লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১১:১১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঢাকার ২০২৪ সালের গণআন্দোলন ও দিল্লির সাম্প্রতিক বিক্ষোভের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

প্রতি দশ মিনিট পর পর নতুন খবর আর একের পর এক আটকের মধ্য দিয়ে ভারতের রাজধানী দিল্লি এখন অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। শনিবার সকাল থেকে ধ্রুব রাঠি, অভিজিৎ দীপক, সৌরভ দাস, আশুতোষ রাঙ্কার ও নেহা বোরাসহ আন্দোলনের একাধিক মুখকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। সন্ধ্যা নাগাদ ‘ককরোচ’ আন্দোলনের শীর্ষ সারির নেতাদের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে আটক করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় সাত হাজার আন্দোলনকারীকে আটক করা হলেও শেষ পাওয়া খবরে নেহা বোরাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটির বেশি নাগরিককে বেআইনিভাবে বাদ দেওয়ার অভিযোগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারকে গ্রেপ্তার করার দাবিতে আন্দোলনকারীরা যন্তর-মন্তরের দিকে যাত্রা করার পরিকল্পনা করেছিলেন। ধ্রুব রাঠির পরিচিত সম্ভাষণ ‘নমস্কার দোস্ত!’ এখন মোদি সরকারের জন্য এক বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে এবং এই 'জ্ঞানেশগেট' ঘটনা মোদি প্রশাসনের জন্য ‘ওয়াটারগেট’ সংকটে পরিণত হয় কি না, তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বর্তমান পরিস্থিতিকে বর্ণনা করে বলেছেন, ‘দিল্লি এখন দুর্গ, আর সারা দেশ এক কয়েদখানা।’ রাজনৈতিক চটকদারি মনে হলেও বাস্তবে আক্ষরিক অর্থেই দিল্লি এখন পুরোপুরি অবরুদ্ধ। সাধারণ নাগরিকদের শহরে প্রবেশ ও বের হওয়া বন্ধ রয়েছে। বাতিল করা হয়েছে মেল ট্রেন, বাস এবং মেট্রো রেল চলাচল। শহরজুড়ে চলছে গণধরপাকড়, জারি করা হয়েছে ১৬৩ ধারা এবং বিশাল এলাকাজুড়ে ইন্টারনেট পরিষেবা বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এই কঠোর আচরণের কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, মোদি সরকার ও ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সমর্থকেরা আন্দোলনকারীদের ‘দেশদ্রোহী’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। তা সত্ত্বেও তরুণেরা পিছু হটছে না; তাঁদের সঙ্গে রাস্তায় নেমেছেন অভিভাবক, তারকা ও বুদ্ধিজীবীরা। শহরের দেয়ালে দেয়ালে স্প্রে দিয়ে লেখা হচ্ছে ‘ভোট চোর গদ্দি ছোড়!’ স্লোগান ও নানা রঙের গ্রাফিতি। দৃশ্যপটটি ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তুলছে।

বাংলাদেশে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল কোটা সংস্কারকে কেন্দ্র করে, আর ভারতে তা শুরু হয় মেডিকেলের প্রশ্নপত্র বা নিট (NEET) পেপার ফাঁস থেকে। প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদে তরুণ সমাজ যখন রাস্তায় নামে, তখন ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত ভরা আদালতে বিক্ষোভকারীদের ‘ককরোচ’ বা ‘তেলাপোকা’ বলে মন্তব্য করেন। তরুণ আন্দোলনকারীরা এই গালিকেই নিজেদের প্রতিবাদের প্রতীক বানিয়ে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) গঠন করে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এটি বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘মুক্তিযোদ্ধার নাতিপুতিরা চাকরি পাবে না তো কি রাজাকারের বাচ্চারা পাবে’ মন্তব্যের পর শিক্ষার্থীদের ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার’ স্লোগান দিয়ে অপমানের ক্ষোভ উগরে দেওয়ার স্মারক বহন করে। আন্দোলনের মুখে মোদির ঘনিষ্ঠ শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করার পর বিক্ষোভ কিছুটা শান্ত হলেও তা স্থায়ী হয়নি। এর পরপরই সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের ভোট জালিয়াতির তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই তরুণেরা পুনরায় রাজপথে নেমে আসে।

বিক্ষোভের মুখে আন্দোলনকারীদের থামাতে সরকার দিল্লির ৫৭টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দেয়। সরকারের এই পদক্ষেপের সমালোচনা করতে গিয়ে শুক্রবার সেই প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের বেঞ্চই মন্তব্য করেন, ‘মাছি মারতে হাতুড়ি চালানো যায় না।’ অর্থাৎ তরুণদের উদ্যোগকে পুনরায় ‘মাছি’ বলে তুচ্ছ করার চেষ্টা করা হলেও রাজনৈতিক ভাষা কীভাবে পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে, বাংলাদেশ ও ভারতের বর্তমান ঘটনাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। শব্দের নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তি মানুষের স্মৃতিতে আটকে থেকে প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত হয়। এদিকে, বিজেপির নেতারা মূল সমস্যা বা জ্ঞানেশ কুমারের ভোট জালিয়াতির অভিযোগ নিয়ে নীরব থেকে আন্দোলনকারীদের পেছনে ইলন মাস্কের অর্থায়ন এবং পশ্চিমা ‘ডিপ স্টেট’-এর সহায়তা রয়েছে বলে দাবি করছেন। বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনের সময়ও আন্দোলনকে বিদেশি শক্তির কারসাজি বলে চালানোর একই ধরনের প্রবণতা দেখা গিয়েছিল।

প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক সারফুদ্দিন আহমেদ এক বিশ্লেষণে উল্লেখ করেন, দুটি দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও তাৎক্ষণিক দাবি ভিন্ন হলেও রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রে গভীর মিল রয়েছে। তরুণদের ক্ষোভ ছোট দাবি থেকে শুরু হলেও সরকারের কঠোর পদক্ষেপ তা বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্নে রূপ দেয়। বাংলাদেশে কোটা সংস্কারের মূল দাবি শিক্ষার্থী নির্যাতন, প্রাণহানি ও গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে ইনসাফ ও নাগরিক মর্যাদার লড়াইয়ে রূপ নিয়েছিল। তবে দিল্লিতে বর্তমানে নিরাপত্তাকর্মীরা তুলনামূলক পেশাদারিত্বের সঙ্গে বিক্ষোভ সামাল দিচ্ছেন এবং সেখানে এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তা সত্ত্বেও এত বড় দেশে বিস্তৃত আন্দোলন যেকোনো মুহূর্তে সহিংস রূপ নেওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।

শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল ও ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে যে দক্ষিণ এশিয়ার শাসনব্যবস্থাগুলো সামাজিক ক্ষোভ থেকে মুক্ত নয়। ক্ষমতা যখন সমালোচনা সহ্য করতে পারে না, তখন প্রশ্নকারীদের মুখ চেপে ধরা ও আন্দোলনকে নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে দেখার পথ বেছে নেয়। এই পথ সাময়িকভাবে শৃঙ্খলা আনলেও ক্ষোভের মূল কারণ দূর করতে পারে না। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে নরেন্দ্র মোদি কোনো উন্মুক্ত সংবাদ সম্মেলনের মুখোমুখি হননি। সরকারের এই পলায়নপর দৃষ্টিভঙ্গি নাকি নিজেকে অজেয় প্রমাণের চেষ্টা—চলমান আন্দোলন হয়তো শিগগিরই সেই প্রশ্নের উত্তর উন্মোচন করবে।

আবার এত শিগগিরই যে সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের জালিয়াতির খবর আলোয় আসবে এবং তার পরপরই সদ্য আস্তানায় ফেরা তেলাপোকারা শুঁড় উঁচিয়ে দলে দলে রাস্তায় নামবে—এটিও কেউ আঁচ করতে পারেনি।.নেহা বোরা যেভাবে ভারতে গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের তরুণ মুখ.দিল্লিতে বিক্ষোভ: ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে.ককরোচের হাত থেকে দিল্লিকে ‘রক্ষা’ করতে সরকার যখন দিল্লি মেট্রোর ৫৭টি স্টেশন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিল, তখন সেই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে গিয়ে বেকার তরুণদের ককরোচ বলে গালি দেওয়া সেই প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের বেঞ্চ শুক্রবার সরকারের উদ্দেশে বলেছেন, ‘মাছি মারতে হাতুড়ি চালানো যায় না।’ এখানেও আন্দোলনকারীদের ‘মাছি’ বলে প্রকারান্তরে তাদের উদযোগকে অতি তুচ্ছ বলে ‘রায়’ দেওয়া হয়েছে।দিন শেষে এগুলো রাজনৈতিক ভাষা।

ইমেইল: sarfuddin2003@gmail.com *মতামত লেখকের নিজস্ব।

জনপ্রিয় সংবাদ

বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

ঢাকার ২০২৪ সালের গণআন্দোলন ও দিল্লির সাম্প্রতিক বিক্ষোভের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

প্রকাশিত হয়েছে: ০৪:১২:১৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

প্রতি দশ মিনিট পর পর নতুন খবর আর একের পর এক আটকের মধ্য দিয়ে ভারতের রাজধানী দিল্লি এখন অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। শনিবার সকাল থেকে ধ্রুব রাঠি, অভিজিৎ দীপক, সৌরভ দাস, আশুতোষ রাঙ্কার ও নেহা বোরাসহ আন্দোলনের একাধিক মুখকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। সন্ধ্যা নাগাদ ‘ককরোচ’ আন্দোলনের শীর্ষ সারির নেতাদের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে আটক করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় সাত হাজার আন্দোলনকারীকে আটক করা হলেও শেষ পাওয়া খবরে নেহা বোরাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটির বেশি নাগরিককে বেআইনিভাবে বাদ দেওয়ার অভিযোগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারকে গ্রেপ্তার করার দাবিতে আন্দোলনকারীরা যন্তর-মন্তরের দিকে যাত্রা করার পরিকল্পনা করেছিলেন। ধ্রুব রাঠির পরিচিত সম্ভাষণ ‘নমস্কার দোস্ত!’ এখন মোদি সরকারের জন্য এক বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে এবং এই 'জ্ঞানেশগেট' ঘটনা মোদি প্রশাসনের জন্য ‘ওয়াটারগেট’ সংকটে পরিণত হয় কি না, তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বর্তমান পরিস্থিতিকে বর্ণনা করে বলেছেন, ‘দিল্লি এখন দুর্গ, আর সারা দেশ এক কয়েদখানা।’ রাজনৈতিক চটকদারি মনে হলেও বাস্তবে আক্ষরিক অর্থেই দিল্লি এখন পুরোপুরি অবরুদ্ধ। সাধারণ নাগরিকদের শহরে প্রবেশ ও বের হওয়া বন্ধ রয়েছে। বাতিল করা হয়েছে মেল ট্রেন, বাস এবং মেট্রো রেল চলাচল। শহরজুড়ে চলছে গণধরপাকড়, জারি করা হয়েছে ১৬৩ ধারা এবং বিশাল এলাকাজুড়ে ইন্টারনেট পরিষেবা বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এই কঠোর আচরণের কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, মোদি সরকার ও ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সমর্থকেরা আন্দোলনকারীদের ‘দেশদ্রোহী’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। তা সত্ত্বেও তরুণেরা পিছু হটছে না; তাঁদের সঙ্গে রাস্তায় নেমেছেন অভিভাবক, তারকা ও বুদ্ধিজীবীরা। শহরের দেয়ালে দেয়ালে স্প্রে দিয়ে লেখা হচ্ছে ‘ভোট চোর গদ্দি ছোড়!’ স্লোগান ও নানা রঙের গ্রাফিতি। দৃশ্যপটটি ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তুলছে।

বাংলাদেশে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল কোটা সংস্কারকে কেন্দ্র করে, আর ভারতে তা শুরু হয় মেডিকেলের প্রশ্নপত্র বা নিট (NEET) পেপার ফাঁস থেকে। প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদে তরুণ সমাজ যখন রাস্তায় নামে, তখন ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত ভরা আদালতে বিক্ষোভকারীদের ‘ককরোচ’ বা ‘তেলাপোকা’ বলে মন্তব্য করেন। তরুণ আন্দোলনকারীরা এই গালিকেই নিজেদের প্রতিবাদের প্রতীক বানিয়ে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) গঠন করে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এটি বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘মুক্তিযোদ্ধার নাতিপুতিরা চাকরি পাবে না তো কি রাজাকারের বাচ্চারা পাবে’ মন্তব্যের পর শিক্ষার্থীদের ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার’ স্লোগান দিয়ে অপমানের ক্ষোভ উগরে দেওয়ার স্মারক বহন করে। আন্দোলনের মুখে মোদির ঘনিষ্ঠ শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করার পর বিক্ষোভ কিছুটা শান্ত হলেও তা স্থায়ী হয়নি। এর পরপরই সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের ভোট জালিয়াতির তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই তরুণেরা পুনরায় রাজপথে নেমে আসে।

বিক্ষোভের মুখে আন্দোলনকারীদের থামাতে সরকার দিল্লির ৫৭টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দেয়। সরকারের এই পদক্ষেপের সমালোচনা করতে গিয়ে শুক্রবার সেই প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের বেঞ্চই মন্তব্য করেন, ‘মাছি মারতে হাতুড়ি চালানো যায় না।’ অর্থাৎ তরুণদের উদ্যোগকে পুনরায় ‘মাছি’ বলে তুচ্ছ করার চেষ্টা করা হলেও রাজনৈতিক ভাষা কীভাবে পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে, বাংলাদেশ ও ভারতের বর্তমান ঘটনাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। শব্দের নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তি মানুষের স্মৃতিতে আটকে থেকে প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত হয়। এদিকে, বিজেপির নেতারা মূল সমস্যা বা জ্ঞানেশ কুমারের ভোট জালিয়াতির অভিযোগ নিয়ে নীরব থেকে আন্দোলনকারীদের পেছনে ইলন মাস্কের অর্থায়ন এবং পশ্চিমা ‘ডিপ স্টেট’-এর সহায়তা রয়েছে বলে দাবি করছেন। বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনের সময়ও আন্দোলনকে বিদেশি শক্তির কারসাজি বলে চালানোর একই ধরনের প্রবণতা দেখা গিয়েছিল।

প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক সারফুদ্দিন আহমেদ এক বিশ্লেষণে উল্লেখ করেন, দুটি দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও তাৎক্ষণিক দাবি ভিন্ন হলেও রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রে গভীর মিল রয়েছে। তরুণদের ক্ষোভ ছোট দাবি থেকে শুরু হলেও সরকারের কঠোর পদক্ষেপ তা বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্নে রূপ দেয়। বাংলাদেশে কোটা সংস্কারের মূল দাবি শিক্ষার্থী নির্যাতন, প্রাণহানি ও গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে ইনসাফ ও নাগরিক মর্যাদার লড়াইয়ে রূপ নিয়েছিল। তবে দিল্লিতে বর্তমানে নিরাপত্তাকর্মীরা তুলনামূলক পেশাদারিত্বের সঙ্গে বিক্ষোভ সামাল দিচ্ছেন এবং সেখানে এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তা সত্ত্বেও এত বড় দেশে বিস্তৃত আন্দোলন যেকোনো মুহূর্তে সহিংস রূপ নেওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।

শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল ও ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে যে দক্ষিণ এশিয়ার শাসনব্যবস্থাগুলো সামাজিক ক্ষোভ থেকে মুক্ত নয়। ক্ষমতা যখন সমালোচনা সহ্য করতে পারে না, তখন প্রশ্নকারীদের মুখ চেপে ধরা ও আন্দোলনকে নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে দেখার পথ বেছে নেয়। এই পথ সাময়িকভাবে শৃঙ্খলা আনলেও ক্ষোভের মূল কারণ দূর করতে পারে না। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে নরেন্দ্র মোদি কোনো উন্মুক্ত সংবাদ সম্মেলনের মুখোমুখি হননি। সরকারের এই পলায়নপর দৃষ্টিভঙ্গি নাকি নিজেকে অজেয় প্রমাণের চেষ্টা—চলমান আন্দোলন হয়তো শিগগিরই সেই প্রশ্নের উত্তর উন্মোচন করবে।

আবার এত শিগগিরই যে সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের জালিয়াতির খবর আলোয় আসবে এবং তার পরপরই সদ্য আস্তানায় ফেরা তেলাপোকারা শুঁড় উঁচিয়ে দলে দলে রাস্তায় নামবে—এটিও কেউ আঁচ করতে পারেনি।.নেহা বোরা যেভাবে ভারতে গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের তরুণ মুখ.দিল্লিতে বিক্ষোভ: ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে.ককরোচের হাত থেকে দিল্লিকে ‘রক্ষা’ করতে সরকার যখন দিল্লি মেট্রোর ৫৭টি স্টেশন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিল, তখন সেই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে গিয়ে বেকার তরুণদের ককরোচ বলে গালি দেওয়া সেই প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের বেঞ্চ শুক্রবার সরকারের উদ্দেশে বলেছেন, ‘মাছি মারতে হাতুড়ি চালানো যায় না।’ এখানেও আন্দোলনকারীদের ‘মাছি’ বলে প্রকারান্তরে তাদের উদযোগকে অতি তুচ্ছ বলে ‘রায়’ দেওয়া হয়েছে।দিন শেষে এগুলো রাজনৈতিক ভাষা।

ইমেইল: sarfuddin2003@gmail.com *মতামত লেখকের নিজস্ব।