লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৯:১১ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাভারের গোলাপগ্রামে প্লট বিক্রির নামে শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

একসময় ঢাকার সাভারের বিরুলিয়ার গোলাপগ্রাম ছিল প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এক অনন্য গন্তব্য। লাল, হলুদ, গোলাপি ও বেগুনি রঙের অসংখ্য গোলাপের বাগানে ভরে থাকত পুরো এলাকা। ছুটির দিনে রাজধানীর মানুষ প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে ছুটে যেতেন সেখানে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পাল্টে গেছে সেই চিত্র। গোলাপ বাগানের জায়গায় এখন দেখা যাচ্ছে একের পর এক আবাসন প্রকল্পের সাইনবোর্ড। আর এই পরিবর্তনকে ঘিরেই উঠেছে নানা অভিযোগ। স্থানীয় বাসিন্দা, কৃষক এবং কয়েকজন প্লট ক্রেতার অভিযোগ, এমএইচ গ্রুপের মালিকানাধীন ‘লেক আইল্যান্ড ঢাকা’ নামের আবাসন প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকদের কাছ থেকে শত শত কোটি টাকা সংগ্রহ করলেও প্রতিশ্রুত সময়ে প্লট বুঝিয়ে দেয়নি। একই সঙ্গে কৃষিজমি, সরকারি খাসজমি, নদী ও ওয়াকফ সম্পত্তি দখলের অভিযোগও তুলছেন স্থানীয়রা। যদিও কোম্পানির পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।

প্রকল্পটি ঢাকার খুব কাছাকাছি এবং তুলনামূলক উঁচু জমিতে হওয়ায় আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বহু মানুষকে বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের। তাদের অভিযোগ, পাঁচ থেকে সাত বছর ধরে আগামী বছর হ্যান্ডওভার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসলেও বাস্তবে হাতে গোনা ২০–২৫টি প্লটে শুধু ইটের দেয়াল দিয়ে সীমানা নির্ধারণ ছাড়া দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গ্রাহক জানান, তিনি ২০১৯ সালে পাঁচটি প্লট কেনেন। পরে তার মাধ্যমে কোম্পানি আরও প্রায় ২০টি প্লট বিক্রি করে। কোম্পানি তখন জানায়, ২০২২ সালের মধ্যে এ, বি, সি ও ডি ব্লকের প্লট হস্তান্তর করা হবে এবং ২০২৬ সালের মধ্যে পুরো প্রকল্প সম্পন্ন হবে। কিন্তু আজও কিছুই হয়নি, তিনি এখনো প্লট বুঝে পাননি বলে দাবি করেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থে প্রকল্প এলাকার ভেতরে মালিকের জন্য একটি পাঁচতলা বাংলো ও একটি হরিণের খামার গড়ে তোলা হয়েছে। আরও অভিযোগ রয়েছে, খামারের হরিণগুলো প্রতি বছর বাচ্চা দিলেও হরিণের সংখ্যা দৃশ্যমানভাবে বাড়ছে না।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, যে বিরুলিয়া একসময় ‘গোলাপগ্রাম’ নামে পরিচিত ছিল, সেখানে এখন দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে আবাসন প্রকল্প। একসময় এই এলাকার বাতাস ভরে থাকত গোলাপের সুবাসে। মিরিন্ডা, চায়না ও ইরানি জাতের গোলাপের পাশাপাশি জারবেরা, রজনীগন্ধা, গ্লাডিওলাস, চন্দ্রমল্লিকাসহ বিভিন্ন ফুলের চাষ ছিল এ অঞ্চলের অন্যতম পরিচয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, নলকূপ তুলে ফেলা, কৃষিজমি ভরাট, জলাশয় ও নদীতে মাটি ফেলা এবং আবাসন প্রকল্পের সম্প্রসারণের কারণে ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে সেই ঐতিহ্য। গোলাপগ্রাম মূলত কুমার খোদা ও শিশার চর—এই দুই মৌজা নিয়ে গড়ে উঠেছে। মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে শিশাচর নদী, যা তুরাগ নদে গিয়ে মিলেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, বর্ষাকালে আশপাশের এলাকার পানি এই নদী দিয়ে তুরাগে নেমে যেত এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষকেরা একই নদীর পানি ব্যবহার করতেন ফুল ও ফসলের সেচে। কিন্তু আবাসন প্রকল্পের সম্প্রসারণের জন্য নদীর একটি অংশে মাটি ফেলে ভরাট করা হয়েছে। তাদের দাবি, প্রতিদিন এক্সক্যাভেটরের মাধ্যমে নদী, জলাশয় ও আশপাশের কৃষিজমিতে মাটি ফেলা হচ্ছে, যা এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ ও পানি প্রবাহের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

এছাড়া স্থানীয়দের অভিযোগ, প্লট বিক্রির জন্য কোম্পানির প্রকাশিত ব্রোশিওরের ম্যাপে সরকারি খাসজমির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের বসতভিটাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাদের ভাষ্য, শুরুতে অল্প কিছু জমি কিনে এলাকায় কার্যক্রম শুরু করলেও পরে প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় কোম্পানিটি ধীরে ধীরে বিস্তৃত এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। এতে গোলাপ চাষের উল্লেখযোগ্য অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি তাদের। স্থানীয়দের আশঙ্কা, কৃষিজমির পর তাদের বসতভিটাও প্রকল্পের আওতায় চলে যেতে পারে। স্থানীয়রা জানান, আবাসন কোম্পানিটির একটি প্রভাবশালী বাহিনী রয়েছে, যারা জমি বিক্রিতে অনিচ্ছুক মালিকদের বিভিন্নভাবে চাপ ও হয়রানি করে। কয়েকজন কৃষকের দাবি, হাকিম ও বারেক নামে দুই ব্যক্তি এ বাহিনীর নেতৃত্ব দেন এবং তাদের মাধ্যমে স্থানীয়দের হুমকি-ধমকি দিয়ে জমি বিক্রিতে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়। স্থানীয় কৃষক মো. আব্বাসের অভিযোগ, ২০১৩ সালে তার ৫০ শতাংশ জমি কেনার জন্য লেক আইল্যান্ড কোম্পানি ৫ লাখ টাকা বায়না করে। এরপর দীর্ঘ সময় পার হলেও বাকি অর্থ পরিশোধ না করেই জমির দখল নেয়। এ ঘটনায় তিনি আদালতের আশ্রয় নেন এবং তার পক্ষে রায় পেলেও এখনো জমির দখল ফিরে পাননি। অন্তত ১৫ জন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোম্পানি প্রথমে অল্প পরিমাণ অর্থ বায়না দিয়ে জমির দখল নেয়। পরে আর বাকি অর্থ পরিশোধ করে না। যারা জমি বিক্রিতে অনিচ্ছুক, তাদের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হয় বলে অভিযোগ করেন তারা। কয়েকজনের ভাষ্য, পাশের জমিতে গভীর গর্ত খনন এবং রাতের আঁধারে মাটি বিক্রির কারণে একপর্যায়ে তারা জমি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন কৃষক নাজিমউদ্দিন। তার দাবি, প্রায় ৪০ শতাংশ জমি নিয়ে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে জটিলতা চলছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পরও তিনি জমি বা অর্থ—কোনোটিই বুঝে পাননি।

শুধু কৃষকদের ব্যক্তিগত জমিই নয়, সরকারি খাসখতিয়ানভুক্ত কোর্ট অব ওয়ার্ডস (নবাব স্টেট)-এর জমিও বেদখল করা হয়েছে। স্থানীয় আমিনবাজার ভূমি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, কোর্ট অব ওয়ার্ডসের মোট ৬.১৫৭৫ একর জমির মধ্যে প্রায় ৪.৯০৭৫ একর বর্তমানে বেদখল রয়েছে। ভূমি অফিসের তথ্যমতে, এর মধ্যে প্রায় ২.১৫ একর জমি লেক আইল্যান্ড কোম্পানির দখলে রয়েছে। ওই জমিতে নির্মাণাধীন ভবন, সেমিপাকা অফিসঘর, টিনশেড পশুপালন কেন্দ্র এবং বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ গাছ রয়েছে। একই তথ্য অনুযায়ী, আরও প্রায় ১.৩০ একর জমি মো. শরীফ গং এবং ১.৫০ একর জমি সালাম গং পরিবারের দখলে রয়েছে। অবশিষ্ট প্রায় ১.২০ একর জমি পতিত অবস্থায় রয়েছে। এক যুগ ধরে গোলাপ চাষের সঙ্গে যুক্ত সাদুল্লাহপুরের কৃষক মো. ইয়াসিন বলেন, আবাসন প্রকল্পের সম্প্রসারণের কারণে তারা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। তার ভাষায়, ‘কোম্পানি এমন পরিস্থিতি তৈরি করছে যে জমি বিক্রি করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকছে না। তারা রাস্তা দিয়ে ক্ষেতে যেতে দেয় না, ফুল তুলতেও বাধা দেয়, এমনকি ক্ষেতের নলকূপও তুলে ফেলেছে। এখন জমি বিক্রি করা ছাড়া কিছু করার নেই।’ সরেজমিন এলাকায় গিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কৃষক বলেন, ‘আমি যদি কথা বলেছি—এটা কোম্পানি জানতে পারে, তাহলে গরু নিয়েও এখানে আসতে দেবে না। তারা অনেক ক্ষমতাশালী।’

প্রকল্পের বিষয়ে তথ্য জানতে পরিচয় গোপন রেখে ক্রেতা সেজে যোগাযোগ করা হয় লেক আইল্যান্ড ঢাকার মার্কেটিং বিভাগের প্রধান সাইফুল ইসলামের সঙ্গে। প্লটের মূল্য সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘লোকেশনভেদে প্রতি কাঠা জমির দাম ৯ থেকে ২০ লাখ টাকা। তবে একসঙ্গে বেশি জমি কিনলে কিছুটা মূল্যছাড় দেওয়া হবে।’ প্রকল্পের কাগজপত্রে কোনো জটিলতা রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কাগজপত্রে কোনো সমস্যা নেই।’ কৃষিজমিতে আবাসিক প্লটের রেজিস্ট্রেশন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এখানে আগে গোলাপের চাষ হতো। এলাকায় কৃষি ও আরবান—দুই ধরনের শ্রেণির জমিই রয়েছে। তাই রেজিস্ট্রেশনে কোনো সমস্যা হবে না। যদি পুরো এলাকাই কৃষিজমি হতো, তাহলে জটিলতা তৈরি হতে পারত।’

অন্যদিকে ভুক্তভোগী গ্রাহক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রকল্পের আকর্ষণীয় প্রচারণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বহু মানুষ বছরের পর বছর কিস্তি পরিশোধ করলেও এখনো প্লট বুঝে পাননি। একই সঙ্গে কৃষিজমি, সরকারি খাসজমি এবং ওয়াকফ সম্পত্তি দখল করে আবাসন ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগও তুলেছেন তারা। এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। প্রকল্পের মালিক মো. মোবারক হোসেনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে কোম্পানির এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর মেহেদী হাসান অভিযোগের কিছু অংশ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে এখনো গ্রাহকদের কাছে প্লট হস্তান্তর শুরু করা সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পর্যায়ক্রমে প্লট হস্তান্তরের কার্যক্রম শুরু করা হবে বলে তিনি জানান। এ বিষয়ে জানতে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মো. হাসান হাবিবুর রহমান বলেন, ‘লেক আইল্যান্ড ঢাকা’ নামে কোনো প্রকল্পকে পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে বলে আমাদের কাছে তথ্য নেই। তবে এ নামে কোনো আবেদন করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করে দেখা হবে। সাভার উপজেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, ‘লেক আইল্যান্ড ঢাকা’ প্রকল্পের বিষয়ে তারা অবগত আছেন। তবে খাসজমি ব্যবহার বা প্রকল্পটির অনুমোদনসংক্রান্ত বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে রাজউকের অথরাইজড কর্মকর্তা মাশুক আহমেদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ভূমি ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা উইংয়ের উপপরিচালক-২ মারিয়া হক বলেন, ‘বিষয়টি বর্তমানে রাজউক ও স্থানীয় প্রশাসন দেখছে। তবে এ বিষয়ে কোনো লিখিত অভিযোগ পেলে আমরা সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জনপ্রিয় সংবাদ

গুম প্রতিরোধে যাবজ্জীবন ও মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইনের খসড়া অনুমোদন

সাভারের গোলাপগ্রামে প্লট বিক্রির নামে শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

প্রকাশিত হয়েছে: ১২:৫৪:৩৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬

একসময় ঢাকার সাভারের বিরুলিয়ার গোলাপগ্রাম ছিল প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এক অনন্য গন্তব্য। লাল, হলুদ, গোলাপি ও বেগুনি রঙের অসংখ্য গোলাপের বাগানে ভরে থাকত পুরো এলাকা। ছুটির দিনে রাজধানীর মানুষ প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে ছুটে যেতেন সেখানে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পাল্টে গেছে সেই চিত্র। গোলাপ বাগানের জায়গায় এখন দেখা যাচ্ছে একের পর এক আবাসন প্রকল্পের সাইনবোর্ড। আর এই পরিবর্তনকে ঘিরেই উঠেছে নানা অভিযোগ। স্থানীয় বাসিন্দা, কৃষক এবং কয়েকজন প্লট ক্রেতার অভিযোগ, এমএইচ গ্রুপের মালিকানাধীন ‘লেক আইল্যান্ড ঢাকা’ নামের আবাসন প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকদের কাছ থেকে শত শত কোটি টাকা সংগ্রহ করলেও প্রতিশ্রুত সময়ে প্লট বুঝিয়ে দেয়নি। একই সঙ্গে কৃষিজমি, সরকারি খাসজমি, নদী ও ওয়াকফ সম্পত্তি দখলের অভিযোগও তুলছেন স্থানীয়রা। যদিও কোম্পানির পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।

প্রকল্পটি ঢাকার খুব কাছাকাছি এবং তুলনামূলক উঁচু জমিতে হওয়ায় আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বহু মানুষকে বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের। তাদের অভিযোগ, পাঁচ থেকে সাত বছর ধরে আগামী বছর হ্যান্ডওভার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসলেও বাস্তবে হাতে গোনা ২০–২৫টি প্লটে শুধু ইটের দেয়াল দিয়ে সীমানা নির্ধারণ ছাড়া দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গ্রাহক জানান, তিনি ২০১৯ সালে পাঁচটি প্লট কেনেন। পরে তার মাধ্যমে কোম্পানি আরও প্রায় ২০টি প্লট বিক্রি করে। কোম্পানি তখন জানায়, ২০২২ সালের মধ্যে এ, বি, সি ও ডি ব্লকের প্লট হস্তান্তর করা হবে এবং ২০২৬ সালের মধ্যে পুরো প্রকল্প সম্পন্ন হবে। কিন্তু আজও কিছুই হয়নি, তিনি এখনো প্লট বুঝে পাননি বলে দাবি করেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থে প্রকল্প এলাকার ভেতরে মালিকের জন্য একটি পাঁচতলা বাংলো ও একটি হরিণের খামার গড়ে তোলা হয়েছে। আরও অভিযোগ রয়েছে, খামারের হরিণগুলো প্রতি বছর বাচ্চা দিলেও হরিণের সংখ্যা দৃশ্যমানভাবে বাড়ছে না।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, যে বিরুলিয়া একসময় ‘গোলাপগ্রাম’ নামে পরিচিত ছিল, সেখানে এখন দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে আবাসন প্রকল্প। একসময় এই এলাকার বাতাস ভরে থাকত গোলাপের সুবাসে। মিরিন্ডা, চায়না ও ইরানি জাতের গোলাপের পাশাপাশি জারবেরা, রজনীগন্ধা, গ্লাডিওলাস, চন্দ্রমল্লিকাসহ বিভিন্ন ফুলের চাষ ছিল এ অঞ্চলের অন্যতম পরিচয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, নলকূপ তুলে ফেলা, কৃষিজমি ভরাট, জলাশয় ও নদীতে মাটি ফেলা এবং আবাসন প্রকল্পের সম্প্রসারণের কারণে ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে সেই ঐতিহ্য। গোলাপগ্রাম মূলত কুমার খোদা ও শিশার চর—এই দুই মৌজা নিয়ে গড়ে উঠেছে। মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে শিশাচর নদী, যা তুরাগ নদে গিয়ে মিলেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, বর্ষাকালে আশপাশের এলাকার পানি এই নদী দিয়ে তুরাগে নেমে যেত এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষকেরা একই নদীর পানি ব্যবহার করতেন ফুল ও ফসলের সেচে। কিন্তু আবাসন প্রকল্পের সম্প্রসারণের জন্য নদীর একটি অংশে মাটি ফেলে ভরাট করা হয়েছে। তাদের দাবি, প্রতিদিন এক্সক্যাভেটরের মাধ্যমে নদী, জলাশয় ও আশপাশের কৃষিজমিতে মাটি ফেলা হচ্ছে, যা এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ ও পানি প্রবাহের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

এছাড়া স্থানীয়দের অভিযোগ, প্লট বিক্রির জন্য কোম্পানির প্রকাশিত ব্রোশিওরের ম্যাপে সরকারি খাসজমির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের বসতভিটাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাদের ভাষ্য, শুরুতে অল্প কিছু জমি কিনে এলাকায় কার্যক্রম শুরু করলেও পরে প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় কোম্পানিটি ধীরে ধীরে বিস্তৃত এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। এতে গোলাপ চাষের উল্লেখযোগ্য অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি তাদের। স্থানীয়দের আশঙ্কা, কৃষিজমির পর তাদের বসতভিটাও প্রকল্পের আওতায় চলে যেতে পারে। স্থানীয়রা জানান, আবাসন কোম্পানিটির একটি প্রভাবশালী বাহিনী রয়েছে, যারা জমি বিক্রিতে অনিচ্ছুক মালিকদের বিভিন্নভাবে চাপ ও হয়রানি করে। কয়েকজন কৃষকের দাবি, হাকিম ও বারেক নামে দুই ব্যক্তি এ বাহিনীর নেতৃত্ব দেন এবং তাদের মাধ্যমে স্থানীয়দের হুমকি-ধমকি দিয়ে জমি বিক্রিতে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়। স্থানীয় কৃষক মো. আব্বাসের অভিযোগ, ২০১৩ সালে তার ৫০ শতাংশ জমি কেনার জন্য লেক আইল্যান্ড কোম্পানি ৫ লাখ টাকা বায়না করে। এরপর দীর্ঘ সময় পার হলেও বাকি অর্থ পরিশোধ না করেই জমির দখল নেয়। এ ঘটনায় তিনি আদালতের আশ্রয় নেন এবং তার পক্ষে রায় পেলেও এখনো জমির দখল ফিরে পাননি। অন্তত ১৫ জন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোম্পানি প্রথমে অল্প পরিমাণ অর্থ বায়না দিয়ে জমির দখল নেয়। পরে আর বাকি অর্থ পরিশোধ করে না। যারা জমি বিক্রিতে অনিচ্ছুক, তাদের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হয় বলে অভিযোগ করেন তারা। কয়েকজনের ভাষ্য, পাশের জমিতে গভীর গর্ত খনন এবং রাতের আঁধারে মাটি বিক্রির কারণে একপর্যায়ে তারা জমি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন কৃষক নাজিমউদ্দিন। তার দাবি, প্রায় ৪০ শতাংশ জমি নিয়ে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে জটিলতা চলছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পরও তিনি জমি বা অর্থ—কোনোটিই বুঝে পাননি।

শুধু কৃষকদের ব্যক্তিগত জমিই নয়, সরকারি খাসখতিয়ানভুক্ত কোর্ট অব ওয়ার্ডস (নবাব স্টেট)-এর জমিও বেদখল করা হয়েছে। স্থানীয় আমিনবাজার ভূমি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, কোর্ট অব ওয়ার্ডসের মোট ৬.১৫৭৫ একর জমির মধ্যে প্রায় ৪.৯০৭৫ একর বর্তমানে বেদখল রয়েছে। ভূমি অফিসের তথ্যমতে, এর মধ্যে প্রায় ২.১৫ একর জমি লেক আইল্যান্ড কোম্পানির দখলে রয়েছে। ওই জমিতে নির্মাণাধীন ভবন, সেমিপাকা অফিসঘর, টিনশেড পশুপালন কেন্দ্র এবং বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ গাছ রয়েছে। একই তথ্য অনুযায়ী, আরও প্রায় ১.৩০ একর জমি মো. শরীফ গং এবং ১.৫০ একর জমি সালাম গং পরিবারের দখলে রয়েছে। অবশিষ্ট প্রায় ১.২০ একর জমি পতিত অবস্থায় রয়েছে। এক যুগ ধরে গোলাপ চাষের সঙ্গে যুক্ত সাদুল্লাহপুরের কৃষক মো. ইয়াসিন বলেন, আবাসন প্রকল্পের সম্প্রসারণের কারণে তারা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। তার ভাষায়, ‘কোম্পানি এমন পরিস্থিতি তৈরি করছে যে জমি বিক্রি করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকছে না। তারা রাস্তা দিয়ে ক্ষেতে যেতে দেয় না, ফুল তুলতেও বাধা দেয়, এমনকি ক্ষেতের নলকূপও তুলে ফেলেছে। এখন জমি বিক্রি করা ছাড়া কিছু করার নেই।’ সরেজমিন এলাকায় গিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কৃষক বলেন, ‘আমি যদি কথা বলেছি—এটা কোম্পানি জানতে পারে, তাহলে গরু নিয়েও এখানে আসতে দেবে না। তারা অনেক ক্ষমতাশালী।’

প্রকল্পের বিষয়ে তথ্য জানতে পরিচয় গোপন রেখে ক্রেতা সেজে যোগাযোগ করা হয় লেক আইল্যান্ড ঢাকার মার্কেটিং বিভাগের প্রধান সাইফুল ইসলামের সঙ্গে। প্লটের মূল্য সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘লোকেশনভেদে প্রতি কাঠা জমির দাম ৯ থেকে ২০ লাখ টাকা। তবে একসঙ্গে বেশি জমি কিনলে কিছুটা মূল্যছাড় দেওয়া হবে।’ প্রকল্পের কাগজপত্রে কোনো জটিলতা রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কাগজপত্রে কোনো সমস্যা নেই।’ কৃষিজমিতে আবাসিক প্লটের রেজিস্ট্রেশন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এখানে আগে গোলাপের চাষ হতো। এলাকায় কৃষি ও আরবান—দুই ধরনের শ্রেণির জমিই রয়েছে। তাই রেজিস্ট্রেশনে কোনো সমস্যা হবে না। যদি পুরো এলাকাই কৃষিজমি হতো, তাহলে জটিলতা তৈরি হতে পারত।’

অন্যদিকে ভুক্তভোগী গ্রাহক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রকল্পের আকর্ষণীয় প্রচারণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বহু মানুষ বছরের পর বছর কিস্তি পরিশোধ করলেও এখনো প্লট বুঝে পাননি। একই সঙ্গে কৃষিজমি, সরকারি খাসজমি এবং ওয়াকফ সম্পত্তি দখল করে আবাসন ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগও তুলেছেন তারা। এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। প্রকল্পের মালিক মো. মোবারক হোসেনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে কোম্পানির এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর মেহেদী হাসান অভিযোগের কিছু অংশ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে এখনো গ্রাহকদের কাছে প্লট হস্তান্তর শুরু করা সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পর্যায়ক্রমে প্লট হস্তান্তরের কার্যক্রম শুরু করা হবে বলে তিনি জানান। এ বিষয়ে জানতে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মো. হাসান হাবিবুর রহমান বলেন, ‘লেক আইল্যান্ড ঢাকা’ নামে কোনো প্রকল্পকে পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে বলে আমাদের কাছে তথ্য নেই। তবে এ নামে কোনো আবেদন করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করে দেখা হবে। সাভার উপজেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, ‘লেক আইল্যান্ড ঢাকা’ প্রকল্পের বিষয়ে তারা অবগত আছেন। তবে খাসজমি ব্যবহার বা প্রকল্পটির অনুমোদনসংক্রান্ত বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে রাজউকের অথরাইজড কর্মকর্তা মাশুক আহমেদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ভূমি ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা উইংয়ের উপপরিচালক-২ মারিয়া হক বলেন, ‘বিষয়টি বর্তমানে রাজউক ও স্থানীয় প্রশাসন দেখছে। তবে এ বিষয়ে কোনো লিখিত অভিযোগ পেলে আমরা সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’