লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৫:২০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ব্যাটারি প্রযুক্তিতে বড় বিপ্লব: কয়েক মিনিটেই হবে ফুল চার্জ

প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে ফোন চার্জে দেওয়া কিংবা বৈদ্যুতিক গাড়ি নিয়ে বের হওয়ার সময় মাঝপথে চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ার ভয়—যার নাম ‘রেঞ্জ অ্যাংজাইটি’, তা অচিরেই দূর হতে চলেছে। দীর্ঘ বছর ধরে ব্যাটারির মৌলিক প্রযুক্তিতে বড় কোনো পরিবর্তন না এলেও এবার জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার গবেষণাগারে চলছে যুগান্তকারী সব পরীক্ষা। গবেষকদের লক্ষ্য এমন এক ব্যাটারি তৈরি করা, যা মাত্র কয়েক মিনিটে চার্জ হবে, বিপুল শক্তি ধরে রাখবে এবং বছরের পর বছর ব্যবহারের পরও কার্যক্ষমতা হারাবে না।

এই প্রযুক্তির দৌড়ে বর্তমানে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ‘সলিড-স্টেট ব্যাটারি’। প্রচলিত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির ভেতরে থাকা চার্জ বহনকারী তরল পদার্থের পরিবর্তে সলিড-স্টেট ব্যাটারিতে কঠিন পদার্থ হিসেবে সিরামিক, কাচ বা বিশেষ পলিমার ব্যবহার করা হয়। এই সামান্য পরিবর্তন ব্যাটারির শক্তি ধারণের ঘনত্ব বা ‘এনার্জি ডেনসিটি’ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বর্তমানে উন্নত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির ধারণক্ষমতা প্রতি কেজিতে প্রায় ৩০০ ওয়াট-ঘণ্টা হলেও সলিড-স্টেট ব্যাটারির লক্ষ্য ৩৫০ ওয়াট-ঘণ্টার বেশি। এমনকি গবেষণাগারে তৈরি কিছু নমুনা ৫০০ ওয়াট-ঘণ্টার কাছাকাছি পৌঁছেছে। এর ফলে একই ওজনের ব্যাটারি দিয়ে বৈদ্যুতিক গাড়ি এক চার্জে অনেক বেশি পথ চলতে পারবে এবং ফোনও বারবার চার্জ করতে হবে না।

নিরাপত্তার দিক থেকেও এই প্রযুক্তি অনেক এগিয়ে। তরল উপাদান না থাকায় এতে আগুন লাগার ঝুঁকি প্রায় নেই বললেই চলে। তাছাড়া এগুলো ক্ষয় হয় অত্যন্ত ধীরগতিতে; গবেষণায় দেখা গেছে, কয়েক দশক ব্যবহারের পরও এই ব্যাটারিগুলো তাদের মূল ক্ষমতার প্রায় ৯০ শতাংশ ধরে রাখতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর দ্রুত চার্জিং ক্ষমতা। লিথিয়াম-মেটাল অ্যানোডের মতো কার্যকর উপাদান ব্যবহারের ফলে ভবিষ্যতে স্মার্টফোন পাঁচ মিনিটেরও কম সময়ে সম্পূর্ণ চার্জ করা সম্ভব হতে পারে। গাড়ির বাজারেও চলছে তীব্র প্রতিযোগিতা। অটোমোবাইল জায়ান্ট টয়োটা ২০২৭ সালের মধ্যে এমন সলিড-স্টেট ব্যাটারি বাজারে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা মাত্র ১০ মিনিটে ফুল চার্জ হবে এবং একবার চার্জে প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত চলবে। অন্যদিকে স্যামসাং এমন একটি ব্যাটারি প্রদর্শন করেছে, যা মাত্র ৯ মিনিটে ৮০ শতাংশ চার্জ নিতে সক্ষম। এই প্রতিযোগিতায় এলজিসহ বেশ কিছু স্টার্টআপও যুক্ত রয়েছে।

এত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও প্রযুক্তিটি এখনো বাজারে ব্যাপকভাবে না আসার পেছনে একটি বড় জটিলতা রয়েছে। তরল উপাদান যেকোনো অসমান পৃষ্ঠে সহজে ছড়িয়ে পড়ে শূন্যস্থান পূরণ করতে পারে, কিন্তু কঠিন পদার্থ তা পারে না। অণুবীক্ষণ যন্ত্রে ব্যাটারির ভেতরের পৃষ্ঠগুলো পুরোপুরি মসৃণ দেখায় না। ফলে সলিড-স্টেট ব্যাটারিতে কঠিন পদার্থ ও পৃষ্ঠের মাঝে অতি ক্ষুদ্র ফাঁক বা শূন্যতা তৈরি হয়, যা বিদ্যুৎ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে এবং ব্যাটারির কার্যকারিতা কমিয়ে দ্রুত ক্ষয় করে ফেলে। বিশ্বজুড়ে গবেষকেরা এখন এই সমস্যার সমাধান খুঁজছেন।

এই প্রযুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিকাশের আগেই ব্যাটারিতে আরও কিছু অন্তর্বর্তীকালীন পরিবর্তন আসছে। প্যানাসনিক ইতিমধ্যেই এমন একটি পরীক্ষামূলক ব্যাটারি তৈরি করেছে, যা বাস্তব পরিস্থিতিতে মাত্র তিন মিনিটে ১০ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ হতে পারে। এছাড়া ব্যাটারির অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা হওয়া রোধ করতে আধুনিক ‘ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ (বিএমএস) বিভিন্ন অ্যালগরিদম ব্যবহার করে তাপমাত্রা, চার্জের গতি ও ক্ষয় নিয়ন্ত্রণ করছে। ব্যাটারির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে সিলিকন ব্যবহার করেও ধারণক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। এমনকি পরিবেশবান্ধব উপায়ে সূর্যমুখীর বীজের খোসার মতো জৈব বর্জ্য ব্যবহার করে তৈরি পরীক্ষামূলক ব্যাটারি ১ হাজারবার পর্যন্ত চার্জ নেওয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছে।

গবেষণার আরেকটি চমকপ্রদ দিক হলো ‘কোয়ান্টাম ব্যাটারি’। অস্ট্রেলিয়ার গবেষকেরা কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের সুপারপজিশন ও এনট্যাঙ্গেলমেন্টের মতো নীতি ব্যবহার করে একটি সফল পরীক্ষামূলক মডেল তৈরি করেছেন। সাধারণ ব্যাটারির আকার বাড়লে কার্যকারিতা কমলেও কোয়ান্টাম ব্যাটারির ক্ষেত্রে আকার বাড়লে কর্মক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পায়। ভবিষ্যতে এর মাধ্যমে দূর থেকে কোনো তার ছাড়াই অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ব্যাটারি চার্জ করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৭ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রথম বাণিজ্যিক সলিড-স্টেট ব্যাটারি বৈদ্যুতিক গাড়িতে দেখা যেতে পারে। তবে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় শুরুতে এগুলো কেবল দামি গাড়িতেই ব্যবহার করা হবে। পরবর্তীতে উৎপাদন বাড়লে দাম কমে আসবে এবং মোবাইল ফোনসহ অন্যান্য ছোট ডিভাইসেও এই প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়বে। একসময় বৈদ্যুতিক গাড়িতে তেল ভরার মতোই দ্রুত চার্জ দেওয়া যাবে, আর তারবিহীন দূরবর্তী চার্জিংয়ের মাধ্যমে চার্জার খুঁজে বেড়ানোর চিরচেনা দৃশ্যটি হয়তো চিরতরে হারিয়ে যাবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

অস্ত্র হাতে ভাইরাল শিবলু অবশেষে আনোয়ারায় গ্রেপ্তার

ব্যাটারি প্রযুক্তিতে বড় বিপ্লব: কয়েক মিনিটেই হবে ফুল চার্জ

প্রকাশিত হয়েছে: ১০:০৫:২৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে ফোন চার্জে দেওয়া কিংবা বৈদ্যুতিক গাড়ি নিয়ে বের হওয়ার সময় মাঝপথে চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ার ভয়—যার নাম ‘রেঞ্জ অ্যাংজাইটি’, তা অচিরেই দূর হতে চলেছে। দীর্ঘ বছর ধরে ব্যাটারির মৌলিক প্রযুক্তিতে বড় কোনো পরিবর্তন না এলেও এবার জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার গবেষণাগারে চলছে যুগান্তকারী সব পরীক্ষা। গবেষকদের লক্ষ্য এমন এক ব্যাটারি তৈরি করা, যা মাত্র কয়েক মিনিটে চার্জ হবে, বিপুল শক্তি ধরে রাখবে এবং বছরের পর বছর ব্যবহারের পরও কার্যক্ষমতা হারাবে না।

এই প্রযুক্তির দৌড়ে বর্তমানে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ‘সলিড-স্টেট ব্যাটারি’। প্রচলিত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির ভেতরে থাকা চার্জ বহনকারী তরল পদার্থের পরিবর্তে সলিড-স্টেট ব্যাটারিতে কঠিন পদার্থ হিসেবে সিরামিক, কাচ বা বিশেষ পলিমার ব্যবহার করা হয়। এই সামান্য পরিবর্তন ব্যাটারির শক্তি ধারণের ঘনত্ব বা ‘এনার্জি ডেনসিটি’ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বর্তমানে উন্নত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির ধারণক্ষমতা প্রতি কেজিতে প্রায় ৩০০ ওয়াট-ঘণ্টা হলেও সলিড-স্টেট ব্যাটারির লক্ষ্য ৩৫০ ওয়াট-ঘণ্টার বেশি। এমনকি গবেষণাগারে তৈরি কিছু নমুনা ৫০০ ওয়াট-ঘণ্টার কাছাকাছি পৌঁছেছে। এর ফলে একই ওজনের ব্যাটারি দিয়ে বৈদ্যুতিক গাড়ি এক চার্জে অনেক বেশি পথ চলতে পারবে এবং ফোনও বারবার চার্জ করতে হবে না।

নিরাপত্তার দিক থেকেও এই প্রযুক্তি অনেক এগিয়ে। তরল উপাদান না থাকায় এতে আগুন লাগার ঝুঁকি প্রায় নেই বললেই চলে। তাছাড়া এগুলো ক্ষয় হয় অত্যন্ত ধীরগতিতে; গবেষণায় দেখা গেছে, কয়েক দশক ব্যবহারের পরও এই ব্যাটারিগুলো তাদের মূল ক্ষমতার প্রায় ৯০ শতাংশ ধরে রাখতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর দ্রুত চার্জিং ক্ষমতা। লিথিয়াম-মেটাল অ্যানোডের মতো কার্যকর উপাদান ব্যবহারের ফলে ভবিষ্যতে স্মার্টফোন পাঁচ মিনিটেরও কম সময়ে সম্পূর্ণ চার্জ করা সম্ভব হতে পারে। গাড়ির বাজারেও চলছে তীব্র প্রতিযোগিতা। অটোমোবাইল জায়ান্ট টয়োটা ২০২৭ সালের মধ্যে এমন সলিড-স্টেট ব্যাটারি বাজারে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা মাত্র ১০ মিনিটে ফুল চার্জ হবে এবং একবার চার্জে প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত চলবে। অন্যদিকে স্যামসাং এমন একটি ব্যাটারি প্রদর্শন করেছে, যা মাত্র ৯ মিনিটে ৮০ শতাংশ চার্জ নিতে সক্ষম। এই প্রতিযোগিতায় এলজিসহ বেশ কিছু স্টার্টআপও যুক্ত রয়েছে।

এত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও প্রযুক্তিটি এখনো বাজারে ব্যাপকভাবে না আসার পেছনে একটি বড় জটিলতা রয়েছে। তরল উপাদান যেকোনো অসমান পৃষ্ঠে সহজে ছড়িয়ে পড়ে শূন্যস্থান পূরণ করতে পারে, কিন্তু কঠিন পদার্থ তা পারে না। অণুবীক্ষণ যন্ত্রে ব্যাটারির ভেতরের পৃষ্ঠগুলো পুরোপুরি মসৃণ দেখায় না। ফলে সলিড-স্টেট ব্যাটারিতে কঠিন পদার্থ ও পৃষ্ঠের মাঝে অতি ক্ষুদ্র ফাঁক বা শূন্যতা তৈরি হয়, যা বিদ্যুৎ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে এবং ব্যাটারির কার্যকারিতা কমিয়ে দ্রুত ক্ষয় করে ফেলে। বিশ্বজুড়ে গবেষকেরা এখন এই সমস্যার সমাধান খুঁজছেন।

এই প্রযুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিকাশের আগেই ব্যাটারিতে আরও কিছু অন্তর্বর্তীকালীন পরিবর্তন আসছে। প্যানাসনিক ইতিমধ্যেই এমন একটি পরীক্ষামূলক ব্যাটারি তৈরি করেছে, যা বাস্তব পরিস্থিতিতে মাত্র তিন মিনিটে ১০ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ হতে পারে। এছাড়া ব্যাটারির অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা হওয়া রোধ করতে আধুনিক ‘ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ (বিএমএস) বিভিন্ন অ্যালগরিদম ব্যবহার করে তাপমাত্রা, চার্জের গতি ও ক্ষয় নিয়ন্ত্রণ করছে। ব্যাটারির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে সিলিকন ব্যবহার করেও ধারণক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। এমনকি পরিবেশবান্ধব উপায়ে সূর্যমুখীর বীজের খোসার মতো জৈব বর্জ্য ব্যবহার করে তৈরি পরীক্ষামূলক ব্যাটারি ১ হাজারবার পর্যন্ত চার্জ নেওয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছে।

গবেষণার আরেকটি চমকপ্রদ দিক হলো ‘কোয়ান্টাম ব্যাটারি’। অস্ট্রেলিয়ার গবেষকেরা কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের সুপারপজিশন ও এনট্যাঙ্গেলমেন্টের মতো নীতি ব্যবহার করে একটি সফল পরীক্ষামূলক মডেল তৈরি করেছেন। সাধারণ ব্যাটারির আকার বাড়লে কার্যকারিতা কমলেও কোয়ান্টাম ব্যাটারির ক্ষেত্রে আকার বাড়লে কর্মক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পায়। ভবিষ্যতে এর মাধ্যমে দূর থেকে কোনো তার ছাড়াই অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ব্যাটারি চার্জ করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৭ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রথম বাণিজ্যিক সলিড-স্টেট ব্যাটারি বৈদ্যুতিক গাড়িতে দেখা যেতে পারে। তবে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় শুরুতে এগুলো কেবল দামি গাড়িতেই ব্যবহার করা হবে। পরবর্তীতে উৎপাদন বাড়লে দাম কমে আসবে এবং মোবাইল ফোনসহ অন্যান্য ছোট ডিভাইসেও এই প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়বে। একসময় বৈদ্যুতিক গাড়িতে তেল ভরার মতোই দ্রুত চার্জ দেওয়া যাবে, আর তারবিহীন দূরবর্তী চার্জিংয়ের মাধ্যমে চার্জার খুঁজে বেড়ানোর চিরচেনা দৃশ্যটি হয়তো চিরতরে হারিয়ে যাবে।