লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০১:২৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী যুদ্ধের বাস্তবতা ও নতুন নিরাপত্তা প্রতিযোগিতা

মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক সংঘাত আঞ্চলিক রাজনীতির কোনো সাময়িক সংকট নয়, বরং এটি একটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্যে রূপ নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব এই প্রবণতাকে আরও উসকে দিচ্ছে। শান্তি ও স্থিতিশীলতার বুলি আওড়ানো হলেও বাস্তবে মধ্যপ্রাচ্য এখন এমন এক কাঠামোর দিকে যাচ্ছে, যা সম্পূর্ণভাবে সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

এই নতুন ভূরাজনৈতিক মেরুকরণের কেন্দ্রে রয়েছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান। গত এক দশকে আমিরাত মূলত অর্থনীতি, কূটনীতি, বিনিয়োগ ও মানবিক সহায়তার মতো ‘সফট পাওয়ার’ বা কোমল শক্তির মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করেছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবুধাবি তাদের কৌশলে বড় পরিবর্তন এনে সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতাকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ফলে আবুধাবির আঞ্চলিক ভূমিকা কেবল অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না।

২০২০ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের পর ইসরাইল ও আমিরাতের মধ্যকার সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বাইরে গিয়ে এখন গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গভীর হচ্ছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে ইসরাইলের ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির ফলে আমিরাতের সঙ্গে তাদের এই সামরিক সহযোগিতা ধাপে ধাপে আরও সহজ ও বিস্তৃত হয়েছে।

তবে এই সমীকরণটি কেবল ইসরাইল ও আমিরাতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে রয়েছে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের উপসাগরীয় নিরাপত্তা নীতি। ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রই সৌদি আরব, আমিরাত ও কাতারের মতো মিত্রদের নিরাপত্তার মূল গ্যারান্টর হিসেবে কাজ করে আসছে। কিন্তু ২০২৬ সালের ইরান যুদ্ধ এই ব্যবস্থার বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা সবার সামনে উন্মোচন করেছে। মধ্যপ্রাচ্য কাউন্সিলের একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে ওয়াশিংটনের নিজস্ব অগ্রাধিকারের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে। ফলে এই অঞ্চলের দেশগুলো এখন নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নতুন করে নজর দিচ্ছে।

এখানেই মূলত 'স্থায়ী যুদ্ধ' বা পার্মানেন্ট ওয়ারের ধারণাটি সামনে আসে। নিরাপত্তার সমাধান হিসেবে যদি কেবল আরও অস্ত্র, সামরিক ঘাঁটি এবং প্রতিরক্ষা চুক্তিকেই বেছে নেওয়া হয়, তবে তা সংঘাতের মূল কারণগুলো দূর না করে উল্টো সামরিক অবকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করবে। এক দেশের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি অন্য দেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে, যা জন্ম দেবে নতুন এক অস্ত্র প্রতিযোগিতার। ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনা এর বড় প্রমাণ। হরমুজ প্রণালি ও উপসাগরীয় জ্বালানি পথ এখন বড় ভূরাজনৈতিক লড়াইয়ের ময়দান। ইরান হরমুজ প্রণালিতে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছে যে তাদের জ্বালানি সম্পদও পাল্টা আক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে। অন্যদিকে, আবুধাবি হরমুজের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প পাইপলাইন ও বাণিজ্যপথ তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে।

এই জটিল পরিস্থিতিতে আমিরাতের অবস্থান দ্বিধাদ্বন্দ্বের। একদিকে তারা ইরানের হামলা প্রতিহত করতে নিজেদের প্রতিরক্ষা মজবুত করছে, অন্যদিকে বুঝতে পারছে যে কেবল মার্কিন নিরাপত্তার ওপর ভরসা করা নিরাপদ নয়। এদিকে, ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের সমর্থকরা মনে করেন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা সংঘাত কমাবে। কিন্তু সমালোচকদের মতে, ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান না করে কেবল রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে চুক্তি জনগণের ক্ষোভ মেটাতে পারবে না। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানকে প্রতিহত করতে এবং আরব-ইসরাইল সম্পর্ক বাড়াতে নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে, যা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের সামনে এখন দুটি পথ খোলা রয়েছে। প্রথমটি হলো সামরিক জোট ও অস্ত্রের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ক্ষমতা প্রদর্শন, আর দ্বিতীয়টি হলো সংলাপ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও ফিলিস্তিন সংকটের রাজনৈতিক সমাধান। নিরাপত্তার নামে কেবল সামরিকীকরণ চলতে থাকলে যুদ্ধই এই অঞ্চলের স্থায়ী নিয়তি হয়ে দাঁড়াবে। এই ভবিষ্যৎ কেবল ওয়াশিংটন, তেল আবিব বা আবুধাবির ওপর নির্ভর করছে না; বরং তেহরান, রিয়াদ, দোহা ও আঙ্কারার মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সিদ্ধান্তও এর গতিপথ নির্ধারণ করবে।

প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১: ৫৭আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১: ৫৭

জনপ্রিয় সংবাদ

কোন খাবার হজম হতে কত সময় লাগে? জেনে নিন সঠিক নিয়ম

মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী যুদ্ধের বাস্তবতা ও নতুন নিরাপত্তা প্রতিযোগিতা

প্রকাশিত হয়েছে: ০৬:০৩:০৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক সংঘাত আঞ্চলিক রাজনীতির কোনো সাময়িক সংকট নয়, বরং এটি একটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্যে রূপ নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব এই প্রবণতাকে আরও উসকে দিচ্ছে। শান্তি ও স্থিতিশীলতার বুলি আওড়ানো হলেও বাস্তবে মধ্যপ্রাচ্য এখন এমন এক কাঠামোর দিকে যাচ্ছে, যা সম্পূর্ণভাবে সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

এই নতুন ভূরাজনৈতিক মেরুকরণের কেন্দ্রে রয়েছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান। গত এক দশকে আমিরাত মূলত অর্থনীতি, কূটনীতি, বিনিয়োগ ও মানবিক সহায়তার মতো ‘সফট পাওয়ার’ বা কোমল শক্তির মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করেছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবুধাবি তাদের কৌশলে বড় পরিবর্তন এনে সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতাকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ফলে আবুধাবির আঞ্চলিক ভূমিকা কেবল অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না।

২০২০ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের পর ইসরাইল ও আমিরাতের মধ্যকার সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বাইরে গিয়ে এখন গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গভীর হচ্ছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে ইসরাইলের ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির ফলে আমিরাতের সঙ্গে তাদের এই সামরিক সহযোগিতা ধাপে ধাপে আরও সহজ ও বিস্তৃত হয়েছে।

তবে এই সমীকরণটি কেবল ইসরাইল ও আমিরাতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে রয়েছে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের উপসাগরীয় নিরাপত্তা নীতি। ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রই সৌদি আরব, আমিরাত ও কাতারের মতো মিত্রদের নিরাপত্তার মূল গ্যারান্টর হিসেবে কাজ করে আসছে। কিন্তু ২০২৬ সালের ইরান যুদ্ধ এই ব্যবস্থার বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা সবার সামনে উন্মোচন করেছে। মধ্যপ্রাচ্য কাউন্সিলের একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে ওয়াশিংটনের নিজস্ব অগ্রাধিকারের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে। ফলে এই অঞ্চলের দেশগুলো এখন নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নতুন করে নজর দিচ্ছে।

এখানেই মূলত 'স্থায়ী যুদ্ধ' বা পার্মানেন্ট ওয়ারের ধারণাটি সামনে আসে। নিরাপত্তার সমাধান হিসেবে যদি কেবল আরও অস্ত্র, সামরিক ঘাঁটি এবং প্রতিরক্ষা চুক্তিকেই বেছে নেওয়া হয়, তবে তা সংঘাতের মূল কারণগুলো দূর না করে উল্টো সামরিক অবকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করবে। এক দেশের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি অন্য দেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে, যা জন্ম দেবে নতুন এক অস্ত্র প্রতিযোগিতার। ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনা এর বড় প্রমাণ। হরমুজ প্রণালি ও উপসাগরীয় জ্বালানি পথ এখন বড় ভূরাজনৈতিক লড়াইয়ের ময়দান। ইরান হরমুজ প্রণালিতে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছে যে তাদের জ্বালানি সম্পদও পাল্টা আক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে। অন্যদিকে, আবুধাবি হরমুজের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প পাইপলাইন ও বাণিজ্যপথ তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে।

এই জটিল পরিস্থিতিতে আমিরাতের অবস্থান দ্বিধাদ্বন্দ্বের। একদিকে তারা ইরানের হামলা প্রতিহত করতে নিজেদের প্রতিরক্ষা মজবুত করছে, অন্যদিকে বুঝতে পারছে যে কেবল মার্কিন নিরাপত্তার ওপর ভরসা করা নিরাপদ নয়। এদিকে, ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের সমর্থকরা মনে করেন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা সংঘাত কমাবে। কিন্তু সমালোচকদের মতে, ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান না করে কেবল রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে চুক্তি জনগণের ক্ষোভ মেটাতে পারবে না। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানকে প্রতিহত করতে এবং আরব-ইসরাইল সম্পর্ক বাড়াতে নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে, যা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের সামনে এখন দুটি পথ খোলা রয়েছে। প্রথমটি হলো সামরিক জোট ও অস্ত্রের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ক্ষমতা প্রদর্শন, আর দ্বিতীয়টি হলো সংলাপ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও ফিলিস্তিন সংকটের রাজনৈতিক সমাধান। নিরাপত্তার নামে কেবল সামরিকীকরণ চলতে থাকলে যুদ্ধই এই অঞ্চলের স্থায়ী নিয়তি হয়ে দাঁড়াবে। এই ভবিষ্যৎ কেবল ওয়াশিংটন, তেল আবিব বা আবুধাবির ওপর নির্ভর করছে না; বরং তেহরান, রিয়াদ, দোহা ও আঙ্কারার মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সিদ্ধান্তও এর গতিপথ নির্ধারণ করবে।

প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১: ৫৭আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১: ৫৭