লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০১:৫৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কাগজে বিপুল সক্ষমতা, বাস্তবে তীব্র গরমে লোডশেডিংয়ের চরম ভোগান্তি

একসময় বিদ্যুৎ ছিল বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম দৃশ্যমান সাফল্য। গ্রাম থেকে শহর ও দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়াকে বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। পাওয়ার সেলের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩৩ হাজার ৯২ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছিল গত ২০ মে ১৭ হাজার ২০১ মেগাওয়াট। বর্তমানে দেশে গ্রাহক সংখ্যা ৫ কোটি ১ লাখ ৯৬ হাজার, মোট সঞ্চালন লাইন ১৮ হাজার ৮১৬ কিলোমিটার এবং গ্রিড সাব-স্টেশন ক্ষমতা ৯১ হাজার ৫১২ এমভিএ। এছাড়া আগামী জুন ২০২৬ পর্যন্ত বিতরণ লাইন ৬ লাখ ৬১ হাজার ৭৯৬ কিলোমিটারে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে এবং মাথাপিছু বিদ্যুৎ উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৬৮০ কিলোওয়াট। ২৫-২৬ অর্থবছর নাগাদ শতভাগ জনগোষ্ঠীকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনার লক্ষ্য থাকলেও, এই তীব্র গরমে আবারো চরম বিদ্যুৎ সংকটে পড়েছে দেশের মানুষ।

জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি, বাড়তি চাহিদা, আমদানিনির্ভরতা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের আর্থিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার কারণে এই বিশাল উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে রাজধানী ঢাকাসহ দেশজুড়ে ফিরে এসেছে লোডশেডিংয়ের তীব্র দুর্ভোগ। গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাসাবাড়িতে ফ্যান, এসি, ফ্রিজ ও পানির পাম্পের ব্যবহার যেমন বাড়ছে, তেমনি শিল্পকারখানা, অফিস ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানেও বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে। কিন্তু এই বাড়তি চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা থাকলেও পর্যাপ্ত গ্যাস, কয়লা বা তরল জ্বালানির অভাবে অনেক কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। ফলে কাগজে-কলমে বিপুল উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও প্রয়োজনের সময় গ্রিডে সেই বিদ্যুৎ মিলছে না।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়। দিনের ব্যস্ত সময়ে বিদ্যুৎ চলে যাওয়া, রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকা কিংবা একই দিনে একাধিকবার বিদ্যুৎ-বিভ্রাটে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন নগরবাসী। বহুতল ভবনগুলোতে লিফট ও পানির পাম্প অচল হয়ে পড়ছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও অফিসে কাজের গতি কমছে এবং বিকল্প হিসেবে জেনারেটর ব্যবহার করতে গিয়ে বাড়তি জ্বালানি ব্যয় বহন করতে হচ্ছে, যা জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে চাহিদা বাড়লেও উৎপাদনের ঘাটতি থাকায় দৈনিক গড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন অন্তত ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং দেওয়ার সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে সংসদে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কাগজে-কলমে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা ৩২ হাজার ৩৩২ মেগাওয়াট, যার মধ্যে গ্রিডভিত্তিক সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। কিন্তু এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১৬ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বাংলাদেশের ১৬শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি রয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের মতে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো মূলত গ্যাস ও কয়লা নির্ভর হওয়ায় জ্বালানি সংকটে বর্তমানে দৈনিক বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব উম্মে রেহানা জানান, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অনেক হলেও পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ না থাকায় উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এছাড়া আদানির একটি বিদ্যুৎ ইউনিটে কারিগরি সমস্যা তৈরি হওয়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জ্বালানির দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা না করে কেবল বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর কারণে এই জটিলতা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করে বলেন, আপনার গাড়ি আছে কিন্তু গাড়ি চালানোর তেল নেই—বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সেক্টরের বর্তমান অবস্থা ঠিক এমন। গত দেড় দশকে বিদ্যুৎ খাতে বড় বিনিয়োগের মাধ্যমে স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছালেও কারিগরি ত্রুটি, রক্ষণাবেক্ষণ ও আর্থিক সংকটের কারণে কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না।

দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ গ্যাসনির্ভর হলেও দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহ সীমিত। ঘাটতি মেটাতে আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গড়ে ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে দেশীয় উৎস ও এলএনজি মিলিয়ে সর্বোচ্চ ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও সম্প্রতি এলএনজি সরবরাহ ৭৪ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে আসায় মোট সরবরাহ দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৩৫ কোটি ঘনফুট। এই ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি শিল্পকারখানা, আবাসিক রান্না ও পরিবহন খাতে গ্যাসের সংকট তীব্র হয়েছে।

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অবস্থাও সংকটাপন্ন। পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, দেশে বর্তমানে আটটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট। তবে পটুয়াখালীর পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র কারিগরি সমস্যার কারণে এবং মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ রয়েছে। এছাড়া বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটও কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ। অন্যদিকে, ভারতের ঝাড়খন্ডে অবস্থিত আদানির কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির সক্ষমতা প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট হলেও কয়লা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় গত ৭ আগস্ট থেকে তারা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রটি দিনের বেলায় প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যায় সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ দিচ্ছে।

বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বিইপ্পার সাবেক সভাপতি ইমরান করিম জানান, ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ অর্থবছরে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো তাদের সক্ষমতার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেও পরবর্তীতে পিডিবির বকেয়া পাওনা বাড়তে থাকায় উৎপাদন ধীরে ধীরে কমে যায়। তাঁর মতে, পিডিবির সঙ্গে বকেয়া ও অন্যান্য বিরোধের সমাধান করা গেলে তেলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

জ্বালানি খাতের এই সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতাও বড় ভূমিকা রাখছে। আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, গ্যাস বা কয়লার দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি জাহাজভাড়া, বীমা ব্যয় ও ডলারের বিনিময় হার বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদনের আর্থিক ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে সরবরাহ অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম মনে করেন, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা এবং কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এই সংকট বারবার ফিরে আসছে। সংকটের মধ্যেও সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে এলএনজি কেনা, সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থাকা জাহাজে এলএনজি আমদানি এবং চীনের অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নতুন টার্মিনাল নির্মাণের মতো উদ্যোগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এসব কর্মকাণ্ডে সংকট থেকে বের হওয়ার কার্যকর উদ্যোগের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

গ্রাহকদের ক্ষোভও বাড়ছে। গত জুনে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়ানো হলেও সেবার মান উন্নত হয়নি। মোহাম্মদপুরের নবীনগর এলাকার বাসিন্দা লিজা জানান, গভীর রাতেও দুই-তিনবার বিদ্যুৎ যায় এবং একবার গেলে দেড়-দুই ঘণ্টার আগে আসে না। তাঁর দাবি, রাজধানীতে প্রতিদিন ছয় থেকে সাত ঘণ্টা এবং গ্রামাঞ্চলে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। একই এলাকার বাসিন্দা শিউলি বেগম জানান, ছুটির দিনেও কয়েক দফা বিদ্যুৎহীন থাকতে হয়েছে এবং গ্যাস না থাকায় বাধ্য হয়ে বিদ্যুৎচালিত চুলা ব্যবহার করতে গিয়ে বাড়তি খরচের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি দেশের বিদ্যুৎ নিরাপত্তা শুধু সর্বোচ্চ উৎপাদন সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রার সক্ষমতা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের আর্থিক স্বাস্থ্য ও গ্রিডের সক্ষমতা জড়িত। তাই শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ না করে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, আমদানির উৎস বহুমুখী করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং আর্থিক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করা না হলে এ সংকট থেকে স্থায়ী মুক্তি মিলবে না।

২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত বিদ্যুৎ সুবিধা প্রাপ্ত জনগোষ্ঠী ১০০ শতাংশ। কিন্তু সেই সক্ষমতার মধ্যেও এই তীব্র গরমে আবারো বিদ্যুৎ সংকটে পড়েছে মানুষ। জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি, বাড়তি চাহিদা, আমদানিনির্ভরতা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের আর্থিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার কারণে উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে সারাদেশের মতো রাজধানীতেও ফিরে এসেছে লোডশেডিংয়ের দুর্ভোগ। তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে।

গত দেড় দশকে বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন সক্ষমতা ও অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা হয়েছে। একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি জাতীয় গ্রিড সম্প্রসারণ এবং বিদ্যুৎ আমদানির ব্যবস্থাও করা হয়েছে। ফলে স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। কিন্তু স্থাপিত সক্ষমতা এবং বাস্তবে উৎপাদিত বিদ্যুতের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। একটি কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা ৫০০ মেগাওয়াট হলেও জ্বালানি সংকট, রক্ষণাবেক্ষণ, কারিগরি ত্রুটি কিংবা আর্থিক কারণে সেটি সবসময় পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারে না।

জনপ্রিয় সংবাদ

মেরে ফেলার হুমকি পেয়েছি, বাফুফের বরখাস্ত কোচের বিস্ফোরক দাবি

কাগজে বিপুল সক্ষমতা, বাস্তবে তীব্র গরমে লোডশেডিংয়ের চরম ভোগান্তি

প্রকাশিত হয়েছে: ০৫:৪৬:৪৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

একসময় বিদ্যুৎ ছিল বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম দৃশ্যমান সাফল্য। গ্রাম থেকে শহর ও দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়াকে বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। পাওয়ার সেলের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩৩ হাজার ৯২ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছিল গত ২০ মে ১৭ হাজার ২০১ মেগাওয়াট। বর্তমানে দেশে গ্রাহক সংখ্যা ৫ কোটি ১ লাখ ৯৬ হাজার, মোট সঞ্চালন লাইন ১৮ হাজার ৮১৬ কিলোমিটার এবং গ্রিড সাব-স্টেশন ক্ষমতা ৯১ হাজার ৫১২ এমভিএ। এছাড়া আগামী জুন ২০২৬ পর্যন্ত বিতরণ লাইন ৬ লাখ ৬১ হাজার ৭৯৬ কিলোমিটারে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে এবং মাথাপিছু বিদ্যুৎ উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৬৮০ কিলোওয়াট। ২৫-২৬ অর্থবছর নাগাদ শতভাগ জনগোষ্ঠীকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনার লক্ষ্য থাকলেও, এই তীব্র গরমে আবারো চরম বিদ্যুৎ সংকটে পড়েছে দেশের মানুষ।

জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি, বাড়তি চাহিদা, আমদানিনির্ভরতা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের আর্থিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার কারণে এই বিশাল উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে রাজধানী ঢাকাসহ দেশজুড়ে ফিরে এসেছে লোডশেডিংয়ের তীব্র দুর্ভোগ। গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাসাবাড়িতে ফ্যান, এসি, ফ্রিজ ও পানির পাম্পের ব্যবহার যেমন বাড়ছে, তেমনি শিল্পকারখানা, অফিস ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানেও বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে। কিন্তু এই বাড়তি চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা থাকলেও পর্যাপ্ত গ্যাস, কয়লা বা তরল জ্বালানির অভাবে অনেক কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। ফলে কাগজে-কলমে বিপুল উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও প্রয়োজনের সময় গ্রিডে সেই বিদ্যুৎ মিলছে না।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়। দিনের ব্যস্ত সময়ে বিদ্যুৎ চলে যাওয়া, রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকা কিংবা একই দিনে একাধিকবার বিদ্যুৎ-বিভ্রাটে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন নগরবাসী। বহুতল ভবনগুলোতে লিফট ও পানির পাম্প অচল হয়ে পড়ছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও অফিসে কাজের গতি কমছে এবং বিকল্প হিসেবে জেনারেটর ব্যবহার করতে গিয়ে বাড়তি জ্বালানি ব্যয় বহন করতে হচ্ছে, যা জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে চাহিদা বাড়লেও উৎপাদনের ঘাটতি থাকায় দৈনিক গড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন অন্তত ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং দেওয়ার সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে সংসদে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কাগজে-কলমে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা ৩২ হাজার ৩৩২ মেগাওয়াট, যার মধ্যে গ্রিডভিত্তিক সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। কিন্তু এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১৬ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বাংলাদেশের ১৬শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি রয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের মতে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো মূলত গ্যাস ও কয়লা নির্ভর হওয়ায় জ্বালানি সংকটে বর্তমানে দৈনিক বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব উম্মে রেহানা জানান, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অনেক হলেও পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ না থাকায় উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এছাড়া আদানির একটি বিদ্যুৎ ইউনিটে কারিগরি সমস্যা তৈরি হওয়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জ্বালানির দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা না করে কেবল বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর কারণে এই জটিলতা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করে বলেন, আপনার গাড়ি আছে কিন্তু গাড়ি চালানোর তেল নেই—বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সেক্টরের বর্তমান অবস্থা ঠিক এমন। গত দেড় দশকে বিদ্যুৎ খাতে বড় বিনিয়োগের মাধ্যমে স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছালেও কারিগরি ত্রুটি, রক্ষণাবেক্ষণ ও আর্থিক সংকটের কারণে কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না।

দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ গ্যাসনির্ভর হলেও দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহ সীমিত। ঘাটতি মেটাতে আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গড়ে ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে দেশীয় উৎস ও এলএনজি মিলিয়ে সর্বোচ্চ ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও সম্প্রতি এলএনজি সরবরাহ ৭৪ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে আসায় মোট সরবরাহ দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৩৫ কোটি ঘনফুট। এই ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি শিল্পকারখানা, আবাসিক রান্না ও পরিবহন খাতে গ্যাসের সংকট তীব্র হয়েছে।

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অবস্থাও সংকটাপন্ন। পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, দেশে বর্তমানে আটটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট। তবে পটুয়াখালীর পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র কারিগরি সমস্যার কারণে এবং মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ রয়েছে। এছাড়া বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটও কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ। অন্যদিকে, ভারতের ঝাড়খন্ডে অবস্থিত আদানির কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির সক্ষমতা প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট হলেও কয়লা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় গত ৭ আগস্ট থেকে তারা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রটি দিনের বেলায় প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যায় সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ দিচ্ছে।

বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বিইপ্পার সাবেক সভাপতি ইমরান করিম জানান, ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ অর্থবছরে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো তাদের সক্ষমতার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেও পরবর্তীতে পিডিবির বকেয়া পাওনা বাড়তে থাকায় উৎপাদন ধীরে ধীরে কমে যায়। তাঁর মতে, পিডিবির সঙ্গে বকেয়া ও অন্যান্য বিরোধের সমাধান করা গেলে তেলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

জ্বালানি খাতের এই সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতাও বড় ভূমিকা রাখছে। আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, গ্যাস বা কয়লার দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি জাহাজভাড়া, বীমা ব্যয় ও ডলারের বিনিময় হার বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদনের আর্থিক ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে সরবরাহ অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম মনে করেন, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা এবং কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এই সংকট বারবার ফিরে আসছে। সংকটের মধ্যেও সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে এলএনজি কেনা, সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থাকা জাহাজে এলএনজি আমদানি এবং চীনের অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নতুন টার্মিনাল নির্মাণের মতো উদ্যোগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এসব কর্মকাণ্ডে সংকট থেকে বের হওয়ার কার্যকর উদ্যোগের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

গ্রাহকদের ক্ষোভও বাড়ছে। গত জুনে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়ানো হলেও সেবার মান উন্নত হয়নি। মোহাম্মদপুরের নবীনগর এলাকার বাসিন্দা লিজা জানান, গভীর রাতেও দুই-তিনবার বিদ্যুৎ যায় এবং একবার গেলে দেড়-দুই ঘণ্টার আগে আসে না। তাঁর দাবি, রাজধানীতে প্রতিদিন ছয় থেকে সাত ঘণ্টা এবং গ্রামাঞ্চলে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। একই এলাকার বাসিন্দা শিউলি বেগম জানান, ছুটির দিনেও কয়েক দফা বিদ্যুৎহীন থাকতে হয়েছে এবং গ্যাস না থাকায় বাধ্য হয়ে বিদ্যুৎচালিত চুলা ব্যবহার করতে গিয়ে বাড়তি খরচের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি দেশের বিদ্যুৎ নিরাপত্তা শুধু সর্বোচ্চ উৎপাদন সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রার সক্ষমতা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের আর্থিক স্বাস্থ্য ও গ্রিডের সক্ষমতা জড়িত। তাই শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ না করে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, আমদানির উৎস বহুমুখী করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং আর্থিক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করা না হলে এ সংকট থেকে স্থায়ী মুক্তি মিলবে না।

২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত বিদ্যুৎ সুবিধা প্রাপ্ত জনগোষ্ঠী ১০০ শতাংশ। কিন্তু সেই সক্ষমতার মধ্যেও এই তীব্র গরমে আবারো বিদ্যুৎ সংকটে পড়েছে মানুষ। জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি, বাড়তি চাহিদা, আমদানিনির্ভরতা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের আর্থিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার কারণে উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে সারাদেশের মতো রাজধানীতেও ফিরে এসেছে লোডশেডিংয়ের দুর্ভোগ। তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে।

গত দেড় দশকে বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন সক্ষমতা ও অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা হয়েছে। একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি জাতীয় গ্রিড সম্প্রসারণ এবং বিদ্যুৎ আমদানির ব্যবস্থাও করা হয়েছে। ফলে স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। কিন্তু স্থাপিত সক্ষমতা এবং বাস্তবে উৎপাদিত বিদ্যুতের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। একটি কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা ৫০০ মেগাওয়াট হলেও জ্বালানি সংকট, রক্ষণাবেক্ষণ, কারিগরি ত্রুটি কিংবা আর্থিক কারণে সেটি সবসময় পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারে না।