লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১১:০৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশে বিদেশি মেডিকেল শিক্ষার্থী কমছে: কারণ ও প্রতিকার

বাংলাদেশের মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজগুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা গত দুই বছরে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। একসময় ভারত, নেপালসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের কাছে উচ্চশিক্ষার অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য ছিল বাংলাদেশ, তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রবণতায় পরিবর্তন এসেছে।

ভারতের মণিপুর থেকে আসা হানজাবাম ধনরাজ শর্মা বর্তমানে বগুড়ার টিএমএসএস মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি জানান, তার বড় বোন হানজাবাম দীপা একই কলেজ থেকে ২০২৪ সালে এমবিবিএস শেষ করেছেন। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় বোনকে পৌঁছে দিতেই প্রথমবার বাংলাদেশে এসেছিলেন ধনরাজ। বাংলাদেশে পড়ার কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, ভারতে সরকারি মেডিক্যালে সুযোগ পাওয়া কঠিন এবং বেসরকারি মেডিক্যালের খরচ এখানকার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এছাড়াও, বাংলাদেশের পাঠ্যক্রম তাদের দেশের সঙ্গে অনেকটা মেলে, দূরত্ব কম এবং ভাষা রপ্ত করা সহজ। ২০২২ সাল থেকে বাংলাদেশে থাকা ধনরাজ কখনোই নিজেকে অনিরাপদ মনে করেননি, যদিও আত্মীয়স্বজনেরা সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখে দুশ্চিন্তা করেন।

ধনরাজের মতো অনেক বিদেশি শিক্ষার্থীই প্রতিবছর বাংলাদেশের মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজগুলোয় ভর্তি হন। এদের মধ্যে ভারতীয় ও নেপালি শিক্ষার্থীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। এছাড়াও ভুটান, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, ফিলিস্তিনসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা এখানে চিকিৎসাবিদ্যায় পড়তে আসেন। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া থেকেও শিক্ষার্থীরা আসেন, তবে তারা মূলত প্রবাসী বাংলাদেশি। নেপালের ডা. রাম সাগর শাহ ২০০৯ সালে চট্টগ্রামের ইউএসটিসি মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস শেষ করে নিজ দেশে ফিরে গিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (সাবেক বিএসএমএমইউ) নিওনেটোলজিতে উচ্চশিক্ষা নিতে আবার বাংলাদেশে আসেন, কারণ এখানে সরাসরি এই বিষয়ে পড়ার সুযোগ আছে এবং তিনি ভাষাটিও জানেন। গত বছর এমবিবিএস চূড়ান্ত পরীক্ষায় সারা দেশে সেরা ১০–এর মধ্যে ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের নেপালি শিক্ষার্থী স্তুতি রিমাল। তিনি বলেছিলেন, মুখ না খুললে কেউ বুঝতেই পারে না যে তিনি বাংলাদেশি নন।

তবে, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত দুই বছরে মেডিক্যাল কলেজগুলোয় বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে। স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিজিএমই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০–২১ শিক্ষাবর্ষে বেসরকারি মেডিক্যালগুলোতে ভর্তি হওয়া মোট বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ হাজার ৭৪৭ জন। পরের দুই বছরে তা বেড়ে যথাক্রমে ২ হাজার ১২ ও ২ হাজার ৯৬ জন হয়েছিল। কিন্তু ২০২৩–২৪ শিক্ষাবর্ষ থেকেই এই সংখ্যা কমতে শুরু করে, সে বছর ভর্তি হন ১ হাজার ৬৬৯ জন। পরের বছর অর্থাৎ ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে তা আরও কমে ১ হাজার ১৮৭ জনে দাঁড়ায়। ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনো না পাওয়া গেলেও, স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (চিকিৎসাশিক্ষা) অধ্যাপক ডা. রুবীনা ইয়াসমীন নিশ্চিত করেছেন যে এবার বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা গতবারের চেয়েও কম। তিনি জানান, সরকারি মেডিক্যালে বিদেশিদের জন্য বরাদ্দ আসন মোটামুটি ভরে গেলেও, বেসরকারি মেডিক্যালগুলো আগের মতো বিদেশি শিক্ষার্থী পাচ্ছে না।

বাংলাদেশে ৩৭টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ রয়েছে, যার সব কটিতে বিদেশি শিক্ষার্থী নেই। ঢাকা মেডিকেল কলেজ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে বেশি জনপ্রিয়। সরকারি মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজগুলোয় বিদেশি শিক্ষার্থীরা মূলত সার্ক ও নন–সার্ক কোটায় সুযোগ পান। প্রতিবছর এই কোটায় ২২০ থেকে ২৬টি আসন বরাদ্দ থাকে। ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষে সার্ক কোটায় ১২৫ জন ও নন–সার্ক কোটায় ৯৯ জনকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এমবিবিএস কোর্সে ভারতের জন্য ২২টি, পাকিস্তানের ২১, নেপালের ১৯, শ্রীলঙ্কার ১৩, ভুটানের ২৮, মালদ্বীপের ৬ ও আফগানিস্তানের জন্য ৩টি আসন বরাদ্দ ছিল। নন–সার্ক কোটায় মিয়ানমার, ফিলিস্তিন ও অন্যান্য দেশের জন্য ৭২টি আসন বরাদ্দ ছিল। ডেন্টালের জন্য সার্ক ও নন–সার্ক কোটায় মোট ৪০টি আসন রাখা হয়েছে। তবে ভর্তির সুযোগ পেলেও সবাই ভর্তি না হওয়ায় বিগত বছরে মোট কতজন বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

বিদেশি শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে বৈশ্বিক পরিস্থিতি, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি এবং ২০২৪ সাল–পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতাকে প্রধান কারণ হিসেবে অনুমান করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে আরও কিছু কারণ জানা গেছে। নেপাল ও মালদ্বীপে গত কয়েক বছরে চিকিৎসাবিদ্যা নিয়ে পড়ার সুযোগ বেড়েছে। এছাড়াও, যেসব এজেন্সি রাশিয়া, চীন কিংবা অন্যান্য দেশে পড়ার ব্যবস্থা করে, তারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে আরও সক্রিয় হয়েছে। ফলে ভারত, নেপালসহ আশপাশের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের বিকল্প বিভিন্ন গন্তব্য বেছে নিচ্ছেন। স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. ফারুক আহাম্মদ জানান, তিনি যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ছিলেন, তখন বিদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে থাকা, খাওয়া ও স্যানিটেশনের কিছু সমস্যার কথা জানতে পারেন। তিনি বলেন, বিদেশি শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে তারা সব সময় আন্তরিক।

কয়েক বছর আগেও মালদ্বীপ থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী বাংলাদেশে আসতেন। এখন তারা চীন, রাশিয়া বা মালয়েশিয়ায় পড়তে যান, তবে ইন্টার্নশিপের জন্য বাংলাদেশে আসেন। দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক বিবেচনা করে প্রতিবছর মালদ্বীপের প্রায় দেড় শ শিক্ষার্থীকে বিনা খরচে এখানকার সরকারি মেডিক্যালে ইন্টার্নশিপের সুযোগ দেওয়া হয়।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএমসিএ) নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। বিপিএমসিএর জেনারেল সেক্রেটারি অধ্যাপক ডা. মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, গত বছর তারা মালদ্বীপ ও নেপালে মেডিক্যাল এডুকেশন ফেয়ার করেছেন। এ বছর ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, এমন কয়েকটি দেশে ফেয়ার করার পরিকল্পনা আছে। তিনি আরও বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকেও অনেকে বাংলাদেশে পড়তে আসেন, তাদেরও আগ্রহী করা যেতে পারে। তবে শুধু শিক্ষার কথা বললে হবে না, দেশ হিসেবেও বাংলাদেশের মার্কেটিং ও ব্র্যান্ডিং দরকার।

বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি মেডিক্যালে (নন–সার্ক কোটায়) প্রতিবছর টিউশন ফি বাবদ পাঁচ হাজার ডলার (অর্থাৎ পাঁচ বছরের শিক্ষাজীবনে প্রায় ২৫ হাজার ডলার) দিতে হয়। বেসরকারি মেডিক্যালে প্রতিষ্ঠানভেদে খরচ হয় ৩৫ থেকে ৪৫ হাজার ডলার। দেশের ৬৮টি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের মধ্যে অন্তত ৬০টিতেই নিয়মিত বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ, ঢাকার ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজ, গাজীপুরের ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ, বগুড়ার টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ, ময়মনসিংহের কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ, সিরাজগঞ্জের খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ, কুমিল্লার ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজ, রংপুর কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ ইত্যাদি। এই খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় সুযোগ রয়েছে।

তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত দুই বছরে মেডিক্যাল কলেজগুলোয় বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে।.২০১৯ সালে রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশে এসেছিলেন ভুটানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং।

জনপ্রিয় সংবাদ

ঢাকায় বৃষ্টি ও তাপমাত্রা হ্রাসের পূর্বাভাস আবহাওয়া অধিদপ্তরের

বাংলাদেশে বিদেশি মেডিকেল শিক্ষার্থী কমছে: কারণ ও প্রতিকার

প্রকাশিত হয়েছে: ০৮:১৬:৩০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশের মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজগুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা গত দুই বছরে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। একসময় ভারত, নেপালসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের কাছে উচ্চশিক্ষার অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য ছিল বাংলাদেশ, তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রবণতায় পরিবর্তন এসেছে।

ভারতের মণিপুর থেকে আসা হানজাবাম ধনরাজ শর্মা বর্তমানে বগুড়ার টিএমএসএস মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি জানান, তার বড় বোন হানজাবাম দীপা একই কলেজ থেকে ২০২৪ সালে এমবিবিএস শেষ করেছেন। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় বোনকে পৌঁছে দিতেই প্রথমবার বাংলাদেশে এসেছিলেন ধনরাজ। বাংলাদেশে পড়ার কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, ভারতে সরকারি মেডিক্যালে সুযোগ পাওয়া কঠিন এবং বেসরকারি মেডিক্যালের খরচ এখানকার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এছাড়াও, বাংলাদেশের পাঠ্যক্রম তাদের দেশের সঙ্গে অনেকটা মেলে, দূরত্ব কম এবং ভাষা রপ্ত করা সহজ। ২০২২ সাল থেকে বাংলাদেশে থাকা ধনরাজ কখনোই নিজেকে অনিরাপদ মনে করেননি, যদিও আত্মীয়স্বজনেরা সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখে দুশ্চিন্তা করেন।

ধনরাজের মতো অনেক বিদেশি শিক্ষার্থীই প্রতিবছর বাংলাদেশের মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজগুলোয় ভর্তি হন। এদের মধ্যে ভারতীয় ও নেপালি শিক্ষার্থীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। এছাড়াও ভুটান, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, ফিলিস্তিনসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা এখানে চিকিৎসাবিদ্যায় পড়তে আসেন। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া থেকেও শিক্ষার্থীরা আসেন, তবে তারা মূলত প্রবাসী বাংলাদেশি। নেপালের ডা. রাম সাগর শাহ ২০০৯ সালে চট্টগ্রামের ইউএসটিসি মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস শেষ করে নিজ দেশে ফিরে গিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (সাবেক বিএসএমএমইউ) নিওনেটোলজিতে উচ্চশিক্ষা নিতে আবার বাংলাদেশে আসেন, কারণ এখানে সরাসরি এই বিষয়ে পড়ার সুযোগ আছে এবং তিনি ভাষাটিও জানেন। গত বছর এমবিবিএস চূড়ান্ত পরীক্ষায় সারা দেশে সেরা ১০–এর মধ্যে ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের নেপালি শিক্ষার্থী স্তুতি রিমাল। তিনি বলেছিলেন, মুখ না খুললে কেউ বুঝতেই পারে না যে তিনি বাংলাদেশি নন।

তবে, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত দুই বছরে মেডিক্যাল কলেজগুলোয় বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে। স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিজিএমই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০–২১ শিক্ষাবর্ষে বেসরকারি মেডিক্যালগুলোতে ভর্তি হওয়া মোট বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ হাজার ৭৪৭ জন। পরের দুই বছরে তা বেড়ে যথাক্রমে ২ হাজার ১২ ও ২ হাজার ৯৬ জন হয়েছিল। কিন্তু ২০২৩–২৪ শিক্ষাবর্ষ থেকেই এই সংখ্যা কমতে শুরু করে, সে বছর ভর্তি হন ১ হাজার ৬৬৯ জন। পরের বছর অর্থাৎ ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে তা আরও কমে ১ হাজার ১৮৭ জনে দাঁড়ায়। ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনো না পাওয়া গেলেও, স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (চিকিৎসাশিক্ষা) অধ্যাপক ডা. রুবীনা ইয়াসমীন নিশ্চিত করেছেন যে এবার বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা গতবারের চেয়েও কম। তিনি জানান, সরকারি মেডিক্যালে বিদেশিদের জন্য বরাদ্দ আসন মোটামুটি ভরে গেলেও, বেসরকারি মেডিক্যালগুলো আগের মতো বিদেশি শিক্ষার্থী পাচ্ছে না।

বাংলাদেশে ৩৭টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ রয়েছে, যার সব কটিতে বিদেশি শিক্ষার্থী নেই। ঢাকা মেডিকেল কলেজ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে বেশি জনপ্রিয়। সরকারি মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজগুলোয় বিদেশি শিক্ষার্থীরা মূলত সার্ক ও নন–সার্ক কোটায় সুযোগ পান। প্রতিবছর এই কোটায় ২২০ থেকে ২৬টি আসন বরাদ্দ থাকে। ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষে সার্ক কোটায় ১২৫ জন ও নন–সার্ক কোটায় ৯৯ জনকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এমবিবিএস কোর্সে ভারতের জন্য ২২টি, পাকিস্তানের ২১, নেপালের ১৯, শ্রীলঙ্কার ১৩, ভুটানের ২৮, মালদ্বীপের ৬ ও আফগানিস্তানের জন্য ৩টি আসন বরাদ্দ ছিল। নন–সার্ক কোটায় মিয়ানমার, ফিলিস্তিন ও অন্যান্য দেশের জন্য ৭২টি আসন বরাদ্দ ছিল। ডেন্টালের জন্য সার্ক ও নন–সার্ক কোটায় মোট ৪০টি আসন রাখা হয়েছে। তবে ভর্তির সুযোগ পেলেও সবাই ভর্তি না হওয়ায় বিগত বছরে মোট কতজন বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

বিদেশি শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে বৈশ্বিক পরিস্থিতি, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি এবং ২০২৪ সাল–পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতাকে প্রধান কারণ হিসেবে অনুমান করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে আরও কিছু কারণ জানা গেছে। নেপাল ও মালদ্বীপে গত কয়েক বছরে চিকিৎসাবিদ্যা নিয়ে পড়ার সুযোগ বেড়েছে। এছাড়াও, যেসব এজেন্সি রাশিয়া, চীন কিংবা অন্যান্য দেশে পড়ার ব্যবস্থা করে, তারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে আরও সক্রিয় হয়েছে। ফলে ভারত, নেপালসহ আশপাশের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের বিকল্প বিভিন্ন গন্তব্য বেছে নিচ্ছেন। স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. ফারুক আহাম্মদ জানান, তিনি যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ছিলেন, তখন বিদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে থাকা, খাওয়া ও স্যানিটেশনের কিছু সমস্যার কথা জানতে পারেন। তিনি বলেন, বিদেশি শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে তারা সব সময় আন্তরিক।

কয়েক বছর আগেও মালদ্বীপ থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী বাংলাদেশে আসতেন। এখন তারা চীন, রাশিয়া বা মালয়েশিয়ায় পড়তে যান, তবে ইন্টার্নশিপের জন্য বাংলাদেশে আসেন। দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক বিবেচনা করে প্রতিবছর মালদ্বীপের প্রায় দেড় শ শিক্ষার্থীকে বিনা খরচে এখানকার সরকারি মেডিক্যালে ইন্টার্নশিপের সুযোগ দেওয়া হয়।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএমসিএ) নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। বিপিএমসিএর জেনারেল সেক্রেটারি অধ্যাপক ডা. মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, গত বছর তারা মালদ্বীপ ও নেপালে মেডিক্যাল এডুকেশন ফেয়ার করেছেন। এ বছর ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, এমন কয়েকটি দেশে ফেয়ার করার পরিকল্পনা আছে। তিনি আরও বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকেও অনেকে বাংলাদেশে পড়তে আসেন, তাদেরও আগ্রহী করা যেতে পারে। তবে শুধু শিক্ষার কথা বললে হবে না, দেশ হিসেবেও বাংলাদেশের মার্কেটিং ও ব্র্যান্ডিং দরকার।

বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি মেডিক্যালে (নন–সার্ক কোটায়) প্রতিবছর টিউশন ফি বাবদ পাঁচ হাজার ডলার (অর্থাৎ পাঁচ বছরের শিক্ষাজীবনে প্রায় ২৫ হাজার ডলার) দিতে হয়। বেসরকারি মেডিক্যালে প্রতিষ্ঠানভেদে খরচ হয় ৩৫ থেকে ৪৫ হাজার ডলার। দেশের ৬৮টি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের মধ্যে অন্তত ৬০টিতেই নিয়মিত বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ, ঢাকার ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজ, গাজীপুরের ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ, বগুড়ার টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ, ময়মনসিংহের কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ, সিরাজগঞ্জের খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ, কুমিল্লার ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজ, রংপুর কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ ইত্যাদি। এই খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় সুযোগ রয়েছে।

তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত দুই বছরে মেডিক্যাল কলেজগুলোয় বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে।.২০১৯ সালে রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশে এসেছিলেন ভুটানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং।