লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১১:১৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ইরানের কৌশলগত ঝুঁকি ও বর্তমান সংকট

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানা ১০ দিনের পাল্টাপাল্টি হামলার পর ইরান বর্তমানে এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এখন আর শুধু আঞ্চলিক বিষয় নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য একটি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান এই জলপথকে তার প্রধান কৌশলগত হাতিয়ার বা ডিটারেন্স হিসেবে ব্যবহার করছে।

ইরানের সামনে তিনটি পথ খোলা থাকলেও কোনোটিই সহজ নয়। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা করা, যেখানে হরমুজে জাহাজে হামলা বন্ধ, ইউরেনিয়াম মজুত সীমিত করা এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পরিদর্শনের বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চাওয়া যেতে পারে। তবে কট্টরপন্থীদের কাছে এটি আত্মসমর্পণের শামিল। দ্বিতীয় পথটি হলো সংঘাত আরও বাড়ানো, যা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করবে কিন্তু একই সঙ্গে বৃহত্তর সামরিক জোটের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকিও বাড়াবে। তৃতীয় ও বাস্তবসম্মত পথ হিসেবে ইরান বর্তমানে পরিস্থিতি বজায় রাখার চেষ্টা করছে, যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা থাকবে কিন্তু তা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেবে না।

এই কৌশলের সীমাবদ্ধতা হলো, ইরান হরমুজকে যত বেশি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে, বিশ্ব ততই বিকল্প পথের দিকে ঝুঁকবে, যা দীর্ঘমেয়াদে ইরানের গুরুত্ব কমিয়ে দেবে। পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফও এই ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।

ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যও এখন বেশ জটিল। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটি আগের মতো সুসংহত কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। একদিকে প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য আলোচনার পক্ষে, অন্যদিকে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (IRGC) এবং রক্ষণশীলরা দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধের পক্ষপাতী।

জুন মাসে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে, যার উদ্দেশ্য ছিল সামরিক অভিযান বন্ধ করা, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে যুদ্ধের স্থায়ী সমাধানের জন্য আলোচনা চালিয়ে যাওয়া। কিন্তু মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুদ্ধবিরতি কার্য অকার্যকর হয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। তেহরানের এক নারী জানান, তিনি একটি বৈদেশিক বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। যুদ্ধ ও অনিশ্চয়তার কারণে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ১৭ বছরের অভিজ্ঞতা এবং ডক্টরেট ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও গত চার মাস ধরে তিনি বেকার। বিদেশি হামলার ফলে সৃষ্ট জনমত সত্ত্বেও, দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক চাপ ও অনিশ্চয়তা ইরানের সাধারণ মানুষের ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সামনেও যুদ্ধ বাড়ানো, চাপ অব্যাহত রাখা কিংবা রাজনৈতিক সমঝোতার পথ খোলা রয়েছে। তবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই রেষারেষি আগামী কয়েক মাস সংঘাত, কূটনৈতিক মধ্যস্থতা এবং অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির চক্রেই আবর্তিত হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

তেহরানের শামসাবাদ শিল্প পার্কে বিস্ফোরণ, আহত ১৮

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ইরানের কৌশলগত ঝুঁকি ও বর্তমান সংকট

প্রকাশিত হয়েছে: ১২:০৪:৪০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানা ১০ দিনের পাল্টাপাল্টি হামলার পর ইরান বর্তমানে এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এখন আর শুধু আঞ্চলিক বিষয় নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য একটি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান এই জলপথকে তার প্রধান কৌশলগত হাতিয়ার বা ডিটারেন্স হিসেবে ব্যবহার করছে।

ইরানের সামনে তিনটি পথ খোলা থাকলেও কোনোটিই সহজ নয়। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা করা, যেখানে হরমুজে জাহাজে হামলা বন্ধ, ইউরেনিয়াম মজুত সীমিত করা এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পরিদর্শনের বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চাওয়া যেতে পারে। তবে কট্টরপন্থীদের কাছে এটি আত্মসমর্পণের শামিল। দ্বিতীয় পথটি হলো সংঘাত আরও বাড়ানো, যা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করবে কিন্তু একই সঙ্গে বৃহত্তর সামরিক জোটের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকিও বাড়াবে। তৃতীয় ও বাস্তবসম্মত পথ হিসেবে ইরান বর্তমানে পরিস্থিতি বজায় রাখার চেষ্টা করছে, যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা থাকবে কিন্তু তা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেবে না।

এই কৌশলের সীমাবদ্ধতা হলো, ইরান হরমুজকে যত বেশি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে, বিশ্ব ততই বিকল্প পথের দিকে ঝুঁকবে, যা দীর্ঘমেয়াদে ইরানের গুরুত্ব কমিয়ে দেবে। পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফও এই ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।

ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যও এখন বেশ জটিল। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটি আগের মতো সুসংহত কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। একদিকে প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য আলোচনার পক্ষে, অন্যদিকে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (IRGC) এবং রক্ষণশীলরা দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধের পক্ষপাতী।

জুন মাসে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে, যার উদ্দেশ্য ছিল সামরিক অভিযান বন্ধ করা, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে যুদ্ধের স্থায়ী সমাধানের জন্য আলোচনা চালিয়ে যাওয়া। কিন্তু মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুদ্ধবিরতি কার্য অকার্যকর হয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। তেহরানের এক নারী জানান, তিনি একটি বৈদেশিক বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। যুদ্ধ ও অনিশ্চয়তার কারণে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ১৭ বছরের অভিজ্ঞতা এবং ডক্টরেট ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও গত চার মাস ধরে তিনি বেকার। বিদেশি হামলার ফলে সৃষ্ট জনমত সত্ত্বেও, দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক চাপ ও অনিশ্চয়তা ইরানের সাধারণ মানুষের ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সামনেও যুদ্ধ বাড়ানো, চাপ অব্যাহত রাখা কিংবা রাজনৈতিক সমঝোতার পথ খোলা রয়েছে। তবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই রেষারেষি আগামী কয়েক মাস সংঘাত, কূটনৈতিক মধ্যস্থতা এবং অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির চক্রেই আবর্তিত হবে বলে মনে করা হচ্ছে।