তব থেকে শুরু করে রমজানে তারাবির তিলাওয়াত—আমাদের সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে ধর্মীয় শিক্ষা। অনেক স্বজনই কওমি মাদ্রাসার আঙিনা পেরিয়ে মূলধারায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। অথচ সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা আমাদের উদ্বেগের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সাভারে সাত বছরের এক শিশু ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগে মাদ্রাসা শিক্ষকসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। একইভাবে সিলেট নগরীতে ১২ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে এক শিক্ষক কারাগারে এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে আট বছরের শিশুকে বলাৎকারের অভিযোগে প্রধান শিক্ষক র‍্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। যদিও এগুলো এখনো আদালতে প্রমাণসাপেক্ষ, কিন্তু শিশুদের কান্না আর মাদ্রাসায় না যাওয়ার অসহায় আকুতি নিরেট বাস্তব।

শিশুর ওপর যেকোনো নিপীড়নই জঘন্য অপরাধ। এর বিচার দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক হওয়া প্রয়োজন। তবে এই বিচারের দাবিকে যেন কোনো বিশেষ শিক্ষাধারার বিরুদ্ধে সামাজিক অবিশ্বাসের হাতিয়ার বানানো না হয়। ব্যানবেইসের ২০১৫ সালের হিসাব অনুযায়ী দেশে প্রায় ১৩ হাজার ৯০২টি কওমি মাদ্রাসায় প্রায় ১৪ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। বিভিন্ন বোর্ডের তথ্যমতে, এই সংখ্যা ২০ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। সমাজের দরিদ্র কৃষক, দিনমজুর বা রিকশাচালকের সন্তানেরা এই প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। কোরবানির চামড়া, জাকাত ও দান-অনুদান দিয়ে এই শিক্ষাব্যবস্থা টিকে আছে। ২০১৮ সালে সরকারি স্বীকৃতির মাধ্যমে কওমি শিক্ষা বোর্ডগুলো পুনর্গঠিত হয়েছে, কিন্তু এর সঙ্গে জবাবদিহির কাঠামো কতটা যুক্ত হয়েছে, তা বড় প্রশ্ন।

প্রতিটি আবাসিক মাদ্রাসায় লিখিত শিশুসুরক্ষা নীতি থাকা জরুরি। শিক্ষক নিয়োগে পটভূমি যাচাই, রাতে ঘুমানোর ব্যবস্থায় শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের পৃথকীকরণ এবং অভিযোগ জানানোর স্বাধীন হটলাইন থাকা আবশ্যক। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে ভয়ভীতি দেখিয়ে দীর্ঘ নীরবতা পালনের যে প্যাটার্ন দেখা যায়, তা ভয়াবহ। অপরাধ ঢাকার চেষ্টা বা সালিসের মাধ্যমে মীমাংসা করা অপরাধীর চেয়েও বড় অপরাধ। এদের চিহ্নিত করা এবং ব্যবস্থা নেওয়া বোর্ডগুলোরই দায়িত্ব। আমাদের জানা আছে, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্টের সিরিজ বোমা হামলার ঘটনা। শারীরিক শাস্তির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে মাদ্রাসার সম্মান রক্ষার নামে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে।

এক ব্যক্তির অপরাধের দায়ে পুরো কওমি সমাজকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যুক্তিহীন। কোরআনের নীতি অনুযায়ী, কেউ অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না। আল-হাইআতুল উলয়াসহ অন্যান্য বোর্ডের উচিত অবিলম্বে বাধ্যতামূলক শিশুসুরক্ষা নীতি প্রণয়ন করা এবং অননুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়ভার গ্রহণ করা। তারপর ২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানে রক্ত দিয়ে কওমি মাদ্রাসার আলেম ও শিক্ষার্থীরা প্রমাণ করেছেন ন্যায্য আন্দোলনে তারা ছাত্র-জনতার কাতারেই আছেন। সুতরাং পরিষ্কার সত্য হলো—অপরাধীকে চিহ্নিত করা এবং একটি পুরো শিক্ষাধারাকে সন্দেহ করা সম্পূর্ণ আলাদা কাজ। রাষ্ট্র, সমাজ ও অভিভাবকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মাদ্রাসায় পড়া শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মাদ্রাসাকে বয়কট নয়, বরং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে এই শিক্ষাধারাকে শোধরানোর অংশীদার হতে হবে সমাজকে।

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যবর্তী নির্বাচনে হারের পর হেগসেথকে সরানোর গুঞ্জন ট্রাম্পের অন্দরে

মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতন: দোষারোপের বদলে প্রয়োজন কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা

প্রকাশিত হয়েছে: ০২:১৭:৪৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬

গ্রামের মক্তব থেকে শুরু করে রমজানে তারাবির তিলাওয়াত—আমাদের সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে ধর্মীয় শিক্ষা। অনেক স্বজনই কওমি মাদ্রাসার আঙিনা পেরিয়ে মূলধারায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। অথচ সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা আমাদের উদ্বেগের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সাভারে সাত বছরের এক শিশু ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগে মাদ্রাসা শিক্ষকসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। একইভাবে সিলেট নগরীতে ১২ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে এক শিক্ষক কারাগারে এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে আট বছরের শিশুকে বলাৎকারের অভিযোগে প্রধান শিক্ষক র‍্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। যদিও এগুলো এখনো আদালতে প্রমাণসাপেক্ষ, কিন্তু শিশুদের কান্না আর মাদ্রাসায় না যাওয়ার অসহায় আকুতি নিরেট বাস্তব।

শিশুর ওপর যেকোনো নিপীড়নই জঘন্য অপরাধ। এর বিচার দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক হওয়া প্রয়োজন। তবে এই বিচারের দাবিকে যেন কোনো বিশেষ শিক্ষাধারার বিরুদ্ধে সামাজিক অবিশ্বাসের হাতিয়ার বানানো না হয়। ব্যানবেইসের ২০১৫ সালের হিসাব অনুযায়ী দেশে প্রায় ১৩ হাজার ৯০২টি কওমি মাদ্রাসায় প্রায় ১৪ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। বিভিন্ন বোর্ডের তথ্যমতে, এই সংখ্যা ২০ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। সমাজের দরিদ্র কৃষক, দিনমজুর বা রিকশাচালকের সন্তানেরা এই প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। কোরবানির চামড়া, জাকাত ও দান-অনুদান দিয়ে এই শিক্ষাব্যবস্থা টিকে আছে। ২০১৮ সালে সরকারি স্বীকৃতির মাধ্যমে কওমি শিক্ষা বোর্ডগুলো পুনর্গঠিত হয়েছে, কিন্তু এর সঙ্গে জবাবদিহির কাঠামো কতটা যুক্ত হয়েছে, তা বড় প্রশ্ন।

প্রতিটি আবাসিক মাদ্রাসায় লিখিত শিশুসুরক্ষা নীতি থাকা জরুরি। শিক্ষক নিয়োগে পটভূমি যাচাই, রাতে ঘুমানোর ব্যবস্থায় শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের পৃথকীকরণ এবং অভিযোগ জানানোর স্বাধীন হটলাইন থাকা আবশ্যক। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে ভয়ভীতি দেখিয়ে দীর্ঘ নীরবতা পালনের যে প্যাটার্ন দেখা যায়, তা ভয়াবহ। অপরাধ ঢাকার চেষ্টা বা সালিসের মাধ্যমে মীমাংসা করা অপরাধীর চেয়েও বড় অপরাধ। এদের চিহ্নিত করা এবং ব্যবস্থা নেওয়া বোর্ডগুলোরই দায়িত্ব। আমাদের জানা আছে, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্টের সিরিজ বোমা হামলার ঘটনা। শারীরিক শাস্তির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে মাদ্রাসার সম্মান রক্ষার নামে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে।

এক ব্যক্তির অপরাধের দায়ে পুরো কওমি সমাজকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যুক্তিহীন। কোরআনের নীতি অনুযায়ী, কেউ অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না। আল-হাইআতুল উলয়াসহ অন্যান্য বোর্ডের উচিত অবিলম্বে বাধ্যতামূলক শিশুসুরক্ষা নীতি প্রণয়ন করা এবং অননুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়ভার গ্রহণ করা। তারপর ২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানে রক্ত দিয়ে কওমি মাদ্রাসার আলেম ও শিক্ষার্থীরা প্রমাণ করেছেন ন্যায্য আন্দোলনে তারা ছাত্র-জনতার কাতারেই আছেন। সুতরাং পরিষ্কার সত্য হলো—অপরাধীকে চিহ্নিত করা এবং একটি পুরো শিক্ষাধারাকে সন্দেহ করা সম্পূর্ণ আলাদা কাজ। রাষ্ট্র, সমাজ ও অভিভাবকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মাদ্রাসায় পড়া শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মাদ্রাসাকে বয়কট নয়, বরং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে এই শিক্ষাধারাকে শোধরানোর অংশীদার হতে হবে সমাজকে।