লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১১:৪১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বোর্হেস: তীরন্দাজ, তীর ও লক্ষ্য—এক সাহিত্যিক স্মৃতিকথা

জর্জ লুইস বোর্হেস যখন প্রথম আমার পড়ার টেবিলে আসেন, তখন তিনি বিশ্বসাহিত্যের কোনো পরিচিত নাম ছিলেন না। ১৯৪০-এর দশকের কাছাকাছি সময়ে মেক্সিকোতে আমরা কয়েকজন তরুণ লেখক—হোসে লুইস মার্তিনেস, আলি চুমাসেরো, হাভিয়ের ভিয়াউরুতিয়া—তাঁকে এক গোপন সংকেতের মতো পড়তাম। তিনি ছিলেন লেখকদের জন্য লেখক। ১৯৪১ সালে প্রকাশিত ‘দ্য গার্ডেন অব ফর্কিং পাথস’ বইটির পুরনো নীল মলাটের সংস্করণটি আজও আমার কাছে আছে, যেখানে একটি তীরের ছবি ছিল—যেটি কোনো ভৌগোলিক দিক নয়, বরং একটি মানসিক ভূখণ্ডের ইঙ্গিত বহন করত।

বোর্হেসকে পড়া মানে কেবল বই পড়া নয়, বরং এক কণ্ঠের সঙ্গে নীরব কথোপকথন। আলফোনসো রেয়েসের কাছে প্রথম তাঁর বাস্তব উপস্থিতির কথা শুনি। রেয়েস তাঁকে শ্রদ্ধা করলেও তাদের সাহিত্যিক রুচি ছিল ভিন্ন। পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে প্যারিসে আর্জেন্টাইন বন্ধুদের—হোসে বিয়াঙ্কো, সিলভিনা ওকাম্পো ও আদলফো বিয়োই কাসারেস—মুখে তাঁর কথা শুনে মনে হতো আমি তাঁকে চিনি। ১৯৭১ সালে অস্টিনে তাঁর সঙ্গে আমার সরাসরি দেখা হয়। তখনো তাঁর আলামোর রক্ষকদের নিয়ে লেখা একটি কবিতার কারণে আমার মনে কিছুটা ক্ষোভ ছিল, যা আমাদের দূরত্বের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু বুয়েনস আয়ার্স বা মেক্সিকোতে পরবর্তী সাক্ষাতগুলোতে আমাদের সাহিত্যিক রুচির মিলগুলো সেই দূরত্ব কমিয়ে আনে। মেক্সিকোর এক অনুষ্ঠানে ভিড়ের মাঝে তিনি যখন তুলে-র কবিতা আবৃত্তি করছিলেন, তখন মনে হয়েছিল বর্তমানের মাঝখানে হঠাৎ অতীত এসে দাঁড়িয়েছে।

বুয়েনস আয়ার্সের লেজামা পার্কে হাঁটতে হাঁটতে কিংবা ক্যাফে তোর্তোনির আড্ডায় বোর্হেস তাঁর যৌবনের শব্দের শহরের কথা বলতেন। শেষের দিকে নিউইয়র্কে আমাদের দেখা হওয়ার সময় তিনি রেয়েস ও লোপেস ভেলার্দের কথা তুলেছিলেন। মৃত্যুর জন্য মানুষ সারাজীবন প্রস্তুত হয়, কিন্তু মৃত্যু কখনো প্রস্তুত হয়ে আসে না—তাঁর মৃত্যু আমাকে এই সত্যের সামনে দাঁড় করিয়েছিল। ছিয়াশি বছর বয়সও মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট নয়।

বোর্হেস প্রবন্ধ, কবিতা ও ছোটগল্প—এই তিন রূপে লিখলেও তাঁর সবকিছুর মূলে ছিল চিন্তা। বার্কলি, লাইবনিজ, স্পিনোজা থেকে শুরু করে বৌদ্ধ দর্শন পর্যন্ত তাঁর আগ্রহের পরিধি ছিল বিস্তৃত। তিনি ছিলেন একাধারে অধিবিদ্যার অনুরাগী এবং সংশয়বাদী। তাঁর লেখায় আয়না বারবার ফিরে আসে, যা পরিচয়ের বহুত্বকে নির্দেশ করে। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ সময়ের গোলকধাঁধায় নিজেকে খুঁজতে গিয়ে প্রতিবারই অন্য কাউকে আবিষ্কার করে।

তাঁর সাহিত্যিক বিশ্বজনীনতা লাতিন আমেরিকান পরিচয়কে মুছে দেয়নি, বরং তা ছিল তারই ফল। বুয়েনস আয়ার্সের গলি, ছুরি, গাউচো, পুরুষের অহংকার ও রাস্তার হিংসা—সবই তাঁর কল্পনায় বারবার ফিরে এসেছে। তিনি বিন্দুতে অসীমকে ধরতে চেয়েছিলেন। তাঁর মতে, তীরন্দাজ, তীর ও লক্ষ্য—এই তিনটি আলাদা বস্তু নয়; মানুষই তীরন্দাজ, মানুষই তীর এবং মানুষই লক্ষ্য। আর সময় হলো সেই অদৃশ্য স্থান, যেখানে তারা মিলিত হয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

জাপানে শক্তিশালী টাইফুন দুজুয়ানের আঘাত, বিদ্যুৎহীন ৫০ হাজার পরিবার

বোর্হেস: তীরন্দাজ, তীর ও লক্ষ্য—এক সাহিত্যিক স্মৃতিকথা

প্রকাশিত হয়েছে: ০৪:৫১:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জর্জ লুইস বোর্হেস যখন প্রথম আমার পড়ার টেবিলে আসেন, তখন তিনি বিশ্বসাহিত্যের কোনো পরিচিত নাম ছিলেন না। ১৯৪০-এর দশকের কাছাকাছি সময়ে মেক্সিকোতে আমরা কয়েকজন তরুণ লেখক—হোসে লুইস মার্তিনেস, আলি চুমাসেরো, হাভিয়ের ভিয়াউরুতিয়া—তাঁকে এক গোপন সংকেতের মতো পড়তাম। তিনি ছিলেন লেখকদের জন্য লেখক। ১৯৪১ সালে প্রকাশিত ‘দ্য গার্ডেন অব ফর্কিং পাথস’ বইটির পুরনো নীল মলাটের সংস্করণটি আজও আমার কাছে আছে, যেখানে একটি তীরের ছবি ছিল—যেটি কোনো ভৌগোলিক দিক নয়, বরং একটি মানসিক ভূখণ্ডের ইঙ্গিত বহন করত।

বোর্হেসকে পড়া মানে কেবল বই পড়া নয়, বরং এক কণ্ঠের সঙ্গে নীরব কথোপকথন। আলফোনসো রেয়েসের কাছে প্রথম তাঁর বাস্তব উপস্থিতির কথা শুনি। রেয়েস তাঁকে শ্রদ্ধা করলেও তাদের সাহিত্যিক রুচি ছিল ভিন্ন। পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে প্যারিসে আর্জেন্টাইন বন্ধুদের—হোসে বিয়াঙ্কো, সিলভিনা ওকাম্পো ও আদলফো বিয়োই কাসারেস—মুখে তাঁর কথা শুনে মনে হতো আমি তাঁকে চিনি। ১৯৭১ সালে অস্টিনে তাঁর সঙ্গে আমার সরাসরি দেখা হয়। তখনো তাঁর আলামোর রক্ষকদের নিয়ে লেখা একটি কবিতার কারণে আমার মনে কিছুটা ক্ষোভ ছিল, যা আমাদের দূরত্বের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু বুয়েনস আয়ার্স বা মেক্সিকোতে পরবর্তী সাক্ষাতগুলোতে আমাদের সাহিত্যিক রুচির মিলগুলো সেই দূরত্ব কমিয়ে আনে। মেক্সিকোর এক অনুষ্ঠানে ভিড়ের মাঝে তিনি যখন তুলে-র কবিতা আবৃত্তি করছিলেন, তখন মনে হয়েছিল বর্তমানের মাঝখানে হঠাৎ অতীত এসে দাঁড়িয়েছে।

বুয়েনস আয়ার্সের লেজামা পার্কে হাঁটতে হাঁটতে কিংবা ক্যাফে তোর্তোনির আড্ডায় বোর্হেস তাঁর যৌবনের শব্দের শহরের কথা বলতেন। শেষের দিকে নিউইয়র্কে আমাদের দেখা হওয়ার সময় তিনি রেয়েস ও লোপেস ভেলার্দের কথা তুলেছিলেন। মৃত্যুর জন্য মানুষ সারাজীবন প্রস্তুত হয়, কিন্তু মৃত্যু কখনো প্রস্তুত হয়ে আসে না—তাঁর মৃত্যু আমাকে এই সত্যের সামনে দাঁড় করিয়েছিল। ছিয়াশি বছর বয়সও মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট নয়।

বোর্হেস প্রবন্ধ, কবিতা ও ছোটগল্প—এই তিন রূপে লিখলেও তাঁর সবকিছুর মূলে ছিল চিন্তা। বার্কলি, লাইবনিজ, স্পিনোজা থেকে শুরু করে বৌদ্ধ দর্শন পর্যন্ত তাঁর আগ্রহের পরিধি ছিল বিস্তৃত। তিনি ছিলেন একাধারে অধিবিদ্যার অনুরাগী এবং সংশয়বাদী। তাঁর লেখায় আয়না বারবার ফিরে আসে, যা পরিচয়ের বহুত্বকে নির্দেশ করে। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ সময়ের গোলকধাঁধায় নিজেকে খুঁজতে গিয়ে প্রতিবারই অন্য কাউকে আবিষ্কার করে।

তাঁর সাহিত্যিক বিশ্বজনীনতা লাতিন আমেরিকান পরিচয়কে মুছে দেয়নি, বরং তা ছিল তারই ফল। বুয়েনস আয়ার্সের গলি, ছুরি, গাউচো, পুরুষের অহংকার ও রাস্তার হিংসা—সবই তাঁর কল্পনায় বারবার ফিরে এসেছে। তিনি বিন্দুতে অসীমকে ধরতে চেয়েছিলেন। তাঁর মতে, তীরন্দাজ, তীর ও লক্ষ্য—এই তিনটি আলাদা বস্তু নয়; মানুষই তীরন্দাজ, মানুষই তীর এবং মানুষই লক্ষ্য। আর সময় হলো সেই অদৃশ্য স্থান, যেখানে তারা মিলিত হয়।