লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৯:১২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সংকট ও বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকা

গণতন্ত্র রক্ষা ও একে সুসংহত করার প্রক্রিয়ায় সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে আলোচনার সময় একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রায়ই এড়িয়ে যাওয়া হয়: আমরা ঠিক কোন ধরনের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই? গণতন্ত্রের রূপ নানাবিধ হতে পারে এবং একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই শেষ কথা নয়। নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক যাত্রার সূচনা হলেও, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ বা অভিজাতদের আধিপত্যের ফলে ‘সংখ্যাগুরুর স্বৈরতন্ত্র’ কিংবা ‘অভিজাতদের স্বৈরতন্ত্র’ সৃষ্টির ঝুঁকি থাকে। গণতন্ত্রের মূল সংগ্রাম হলো এই দুই চরমপন্থার মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখা, যাতে নীতিনির্ধারণে জনগণের উদ্বেগের প্রতিফলন ঘটে।

বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ধারণাটি বর্তমানে অত্যন্ত সংকুচিত। পাঁচ বছর অন্তর কেবল নির্বাচনের দিনটিতে মনোযোগ সীমাবদ্ধ রাখলে মধ্যবর্তী সময়ে বিরোধী দলের কাছ থেকে গঠনমূলক কিছু আশা করা অর্থহীন। এই কাঠামোগত দুর্বলতায় নির্বাহী বিভাগ জবাবদিহির বাইরে থাকে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনতা হারায়। গণতন্ত্রকে যদি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবেই বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকার সুযোগ তৈরি হয়। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন এক প্রতিনিধিত্বমূলক উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যা রাজনীতিকে ‘বিজয়ীই সব নিয়ে নেয়’ নীতি থেকে সরিয়ে ‘কিছু জেতো কিছু হারো’ নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত করবে।

ক্ষমতাসীন দল স্বেচ্ছায় ক্ষমতা সীমিত করতে চায় না বলে বিরোধী দলের মূল কাজ হওয়া উচিত কাঠামোগত সংস্কারের জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং নাগরিক সমাজের সঙ্গে মিত্রতা গড়ে তোলা। উদার গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে ‘অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের’ ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়ায় জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ থাকে। বিরোধী দলকে সাধারণ মানুষের আরও কাছাকাছি আসতে হবে এবং নির্বাচনী, উদার প্রাতিষ্ঠানিক ও অংশগ্রহণমূলক—এই তিন মাত্রাকে সমন্বয় করতে হবে।

বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যখন শাসক দল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্নির্মাণে অনিচ্ছুক এবং আমলাতন্ত্রের দলীয়করণে ব্যস্ত, তখন বিরোধী দলের ভূমিকা আরও জরুরি। তবে দুঃখজনকভাবে, বর্তমান বিরোধী রাজনীতি সংঘাতকেন্দ্রিক এবং নাগরিকমুখী চিন্তাভাবনা থেকে দূরে। একটি প্রগতিশীল রাজনীতি বাস্তবায়নে তাদের তিনটি বিষয়ে জোর দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, শুধু সমালোচনা নয়, বরং টেকসই সংস্কারের যৌক্তিকতা জনগণের সামনে উপস্থাপন করে সুশীল সমাজ ও অংশীদারদের নিয়ে পাল্টা সংস্কারবাদী রাজনৈতিক অক্ষ গড়ে তোলা। দ্বিতীয়ত, শক্তি প্রদর্শনের চিরাচরিত কর্মসূচির বদলে দ্রব্যমূল্য, বেকারত্ব ও দুর্নীতির মতো দৈনন্দিন সংকট নিয়ে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানো। তৃতীয়ত, ধর্ম, জাতি বা লিঙ্গপরিচয়–নির্বিশেষে প্রত্যেকের অধিকার রক্ষার সুস্পষ্ট ভিশন ঘোষণা করা।

জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলো এখনো সংঘাত ও আবেগসর্বস্ব রাজনীতিতে অভ্যস্ত এবং তাদের সংস্কার প্রস্তাবগুলো অনেক সময় তাদের আদর্শের সাথে সাংঘর্ষিক। গঠনমূলক বিকল্প নীতি উপস্থাপন না করে ১৯৯০-এর দশকের পুরোনো কৌশল নিয়েই তারা হাঁটছে। বিপরীতে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)-এর মতো তরুণ দলগুলো প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রতি আন্তরিক হলেও, তারা জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং রক্ষণশীলতার চাপের মাঝে ‘হ্যামলেটীয় দ্বিধা’য় ভুগছে। এছাড়া বামপন্থী দলগুলোর সাংগঠনিক সক্ষমতার অভাব এবং চরম-ডানপন্থী দলগুলোর দর্শন উদার গণতন্ত্রের পরিপন্থী। একটি দেশের বিরোধী দলের প্রকৃত শক্তি কেবল সরকার পরিবর্তনের সক্ষমতায় নয়, বরং প্রতিষ্ঠান গড়ার অঙ্গীকার ও জনসম্পৃক্ততার ওপর নির্ভর করে। জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করতে এমন বিরোধী রাজনীতির প্রয়োজন, যা ক্ষমতার লড়াইয়ের ঊর্ধ্বে উঠে একটি সহনশীল সমাজ প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা দেবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যবর্তী নির্বাচনে হারের পর হেগসেথকে সরানোর গুঞ্জন ট্রাম্পের অন্দরে

বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সংকট ও বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকা

প্রকাশিত হয়েছে: ০২:০০:৫৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

গণতন্ত্র রক্ষা ও একে সুসংহত করার প্রক্রিয়ায় সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে আলোচনার সময় একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রায়ই এড়িয়ে যাওয়া হয়: আমরা ঠিক কোন ধরনের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই? গণতন্ত্রের রূপ নানাবিধ হতে পারে এবং একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই শেষ কথা নয়। নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক যাত্রার সূচনা হলেও, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ বা অভিজাতদের আধিপত্যের ফলে ‘সংখ্যাগুরুর স্বৈরতন্ত্র’ কিংবা ‘অভিজাতদের স্বৈরতন্ত্র’ সৃষ্টির ঝুঁকি থাকে। গণতন্ত্রের মূল সংগ্রাম হলো এই দুই চরমপন্থার মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখা, যাতে নীতিনির্ধারণে জনগণের উদ্বেগের প্রতিফলন ঘটে।

বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ধারণাটি বর্তমানে অত্যন্ত সংকুচিত। পাঁচ বছর অন্তর কেবল নির্বাচনের দিনটিতে মনোযোগ সীমাবদ্ধ রাখলে মধ্যবর্তী সময়ে বিরোধী দলের কাছ থেকে গঠনমূলক কিছু আশা করা অর্থহীন। এই কাঠামোগত দুর্বলতায় নির্বাহী বিভাগ জবাবদিহির বাইরে থাকে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনতা হারায়। গণতন্ত্রকে যদি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবেই বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকার সুযোগ তৈরি হয়। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন এক প্রতিনিধিত্বমূলক উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যা রাজনীতিকে ‘বিজয়ীই সব নিয়ে নেয়’ নীতি থেকে সরিয়ে ‘কিছু জেতো কিছু হারো’ নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত করবে।

ক্ষমতাসীন দল স্বেচ্ছায় ক্ষমতা সীমিত করতে চায় না বলে বিরোধী দলের মূল কাজ হওয়া উচিত কাঠামোগত সংস্কারের জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং নাগরিক সমাজের সঙ্গে মিত্রতা গড়ে তোলা। উদার গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে ‘অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের’ ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়ায় জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ থাকে। বিরোধী দলকে সাধারণ মানুষের আরও কাছাকাছি আসতে হবে এবং নির্বাচনী, উদার প্রাতিষ্ঠানিক ও অংশগ্রহণমূলক—এই তিন মাত্রাকে সমন্বয় করতে হবে।

বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যখন শাসক দল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্নির্মাণে অনিচ্ছুক এবং আমলাতন্ত্রের দলীয়করণে ব্যস্ত, তখন বিরোধী দলের ভূমিকা আরও জরুরি। তবে দুঃখজনকভাবে, বর্তমান বিরোধী রাজনীতি সংঘাতকেন্দ্রিক এবং নাগরিকমুখী চিন্তাভাবনা থেকে দূরে। একটি প্রগতিশীল রাজনীতি বাস্তবায়নে তাদের তিনটি বিষয়ে জোর দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, শুধু সমালোচনা নয়, বরং টেকসই সংস্কারের যৌক্তিকতা জনগণের সামনে উপস্থাপন করে সুশীল সমাজ ও অংশীদারদের নিয়ে পাল্টা সংস্কারবাদী রাজনৈতিক অক্ষ গড়ে তোলা। দ্বিতীয়ত, শক্তি প্রদর্শনের চিরাচরিত কর্মসূচির বদলে দ্রব্যমূল্য, বেকারত্ব ও দুর্নীতির মতো দৈনন্দিন সংকট নিয়ে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানো। তৃতীয়ত, ধর্ম, জাতি বা লিঙ্গপরিচয়–নির্বিশেষে প্রত্যেকের অধিকার রক্ষার সুস্পষ্ট ভিশন ঘোষণা করা।

জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলো এখনো সংঘাত ও আবেগসর্বস্ব রাজনীতিতে অভ্যস্ত এবং তাদের সংস্কার প্রস্তাবগুলো অনেক সময় তাদের আদর্শের সাথে সাংঘর্ষিক। গঠনমূলক বিকল্প নীতি উপস্থাপন না করে ১৯৯০-এর দশকের পুরোনো কৌশল নিয়েই তারা হাঁটছে। বিপরীতে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)-এর মতো তরুণ দলগুলো প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রতি আন্তরিক হলেও, তারা জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং রক্ষণশীলতার চাপের মাঝে ‘হ্যামলেটীয় দ্বিধা’য় ভুগছে। এছাড়া বামপন্থী দলগুলোর সাংগঠনিক সক্ষমতার অভাব এবং চরম-ডানপন্থী দলগুলোর দর্শন উদার গণতন্ত্রের পরিপন্থী। একটি দেশের বিরোধী দলের প্রকৃত শক্তি কেবল সরকার পরিবর্তনের সক্ষমতায় নয়, বরং প্রতিষ্ঠান গড়ার অঙ্গীকার ও জনসম্পৃক্ততার ওপর নির্ভর করে। জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করতে এমন বিরোধী রাজনীতির প্রয়োজন, যা ক্ষমতার লড়াইয়ের ঊর্ধ্বে উঠে একটি সহনশীল সমাজ প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা দেবে।