লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৯:০৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আবু ইয়াকুব ইউসুফ ইবন ইয়াখলাফ আল-কুমি: এক সুফি সাধকের জীবনকথা

ইবন আরাবির ‘রূহ আল-কুদস ও আদ-দুররাত আল-ফাখিরাহ’ অবলম্বনে রচিত ‘আন্দালুসের সুফি’ গ্রন্থে ইবন আরাবির সমসাময়িক সাধকদের জীবন ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার এক ঐতিহাসিক দলিল পাওয়া যায়। আর. ডব্লিউ. জে. অস্টিনের ইংরেজি অনুবাদে সমৃদ্ধ এই সংকলনে ইবন আরাবি তার দীক্ষাগুরু ও সান্নিধ্য পাওয়া পবিত্র আত্মাদের কথা তুলে ধরেছেন। এই ধারায় অন্যতম একজন শায়খ হলেন আবু ইয়াকুব ইউসুফ ইবন ইয়াখলাফ আল-কুমি।

আবু ইয়াকুব ছিলেন আবু মাদইয়ানের অন্তরঙ্গ সঙ্গীদের মধ্যে অন্যতম। তিনি আমাদের এই ভূখণ্ডের অনেক বিশিষ্ট সুফির সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন। মিসরে বসবাসের সময় আলেকজান্দ্রিয়ায় তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং আবু তাহির আল-সালাফি তাকে নিজের পরিবারের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। একবার ফেজ নগরীর শাসনকর্তার পদ গ্রহণের প্রস্তাব পেলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। আবু মাদইয়ান তার সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আমাদের কাছে আবু ইয়াকুব ঠিক তেমনি, যেমনটি একটি জাহাজের কাছে নিরাপদ নোঙর।’

তিনি নির্জনে ইবাদত করতে ভালোবাসতেন এবং সর্বদা গোপনে দান করতেন। দরিদ্রদের সম্মান করা এবং ধনীদের অহংকার ভেঙে দেওয়া ছিল তার স্বভাবের অংশ। তার তত্ত্বাবধানে থাকাকালে ইবন আরাবি তার কাছ থেকে শিক্ষা ও স্নেহ পেয়েছেন। শায়খ আবদুল্লাহ বদর আল-হাবশির গৃহে তিনি ইন্তেকাল করেন। বদর আল-হাবশি জানাতেন, শায়খ চাইলে মুহূর্তের মধ্যে কোনো সাধককে আধ্যাত্মিক অধঃপতন থেকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করতে পারতেন। তিনি অধিকাংশ সময় মালামাতি তরিকার আদর্শ অনুসরণ করতেন।

শায়খ আবু ইয়াকুবের মুখে গাম্ভীর্যের ছাপ থাকলেও কোনো দরিদ্র মানুষকে দেখামাত্রই তার মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠত। তিনি অভাবীদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতে দ্বিধা করতেন না। ইবন আরাবি একবার স্বপ্নে তার বক্ষ বিদীর্ণ হয়ে সূর্যের মতো আলো বিচ্ছুরণের দৃশ্য দেখেছিলেন। শায়খ তাকে দুধ পান করিয়ে আধ্যাত্মিক অনুগ্রহ দান করেছিলেন। প্রথম সাক্ষাতের সময় শায়খ ইবন আরাবিকে নামাজরত মানুষের সামনে দিয়ে অতিক্রম করার পরিণাম সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন, যার সঠিক উত্তর দিয়ে ইবন আরাবি তার সন্তুষ্টি অর্জন করেছিলেন।

শিক্ষক হিসেবে তিনি অত্যন্ত স্নেহশীল হলেও ইবন আরাবির সামনে তা প্রকাশ করতেন না। বরং সভায় তাকে তিরস্কার করতেন এবং অন্যদের প্রতি অধিক অনুগ্রহ দেখাতেন। কিন্তু ইবন আরাবিই ছিলেন তার প্রকৃত সাফল্য অর্জনকারী শিক্ষার্থী। একদিন ঘোড়ায় চড়ে আলমোনতেবের পর্বতে যাওয়ার সময় শায়খ তাকে আল-কুশাইরির রিসালা থেকে পাঠ করতে বলেছিলেন। সে সময় শায়খ আবু মাদইয়ানের অলৌকিক ঘটনা ও গুণাবলির কথা বলতে বলতে ইবন আরাবিকে এমন আধ্যাত্মিক অনুগ্রহে সিক্ত করেছিলেন যে, পথ চলার সময় তাদের পোশাকে কোনো কাঁটার আঁচড়ও লাগেনি।

শায়খ আবু ইয়াকুবের আধ্যাত্মিক ক্ষমতার গভীরতা ছিল অসীম। তিনি শিষ্যদের যে সাধনার নির্দেশ দিতেন, নিজেও তা পালন করতেন। এমনকি ইবন আরাবির ব্যক্তিগত দায়িত্ব সম্পন্ন করার দায়িত্বও তিনি নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। তার জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আধ্যাত্মিক আলোর সন্ধান বিনম্র হৃদয় ও নিঃশব্দ সেবার মধ্যেই নিহিত।

জনপ্রিয় সংবাদ

জয়পুরহাটে দরিদ্রদের স্বাবলম্বী করতে বিনামূল্যে বকনা গরু বিতরণ

আবু ইয়াকুব ইউসুফ ইবন ইয়াখলাফ আল-কুমি: এক সুফি সাধকের জীবনকথা

প্রকাশিত হয়েছে: ১২:৫৫:৪৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬

ইবন আরাবির ‘রূহ আল-কুদস ও আদ-দুররাত আল-ফাখিরাহ’ অবলম্বনে রচিত ‘আন্দালুসের সুফি’ গ্রন্থে ইবন আরাবির সমসাময়িক সাধকদের জীবন ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার এক ঐতিহাসিক দলিল পাওয়া যায়। আর. ডব্লিউ. জে. অস্টিনের ইংরেজি অনুবাদে সমৃদ্ধ এই সংকলনে ইবন আরাবি তার দীক্ষাগুরু ও সান্নিধ্য পাওয়া পবিত্র আত্মাদের কথা তুলে ধরেছেন। এই ধারায় অন্যতম একজন শায়খ হলেন আবু ইয়াকুব ইউসুফ ইবন ইয়াখলাফ আল-কুমি।

আবু ইয়াকুব ছিলেন আবু মাদইয়ানের অন্তরঙ্গ সঙ্গীদের মধ্যে অন্যতম। তিনি আমাদের এই ভূখণ্ডের অনেক বিশিষ্ট সুফির সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন। মিসরে বসবাসের সময় আলেকজান্দ্রিয়ায় তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং আবু তাহির আল-সালাফি তাকে নিজের পরিবারের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। একবার ফেজ নগরীর শাসনকর্তার পদ গ্রহণের প্রস্তাব পেলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। আবু মাদইয়ান তার সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আমাদের কাছে আবু ইয়াকুব ঠিক তেমনি, যেমনটি একটি জাহাজের কাছে নিরাপদ নোঙর।’

তিনি নির্জনে ইবাদত করতে ভালোবাসতেন এবং সর্বদা গোপনে দান করতেন। দরিদ্রদের সম্মান করা এবং ধনীদের অহংকার ভেঙে দেওয়া ছিল তার স্বভাবের অংশ। তার তত্ত্বাবধানে থাকাকালে ইবন আরাবি তার কাছ থেকে শিক্ষা ও স্নেহ পেয়েছেন। শায়খ আবদুল্লাহ বদর আল-হাবশির গৃহে তিনি ইন্তেকাল করেন। বদর আল-হাবশি জানাতেন, শায়খ চাইলে মুহূর্তের মধ্যে কোনো সাধককে আধ্যাত্মিক অধঃপতন থেকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করতে পারতেন। তিনি অধিকাংশ সময় মালামাতি তরিকার আদর্শ অনুসরণ করতেন।

শায়খ আবু ইয়াকুবের মুখে গাম্ভীর্যের ছাপ থাকলেও কোনো দরিদ্র মানুষকে দেখামাত্রই তার মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠত। তিনি অভাবীদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতে দ্বিধা করতেন না। ইবন আরাবি একবার স্বপ্নে তার বক্ষ বিদীর্ণ হয়ে সূর্যের মতো আলো বিচ্ছুরণের দৃশ্য দেখেছিলেন। শায়খ তাকে দুধ পান করিয়ে আধ্যাত্মিক অনুগ্রহ দান করেছিলেন। প্রথম সাক্ষাতের সময় শায়খ ইবন আরাবিকে নামাজরত মানুষের সামনে দিয়ে অতিক্রম করার পরিণাম সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন, যার সঠিক উত্তর দিয়ে ইবন আরাবি তার সন্তুষ্টি অর্জন করেছিলেন।

শিক্ষক হিসেবে তিনি অত্যন্ত স্নেহশীল হলেও ইবন আরাবির সামনে তা প্রকাশ করতেন না। বরং সভায় তাকে তিরস্কার করতেন এবং অন্যদের প্রতি অধিক অনুগ্রহ দেখাতেন। কিন্তু ইবন আরাবিই ছিলেন তার প্রকৃত সাফল্য অর্জনকারী শিক্ষার্থী। একদিন ঘোড়ায় চড়ে আলমোনতেবের পর্বতে যাওয়ার সময় শায়খ তাকে আল-কুশাইরির রিসালা থেকে পাঠ করতে বলেছিলেন। সে সময় শায়খ আবু মাদইয়ানের অলৌকিক ঘটনা ও গুণাবলির কথা বলতে বলতে ইবন আরাবিকে এমন আধ্যাত্মিক অনুগ্রহে সিক্ত করেছিলেন যে, পথ চলার সময় তাদের পোশাকে কোনো কাঁটার আঁচড়ও লাগেনি।

শায়খ আবু ইয়াকুবের আধ্যাত্মিক ক্ষমতার গভীরতা ছিল অসীম। তিনি শিষ্যদের যে সাধনার নির্দেশ দিতেন, নিজেও তা পালন করতেন। এমনকি ইবন আরাবির ব্যক্তিগত দায়িত্ব সম্পন্ন করার দায়িত্বও তিনি নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। তার জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আধ্যাত্মিক আলোর সন্ধান বিনম্র হৃদয় ও নিঃশব্দ সেবার মধ্যেই নিহিত।