লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৯:৪৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আঙুলের ছাপের অনন্য জ্যামিতিক নকশা ও তার নেপথ্যের বিজ্ঞান

সমগ্র মহাবিশ্বে প্রতিটি মানুষের আঙুলের ছাপের জ্যামিতিক নকশা সম্পূর্ণ অনন্য এবং অদ্বিতীয়। এই পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষের বাস হলেও একজনের আঙুলের ছাপের সঙ্গে অন্য কারও ছাপের কোনো মিল নেই। এমনকি যেসব আইডেনটিক্যাল জমজ সন্তানের ডিএনএ প্রায় ৯৯.৯৯ শতাংশ একই রকম থাকে, তাদের ক্ষেত্রেও আঙুলের ছাপ কখনো এক হয় না। মূলত মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থাতেই মানুষের আঙুলের এই অনন্য ছাপ তৈরি হয়।

গর্ভধারণের ১০ম থেকে ১৩তম সপ্তাহের মধ্যে ভ্রূণের আঙুলের ত্বকে প্রাথমিক রেখাগুলো দৃশ্যমান হতে শুরু করে। এরপর ১৬তম থেকে ১৯তম সপ্তাহের মধ্যে এই রেখাগুলোর জ্যামিতিক নকশাটি স্থায়ী রূপ নেয়। গর্ভাশয়ের অভ্যন্তরে অ্যামনিওটিক তরলের প্রবাহ ও চাপ, রক্তনালীর বিন্যাস এবং ভ্রূণের নড়াচড়ার মতো অসংখ্য পরিবর্তনশীল জৈবিক প্রভাবের ওপর ভিত্তি করে এই নকশাটি গড়ে ওঠে। এই সূক্ষ্ম প্রক্রিয়াগুলো এতই বৈচিত্র্যময় যে একই গর্ভে পাশাপাশি বেড়ে ওঠা জমজ সন্তানদের আঙুলের ছাপেও ভিন্ন জ্যামিতিক রূপ তৈরি হয়।

আঙুলের ছাপের এই অনন্যতা আবিষ্কার ও তা প্রমাণের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহাসিক পটভূমি। ১৮৮০ সালে স্কটিশ চিকিৎসক স্যার হেনরি ফোল্ডস বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী 'নেচার'-এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধে প্রথম আঙুলের ছাপের সাহায্যে অপরাধী ও ব্যক্তি শনাক্তকরণের বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। এরপর ১৮৯২ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী স্যার ফ্রান্সিস গাল্টন এ বিষয়ে গভীর গাণিতিক ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালনা করেন। তিনি 'গাল্টন ডিটেইলস' তত্ত্বের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে দুজন মানুষের আঙুলের ছাপ হুবহু এক হওয়া গাণিতিকভাবে প্রায় অসম্ভব।

পরবর্তীতে ১৮৯৭ সালে তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশে এই আবিষ্কারকে বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগের জন্য এক যুগান্তকারী গাণিতিক শ্রেণীবদ্ধকরণ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন দুই বাঙালি মেধাবী পুলিশ কর্মকর্তা কাজী আজিজুল হক এবং হেমচন্দ্র বসু। তাদের তৈরি করা গাণিতিক ফর্মুলার ওপর ভিত্তি করেই বিশ্বখ্যাত 'হেনরি ক্লাসিফিকেশন সিস্টেম' গড়ে ওঠে, যা বিশ্বজুড়ে আধুনিক ফরেনসিক বিজ্ঞানের মজবুত ভিত্তি স্থাপন করেছে।

জ্যামিতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে আঙুলের ছাপে মূলত তিনটি প্রধান নকশা দেখা যায়। এগুলো হলো লুপ বা বাঁকানো রেখা, আর্চ বা ধনুকের মতো খিলান এবং ওয়ার্ল বা পেঁচানো ঘূর্ণি। আঙুলের ত্বকে থাকা রেখাগুলো যেখানে দ্বিখণ্ডিত হয়, শেষ হয় কিংবা বিন্দুর মতো রূপ নেয়, বৈজ্ঞানিক ভাষায় সেই সূক্ষ্ম স্থানগুলোকে 'মিনুশাই' বলা হয়। একটি আঙুলে এমন অসংখ্য মিনুশাই পয়েন্ট থাকে। এই বিন্দুগুলোর অবস্থান, কোণ ও পারস্পরিক দূরত্বের জটিল জ্যামিতিক হিসাব প্রতিটি মানুষের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা বিন্যাস তৈরি করে।

একবার গর্ভাশয়ে এই জ্যামিতিক নকশাটি তৈরি হয়ে গেলে মানুষের মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তা আর কখনো পরিবর্তিত হয় না। যদি কখনো আঙুলের উপরিভাগ বা এপিডার্মিস কেটে যায় বা পুড়েও যায়, তবে তা সুস্থ হওয়ার পর ঠিক আগের নকশাতেই ফিরে আসে। কেবল যদি ত্বকের গভীরের ডার্মাল প্যাপিলা স্তর পর্যন্ত কোনো আঘাত পৌঁছায়, তবেই সেখানে স্থায়ী ক্ষত তৈরি হতে পারে, যা আবার নিজের জায়গায় আরেকটি অনন্য চিহ্ন বহন করে। এই অপরিবর্তনশীল ও নিখুঁত জ্যামিতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আধুনিক বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যন্ত সর্বত্র আঙুলের ছাপকে মানুষের সবচেয়ে বিশ্বস্ত পরিচয় হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

মহাজাগতিক স্কেলে চিন্তা করলে এটি আরও বেশি বিস্ময়কর। একটি আঙুলের ছাপে থাকা ৫০ থেকে ১৫০টি মিনুশাই পয়েন্টের অবস্থান, দিক ও দূরত্বের সমন্বয়ে যে সম্ভাবনার বিন্যাস তৈরি হয়, তা গাণিতিকভাবে এক অসম্ভব সংখ্যা নির্দেশ করে। ফলে এটি কেবল এই পৃথিবীতেই নয়, বরং পুরো মহাবিশ্বের বিশৃঙ্খলা ও অনিশ্চয়তার নিয়মেও মানুষের অনন্যতার এক অতুলনীয় গাণিতিক প্রমাণ বহন করে।

লেখক: মইনুল রনি, তথ্যসূত্র: Discover with Mainul।

এমনকি যেসব আইডেনটিকাল জমজ (Identical Twins) সন্তানের দেহের ডিএনএ প্রায় ৯৯.৯৯% এক, তাদের আঙুলের ছাপও কখনো এক হয় না!

একটি আঙুলের ছাপে থাকা ৫০ থেকে ১৫০টি মিনুশাই পয়েন্টের অবস্থান, দিক ও দূরত্বের সমন্বয়ে যে সম্ভাবনার বিন্যাস (Permutation) তৈরি হয়, তা গাণিতিকভাবে অসম্ভব এক সংখ্যা নির্দেশ করে।

জনপ্রিয় সংবাদ

মোবাইল হ্যাক ও ভয়েস ক্লোন নিয়ে সংসদ সদস্যদের সতর্ক করলেন চিফ হুইপ

আঙুলের ছাপের অনন্য জ্যামিতিক নকশা ও তার নেপথ্যের বিজ্ঞান

প্রকাশিত হয়েছে: ০২:৩৫:০৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমগ্র মহাবিশ্বে প্রতিটি মানুষের আঙুলের ছাপের জ্যামিতিক নকশা সম্পূর্ণ অনন্য এবং অদ্বিতীয়। এই পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষের বাস হলেও একজনের আঙুলের ছাপের সঙ্গে অন্য কারও ছাপের কোনো মিল নেই। এমনকি যেসব আইডেনটিক্যাল জমজ সন্তানের ডিএনএ প্রায় ৯৯.৯৯ শতাংশ একই রকম থাকে, তাদের ক্ষেত্রেও আঙুলের ছাপ কখনো এক হয় না। মূলত মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থাতেই মানুষের আঙুলের এই অনন্য ছাপ তৈরি হয়।

গর্ভধারণের ১০ম থেকে ১৩তম সপ্তাহের মধ্যে ভ্রূণের আঙুলের ত্বকে প্রাথমিক রেখাগুলো দৃশ্যমান হতে শুরু করে। এরপর ১৬তম থেকে ১৯তম সপ্তাহের মধ্যে এই রেখাগুলোর জ্যামিতিক নকশাটি স্থায়ী রূপ নেয়। গর্ভাশয়ের অভ্যন্তরে অ্যামনিওটিক তরলের প্রবাহ ও চাপ, রক্তনালীর বিন্যাস এবং ভ্রূণের নড়াচড়ার মতো অসংখ্য পরিবর্তনশীল জৈবিক প্রভাবের ওপর ভিত্তি করে এই নকশাটি গড়ে ওঠে। এই সূক্ষ্ম প্রক্রিয়াগুলো এতই বৈচিত্র্যময় যে একই গর্ভে পাশাপাশি বেড়ে ওঠা জমজ সন্তানদের আঙুলের ছাপেও ভিন্ন জ্যামিতিক রূপ তৈরি হয়।

আঙুলের ছাপের এই অনন্যতা আবিষ্কার ও তা প্রমাণের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহাসিক পটভূমি। ১৮৮০ সালে স্কটিশ চিকিৎসক স্যার হেনরি ফোল্ডস বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী 'নেচার'-এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধে প্রথম আঙুলের ছাপের সাহায্যে অপরাধী ও ব্যক্তি শনাক্তকরণের বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। এরপর ১৮৯২ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী স্যার ফ্রান্সিস গাল্টন এ বিষয়ে গভীর গাণিতিক ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালনা করেন। তিনি 'গাল্টন ডিটেইলস' তত্ত্বের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে দুজন মানুষের আঙুলের ছাপ হুবহু এক হওয়া গাণিতিকভাবে প্রায় অসম্ভব।

পরবর্তীতে ১৮৯৭ সালে তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশে এই আবিষ্কারকে বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগের জন্য এক যুগান্তকারী গাণিতিক শ্রেণীবদ্ধকরণ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন দুই বাঙালি মেধাবী পুলিশ কর্মকর্তা কাজী আজিজুল হক এবং হেমচন্দ্র বসু। তাদের তৈরি করা গাণিতিক ফর্মুলার ওপর ভিত্তি করেই বিশ্বখ্যাত 'হেনরি ক্লাসিফিকেশন সিস্টেম' গড়ে ওঠে, যা বিশ্বজুড়ে আধুনিক ফরেনসিক বিজ্ঞানের মজবুত ভিত্তি স্থাপন করেছে।

জ্যামিতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে আঙুলের ছাপে মূলত তিনটি প্রধান নকশা দেখা যায়। এগুলো হলো লুপ বা বাঁকানো রেখা, আর্চ বা ধনুকের মতো খিলান এবং ওয়ার্ল বা পেঁচানো ঘূর্ণি। আঙুলের ত্বকে থাকা রেখাগুলো যেখানে দ্বিখণ্ডিত হয়, শেষ হয় কিংবা বিন্দুর মতো রূপ নেয়, বৈজ্ঞানিক ভাষায় সেই সূক্ষ্ম স্থানগুলোকে 'মিনুশাই' বলা হয়। একটি আঙুলে এমন অসংখ্য মিনুশাই পয়েন্ট থাকে। এই বিন্দুগুলোর অবস্থান, কোণ ও পারস্পরিক দূরত্বের জটিল জ্যামিতিক হিসাব প্রতিটি মানুষের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা বিন্যাস তৈরি করে।

একবার গর্ভাশয়ে এই জ্যামিতিক নকশাটি তৈরি হয়ে গেলে মানুষের মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তা আর কখনো পরিবর্তিত হয় না। যদি কখনো আঙুলের উপরিভাগ বা এপিডার্মিস কেটে যায় বা পুড়েও যায়, তবে তা সুস্থ হওয়ার পর ঠিক আগের নকশাতেই ফিরে আসে। কেবল যদি ত্বকের গভীরের ডার্মাল প্যাপিলা স্তর পর্যন্ত কোনো আঘাত পৌঁছায়, তবেই সেখানে স্থায়ী ক্ষত তৈরি হতে পারে, যা আবার নিজের জায়গায় আরেকটি অনন্য চিহ্ন বহন করে। এই অপরিবর্তনশীল ও নিখুঁত জ্যামিতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আধুনিক বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যন্ত সর্বত্র আঙুলের ছাপকে মানুষের সবচেয়ে বিশ্বস্ত পরিচয় হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

মহাজাগতিক স্কেলে চিন্তা করলে এটি আরও বেশি বিস্ময়কর। একটি আঙুলের ছাপে থাকা ৫০ থেকে ১৫০টি মিনুশাই পয়েন্টের অবস্থান, দিক ও দূরত্বের সমন্বয়ে যে সম্ভাবনার বিন্যাস তৈরি হয়, তা গাণিতিকভাবে এক অসম্ভব সংখ্যা নির্দেশ করে। ফলে এটি কেবল এই পৃথিবীতেই নয়, বরং পুরো মহাবিশ্বের বিশৃঙ্খলা ও অনিশ্চয়তার নিয়মেও মানুষের অনন্যতার এক অতুলনীয় গাণিতিক প্রমাণ বহন করে।

লেখক: মইনুল রনি, তথ্যসূত্র: Discover with Mainul।

এমনকি যেসব আইডেনটিকাল জমজ (Identical Twins) সন্তানের দেহের ডিএনএ প্রায় ৯৯.৯৯% এক, তাদের আঙুলের ছাপও কখনো এক হয় না!

একটি আঙুলের ছাপে থাকা ৫০ থেকে ১৫০টি মিনুশাই পয়েন্টের অবস্থান, দিক ও দূরত্বের সমন্বয়ে যে সম্ভাবনার বিন্যাস (Permutation) তৈরি হয়, তা গাণিতিকভাবে অসম্ভব এক সংখ্যা নির্দেশ করে।