লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১১:৫৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উচ্চারণ নয়, কাজের পরীক্ষায় হোক রাষ্ট্রনেতার মূল্যায়ন

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাংলায় দেওয়া ভাষণের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর উচ্চারণ ও বলার ধরন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও ব্যঙ্গাত্মক মিম তৈরি হয়েছে। সুন্দরভাবে কথা বলা নিঃসন্দেহে একটি গুণ, তবে প্রশ্ন উঠেছে—একজন রাষ্ট্রনেতার মূল্যায়নের প্রধান মাপকাঠি কি তাঁর উচ্চারণ হওয়া উচিত, নাকি তাঁর কাজের ফলাফল? এই বিষয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ও ইতিহাসের নানা উদাহরণ তুলে ধরেছেন গবেষক ও লেখক রহমান মৃধা, যিনি সুইডেনের ফাইজার কোম্পানির সাবেক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, অনেক মহান নেতা তাঁদের চমৎকার বক্তৃতার জন্য নয়, বরং কাজের জন্যই স্মরণীয় হয়ে আছেন। মহাত্মা গান্ধী তাঁর আত্মজীবনীতে স্বীকার করেছেন যে, একসময় জনসমক্ষে কথা বলতে গিয়ে তিনি কাঁপতেন এবং লিখে আনা বক্তব্যও ঠিকমতো পড়তে পারতেন না। কিন্তু ইতিহাস তাঁকে তাঁর উচ্চারণের জন্য নয়, তাঁর রাজনৈতিক সংগ্রাম ও দর্শনের জন্য মনে রেখেছে। আবার যুদ্ধোত্তর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লেমেন্ট অ্যাটলি বাগ্মী না হয়েও তাঁর আমলে ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) প্রতিষ্ঠা করে সমাজকল্যাণে বড় পরিবর্তন এনেছিলেন। অন্যদিকে আব্রাহাম লিংকন বা উইনস্টন চার্চিলের মতো নেতারা যেমন অসাধারণ বক্তা ছিলেন, তেমনি তাঁদের কাজের পরিধিও ছিল বিশাল। এর অর্থ হলো, ভালো বক্তৃতা ও ভালো কাজ পরস্পরবিরোধী নয়, তবে বক্তব্যকে কখনোই কাজের বিকল্প করা ঠিক নয়।

নিজের কর্মজীবনের একটি উদাহরণ দিয়ে রহমান মৃধা জানান, ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে কাজ করার শুরুর দিকে তাঁকে একটি প্ল্যান্ট ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলে তিনি ভাষাগত আত্মবিশ্বাসের অভাবে তা ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। বিষয়টি নিউইয়র্কের হেড অফিস পর্যন্ত গড়ালে কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর তাঁকে ফোন করেন। রহমান মৃধা যখন নিজের ভাষাগত সীমাবদ্ধতা ও মানুষের হাসাহাসির ভয়ের কথা জানান, তখন এমডি তাঁকে মনে করিয়ে দেন যে, প্রতিষ্ঠানের ৯৯ শতাংশ সুইডিশ কর্মীর মধ্যে সবার চেয়ে বেশি কথা বলা তাঁর কাজ নয়। এমডি বলেছিলেন, "কোম্পানি একজন টকার (বক্তা) খুঁজছে না, একজন ওয়ার্কার (কর্মী) খুঁজছে।" এই শিক্ষা থেকে তিনি বোঝেন, নেতৃত্বের মূল কাজ হলো সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, দক্ষ মানুষকে কাজে লাগানো এবং ফলাফল নিশ্চিত করা।

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর উচ্চারণ বা ইংরেজি বলার ধরন নিয়ে সমালোচনা হতেই পারে, তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো তাঁর নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে। দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মতো বিষয়গুলো কোনো নেতার ভুল উচ্চারণের কারণে প্রভাবিত হয় না। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার পেছনে থাকে বাজারব্যবস্থা, নীতি এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত। ভুল উচ্চারণ সাময়িক হাসির খোরাক জোগাতে পারে, কিন্তু একটি ভুল নীতি বা সিদ্ধান্ত একটি পরিবারকে নিঃস্ব করতে পারে, অর্থনীতিকে ধ্বংস করতে পারে।

সাধারণ মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মিম খেয়ে বাঁচে না; তাদের প্রয়োজন খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা। একজন কৃষকের কাছে প্রধানমন্ত্রীর উচ্চারণের চেয়ে তাঁর ফসলের ন্যায্য মূল্য পাওয়া অনেক বেশি জরুরি। শ্রমিকের কাছে মজুরি ও নিরাপত্তা, রোগীর কাছে হাসপাতালের চিকিৎসা এবং বেকার তরুণের কাছে কর্মসংস্থানই মুখ্য বিষয়। তাই সমালোচনার নৈতিক দায়িত্ব মেনে আমাদের তুচ্ছ বিষয় ছেড়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত। শেষ পর্যন্ত ইতিহাস মানুষের কণ্ঠস্বরের রেকর্ড রাখে না, বরং তাদের কাজ ও সিদ্ধান্তের পরিণতিই সংরক্ষণ করে। নেতার আসল পরীক্ষা উচ্চারণে নয়, তাঁর কাজে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ঝিনাইদহে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যে জুতার মালা, তীব্র নিন্দা

উচ্চারণ নয়, কাজের পরীক্ষায় হোক রাষ্ট্রনেতার মূল্যায়ন

প্রকাশিত হয়েছে: ০৫:০৫:০৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাংলায় দেওয়া ভাষণের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর উচ্চারণ ও বলার ধরন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও ব্যঙ্গাত্মক মিম তৈরি হয়েছে। সুন্দরভাবে কথা বলা নিঃসন্দেহে একটি গুণ, তবে প্রশ্ন উঠেছে—একজন রাষ্ট্রনেতার মূল্যায়নের প্রধান মাপকাঠি কি তাঁর উচ্চারণ হওয়া উচিত, নাকি তাঁর কাজের ফলাফল? এই বিষয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ও ইতিহাসের নানা উদাহরণ তুলে ধরেছেন গবেষক ও লেখক রহমান মৃধা, যিনি সুইডেনের ফাইজার কোম্পানির সাবেক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, অনেক মহান নেতা তাঁদের চমৎকার বক্তৃতার জন্য নয়, বরং কাজের জন্যই স্মরণীয় হয়ে আছেন। মহাত্মা গান্ধী তাঁর আত্মজীবনীতে স্বীকার করেছেন যে, একসময় জনসমক্ষে কথা বলতে গিয়ে তিনি কাঁপতেন এবং লিখে আনা বক্তব্যও ঠিকমতো পড়তে পারতেন না। কিন্তু ইতিহাস তাঁকে তাঁর উচ্চারণের জন্য নয়, তাঁর রাজনৈতিক সংগ্রাম ও দর্শনের জন্য মনে রেখেছে। আবার যুদ্ধোত্তর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লেমেন্ট অ্যাটলি বাগ্মী না হয়েও তাঁর আমলে ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) প্রতিষ্ঠা করে সমাজকল্যাণে বড় পরিবর্তন এনেছিলেন। অন্যদিকে আব্রাহাম লিংকন বা উইনস্টন চার্চিলের মতো নেতারা যেমন অসাধারণ বক্তা ছিলেন, তেমনি তাঁদের কাজের পরিধিও ছিল বিশাল। এর অর্থ হলো, ভালো বক্তৃতা ও ভালো কাজ পরস্পরবিরোধী নয়, তবে বক্তব্যকে কখনোই কাজের বিকল্প করা ঠিক নয়।

নিজের কর্মজীবনের একটি উদাহরণ দিয়ে রহমান মৃধা জানান, ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে কাজ করার শুরুর দিকে তাঁকে একটি প্ল্যান্ট ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলে তিনি ভাষাগত আত্মবিশ্বাসের অভাবে তা ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। বিষয়টি নিউইয়র্কের হেড অফিস পর্যন্ত গড়ালে কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর তাঁকে ফোন করেন। রহমান মৃধা যখন নিজের ভাষাগত সীমাবদ্ধতা ও মানুষের হাসাহাসির ভয়ের কথা জানান, তখন এমডি তাঁকে মনে করিয়ে দেন যে, প্রতিষ্ঠানের ৯৯ শতাংশ সুইডিশ কর্মীর মধ্যে সবার চেয়ে বেশি কথা বলা তাঁর কাজ নয়। এমডি বলেছিলেন, "কোম্পানি একজন টকার (বক্তা) খুঁজছে না, একজন ওয়ার্কার (কর্মী) খুঁজছে।" এই শিক্ষা থেকে তিনি বোঝেন, নেতৃত্বের মূল কাজ হলো সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, দক্ষ মানুষকে কাজে লাগানো এবং ফলাফল নিশ্চিত করা।

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর উচ্চারণ বা ইংরেজি বলার ধরন নিয়ে সমালোচনা হতেই পারে, তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো তাঁর নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে। দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মতো বিষয়গুলো কোনো নেতার ভুল উচ্চারণের কারণে প্রভাবিত হয় না। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার পেছনে থাকে বাজারব্যবস্থা, নীতি এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত। ভুল উচ্চারণ সাময়িক হাসির খোরাক জোগাতে পারে, কিন্তু একটি ভুল নীতি বা সিদ্ধান্ত একটি পরিবারকে নিঃস্ব করতে পারে, অর্থনীতিকে ধ্বংস করতে পারে।

সাধারণ মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মিম খেয়ে বাঁচে না; তাদের প্রয়োজন খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা। একজন কৃষকের কাছে প্রধানমন্ত্রীর উচ্চারণের চেয়ে তাঁর ফসলের ন্যায্য মূল্য পাওয়া অনেক বেশি জরুরি। শ্রমিকের কাছে মজুরি ও নিরাপত্তা, রোগীর কাছে হাসপাতালের চিকিৎসা এবং বেকার তরুণের কাছে কর্মসংস্থানই মুখ্য বিষয়। তাই সমালোচনার নৈতিক দায়িত্ব মেনে আমাদের তুচ্ছ বিষয় ছেড়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত। শেষ পর্যন্ত ইতিহাস মানুষের কণ্ঠস্বরের রেকর্ড রাখে না, বরং তাদের কাজ ও সিদ্ধান্তের পরিণতিই সংরক্ষণ করে। নেতার আসল পরীক্ষা উচ্চারণে নয়, তাঁর কাজে।